ক্ষমতার রাজনীতি

ক্ষমতার রাজনীতি

রাষ্ট্রক্ষমতা বিষয়টি হলো রাজনীতির একটি অপরিহার্য উপাদান। তবে, নীতি-আদর্শের বিষয়টি তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু ক্ষমতা কেন্দ্রিক রাজনীতির ক্ষেত্রে এক নম্বরে উঠে আসে রাষ্ট্রক্ষমতা এবং নীতি-আদর্শ হয়ে পড়ে দুই নম্বরের বিবেচ্য বিষয়, গদির লোভে যা হয়ে ওঠে পরিত্যাগযোগ্য।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসার জন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যুব সমাজের ব্যাপক সমর্থন অর্জনে স্বক্ষম হয়েছিল। এই প্রতিশ্রুতি দিতে এবার আওয়ামী লীগ দ্বিধান্বিত ছিল না। কারণ ক্ষমতাকেন্দ্রিক মেরুকরণে জামায়াতে ইসলামী ৪-দলের মাধ্যমে বিএনপির সাথে এ পর্যায়ে গাঁটছড়া বাঁধা ছিল। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে ক্ষমতার ইস্যু ও আদর্শিক ইস্যু এক্ষেত্রে এক জায়গায় চলে আসায় আওয়ামী লীগের পক্ষে সে বিষয়ে পদক্ষেপ সূচনা করা সম্ভব হয়েছিল।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হওয়া, একের পর এক মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষিত ও কার্যকর হতে থাকা- ইত্যাদি আঘাত মোকাবিলার জন্য জামাতিসহ উগ্র ও প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক শক্তি পাল্টা অভিযান চালানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। হেফাজতের প্লাটফর্মকে সামনে এনে সেটিকে সে কাজে লাগানোর পথ নিয়েছিল। বিএনপি তাকে আশ্রয় করে সরকার বিরোধী শক্তি সমাবেশ গড়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল। কিন্তু আওয়ামী সরকার ক্ষমতা-কেন্দ্রিক বিবেচনা থেকে সেরূপ শক্তি সমাবেশ গড়ার প্রয়াসকে অসম্ভব করার জন্য নিজেই নীতি আদর্শ বিসর্জন দিয়ে হেফাজতকে হাত করতে সক্ষম হয়েছিল।

কোন ধরনের সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে সে বিষয়ে ’৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের মধ্যদিয়ে বিতর্কের মীমাংসা হয়ে থাকলেও, তা নিয়ে নতুন করে মতবিরোধ সৃষ্টি করে এক বিপজ্জনক অচলাবস্থার জন্ম দেয়া হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকার একতরফাভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করার মাধ্যমে বুঝেশুনেই এই অচলাবস্থা ও সংকট সৃষ্টি করেছিল। এভাবে নির্বাচন বয়কটের ফাঁদ তৈরি করে তারা একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ফাঁকা মাঠে গোল দেয়ার সুযোগ তৈরি করে নিয়েছিল।

ছল-চাতুরির মাধ্যমে ক্ষমতায় যেতে সক্ষম হলেও দ্বিতীয় মেয়াদের আওয়ামী লীগ সরকারের দুঃশাসনের কারণে তার জনসমর্থনে ধ্বস নামা অব্যাহত ছিল। এ অবস্থায় ৪ বছর পর আবার জাতীয় নির্বাচন এলে তাকে আবার যেনতেন উপায়ে গদি আঁকড়ে থাকার পথ নিতে হয়েছিল। সেবার অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে ব্যবহার করে নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত দিনের আগের রাতেই ভোটের তামাশা মঞ্চায়িত করা হয়েছিল।

ক্ষমতাকেন্দ্রিক বিবেচনা থেকে অনুসরণ করা কূটকৌশল দেশের সাংবিধানিক-গণতান্ত্রিক শাসনকে সংহত করার বদলে তাকে ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছে। জনগণকে অধিকারহীন করে তুলেছে। গণতন্ত্রকে খর্ব করেছে। যা কিনা সাম্প্রদায়িক বিপদ মোকাবেলার প্রধান অস্ত্র ও অবলম্বন। অসৎ পন্থায় কখনো কোনো সৎ উদ্দেশ্য যে শেষ পর্যন্ত হাসিল করা যায় না সেটি ইতিহাসের শিক্ষা। সাম্প্রদায়িকতার বিপদ মোকাবিলা করতে হলে গণতন্ত্রের স্বচ্ছ পথ পরিত্যাগ করা যে চরম আত্মঘাতি পদক্ষেপ, গদি রক্ষার আশু স্বার্থে ক্ষমতাসীনরা তা ভুলে বসে আছে।

শাসককূল রাষ্ট্রক্ষমতাকে লুটপাটের সহজ পথ ও পন্থায় পরিণত করেছে। তারা তাদের রাজনীতিকে ব্যবসাতে পরিণত করেছে। দেশের দুটো বুর্জোয়া বড় দল রাষ্ট্রক্ষমতাকে লুটপাটের সহজ পথ বানিয়ে ফেলেছে। সেখানে লুটেরাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছে। লুটপাটের স্বার্থে পরিচালিত তাদের এহেন রাজনীতিতে নীতি-নৈতিকতা-আদর্শের কোনো মূল্য নেই। লুটপাটকে তাদের কর্মকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্যে পরিণত করেছে। মতাদর্শ-কেন্দ্রিক বিবেচনাকে প্রাধান্য না দিয়ে নিছক ক্ষমতা-কেন্দ্রিক এই রুগ্ন রাজনীতির খেসারত দিতে হচ্ছে জাতি ও জনগণকে। চেপে বসেছে ভোটাধিকার-বর্জিত, জবরদস্তিমূলক, গণতন্ত্রহীন, ফ্যাসিস্ট ধারার শাসন-শোষণ ব্যবস্থা।

৯৯% দেশবাসীর জীবনে চেপে বসেছে শোষণ-বঞ্চনা-বৈষম্যের নিষ্ঠুর ও অমানবিক এক অস্তিত্ব। এরকম অবস্থা চলতে দেয়া যায়না। এই অবস্থা বদলে দিতে হবে। জাতীয়তাবাদ-সমাজতন্ত্র-গণতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার জন্য গড়ে তুলতে হবে উত্তাল গণজাগরণ, রচনা করতে হবে সর্বাত্মক গণঅভ্যূত্থান। সেজন্য দেশে বামপন্থি-প্রগতিশীল-প্রকৃত গণতান্ত্রিক, সৎ ও দেশপ্রেমিকদের ঐক্যবদ্ধ বিকল্প শক্তি-সমাবেশের উত্থান ঘটাতে হবে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আদর্শিক বিবেচনাকে অগ্রাধিকার না দিয়ে নিছক ক্ষমতাকেন্দ্রিক বিবেচনা দ্বারা পরিচালিত হওয়ার মতো ক্ষমার অযোগ্য ভুল আর করতে দেয়া যাবে না।