একুশের সংগ্রাম ও কমিউনিস্টদের ভূমিকা

একুশের সংগ্রাম ও কমিউনিস্টদের ভূমিকা

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে মাতৃভাষার অধিকারের দাবিতে রক্ত ঝরেছিল ঢাকার রাজপথে। রফিক, শফিক, সালাম, জব্বার, বরকতদের বুকের তাজা রক্তে সেদিন রচিত হয়েছিল আন্দোলনের এক অনন্য অধ্যায়, ইতিহাসের এক অমর গাঁথা। এরকম আরো রক্তঝরা গণসংগ্রাম সংগঠিত হয়েছিল বায়ান্নর আগে ও পরে। রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল শহীদের রক্তে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি আজো হয়ে আছে বাঙালির ‘শহীদ দিবস’। দেশের জন্য আত্মদানের মহিমা, পুলিশের গুলিতে বুলেটে-ঝাঁজরা হওয়া বুক, উড়ে যাওয়া মাথার খুলি, কুমড়ো ফুলের বড়ি রেঁধে ছেলের জন্য পথ চেয়ে বসে থাকা পাড়াগাঁয়ের সেই দুঃখিনী মায়ের কোল খালি হওয়া চিরবিদায়ের বিরহ যন্ত্রণা– এগুলোই অমর একুশের প্রতিচ্ছবি। সাথে সাথে একুশ হচ্ছে মাথা না নোয়ানো, অমিত সাহস, বীরত্ব এবং ছাত্র-জনতার একতাবদ্ধ দুর্বার প্রতিরোধের মহাকাব্যিক আখ্যান। গ্রীক ট্র্যাজেডির মতো যুগপৎ বেদনা ও বীরত্বের অমর গাঁথা।

বায়ান্নতে আমার বয়স ছিল চার বছর ছুঁই ছুঁই অবস্থায়। মিছিলে যাওয়ার বয়স তখনো আমার হয়নি। তবুও সেই বয়সেই একুশের ছাপ এসে স্থায়ী স্মৃতিময় আসন করে নিয়েছিল শিশু মনের কোমল অনুভূতিতে ও চেতনায়। সব বিষয় বুঝতে না পারলেও টের পাচ্ছিলাম যে, চারদিকে চলছে একটি চাপা গুঞ্জন। উত্তেজিত কথাবার্তা। বয়স্কজনদের বড় রাস্তার মাথায় গিয়ে খবরা-খবরের খোঁজ নিয়ে আসা। ঝাপ বন্ধ করে গলির মুখে দোকানীদের জটলা করা। শুধু একদিন নয়, কয়েকদিন ধরে এধরনের টান টান উত্তেজনা। কি যেন বড় কিছু ঘটে চলেছে দেশজুড়ে। সে অগ্নিঝরা দিনগুলোর খণ্ডচিত্র, ও ইতিহাস রচনাকারী সেসব উত্তাল ঘটনাবলীর ছাপ, অস্পষ্ট ছবির মতো সেদিন আমার সেদিনের শিশুমনে স্থায়ী চিহ্ন রচনা করেছিল।

কালক্রমে বয়স বেড়েছে। আরো বড় হয়ে কবে প্রথম একুশের প্রভাতফেরীতে পা মিলিয়েছি, শহীদ মিনারে ফুল দিয়েছি, সে কথা নির্দিষ্ট করে মনে নেই। কিন্তু বায়ান্ন থেকে আজ পর্যন্ত আমার মাঝে দেশপ্রেম, বাঙালি জাতীয়তাবোধ, গণমুক্তির সংগ্রাম ও প্রতিবাদ-বিদ্রোহের উদ্দীপক প্রেরণারূপে আমার আবেগ, অনুভূতি ও চেতনায় স্থায়ী আসন অধিকার করে আছে ‘অমর একুশে’। আমার মতো আরো কোটি কোটি বাঙালির ক্ষেত্রেও তাই।

সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদের আদর্শে আমার উদ্বুদ্ধ হওয়া ও একজন কমিউনিস্ট হিসেবে আমার গড়ে ওঠার পেছনে অনেক উপাদান কাজ করেছে। তার মাঝে ছিল যুক্তি-তর্ক ও বিচার-বিবেচনার মস্তিষ্কজাত উপলব্ধি। একই সাথে ছিল আবেগ ও অনুভবের হৃদয় উৎসারিত অনুভূতি। যেসব অগণিত ঘটনাবলী আমার কমিউনিস্ট হয়ে ওঠাকে সম্ভব করেছে তার মাঝে একটি অনন্য প্রধান ঘটনা ছিল বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি এবং বছর বছর সে দিবসটির মর্যাদাপূর্ণ উদ্যাপন।

রাজনীতিতে আমার হাতেখড়ি হয়েছিল ছাত্র ইউনিয়ন সংগঠনটির পতাকার নিচে সমবেত হওয়ার মধ্য দিয়ে। তখন থেকেই আমার ক্ষেত্রে একুশে ফেব্রুয়ারি হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক চর্চা ও পাঠের স্বাভাবিক ও অত্যাবশ্যক একটি বিষয়। স্বাভাবিক ছিল এ কারণে যে, ছাত্র ইউনিয়নের জন্মের উৎস ছিল বায়ান্নর সেই ভাষা সংগ্রাম। একুশের রক্তঝরা সংগ্রামের অভিজ্ঞতায় জনগণের মাঝে যে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিবাদী চেতনার নব উন্মেষ ঘটেছিল, সেই ক্রান্তিকালীন সংগ্রামী উল্লম্ফণের ঘটনাবলীর ক্ষেত্রে দেশের সাধারণ ছাত্র সমাজ অগ্রণী ও নেতৃত্বের ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। এসব ঘটনাপ্রবাহ এই উপলব্ধিকে তীক্ষ্মভাবে সামনে এনেছিল যে, একুশের চেতনাকে ধারণ করে তাকে এগিয়ে নেয়ার জন্য দেশে একটি নতুন উপযুক্ত ছাত্র সংগঠনের একান্ত প্রয়োজন। দেশে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের ধারার একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, প্রগতিবাদী ছাত্র সংগঠন প্রতিষ্ঠার যে প্রয়োজনীয়তার কথা সে সময় তীক্ষèভাবে অনুভূত হয়েছিল, তার পটভূমি রচনা করেছিল বায়ান্নর ভাষা-সংগ্রাম। বায়ান্নর সংগ্রামের সেই নির্যাসকে অবলম্বন করেই একুশে ফেব্রুয়ারির মাত্র ২ মাসের মাথায়, পেছনে থাকা কমিউনিস্ট পার্টির প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণায়, প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল নতুন ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন। একুশের চেতনার নির্যাসই হলো ছাত্র ইউনিয়নের মূলনীতি। তাই, এটিই স্বাভাবিক ছিল যে ছাত্র ইউনিয়নের অপরাপর সব সচেতন সদস্যের মতো আমিও পরিপূর্ণরূপে স্নাত হয়ে উঠেছিলাম একুশের অমর চেতনায়। এক অর্থে ‘ছাত্র ইউনিয়ন’ করা সবাই আমরা তখনো এবং এখনো ‘একুশের সন্তান’।

একুশকে চিনতে পারার প্রক্রিয়াতেই জানতে পেরেছিলাম সংগ্রামের এই বীরত্বপূর্ণ অধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ সেনানায়কদের নাম ও পরিচয়। এই কালজয়ী সংগ্রামের অধিকাংশ অগ্রনায়করা ছিলেন প্রগতিবাদী, সমাজতন্ত্রের অনুসারী ও গোপনে কর্মরত কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত। তাদের মধ্যে অনেকে একুশের আগেই, আবার একাংশ একুশের সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় কমিউনিস্ট পার্টিতে যুক্ত হয়েছিলেন। প্রখ্যাত গবেষক ও বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমর তার গবেষণা গ্রন্থে লিখেছেন “ভাষা আন্দোলন যারা সক্রিয়ভাবে পরিচালনার চেষ্টা করেছিলেন এবং তার উপর কিছুটা প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তারা সকলেই কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য বা সমর্থক হিসেবে তার সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং তাদের আন্দোলনগত চিন্তাধারা ও লাইন পার্টি সার্কুলারের (১১ই ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ তারিখের) লাইন অনুযায়ীই মূলত গঠিত ও পরিচালিত হয়েছিল।”

’৫২-এর ১১ ফেব্রুয়ারি গুরুত্বপূর্ণ ও কিছুটা দীর্ঘ কমিউনিস্ট পার্টির সেই সার্কুলারের কিছু কিছু অংশ উদ্বৃত করলেই একুশের সংগ্রাম পরিচালনার ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টির অবস্থান ও ভূমিকার একটি চিত্র পাওয়া যাবে।

সার্কুলারে বলা হয়েছিল, “২৭ জানুয়ারি ঢাকার সভায় বক্তৃতা দানকালে প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দীন সাহেব ঘোষণা করিয়াছেন যে– ‘উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হইবে।’ এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ববঙ্গে আবার রাষ্ট্রভাষার আন্দোলন গড়িয়া উঠিয়াছে। … এই উক্তির প্রতিবাদে ও ‘বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার’ দাবিতে ৩০ জানুয়ারি ইউনিভারসিটি ছাত্রদের নেতৃত্বে প্রথম প্রতীক ধর্মঘট, সভা, শোভাযাত্রা হয় এবং ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরে সাধারণ ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত লওয়া হয়।…

… ৪ঠা ফেব্রুয়ারির সাধারণ ধর্মঘট দারুণভাবে সাফল্যমণ্ডিত হইয়াছে– সমস্ত স্কুল কলেজে পরিপূর্ণ হরতাল পালিত হইয়াছে। ইউনিভারসিটি প্রাঙ্গণে বিরাট সভা হইয়াছে এবং সভার পর দেড়-দুই মাইল লম্বা বিরাট এক শোভাযাত্রা সারা ঢাকা শহর প্রদক্ষিণ করে। ঢাকা শহরে এতো বড় শোভাযাত্রা পূর্বে আর কখনও হয় নাই। … ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কমিটি’ ও ‘ইউনিভারসিটি রাষ্ট্রভাষা কমিটি’ ২১ শে ফেব্রুয়ারি সারা প্রদেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট পালন করার আহ্বান জানাইয়াছে। সারা প্রদেশব্যাপী রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে পরিব্যাপ্ত করার জন্য ২১ শে ফেব্রুয়ারি সাধারণ ধর্মঘটকে সাফল্যমণ্ডিত করিয়া তোলা খুবই জরুরি।…

… ১৯৪৮ সালের আন্দোলন হইতেও এবারের আন্দোলন অনেক বেশি শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাইতেছে। … অতএব রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্য এবং একটি শক্তিশালী ও ব্যাপক গণআন্দোলনে পরিণত করার জন্য পার্টিকে আজ সঠিক কর্মপন্থা লইয়া অগ্রসর হইতে হইবে।

২১ শে ফেব্রুয়ারি সাধারণ ধর্মঘটকে সাফল্যমণ্ডিত করিয়া তোলার জন্য আমাদের কাজ : (১) মজুর শ্রেণির মধ্যে… ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। অতএব লিফলেট, পোস্টার ও ছোট ছোট বৈঠক মারফৎ… মজুর শ্রেণির মধ্যে প্রচারের ব্যবস্থা করুন। (২)… গ্রামাঞ্চলের বাজারগুলিতেও যাহাতে হরতাল পালিত হয়, তাহার জন্য বিশেষ চেষ্টা নেয়া প্রয়োজন। এখন হইতেই সভা, বৈঠক মারফৎ ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করুন। (৩)… উর্দু ভাষাভাষী জনসাধারণের মধ্যে প্রচারের জন্য…. উর্দু ভাষায় প্রচারপত্র, পোস্টার ইত্যাদির ব্যবস্থা করুন। (৪)… জেলায় জেলায় ও স্থানীয়ভাবে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কমিটি গঠন করুন। (৫)… ২১শে ফেব্রুয়ারির জন্য… ভলান্টিয়ার দল গড়িয়া তোলার উপর জোর দিন। (৭)… বেশি সংখ্যায় প্রচারপত্র দেওয়া সম্ভব হইবে না; অতএব সর্বত্র ব্যাপকভাবে পোস্টার লাগানোর ব্যবস্থা করুন। …

… রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে সঠিকভাবে পরিচালিত করার জন্য… প্রত্যেকটি পার্টি ইউনিট ও পার্টি সভ্য সম্মিলিতভাবে কার্যকরী প্ল্যান লইয়া অগ্রসর হউন।… এই আন্দোলনের ভিতর দিয়া বহু কর্মী ও পার্টি মিলিট্যান্ট বাহির হইয়া আসিবেন। এই নতুন নতুন কর্মীদের পার্টি গ্রুপে সংগঠিত করা ও পার্টির নীতিতে শিক্ষিত করিয়া তোলার জন্য… বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।”

’৫২-র ২১শে ফেব্রুয়ারির ১০ দিন আগে ১১ ফেব্রুয়ারি কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরে গোপনে প্রচারিত এই দীর্ঘ সার্কুলারের একাংশের উদ্বৃতি তুলে ধরতেই লেখার অনেকটা জায়গা নিয়ে নিল। পাঠকের বিরক্তি সৃষ্টির আশঙ্কা সত্ত্বেও তার আশ্রয় নিলাম একদিকে সেই সংগ্রামের গণসম্পৃক্ততা ও স্বরূপ তুলে ধরার জন্য এবং অন্যদিকে এ সত্যটি প্রমাণ করার জন্য যে, একুশের ইতিহাস সৃষ্টির পেছনে যে শক্তির সচেতন ও সংগঠিত প্রয়াস সবচেয়ে বেশি ছিল সেটি হলো কমিউনিস্ট পার্টির।

বস্তুত, ১৯৪৮ সালে সংগঠিত ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্বের সময় থেকেই কমিউনিস্ট পার্টি তাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বাংলা ভাষাকে গণপরিষদের অন্যতম ভাষা করার দাবিতে পূর্ব বাংলায় সংগঠিত প্রথম সাধারণ ধর্মঘটে কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীরা সর্বত্র সাধ্যমত অংশগ্রহণ করেছিল। ’৫২-এর একুশের আগে ও পরে প্রবল প্রতিকূলতা ও আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা সত্ত্বেও আন্দোলনের ধারাকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্য কমিউনিস্ট পার্টি স্পষ্ট ও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছিল।

কিছু মহল থেকে এমন একটি কথা বলা হয়ে থাকে যে, ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কমিটি’ কর্তৃক ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে জারিকৃত ১৪৪ ধারা ‘না ভাঙ্গার’ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব পার্টির কর্মীদের সেই সিদ্ধান্ত মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছিল। বিষয়টি মোটেও সত্য নয়। একথা ঠিক যে গোপন আস্তানায় দিনের পর দিন ধরে বসবাসকরা পার্টি নেতৃত্বের পক্ষে ছাত্র-জনমত তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা কষ্টকর ছিল। এবং একই কারণে নেতৃত্বের পক্ষে অসুবিধাজনক ছিল চটজলদি ১৪৪ ধারা মানা-না মানা সম্পর্কে সঠিক মূল্যায়ন করা ও নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। এ পরিস্থিতিতে ১৪৪ ধারা অমান্য করে মিছিল করা উচিত হবে কি হবে না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্বটি প্রকাশ্যে কর্মরত ও আন্দোলনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছাত্র কমরেডদের উপর ছেড়ে দেয়াটাই বিচক্ষণতার পরিচায়ক ছিল। পার্টি নেতৃত্ব ঠিক সেরূপই করেছিল।

১৪৪ ধারা অমান্য করে শোভাযাত্রা বের করা সম্পর্কে পার্টির একুশে পরবর্তী পর্যালোচনা দলিলে বলা হয়েছে– “২০ ফেব্রুয়ারি তারিখে ১৪৪ ধারা জারি হওয়ার পর কি কর্তব্য হইবে এই সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশ না দিয়া সেদিন পার্টি নেতৃত্ব কমরেডদের শুধু বলিয়াছিলেন যে, ২১ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্র জমায়েত করিয়া সেখানে পরবর্তী কর্মপন্থা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়া হোক এবং কমরেডরা যেন (সাধারণ ছাত্রদের) সেই সিদ্ধান্ত মানিয়া নেন। ২১ তারিখে ছাত্রদের মনোভাব সঠিকভাবে বুঝিতে পারিয়া কমরেডরা বাস্তব কর্মক্ষেত্রে সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত করেন যে ১৪৪ ধারা থাকা সত্ত্বেও ১০ জন ১০ জন করিয়া মিছিল করা দরকার। তাহাদের এই সঠিক সিদ্ধান্তই সমস্ত আন্দোলনের মোড় ঘুরাইয়া দেয়।”

কিছুদিন আগে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অবমুক্ত করা গোপন দলিলে উল্লেখ রয়েছে যে ঢাকার তৎকালীন মার্কিন কনস্যুলেটের মতে, বায়ান্নর সে সময়কার ভাষা আন্দোলন জোরদার করতে ছাত্র সমাজকে খেপিয়ে তুলেছিল কমিউনিস্টরাই। বায়ান্নর ১৫ মার্চ ঢাকার মার্কিন কনসাল এই মর্মে ওয়াশিংটনে একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন যে কমিউনিস্টরা ছিল ভাষা আন্দোলনের নাটের গুরু।

একুশের সংগ্রামকে ‘কমিউনিস্ট’ ও ‘হিন্দুদের’ পরিচালিত কাজ বলে মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে প্রচার করা হয়েছিল। ঢাকার ‘মনিং নিউজ’ পত্রিকা এরূপ মিথ্যা খবর প্রকাশ করেছিল যে, “ভারত থেকে ১০০ জন কমিউনিস্ট পূর্ববঙ্গে এসেছে এবং ২০ তারিখ রাত্রে নেতৃস্থানীয় কমিউনিস্টরা সভা করে আন্দোলন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।” এই অপপ্রচারের জবাবে কমিউনিস্ট পার্টি এর দু’দিন পরেই ২৪ ফেব্রুয়ারি তারিখে এক বিবৃতি প্রকাশ করে বলেছিল যে, “আজ আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব করছেন তারা বিভিন্ন দল ও মতের প্রতিনিধি। কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীরাও অন্যান্যদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জনতার পাশে দাঁড়িয়ে নিজ শক্তি অনুযায়ী এই ঐতিহাসিক সংগ্রামে অংশগ্রহণ করছে। কমিউনিস্ট পার্টি চিরদিনই সংগ্রামী জনতার পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করেছে, জেলে গিয়েছে, শহীদ হয়েছে। সরকার এটা জানে বলেই কমিউনিস্ট পার্টির শত শত কর্মী ও নেতাকে বিনা বিচারে বছরের পর বছর আটক রেখেছে।”

এসব কথা যে কতো সত্য তার আরেকটি প্রমাণ হলো, অনেকটা অজানা হয়ে থাকা এই তথ্যটি যে– একুশের বীর শহীদ আবুল বরকত ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাব বলয়ের একজন কর্মী। আমার নিজস্ব পারিবারিক সূত্রেও এ কথা আমার জানা আছে।

রাজনীতিতে ও ইতিহাস তুলে ধরার ক্ষেত্রে ‘সুপ্রিমো’ ভাবমূর্তি নির্মাণের চেষ্টা ও আনুষ্ঠানিকতার কবলে পড়ে বায়ান্নর একুশের সংগ্রামের অনেক সত্য ঘটনাকে আড়ালে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। মানুষের জানা শোনার বাইরে রেখে দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে। এসব তথ্য এক সময় হারিয়েও যেতে পারে। এর পরিণতিতে ঘটবে অন্যরকম এক ‘ইতিহাস বিকৃতি’। ইতিহাসের সঠিক উপলব্ধির জন্য সেসব আড়ালে পড়ে থাকা (অথবা ফেলে রাখা) তথ্যকে সামনে আনা প্রয়োজন। সেই তাগিদ থেকেই কিছু তথ্য এখানে হাজির করলাম।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি।