কর্তৃত্ববাদ হটাও, গণতন্ত্র বাঁচাও

কর্তৃত্ববাদ হটাও, গণতন্ত্র বাঁচাও

অনিরুদ্ধ দাশ অঞ্জন

৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘কালো দিবস’ হিসেবে বিবেচিত। ২০১৮ সালের এই দিনে দেশে যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল, তা আমাদের ইতিহাসে বিরল ও ব্যতিক্রম হয়ে থাকবে। এ দিন যে উলঙ্গ ভোট ডাকাতি হয়েছিল, তা বাংলাদেশের মানুষ আগে প্রত্যক্ষ করেনি।

জনসমর্থনহীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। তাই নির্বাচনের আগেই ফলাফল স্থির করে রেখেছিল। জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে নির্বাচনে নজিরবিহীন ভোট ডাকাতি করা হয়েছিল, যা ছিল কল্পনাতীত। ক্ষমতা ধরে রাখতে আওয়ামী লীগ নির্বাচনের আগের রাতে (২৯ ডিসেম্বর রাতে) কেন্দ্রে কেন্দ্রে ব্যালট পেপারে আগাম সিল মেরে রেখেছিল। রাখঢাক না রেখে খোলামেলাভাবেই ‘নৈশকালীন ভোটে’র এই দুষ্কর্ম করা হয়েছিল। নির্বাচন নিয়ে জনগণের সঙ্গে এমন মশকরা এর আগে হয়নি।

অনেক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ওই নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ বলে অভিহিত করেছিল। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ (টিআইবি) ৫০টি আসনে জরিপ করে নির্বাচনকে ‘অভূতপূর্ব’ ও ‘অবিশ্বাস্য’ বলে অভিহিত করেছিল। টিআইবি ৪৭টি সুনির্দিষ্ট অনিয়ম চিহ্নিত করেছিল, যার মধ্যে ছিল: নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালটে সিল দেয়া, প্রতিপক্ষের এজেন্টদের কেন্দ্রে প্রবেশের সুযোগ না দেয়া, অনেক ভোটারের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে না পারা, বুথ দখল করে প্রকাশ্যে সিল মারা, জোর করে নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট দিতে বাধ্য করা, ভোট শুরুর আগে ব্যালট ভর্তি বাক্স, ভোট শেষের আগে ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যাওয়া, গণমাধ্যমের জন্য ‘অভূতপূর্ব’ কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ইত্যাদি।

ভোটগ্রহণের আগের পরিবেশও ছিল বিরোধী দলগুলোর জন্য বেশ বিপজ্জনক। বিরোধী প্রার্থীদের পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল। বেশির ভাগ আসনে বিরোধী দলের প্রার্থীকে প্রচারকাজ করতে দেয়া হয়নি। অনেক জায়গায় বিরোধী প্রার্থীর ওপর হামলা হয়েছে। বিরোধীরা যাতে নির্বাচনের ময়দানে থাকতে না পারে, তার জন্য অসংখ্য বিরোধী নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে ‘গায়েবি মামলা’ দেয়া হয়েছিল।

কেবল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনই নয়, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনও এক কালো অধ্যায়। এ নির্বাচনেও জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছিল। বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্যে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ৩৯টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে মাত্র ১২টা দল (আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী) এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। ভোটার ও প্রার্থীবিহীন একতরফা এই নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩ আসনে আওয়ামী লীগ ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত’ হয়ে নির্বাচনের আগেই ‘বিজয়’ নিশ্চিত করেছিল। নির্বাচনের ইতিহাসে এ এক বিরল ঘটনা! অনেক তুঘলকি ব্যাপার-স্যাপার ঘটেছিল তখন।

নির্বাচনে অনিয়ম, কারচুপি নতুন নয়। স্বাধীন দেশে ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ ব্যাপক কারচুপি করেছিল। ব্যালট বাক্স হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় এনে গণনা করে খোন্দকার মোশতাক আহমেদকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল।

ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য জনসমর্থনহীন আওয়ামী লীগ পরপর দুটো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারকে পদদলিত করেছে। শুধু জাতীয় সংসদ নির্বাচনই নয়, স্থানীয় সংস্থার নির্বাচনকেও অকার্যকর করে তোলা হয়েছে। উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ, বিভিন্ন পর্যায়ের স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচনেও ভোটারদের অবাধ অংশগ্রহণের সুযোগ হরণ করে, নিজেদের পছন্দের প্রার্থীদের জিতিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেছে সরকার। নির্বাচনের বদলে সর্বত্র চালু হয়েছে সরকারি দলের সিলেকশন। দেশের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জবরদখল ব্যবস্থা।

জনগণের ভোটাধিকারের নিশ্চয়তা এবং নির্বাচিত সরকার থাকার বিষয়টি গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত। গোটা নির্বাচনব্যবস্থাকে কার্যত ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। আত্মসম্মানবোধহীন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বহীন ভূমিকা জনগণের জন্য চরম অবমাননাকর। নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন, নিরপেক্ষ করার জনগণের দাবি ও আকাঙ্ক্ষাকে পদদলিত করে, তাকে সরকারের সেবাদাসে পরিণত করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন এখন ঠাট্টাতামাশার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

নির্বাচন সংক্রান্ত গুরুতর অসদাচরণ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন দেশের ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিক। গত ১৪ ডিসেম্বর তাঁরা রাষ্ট্রপতিকে চিঠি দিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগ তুলে ধরে সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের অধীনে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করেছেন। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে-নির্বাচন কমিশনারদের বিশেষ বক্তা হিসেবে দুই কোটি টাকা গ্রহণ, নিয়োগের নামে চার কোটি আট লাখ টাকার দুর্নীতি, নিয়মবহির্ভূতভাবে তিনটি করে গাড়ি ব্যবহার এবং ইভিএম কেনায় অনিয়ম। আর অসদাচরণের মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ, ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর, খুলনা, সিলেট, রাজশাহী ও বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে গুরুতর অসদাচরণ ইত্যাদি। বাম গণতান্ত্রিক জোট নির্বাচন কমিশনের অপসারণ দাবি করে বলেছে, স্খলিত নির্বাচন কমিশন সব ধরনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও বৈধতা হারিয়েছে।

দেশবাসীকে নানা ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক-ফ্যাসিস্ট কার্যকলাপ ও প্রবণতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। বাকস্বাধীনতা, সাংবাদিকতা ও মিডিয়ার স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, আইনের শাসন, প্রশাসনের ওপর জনগণের কার্যকর নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ ও সরকার পরিচালনায় জনগণের কার্যকর কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করাসহ গণতন্ত্রের অত্যাবশ্যক উপাদানসমূহকে পদদলিত করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে একে একে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে।

পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান ‘মৌলিক গণতন্ত্রে’র কথা বলেছিলেন। আর বর্তমান সরকার বলছে ‘উন্নয়নের গণতন্ত্র’। ‘আগে উন্নয়ন, পরে গণতন্ত্র’ এমন একটি প্রচারণা সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। রাজনৈতিক স্বার্থে গণতন্ত্রকে উন্নয়নের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কর্তৃত্ববাদী শাসকরা স্বৈরতন্ত্রকে বৈধ করতে মুখে গণতন্ত্রের কথা বলেন, গণতন্ত্রকে ব্যাখ্যা করেন নিজেদের সুবিধামতো। গণতন্ত্রের আগে বা পরে সুবিধামতো শব্দও জুড়ে দেন।

কিছুদিন আগে ‘গণতন্ত্র: যেসব লক্ষণ দেখে বুঝবেন একটি দেশ গণতান্ত্রিক নয়’ শিরোনামে প্রকাশিত বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে গণতন্ত্রহীনতার ১০টি লক্ষণ উল্লেখ করা হয়েছিল। লক্ষণগুলো হচ্ছে: ১. প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন, ২. একনায়করাও নির্বাচন করে, ৩. জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করা, ৪. ভোটার অংশগ্রহণ কমে যাবে, ৫. সংসদ হবে একদলীয়, ৬. নিরাপত্তা বাহিনীর প্রভাব, ৭. দুর্বল প্রতিষ্ঠান (নির্বাচন কমিশন, সংসদ, বিচার বিভাগ ইত্যাদি), ৮. মতপ্রকাশে ভয় পাওয়া, ৯. দুর্নীতি বেড়ে যাওয়া, ১০. শাসকদলের ক্ষমতা হারানোর ভয়। বিবিসির এই প্রতিবেদনে গণতন্ত্রহীন বর্তমান বাংলাদেশের ছবিই যেন ফুটে উঠেছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) প্রতিবেদনে ‘গণতান্ত্রিক’ কিংবা ‘ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক’ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ নেই। বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনের বৈশিষ্ট্যগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অনেক আগেই বাংলাদেশ কার্যত একদলীয় শাসনব্যবস্থা তথা কর্তৃত্ববাদে প্রবেশ করেছে।

কর্তৃত্ববাদী শাসনে গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা হারিয়ে গিয়েছে। সরকারের ঘোষিত ও অঘোষিত নিয়ন্ত্রণের ফলে দেশের মানুষের স্বাধীনতা ও অধিকার বিপন্ন হয়ে পড়েছে। শুধু বিরোধী দল ও মতকেই দমন করাই নয়, সামাজিক শক্তি ও উদ্যোগকেও নিষ্ক্রিয় করে ফেলা হয়েছে। জনগণের টুঁটি চেপে ধরতে নিবর্তনমূলক ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে’র যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে। প্রশাসন ও পুলিশের ওপর সরকারের অতিমাত্রায় নির্ভরতা এবং বিচারহীনতা দেখা দিয়েছে। ভীতি সঞ্চার ও বল প্রয়োগ করে বিরোধী মতকে স্তব্ধ করে দিয়ে এবং গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্রের অন্তর্গত সব বিষয়ের ওপর শাসকের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকার করে তোলা হয়েছে। জবরদখলকারী সরকার গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছে।

কর্তৃত্ববাদী শাসনের অন্যতম অনুষঙ্গ লুটপাট। কর্তৃত্ববাদী শাসনে চলছে দুর্নীতি-লুটপাটের মহোৎসব। দুর্নীতি-লুটপাটের অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে গেছে। উন্নয়নের প্রলোভনের আড়ালে সরকার লুটপাটের প্রক্রিয়াকেই কেবল শক্তিশালী করছে। দেশে কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে দ্রুতগতিতে। বিদেশে অর্থ পাচার বাড়ছে। ব্যাংকিং সেক্টর ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমার পরিমাণ বাড়ছে। কানাডার বেগমপাড়ায় দুর্নীতিবাজদের ভিড় বাড়ছে। করোনার কারণে একদিকে দেশের ১০ কোটি মানুষ অর্থনৈতিক ঝুঁঁকিতে পড়েছে, অন্যদিকে দেশে ৩ হাজার ৪১২ জন নতুন কোটিপতি বেড়েছে।

দুর্নীতি আর লুটপাটের গল্পের যেন শেষ নেই! এমন কোনো সেক্টর, মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, অফিস পাওয়া যাবে না, যেখানে লাগামহীন দুর্নীতি নেই। নিয়ন্ত্রণহীন দুর্নীতি-লুটপাটের অনেক কাহিনি আমরা জানতেও পারি না। লুটেরাদের রক্ষা করছে সরকার। দুর্নীতির যেসব ঘটনা আমাদের সামনে আসছে, তাতে আতঙ্কিত হতে হয়। ক্যাসিনো, সম্রাট থেকে পাপিয়া, ট্রাংক আর সিন্দুকে থরে থরে সাজানো টাকা-এসব বিষয় মানুষ ভোলেনি।

সরকারি কেনাকাটায় ‘সাগর চুরি’ এখন ‘মহাসাগর চুরি’তে গড়িয়েছে। সরকারি প্রকল্প মানেই অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর আর অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা। এর মূলে কাজ করছে লাগামহীন দুর্নীতি আর লুটপাটের প্রণোদনা। মন্ত্রী, এমপি, সরকারি কর্মকর্তাদের লাগামহীন বিদেশ সফরের উপাখ্যান শুনলে রীতিমতো চমকে উঠতে হয়।

জনগণের ওপর কর্তৃত্ববাদী সরকারের আক্রমণ অব্যাহত আছে। শ্রমিক ছাঁটাই বাড়ছে। করোনাকালীন সংকটের মধ্যেই সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকল বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে স্থায়ী-অস্থায়ী ৫১ হাজার শ্রমিক বেকার হয়েছেন। বেসরকারিকরণের ধারায় ১৫টি চিনিকল বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে গণবিরোধী সরকার। জিনিসপত্রের দাম বেড়েই চলেছে। নারীর ওপর নিপীড়ন-সহিংসতা বাড়ছে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণও বাড়ছে।

সাম্প্রদায়িক শক্তিকে মোকাবিলার জন্য গণতন্ত্র বিসর্জন দিয়ে হলেও আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে হবে বলে যেসব মতলববাজ একসময় প্রচারে নেমেছিলেন, তারা এখন চুপসে গেছেন। আওয়ামী লীগের শাসনে মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তি ফুলেফেঁপে উঠেছে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় শক্তি অর্জন করে মৌলবাদীরা এখন দেশের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। আওয়ামী লীগ মৌলবাদীদের সঙ্গে আপস করে চলেছে-এ কথা বললে অনেক কম বলা হয়। আওয়ামী লীগ এতটাই দেউলিয়া হয়ে পড়েছে যে, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার পরও কার্যত নিরব ভূমিকা পালন করেছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তো বলেই দিয়েছেন, ‘আমরা কোনো সংঘাতে যাব না’। প্রকৃতপক্ষে দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগই মৌলবাদীদের ভাস্কর্য ভাঙার প্রণোদনা দিয়ে আসছে। দীর্ঘদিন ধরে মৌলবাদীদের আস্ফালন ও শক্তি অর্জনের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার।

বর্তমান শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে জনগণ বাঁচতে চায়। মুক্তি চায় অনির্বাচিত, অবৈধ সরকারের কবল থেকে। গণতন্ত্রের জন্য এ দেশের মানুষ বারে বারে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। রক্তে রঞ্জিত করেছে রাজপথ। গণতন্ত্রের ওপর বারবার আঘাত এসেছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর, গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর ক্রমাগতভাবে প্রত্যক্ষভাবে, কখনও কখনও চোরাগোপ্তা পথে হামলা হয়েছে। নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনে জেনারেল এরশাদের স্বৈরশাসনের অবসানের পর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে বলে এ দেশের মানুষ নতুন করে স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে।

কর্তৃত্ববাদী শাসন বহাল থাকলে জনগণের অধিকার, স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। দেশ বাঁচাতে, মানুষ বাঁচাতে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। দেশের সামগ্রিক এই পরিস্থিতিতে বাম-গণতান্ত্রিক বিকল্প গড়ে তোলার কর্তব্যটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভোট ডাকাতির দুই বছর পূর্তিতে লড়াইয়ের শপথ নিয়ে আওয়াজ তুলতে হবে, ‘কর্তৃত্ববাদ হটাও, গণতন্ত্র বাঁচাও’।

লেখক: প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)।