হোটেলের নামে জমি দখলের প্রতিবাদে ম্রো জনগোষ্ঠীর কালচারাল শোডাউন

বান্দরবানে চিম্বুক পাহাড়ে বসবাসরত ম্রো জনগোষ্ঠী পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণ ও পর্যটনের নামে তাদের প্রাচীন জুম ভূমি কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, এই স্থাপনা নির্মাণের নামে সিকদার গ্রুপ প্রায় এক হাজার একর জুমের জমি দখলের চেষ্টা করছে।

https://www.facebook.com/101576421578178/videos/3484106031676431

গতকাল (৮ নভেম্বর) রোববার সকালে এর প্রতিবাদে বান্দরবান-চিম্বুক-থানচি সড়কের কাপ্রুপাড়া এলাকায় কালচারাল শোডাউন ও সমাবেশ করেছে ম্রো জাতিসত্তার হাজারো জনগোষ্ঠী।

এ সময় ম্রোদের ঐতিহ্যবাহী ফ্লুং (বাঁশের তৈরি বিশেষ ধরনের নানা আকারের বাঁশি) বাজিয়ে ব্যানার, পোস্টার নিয়ে চিম্বুক পাহাড়ের বেশ কয়েকটি পাড়ার শত শত নারী-পুরুষ সমবেত হন।

চিম্বুক পাহাড়ে বসবাসরত প্রায় ২৫টি পাড়ার বাসিন্দা সকাল থেকেই সেখানে জড়ো হতে থাকেন। পরে ম্রো জনগোষ্ঠীর অসংখ্য শিশু ও নারী-পুরুষ বিভিন্ন দাবি সম্বলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশে অংশ নেন।

এই সময় তারা ঐতিহ্যবাহী ম্রো বাঁশি ‘প্লুং’ (বাঁশের তৈরি বিশেষ ধরনের নানা আকারের বাঁশি) বাজিয়ে ব্যানার, পোস্টার নিয়ে নিজেদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন।

সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীতে বিলি করা প্রচারপত্রে অভিযোগ করা হয়, সিকদার গ্রুপ সেনা কল্যাণ ট্রাস্টকে নিয়ে কাপ্রুপাড়া থেকে নাইতং পাহাড় হয়ে জীবননগর পর্যন্ত স্থাপনা নির্মাণের জন্য প্রায় ৮০০ থেকে এক হাজার একর জমি দখল করার পাঁয়তারা করছে।

“যার ফলে চারটি গ্রাম পরোক্ষ এবং ৭০ থেকে ১১৬টি পাড়া ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাড়াগুলোর মধ্যে ১০ হাজারের মতো জুমচাষি উদ্বাস্তু হওয়ার শঙ্কা তৈরি হবে।”

‘রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে তাদের ভূমি নেওয়া হচ্ছে না’ উল্লেখ করে প্রচারপত্রে অভিযোগ করা হয়, “বিলাসী জীবনের ব্যবসার জন্য বেদখল করা হচ্ছে। সিকাদর গ্রুপ (আর এন্ড আর হোল্ডিংস) একটি বিতর্কিত কর্পোরেট কোম্পানি। এই কোম্পানির শুধু বাংলাদেশ নয়, অন্যান্য দেশেও নেতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে।”

পাঁচ দিনের মধ্যে নাইতং পাহাড়ে পাঁচ তারকা হোটেলসহ পর্যটন স্থাপনা নির্মাণ স্থগিত না হলে চিম্বুক পাহাড়বাসী আরও কঠোর অবস্থানে যাবে বলে জানানো হয় এই প্রচারপত্রে।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, শত শত বছর ধরে চিম্বুক পাহাড়সহ নীলগীরিতে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে প্রজন্ম পরম্পরায় ম্রো জনগোষ্ঠী বসবাস ও জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। এই পাহাড় এ জাতিসত্তার জীবিকার প্রধান উৎস। কিন্তু কয়েক বছর ধরে পর্যটনের নামে ম্রোদের প্রথাগত ভূমি চিম্বকি পাহাড়ের নানা অংশ বেদখল হয়ে গেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়ে এখন প্রায় ৮০০ একর ভূমি জবরদখল করে সিকদার গ্রুপ নামের একটি চক্র এ পাহাড়ে পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণের প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। এটি হলে ম্রো জনগোষ্ঠীর কাপ্রু পাড়া, কলাই পাড়া, দলা পাড়া, এরা পাড়া ও রেমনাই পাড়া উচ্ছেদ হবে। একই সঙ্গে পাড়াগুলোর ৪০৫টি পরিবার তাদের প্রথাগত ভিটেমাটি হারা হবে। এটি বন্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে গত অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহের বুধবার ম্রো জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বান্দরবান জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন বক্তারা।

সমাবেশে বক্তব্য রাখেন কাপ্রু পাড়া, এম্পু পাড়া, গালেংগ্যা পাড়া, দলা পাড়া, রামরী পাড়ার কারবারিরা, বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্ট কাউন্সিলের উটিং মারমা ও ম্রো লেখক ইয়াঙান ম্রো প্রমুখ।

সমাবেশ সমাপনি বক্তব্য রাখেন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, ঢাকা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক রেংয়ং ম্রো। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, “নীলগিরি কোনদিন আমাদের নাম ছিল না, চন্দ্রপাহাড় কোনদিন আমরা চিনি না। আমরা ‘শোং নাম হুং’ নামে চিনেছি, আমরা ‘তেংপ্লং চূট’ নামে চিনেছি।
এই ‘শোং নাম হুং’ কিভাবে চন্দ্রপাহাড় হয়ে যায়, এই ‘তেংপ্লং চূট’ কিভাবে নীলগিরি হয়ে যায়? এই জীবন নগর কিভাবে তোমাদের জীবন নগর হয়ে যায়?
এই ভূমি, এই মাটির প্রত্যেকটা ইঞ্চি আমাদের বাপ-দাদার সম্পত্তি।
এই চিম্বুক পাহাড়ে একটাও প্রাইমারি স্কুল নেই, একটাও সরকারি হাই-স্কুল নেই। কোন মুখে আপনারা এখানে উন্নয়নের কথা বলেন, কোন মুখে বলেন আমরা ম্রোদের জন্য উন্নয়ন করছি, ম্রোদের উন্নতির জন্য পর্যটন করছি।
আপনাদের ভিটেমাটিতে যদি কোন ম্রো জনগোষ্ঠী গিয়ে জায়গা দখল করে, আপনাদের জায়গায় গিয়ে যদি আমরা বলতাম – এটা আমদের পর্যটন স্পট, আপনাদের কেমন লাগত একবার নিজের বুকে হাত রেখে প্রশ্ন করুন। যেদিন আপনারা এ প্রশ্নের জবাব খুঁজে পাবেন, সেদিন আমাদের প্রশ্নও বুঝতে পারবেন।”

উল্লেখ্য, সিকদার গ্রুপের ‘আর এন্ড আর হোল্ডিংস’ এই হোটেল নির্মাণ প্রকল্প হাতে নিয়েছে।

সিকদার গ্রুপের (আর অ্যান্ড আর হোল্ডিং) বিরুদ্ধে প্রজন্ম পরম্পরায় বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ে বসবাসকারী ম্রো জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮০০ একর ভূমি দখলের অভিযোগ উঠেছে।