ভাষার ক্ষমতা, ক্ষমতার ভাষা এবং ভাষামুক্তির সংগ্রাম

ভাষার ক্ষমতা, ক্ষমতার ভাষা এবং ভাষামুক্তির সংগ্রাম

ডা. মনোজ দাশ  

ভাষার ক্ষমতা বিপুল। ভাষাই অন্যসব প্রাণী থেকে মানুষকে অনন্য করে তুলেছে। এই ভাষার মাধ্যমেই আমরা আমাদের চারপাশের জগতকে বুঝতে, ব্যাখ্যা করতে, এমনকি পরিবর্তন করতেও সচেষ্ট হই। যে কোনো স্বাভাবিক মানুষই তার মাতৃভাষার জ্ঞান অর্জনে সক্ষম, কিন্তু মানবভাষার একান্ত প্রাথমিক রূপ আয়ত্ত করাও যথেষ্ট বুদ্ধিমান কোনো মানবেতর প্রাণীর পক্ষে সম্ভব নয়।

দার্শনিক দেকার্ত মানবেতর প্রাণীর ভাব জ্ঞাপন প্রক্রিয়াকে মানবভাষা থেকে গুণগতভাবে ভিন্ন ধরনের বলে মনে করেছেন। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন- ‘ভাষা ছাড়া মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে মানবধর্ম থেকে বঞ্চিত হত জাতি মাত্রেরই সমস্ত অর্জিত সম্পদের আদি ও প্রধানতম কোষাগার হচ্ছে তার ভাষা। এজন্য ঊনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাতত্ত্ববিদ জার্মানির ভন হামবোল্টের কথায়- ‘ভাষা হচ্ছে একটি জাতির চেতনার অভিব্যক্তি, অভ্যন্তরীণ রূপের বাহ্যিক প্রকাশ। জগৎ ও জীবন সম্পর্কে ঐ জাতির ধারণার প্রকাশ রূপ। একটি ভাষার বিবর্তনের বিভিন্ন স্তর ঐ জাতির মানস-সংস্কৃতি ও সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গির সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। সুতরাং ভাষা ও জাতীয় ইতিহাস অচ্ছেদ্যভাবে সম্পর্কিত।’

ভাষা একটি চলমান প্রক্রিয়া। ভাষা জড় পদার্থ নয়। এটি কোনো সমাপ্ত কর্মও নয়। ভাষা একটি জীবন্ত প্রবাহ। একটি ভাষা তার বিকাশের প্রক্রিয়ায় অন্য ভাষার সাথে আদান-প্রদান করে। কিন্তু ‘আধিপত্য কায়েমের জন্য ক্ষমতার ভাষা’ এ পথে চলতে চায় না। কারণ ক্ষমতার সাথে অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক, সবকিছুই জড়িয়ে থাকে। ক্ষমতা হচ্ছে নিয়ন্ত্রক শক্তি। ক্ষমতার ভাষা তার ক্ষমতার দাপটে অর্থনৈতিক স্বার্থে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক হেজিমনি প্রতিষ্ঠার জন্য অন্য ভাষাকে গিলে ফেলতে চায়। ক্ষমতার এই ভাষার সর্দার হচ্ছে ভাষা-সাম্রাজ্যবাদ। প্রতিটি দেশে তার সহযোগী ক্ষমতার ভাষাও থাকে। আধিপত্যশীল এই ভাষা-সাম্রাজ্যবাদ ও তার সহযোগী ক্ষমতার ভাষার আগ্রাসনে আগামী শতাব্দীতেই মানুষের মাঝে প্রচলিত পাঁচ হাজার ভাষার মধ্যে সাড়ে চার হাজার ভাষাই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। সারা পৃথিবীতে বহু ভাষাই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আমাদের দেশও তার মধ্যে আছে। ভাষাভাষীর সংখ্যা দশ হাজারেরও কম এ রকম বিলুপ্ত প্রায় ভাষার সংখ্যাও দীর্ঘতর হচ্ছে। আগামী পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই পৃথিবীতে জীবিত ভাষার সংখ্যা অর্ধেকে দাঁড়াবে। অবিভক্ত ভারতে প্রচলিত পনেরশ’ ভাষার মধ্যে চারশ তেতাল্লিশটি ভাষার নাম চলে গেছে বিপন্ন ভাষার তালিকায়। অর্থনৈতিক স্বার্থে কোনো জাতির ভাষাকে নিঃশেষ করে ফেলতে পারলে সেই জাতির ওপর রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তার করা সহজ হয়ে পড়ে। ভাষা চলে গেলে একটি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি-জ্ঞান-প্রজ্ঞা-দর্শন সবকিছুই চলে যায়। নতুন আধিপত্যশীল ভাষা-সভ্যতায় সে তখন অনায়াসেই বিলীন হয়ে যায়। এজন্য মানবিক অস্তিত্ব রক্ষার যতরকম সংগ্রাম আছে তার মধ্যে ভাষা রক্ষার সংগ্রাম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অন্য কথায় ভাষা-সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভাষামুক্তির সংগ্রাম গণতান্ত্রিক সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

পণ্য সভ্যতা পরিবাহিত বাজার সংস্কৃতি কোনো ভাষা তথা জাতিসত্তার টিকে থাকবার প্রশ্নে কিছু শর্ত নির্ধারণ করে দেয়। পণ্যের দেহ অলংকৃত করে মুনাফা নিয়ে আসবার দাপট নিয়ে বিশ্ব বাজারের আধিপত্যশীল ভাষাগুলোর সমকক্ষ হয়ে না উঠতে পারলে কোনো ভাষারই আর অস্তিত্ববান হয়ে থাকবার সম্ভাবনা নেই। বেঁচে থাকতে হলে সব ভাষাকেই হয়ে উঠতে হবে তাদের মত সর্বত্রগামী ও সর্বজনগ্রাহ্য। হয়ে উঠতে হবে কম্পিউটার, কমুউডিটি ও কনজুউমার ফ্রেন্ডলি। ভাষা-সাম্রাজ্যবাদ ও তার সহযোগীরা কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে এমন একটি ভাষাকে সারাবিশ্বে ও প্রতিটি দেশের মানুষের কাছে চাপিয়ে দিতে চায়। মুনাফা নিশ্চিত করার জন্য একটি জাতির অস্তিত্ব সংকট তৈরি করতে না পারলে, নিজস্বতা ধ্বংস করে পরমুখাপেক্ষী করে ফেলতে না পারলে তাদের ব্যবসা জমজমাট হয় না। ‘জাতিগত আত্মনিয়ন্ত্রণ বলতে কী বোঝায়’ নামক প্রবন্ধে লেনিন দেখিয়েছেন- ‘পণ্য উৎপাদনে পরিপূর্ণ বিজয়ের জন্য বুর্জোয়াদের আভ্যন্তরীণ বাজার দখল করতে হবে। আর থাকতে হবে রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ ভূ-খণ্ড, যার অধিবাসীরা একই ভাষায় কথা বলে, …আধুনিক পুঁজিবাদের পক্ষে অবাধ ও ব্যাপক বাণিজ্যের জন্য বাজারের সাথে ছোট-বড় প্রতিটি মালিকের এবং ক্রেতা ও বিক্রেতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হল ভাষার ঐক্য ও তার বাধাহীন বিকাশ।’

বুর্জোয়াদের কাছে ভাষার ঐক্য মানে ‘ঐক্যবদ্ধ ভূ-খণ্ড, যার অধিবাসীরা একই ভাষায় কথা বলে’। তাই ভাষার ঐক্যের জন্য বুর্জোয়ারা ভাষার বৈচিত্র্যকে গুড়িয়ে দিতে চায়। দেড় শতাব্দীরও অধিককাল ধরে ‘ক্ষমতার ভাষা’ কর্তৃক দুর্বল ভাষার ওপর আক্রমণের বিরুদ্ধে কমিউনিস্টরা কথা বলছেন। বিস্তৃত কোনো আলোচনা না করলেও মার্কস-এঙ্গেলস ভাষা সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোকপাত করেছেন। স্তালিন ভাষা প্রশ্ন নিয়ে যান্ত্রিক মার্কসবাদী ধারণার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। স্তালিন দেখান- ‘ভাষা ভিত্তি ও উপরিকাঠামো, কোনটির সাথেই প্রত্যক্ষভাবে জড়িত নয়।’ স্তালিন দেখিয়েছেন, পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিক ও পুঁজিপতি একই মাতৃভাষায় কথা বলে। আবার অন্যদিক থেকে যখন শ্রেণি স্বার্থের প্রশ্ন আসে, তখন শ্রমিক ও পুঁজিপতির ভাষা ভিন্ন হয়ে যায়। পুঁজিপতির ভাষা শোষণের পক্ষে যায়, আর শ্রমিকের ভাষা হয়ে ওঠে শোষণ মুক্তির ভাষা।

এই ভাষা সমস্যা সমাধানের বিষয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য উপস্থাপন করেন লেনিন। লেনিন ১৯১৩ সালে ‘জাতিসত্তার ওপর নির্ভর করে স্কুলের পৃথকীকরণ’-নামক প্রবন্ধে উল্লেখ করেন- ‘সমাজতন্ত্রীরা তাদের কর্মসূচিতে প্রত্যেক জাতির মাতৃভাষা ব্যবহারের অধিকারকে সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃতি প্রদান করে। সকল ভাষার মাঝে সমতার, এমনকি রাষ্ট্রীয় ভাষা অবসানের জন্য দাঁড়ায়। বিদ্যালয়ে মাতৃভাষা ব্যবহার ও মাতৃভাষা শিক্ষা প্রত্যেক জাতির মৌলিক অধিকার। সমাজতন্ত্রীরা পরিপূর্ণ গণতন্ত্র, প্রত্যেক ভাষার পূর্ণ স্বাধীনতা ও সমতার জন্য লড়াই করে।’ অনেক সময় বুর্জোয়ারা একটি ভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করে সেই ভাষা ও ভাষাভাষী জাতিকে আলাদা সুবিধা প্রদান করে। এর ফলে অন্য ভাষাভাষী জাতিসমূহ বৈষম্যের শিকার হয়। কমিউনিস্টরা এর ঘোর বিরোধী। এ প্রসঙ্গে ‘জাতি প্রশ্ন নিয়ে থিসিস’-এ লেনিন উল্লেখ করেন- ‘সমাজতন্ত্রীরা কোনো একটি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার বিরোধী। সামঞ্জস্যপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ঊর্ধে তুলে ধরতে গিয়ে সমাজতন্ত্রীরা সকল জাতির মধ্যে শর্তহীন সমতার দাবি জানায়। কোনো একটি ভাষা, জাতি বা জাতি সমূহের যে কোনো ধরনের সুবিধা প্রদানের চূড়ান্ত বিরোধিতা করে।’

একটি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা প্রকৃতপক্ষে পুঁজিবাদী সমাজে জাতিগত বৈষম্যেরই প্রমাণ। পাকিস্তানে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা ছিল জাতিগত বৈষম্য ও নিপীড়নের দৃষ্টান্ত। স্বাধীনতার পরে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার মধ্যেও মহৎ কিছু নেই। শতকরা সাতানব্বই জন কথা বলে বাংলায়, তাদের মাতৃভাষাও বাংলা। সুতরাং ঘোষণা দেয়ার কিছু নেই, আছে শুধু জনগণকে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দেয়ার ফাঁদ। যে শাসক শ্রেণির সবকিছুই চলে ইংরেজিতে তারা এটা করে শুধুমাত্র নিজস্ব শ্রেণিগত স্বার্থে জাতীয়তাবাদকে উস্কে দেয়া এবং শ্রমজীবী মানুষের শ্রেণি চেতনা গড়ে উঠতে বাধা প্রদান করার জন্য।

তাই পুঁজিবাদে ভাষার মুক্তি নেই। সাম্রাজ্যবাদী ভাষা ও তার সহযোগী ভাষা ক্ষমতার কাছে কোনো ভাষাই নিরাপদ নয়। বড় প্রতিষ্ঠিত বা সংখ্যাধিক্যের ভাষার ক্ষমতার দাপটে ক্ষুদ্র ভাষাগুলি আছে বিপদের মধ্যে। একমাত্র সমাজতন্ত্রেই ভাষার মুক্তি সম্ভব। মানব সমাজ ঠিক যেমন শ্রেণি বৈষম্য দূর করতে পারে কেবলমাত্র নিপীড়িত শ্রেণির রাজনৈতিক আধিপত্যের সাময়িক কাল পর্বের ভেতর দিয়ে, তেমনি মানব সমাজ সমতার ভিত্তিতে বিভিন্ন জাতির ভাষার মিলন ঘটাতে পারে কেবলমাত্র সকল নিপীড়িত জাতির পূর্ণ মুক্তির মধ্য দিয়ে। সমাজতন্ত্র শুধু জাতিগত নিপীড়নের অবসান চায় না, এই অবসানের মধ্য দিয়ে সকল জাতির মিলন ঘটিয়ে জাতির ঊর্ধে এক নতুন মানবজাতি গঠন করবে। সমাজতন্ত্র বৃহৎ জাতির ভাষার সাথে ক্ষুদ্র জাতিসমূহের ভাষার বৈষম্যেরই শুধু অবসান চায় না, প্রত্যেক ভাষার স্বাধীনতা ও সমতার ভিত্তিতে সব জাতিকে শুধু এক জায়গায় আনতে চায় না, তাদের প্রকৃত মিলন ঘটাতে চায়। ‘সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার’ নামক প্রবন্ধে লেনিন সুস্পষ্টভাবে বলেন- ‘কমিউনিস্টরা প্রত্যেক ভাষার স্বাধীনতা ও সমতার দাবি উত্থাপন করে শুধু সাধারণভাবে, অস্পষ্টভাবে ও ফাঁকা আওয়াজ দিয়ে নয়, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত প্রশ্নটি স্থগিত রেখে নয়, বরং সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রদান করে।’

আমাদের মাতৃভাষা বাংলাও ‘ভাষা সাম্রাজ্যবাদ’ দ্বারা আক্রান্ত। অনেক ক্ষেত্রেই দেশের শাসক শ্রেণির ভাষাগত স্বার্থ ও ভাষা-সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থের অভিন্নতা আছে। শাসক শ্রেণি ভাষা সাম্রাজ্যবাদকে সন্তুষ্ট করেই ক্ষমতায় থাকতে বা যেতে চায়। অন্যদিকে তারা বাংলাভাষার মাধ্যমে উগ্রজাতীয়তাবাদী চিন্তাকে উস্কে দিয়ে শ্রমজীবী মানুষকে বিভ্রান্ত করে এবং দেশের অভ্যন্তরে ক্ষুদ্র ভাষাগুলিকে অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দেয়। এজন্য ভাষা-সাম্রাজ্যবাদ ও দেশের শাসকশ্রেণির ক্ষমতার ভাষার চক্রজাল থেকে বাংলা ভাষাকে মুক্ত করতে হবে। যে জাতি ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে একদিন তারা ভাষা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যেমন রুখে দাঁড়াবে তেমনি অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ভাষার সাথে পূর্ণ স্বাধীনতা ও সমতার ভিত্তিতে পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের জন্য এগিয়ে আসবেই।

লেখক: সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি।