স্থানীয়, জাতীয় আন্দোলনকে গড়ে তুলতে হবে গণসংগ্রামের ধারায়

রুহিন হোসেন প্রিন্স

প্রতিদিন আলো ঝলমল জীবনের প্রচার, আরো আলোকিত হয়ে উঠার প্রচার গণমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। শাসকদের প্রচারে এটাই প্রধান চিত্র হিসেবে সামনে আসছে। দেশের কোন কোন এলাকায় গেলে এই চিত্রই সামনে আসে। এটাই কি এখনকার চিত্র?

দেশের এক প্রান্তের জেলা পঞ্চগড়ে এসে দেখা গেল, জানা গেল, মানুষের চিত্র। এসেই শুনলাম অতিবর্ষণ হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। ধান কোনভাবে রক্ষা করার চেষ্টা হয়েছে। তবে এ অঞ্চলের অন্যতম ফসল বাদাম তলিয়ে গেছে। কৃষক বিশেষত ক্ষুদ্র কৃষক দিশেহারা। সারাবছর অনেকে এই ফসলের উপর নির্ভর করেন। এখন অসহায় তারা।

দেশের অন্যতম ‘মিষ্টি এলাকা’ খ্যাত তেতুলিয়ার সমতলের চা-চাষের কথা অনেকে জানি। ঐ কৃষকের আহাজারি চলছে দীর্ঘদিন ধরে। চা-চাষিরা দাম পাচ্ছে না। রাস্তায় চা ফেলে, ক্ষেত নষ্ট করে প্রতিবাদ করছেন, কোথায় গিয়ে কথা বলবেন? কোথায় কথা বললে সমাধান হবে, তা তারা জানেন না।

প্রশাসনও কিছু করতে পারছে না, তারাও অসহায় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কাছে। এখানে গড়ে ওঠা চা-বাগান চলছে নিজস্ব গতিতে। এ জায়গায় ‘কৃষকের জন্য সার, কীটনাশক ব্যবহার, ভাল চা উৎপাদনের জন্য কোন নির্দেশনা পেয়েছে, সহায়তা পেয়েছে’-এমন খবর খুঁজে পাওয়া গেল না। বেশি বিপাকে ক্ষুদ্র চাষি। এতে অসহায় হয়ে পড়ছেন দিন মজুর, দেশের চা-শিল্প।

বিদ্যুৎ নিয়ে এত গল্প! পল্লী বিদ্যুৎ এর খবর ভুক্তভোগীরা জানলেও কর্তাব্যক্তি আর সরকার সব সময় ভিন্ন গল্প শোনায়। এ অঞ্চলে ১০/১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না, এটা শুনলাম। তবে এক নাগাড়ে ১৫ ঘণ্টার উপর বিদ্যুৎ না থাকা দেখা গেল। অসহায় মানুষ এটা মেনে নিয়েই এগুচ্ছে।

নীলফামারীর ডিমলায় বিদ্যুৎ নিয়ে ভয়াবহ দুর্নীতির খবর দীর্ঘদিনের। শোনা যায় স্থানীয় দুর্নীতি দমন কমিশন পর্যন্ত অসহায়। এ অঞ্চলের বিদ্যুৎ বিভাগের ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করেছেন স্বয়ং স্থানীয় ভূক্তভোগীরা। সভায় বিভিন্ন থানার সংগঠকরা জানালেন নীলফামারীতে মানুষের কাজ নেই, ভিক্ষুকের সংখ্যা বাড়ছে।

এ চিত্র এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাড়ছে।

দেশের আরেক প্রান্তের এলাকা সুনামগঞ্জ। শহরসহ বেশ কিছু এলাকায় পানি। হাওড়ের কান্নার শেষ নেই। এ কান্না প্রতিধ্বনিত হয়, জেগে থাকে, কিছু সময়ের জন্য মিলিয়ে যেয়ে জীবন যুদ্ধে মিলত হয় ঐ অঞ্চলের ভুক্তভোগী কৃষক-দিনমজুরের মাঝে। প্রজেক্ট হয়, নানা ঝলমলে প্রজেক্ট, আর গল্প। কিন্তু ঐ শস্য ভাণ্ডার টিকিয়ে রাখা, যারা টিকিয়ে রাখছেন তাদের যথাযথ প্রণোদনার দেখা মেলে না। সর্বশেষ সুনামগঞ্জ, সিলেটে এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি ও দেশের অন্যান্য এলাকায় পানি বাড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

দেশের উপকূলীয় মানুষের জীবন যুদ্ধ তো চলছে নিয়মিত। সেতুর গল্প ঐ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবনে কতটুকু প্রভাব ফেলবে, ঐসব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আয়, সন্তানদের শিক্ষা, সবার স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা কি, তা কেউ জানেন না। জানেনা পাটকল চালু হবে কিনা, শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধ হবে কিনা। গবেষণায় বেরিয়ে আসা তথ্য বলছে, দেশের উর্বর এলাকায় যে শ্রম ও অর্থ ব্যয়ে যে পরিমাণ ফসল উৎপাদন করা যায়, ঐ সব এলাকায় একই শ্রম ও অর্থ ব্যয়ে উৎপাদন হয় এক তৃতীয়াংশ। সংবিধানে বৈষম্য দূর রকার কথা পরিস্কারভাবে বলা আছে। এই বৈষম্য দূর করতে তো বিশেষ ভূমিকা নেওয়া কথা। ঐ অঞ্চলে গিয়ে তার কোন দেখা মেলে না।

ঐ অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সাধারণ অভিজ্ঞতা হলো- কৃষক প্রয়োজন, সুযোগ ও চাহিদা বুঝে নিজের উদ্যোগেই নানা ধরনের ফসল উৎপাদন করে। উৎপাদন বাড়ায়। অথচ ফসলের লাভজনক দাম পায় না। তাই এই বাড়তি উৎপাদনে প্রণোদনার বদলে টানতে হয়, লোকসানের বোঝা। উৎপাদনে সরকার বা সরকারি সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে নেই কোনো জবাবদিহিতা। খুলনা অঞ্চলে গড়ে ওঠা তরমুজ চাষ নিয়ে এ বছরের অভিজ্ঞতায় বিদাপন্ন কৃষক-দিনমজুরের কথা স্মরণ করলে এসব চিত্র পরিস্কার হয়ে ওঠে।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বিএম কন্টেইনার ডিপোর আগুন নিভলেও এর ক্ষত যেমন দূর হয়নি, তেমনি আরো নানা ধরনের ‘ক্ষত’ বেড়েই চলছে। সাধারণ মানুষকে এসব ক্ষত বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। ‘ক্ষত’ দূর হবে এমন ভরসা সাধারণ মানুষ পচ্ছে না।

চট্টগ্রামের কন্টেইনার ডিপোর কথায় আাসি। তথ্যে জানা যাচ্ছে, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে রপ্তানি হওয়া বিভিন্ন পণ্যের ব্যবস্থাপনার (কন্টেইনার পণ্য বোঝাই) মূল কাজ হয় ২০টি বেসরকারি ডিপোতে। এগুলো চট্রগ্রাম সীতাকুণ্ডের মধ্যে অবস্থিত। এসব ডিপোতে ডিজেল পাম্প থাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অথচ ২০টি ডিপোর মধ্যে অন্ততঃ ১০টি ডিপোর মধ্যে নিজস্ব ডিজেল পাম্প থাকার খবর পাওয়া গেছে। কমবেশি সব ডিপোতে আগুন নেভানোর সরঞ্জামের ঘাটতি আছে। অন্ততঃ ১৩টি ডিপোতে আগুন নেভানোর পানির লাইন খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এসব অসংগতির তথ্য খুঁজলে আরো পাওয়া যাবে। তারপরও চলছে। বর্তমান ব্যবস্থা বহাল থাকলে এভাবে চলবে, বড় ঘটনার পর নানা হয়ত কিছুটা উন্নতি হবে। কিন্তু সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী যে ৪৯ জন নিহত হলেন। অসংখ্য মানুষ আহত হয়ে পঙ্গুত্বের জীবন নিয়ে বেঁচে থাকবেন। এদের ও এদের পরিবার পরিজন যে অনুসারে তলিয়ে যাবেন, সে কথাও আমরা জানি। ৯ জুন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বিএম কন্টেইনার ডিপোতে গিয়ে, ঐ এলাকা ও এলাকার মানুষের সাথে কথা বলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহতদের আহাজারিতে যে চিত্র দেখা, শোনা গেল–তাও মিলিয়ে যাবে।

বাজেট ঘোষিত হলো। দেশের মানুষের জন্য বাজেট, অথচ ঐ বাজেট প্রণয়নে দেশের সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলা হয়নি, পরামর্শ নেওয়া হয়নি। দেশে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান আছে, এগুলো যতই ভঙ্গুর হোক না কেন, তাদেরও সম্পৃক্ততা নেই বাজেট প্রণয়নে। এমনকি জাতীয় সংসদ সদস্য, যারা অনুমোদন দেবেন, তাদেরও সম্পৃক্ততা নেই এই বাজেট প্রণয়নে। এই বাজেট হল, আমলা আর গুটিকতক ব্যবসায়ী নির্ভর বাজেট।

সিপিবি বলেছে, এই বাজেট ‘ঋণ করে ঘি খাওয়া ও জনগণের কর চাপানোর বাজেট।’ বাজেটের দিনই ভোজ্য তেলে দাম বাড়ানো হলো। এখন থেকে জনগণের উপর কর বাড়ানো ও দাম বাড়ানোর খবর পাওয়া যাবে, তার কথা এই বাজেটেও বলা হয়েছে।

সাধারণ মানুষের আয় না বাড়লেও সরকারের ‘উন্নয়ন’ গল্প ঠিক রাখতে টাকা তো লাগবে, এই টাকা তুলতে হবে জনগণের পকেট থেকে। পাচার হওয়া টাকাকে সাদা টাকা দেখাতে অনৈতিক প্রণোদনার কথাও বলা হলো বাজেটে। প্রয়োজন ছিল এ টাকা উদ্ধার ও পাচারকারীদের শাস্তি। অথচ হলো উল্টো। এই ধারা চলছে দীর্ঘদিন ধরে।

বাজেটের দর্শনই বাজেটকে মুষ্টিমেয় স্বার্থরক্ষাকারী বৈষম্য ও দুঃশাসনের বাজেটে পরিণত করেছে। এর ফলাফলও মিলছে। খবর পাওয়া গেল একবছরে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশীদের টাকার পরিমাণ বেড়েছে ৩ হাজার কোটি টাকা। জমার পরিমাণ বেড়েছে ৫৬ শতাংশ।

এই অবস্থায় চলছে দেশ। আর এই সময় দেশের উপর ভূরাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারে আমেরিকা নানামুখী তৎপরতা আরো বেড়ে গেছে। চীনের হুঁশিয়ারিও থেমে নেই। অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করেই এরা এদের স্বার্থরক্ষায় মরিয়া হয়ে উঠছে।

দেশে গণতন্ত্রহীন পরিবেশ, ভয়ের পরিবেশ সর্বত্র। মানুষের সম্পৃক্তহীনতা, স্বচ্ছতা আর জবাবদিহিতার অভাব এসব আধিপত্য বিস্তারের বিরুদ্ধে মানুষের কণ্ঠকে এগিয়ে নিচ্ছে না।

এসব সংকট অতিক্রম করেই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এজন্য দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় নানা নামে থাকা শাসক গোষ্ঠীর যে নীতিতে দেশ পরিচালনা করছে, তার বিপরীতে নীতিনিষ্ঠ বাম প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দলের রাজনৈতিক ধারাকে সামনে এনে বিকল্প শক্তি সমাবেশ গড়ে তুলতে হবে। চলমান দু:শাসন হটিয়ে, ব্যাবস্থা বদলের সংগ্রাম অগ্রসর করতে হবে।

এজন্য স্থানীয় মানুষের সমস্যা সমাধানে পথ নির্দেশনা দিয়ে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা ও জাতীয় আন্দেলনে বিকল্প নির্দেশনা এবং এটি বাস্তবায়নে শক্তি সমাবেশ এবং সিপিবি’র দৃঢ় ও নীতিনিষ্ঠ লাগাতার ভূমিকা আরো প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

এক্ষেত্রে দেশের সর্বত্র নিজেদের শক্তিকে সক্রিয়- ঐক্যবদ্ধ করা, সমর্থক শুভানুধ্যায়ী ও সাধারণ মানুষের স্বার্থরক্ষায় প্রত্যয়ী মানুষদের কাছে টেনে আনা আর শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে স্থানীয়, জাতীয় আন্দোলনকে গণসংগ্রামের ধারায় গড়ে তুলতে হবে।

এই শ্রেণি সংগ্রাম, গণআন্দোলনের ধারাকে অগ্রসর করার কর্তব্য পালনই সময়ে দাবি।

লেখক: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)।

Leave a Reply

Your email address will not be published.