হুমকিতে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা

ফোনে আড়ি পাতা নিয়ে সর্বশেষ খবর হচ্ছে, এ কাজে ব্যবহৃত ইসরায়েলের গোপন নজরদারি সফটওয়্যার পেগাসাস ফ্রান্সের অন্তত পাঁচজন মন্ত্রীর মুঠোফোনেও পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানী ওয়েবসাইট মিডিয়াপার্টের বরাত দিয়ে সম্প্রতি এ খবরটি জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।

ইসরায়েলের সাবেক সাইবার গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের হাত ধরে ২০১০ সালে গড়ে উঠে এনএসও গ্রুপ। তাদের তৈরি পেগাসাস স্পাইওয়্যার ব্যবহার করে বিশ্বের অন্তত ৫০টি দেশে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের স্মার্টফোনে আড়ি পাতা হয়েছে বলে খবর বের হয় আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে।

বিভিন্ন কর্তৃত্ববাদী দেশের সেনাবাহিনী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থা এনএসও গ্রুপের গ্রাহক। যেসব দেশে ব্যাপকহারে এই নজরদারি চালানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে তার মধ্যে ভারত আছে। বাংলাদেশ এনএসও গ্রুপের গ্রাহক কিনা তা এখনও স্পষ্ট না। তবে এ নিয়ে বাংলাদেশে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আছে।

কারণ বাংলাদেশে এ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ! কেবল ফোনকল রেকর্ড না, ব্যক্তির গোপন ভিডিও পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, কারা এসব করছে? প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)’র ভূমিকা নিয়েও।

এই প্রশ্ন যে কেবল সরকার বিরোধী বা সমালোচকরাই করছে, তা না। দেশের উচ্চ আদালতও সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সম্প্রতি উষ্মা প্রকাশ করে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ বলেছে, ‘বিটিআরসি কী করে? তাদেরকে প্রতিনিয়ত নির্দেশনা দিয়ে এগুলো বন্ধ করতে হবে? সমাজটা উচ্ছন্নে যাচ্ছে! কেন ব্যক্তির গোপন ভিডিও, কথোপকথন, ছবি ভাইরাল হয়?’

ফোনে আড়িপাতা বন্ধ ও এখন পর্যন্ত ফাঁস হওয়া ঘটনার তদন্ত চেয়ে কদিন আগে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়; যেখানে ২০১৩ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সংঘটিত ২০টি আড়িপাতার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। ফাঁস হওয়া এসব ফোনালাপের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ফোনালাপও রয়েছে।

গত বছর সেপ্টেম্বরে হাইকোর্টের একটি বৃহত্তর বেঞ্চের দেওয়া রায়ে ব্যক্তির গোপনীয়তা রক্ষায় সরকার দায় নিয়ে আলোচনা রয়েছে। ওই রায়ে বলা হয়েছে, ‘আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদে চিঠিপত্রসহ নাগরিকের অন্যান্য যোগাযোগের গোপনীয়তা রক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। আগ্রহী কেউ বা কোনো অংশ চাইলেই তা সহজেই লঙ্ঘন করতে করতে পারে না।’

নিয়ন্ত্রণকারী এ সংস্থার দায়িত্ব মনে করিয়ে দিয়ে আদালত রায়ে বলেছে, ‘বিটিআরসি এবং ফোন কোম্পানিগুলোর বৃহত্তর দায়িত্ব হল যোগাযোগের গোপনীয়তা রক্ষা করে সংবিধানের সুরক্ষা দেওয়া। তারা তাদের কোনো গ্রাহক বা নাগরিকের যোগাযোগ সম্পর্কিত কোনো তথ্যই সরবরাহ করতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আইন সেটিকে অনুমোদন দেয়।

কখনও মামলার তদন্তের স্বার্থে কারও কল রেকর্ডের প্রয়োজন হলে সেক্ষেত্রেও আইনি বাধ্যবাধকতার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে আদালত।

রায়ে বলা হয়েছে, ‘হানা দিয়ে বা আড়ি পেতে নয়, কারও যোগাযোগ সম্পর্কিত তথ্যের জন্য মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে অবশ্যই কারণ উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানাতে হবে। নইলে সরবরাহ করা তথ্য বা নথি সাক্ষ্য হিসেবে গুরুত্ব হারাবে এবং সরবরাহকারী ব্যক্তি ও কর্তৃপক্ষ ব্যক্তির মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের দায়ে দায়ী হবেন।’

এ রায়ের এক বছরের মাথায় সরকারের আরেকটি উদ্যেগ জনমনে নতুন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার জন্ম দিয়েছে।

‘ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষায়’ নতুন একটি আইন করতে যাচ্ছে সমরকার, যা ‘বিরুদ্ধ মত নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার ও স্বাধীন মতপ্রকাশের বাধা’ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সম্প্রতি এ আইনের একটি খসড়া ডিজিটাল সিকিউরিটি এজেন্সির সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হলেও পরে তা সরিয়ে ফেলা হয়।

এ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে জনমনের সংশয় দূর করতে শীঘ্রই খসড়া আইনটি সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার ওয়েবসাইটে প্রকাশের মাধ্যমে সর্বসাধারণের মতামতের জন্য উন্মুক্ত করা জরুরি। নইলে বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মত আরেকটি আইনের খড়গে পড়বে ব্যক্তির গোপনীয়তা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.