স্থানীয় এমপি ও স্থানীয় সরকার-কে বেশি ক্ষমতাবান

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

দেশের তৃণমূলে জনসেবামূলক ও উন্নয়নমূলক কাজকর্ম পরিচালনার ক্ষেত্রে কর্তৃত্ব থাকবে কার হাতে? নির্বাচিত স্থানীয় সংস্থার হাতে নাকি সেই এলাকার নির্বাচিত এমপি-র হাতে? এ নিয়ে আগাগোড়া দ্বন্দ্ব চলছে। এদিকে, স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তারা সুকৌশলে ‘কার্যকর কর্তৃত্ব’ নিজেরাই প্রয়োগ করে চলেছে। এভাবে, আজ সব স্তরের স্থানীয় সংস্থাগুলোর ক্ষমতা খর্ব হয়ে আছে। ফলে এসব সংস্থার মেয়র, চেয়ারম্যান, ভাইস-চেয়ারম্যান, কমিশনার বা সদস্যগণ, জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও, পরিপূর্ণভাবে তাদের সংবিধানসম্মত দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। উপরন্তু, জেলা পরিষদসমূহের নির্বাচনের বিষয়টিকে বহুদিন ধরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

বিভিন্ন স্তরের স্থানীয় সরকারের সংস্থাগুলোর কাজে কর্তৃত্ব করবে কে- তা নিয়ে দ্বন্দ্ব, বিবাদ ও গোলমাল নিরসন হয়নি। বিবাদ ত্রিমুখী। একদিকে রয়েছেন নির্বাচিত মেয়র, কমিশনার, চেয়ারম্যান, ভাইস-চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ, অন্যদিকে আছেন আরেক কিসিমের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, মাননীয় সংসদ সদস্যগণ। আর তাছাড়াও বুক ফুলিয়ে রয়েছেন মহাশক্তিধর আমলাতন্ত্র ও উপজেলায় তার প্রতিনিধি ইউএনও বা উপজেলা নির্বাহী অফিসার। এই ত্রিকোণ রশি টানাটানিতে নির্বাচিত স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলো আজ ত্রিশঙ্কু অবস্থায় নিপতিত। এমপি সাহেবরা আর ইউএনও সাহেবরা এখন পরস্পর পরস্পরের হাত মিলিয়েছে। রাজনৈতিক সরকার ও আমলাতন্ত্র- ওই দু’পক্ষ মিলে এক ধরনের কৌশলগত ঐক্য প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এই দু’পক্ষ একত্রিত হয়ে নির্বাচিত স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোর কর্তৃত্বকে কোণঠাসা করে দিতে সক্ষম হয়েছে।

স্থানীয় স্বশাসনের ব্যাপারটি আমাদের সমাজে সুপ্রাচীনকাল থেকে প্রচলিত। রাজা-মহারাজারা রাজ্য চলাতেন। পরস্পর যুদ্ধ করতেন। রাজ্যের-সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন ভাঙা-গড়া চলত। এসবের মাঝেই প্রশান্ত লয়ে আপন তালে প্রবাহিত হতো গ্রামভিত্তিক ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক-সামাজিক এককগুলো। অনেকেই একে ‘এশিয়েটিক সোসাইটি’ বলে বিশেষায়িত করেছেন। এসব গ্রামের প্রবাহমান ফলগুধারা লালিত হতো, তারই বৈশিষ্ট্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে গড়ে ওঠা স্থানীয় স্বশাসিত ব্যবস্থার গণসংস্থাসমূহ দ্বারা। মাতব্বর, সর্দার ইত্যাদিসহ পঞ্চায়েত ব্যবস্থার ধারণার মধ্য দিয়ে সেই প্রাচীন গণ-শাসন কাঠামোর প্রতিচ্ছবি এখনও আমরা কিছুটা খুঁজে পাই।

যুগ যুগ ধরে চলে আসা সেই স্বশাসিত স্থানীয় শাসনব্যবস্থার ওপর প্রথম সবচেয়ে বড় রকম ধাক্কা এসেছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের হাত থেকে। রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বকে সর্বব্যাপী প্রসারিত করার রাজনৈতিক প্রয়োজনে স্থানীয় স্বশাসনব্যবস্থাকে তারা নিয়ন্ত্রিত করার পদক্ষেপ নিয়েছিল। ১৮৮৫ সালে তারা আমাদের দেশে প্রবর্তন করেছিল ইউনিয়ন বোর্ড নামক সংস্থা। এর মাধ্যমেই প্রাচীনকাল থেকে প্রচলিত স্বশাসিত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বড় রকম বিকৃতি সাধন করা হয়েছিল। স্থানীয় স্বশাসিত ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক-প্রশাসনিক শাসন প্রক্রিয়ার আওতার মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছিল। এগুলোকে করে তোলা হয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকারের ‘স্থানীয় চৌকি’। তবে এসব সত্ত্বেও তৃণমূলের নিবিড় সামাজিক শাসন-প্রক্রিয়ার যেসব কাজ প্রাচীনকাল থেকে স্বশাসিত সংস্থাগুলো পরিচালনা করত, সেসব কাজের অনেকগুলোই ব্রিটিশদের তৈরি করা ইউনিয়ন বোর্ডসমূহকেও অব্যাহত রাখতে হয়েছিল। সেই ইউনিয়ন বোর্ড, জেলা বোর্ড ইত্যাদির উত্তরাধিকার বহন করেই সমকালীন ইউনিয়ন, উপজেল, জেলা পরিষদের গঠনধারা রচিত হয়েছিল। আইয়ুব আমলে মৌলিক গণতন্ত্রের ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে এদেরকে দলীয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় আরও এক ধাপ এগিয়ে নেয়া হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধের পর রচিত সংবিধানে ব্রিটিশ শাসকদের দ্বারা স্বশাসিত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বিকৃতি সাধন কিছুটা রদ করে তাকে তার প্রকৃত গণতান্ত্রিক মর্মবাণীর ভিত্তিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে সংবিধানে সম্পূর্ণ একটি পৃথক পরিচ্ছেদ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু সেই সাংবিধানিক বিধান আজও বাস্তবায়ন হয়নি। রাষ্ট্রের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ আগাগোড়া যে কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর হাতে রয়েছে, তারা তা বাস্তবায়িত হতে দেয়নি। নিজের পায়ে কি সহজে কেউ কুড়াল মারতে রাজি হয়?

আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রের ওপর তাদের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব হাতছাড়া করতে মরিয়া হয়ে বাধা দিয়ে চলেছে ও ষড়যন্ত্র করে চলেছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার আগে স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি তারা রক্ষা করেনি। কর্তৃত্ববান সেই শক্তিধর মহল এখনও স্বশাসিত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ক্ষমতায়ন ঘটাতে দিচ্ছে না।

স্থানীয় সরকারের সংস্থাগুলো হয়ে উঠতে পারতো সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় ক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু এগুলোকে জনগণের ক্ষমতায়নের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে, কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃক তৃণমূলে জোরদার করতে এবং সেখানে তার ক্ষমতার খুঁটি স্থাপন ও সেগুলো মজবুত করার জন্য। তাই, ক্ষমতার দড়ি টানাটানির খেলায় একদিকে আমলাতন্ত্র আর অন্যদিকে আওয়ামী লীগ, বিএনপি প্রভৃতি বড় বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলো স্থানীয় সংস্থার ওপর তাদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে সব সময় মরিয়া থেকেছে। স্থানীয় সংস্থাকে পূর্ণ স্বশাসনের ক্ষমতা দিলে তাদের ক্ষমতার দাপট আগের মতো আর থাকবে না, এই ভয়ে তারা ক্ষমতার গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের চেষ্টাকে নস্যাৎ করতে সব সময়ই তৎপর ও বেপরোয়া।

এরশাদী স্বৈরাচারের আমলে উপজেলা ব্যবস্থা প্রবর্তন করে বলা হয়েছিল যে, এটা প্রশাসন ও রাষ্ট্রব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে করা হচ্ছে। কিন্তু সেই বিকেন্দ্রীকরণ মোটেও কোনো গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণের পদক্ষেপ ছিল না। সেটি ছিল স্বৈরতন্ত্রে¿র শাখা-প্রশাখা তৃণমূলে বিস্তৃত করার একটি দুরভিসন্ধিমূলক প্রয়াস মাত্র। জেলখানায় আটক রেখে বন্দিদের স্বশাসন প্রদানকে যেমন মুক্তি প্রদান বলা যায় না, সামরিক স্বৈরশাসন বহাল রেখে উপজেলা পরিষদ গঠনকেও তেমনই ক্ষমতার গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ বলা নিছক তামাশা বৈ অন্য কিছু নয়।

ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে সমাজকল্যাণ ও উন্নয়নের নানা কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। প্রজেক্টের কাজ, বিধবা ভাতা, স্কুল-কলেজের শিক্ষক নিয়োগ, রাস্তা-কালভার্ট নির্মাণ ইত্যাদি হরেক রকমের কতো কাজ সেখান থেকে করতে হয়। এগুলোই তো ক্ষমতা তথা ‘পাওয়ার’ দেখানোর জায়গা। পরম আকর্ষণীয় এই ‘পাওয়ার’ স্থানীয় সংস্থার হাতে ছেড়ে দিলে এমপি হওয়ার কিংবা আমলা হওয়ার ‘চার্ম’ আর থাকে না। তাই আমলারা এবং এমপিরা এসব বিষয়ে তাদের হাতে থাকা কর্তৃত্ব ছাড়তে নারাজ।

ব্যাপারটা শুধু ‘পাওয়ারের’ বিষয় নয়। এই পাওয়ারের সাথে যুক্ত রয়েছে ‘টু পাইস’ হাতিয়ে নেয়ার আর্থিক স্বার্থের ব্যাপারও। রাস্তা-ঘাট নির্মাণের টেন্ডার থেকে শুরু করে শিক্ষক নিয়োগ, ছাত্র ভর্তি, গমের প্রজেক্ট অনুমোদন- সবকিছুর সাথে জড়িত রয়েছে শুধু দু’পয়সা নয়, জড়িত রয়েছে বিশাল লেনদেন আর বিপুল পরিমাণের উপরি-আয়ের ব্যাপার। এরূপ মোহনীয় আর্থিক সুযোগকে তারা কি স্বেচ্ছায় ছাড়তে রাজি হতে পারে? তাইতো উপজেলা পরিষদের কর্তৃত্ব নির্বাচিত ব্যক্তিদের হাতে দিতে তাদের এতো আপত্তি।

এ প্রসঙ্গে একটি বিভ্রান্তিকর যুক্তি হাজির করে বলা হয়ে থাকে যে, মাননীয় সংসদ সদস্যগণ সংবিধান মোতাবেক নিজ নিজ আসন (constituency) থেকে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। তাই নিজ এলাকার জনগণের ভালো-মন্দ দেখার প্রধান দায়িত্ব তো তাদেরই। নিজ এলাকার জনগণের সার্বিক স্বার্থের মূল প্রতিনিধি তারাই, কারণ তারাই রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রীয় অবস্থানে থাকা একমাত্র নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। স্থানীয় সব কর্মকাণ্ডের বিষয়ে চূড়ান্ত খবরদারির এখতিয়ার সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের- এই দাবি প্রমাণ করার জন্য এ ধরনের যুক্তি দেয়া হয়ে থাকে।

কিন্তু একথা তারা ভুলে যান যে, জনগণ তাদেরকে নির্বাচিত করেছে জাতীয় স্তরের কাজগুলো করার জন্য। স্থানীয় পর্যায়ের কাজ করার জন্য নয়। সে কাজের জন্য স্থানীয় সংস্থার জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়েছে।

সরকারের তরফ থেকে এবিষয়ে আজকাল আরেকটি খোড়া যুক্তি দেয়া হচ্ছে। একথা বলা হচ্ছে যে, যেহেতু স্থানীয় সংস্থা সম্পর্কে আইন প্রণয়নের দায়িত্ব এমপি সাহেবদের, তাই স্থানীয় সংস্থার কাজকর্ম বিষয়ে এমপিদের আবেগ-আকাঙ্ক্ষাকেও দাম দিতে হবে। এ ধরনের কথা যে একাধারে একটি হুমকি ও সাথে সাথে ব্ল্যাক মেইলের ঘটনা, তা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন হয় না। আইন প্রণয়ন করার প্রশ্নে সংসদ সদস্যদের সন্তুষ্ট এবং তাদের প্রতি নজর দেয়াটাই যদি প্রধান কর্তব্য হয় তাহলে ‘রাষ্ট্রের মালিক জনগণ’ – এ কথার কোনো অর্থই আর থাকে না। যদি সংসদ সদস্যদের সন্তুষ্টি বিধান করেই যাবতীয় সব কাজ করতে হয়, দেশ, জনগণ ও গণতন্ত্রের স্বার্থের বিষয়টি এবং দেশের সাংবিধানিক বিধি-বিধানকে প্রাধান্য দেয়ার বিষয়টি তাহলে কেবল কথার কথা হয়ে থাকবে।

এখন নজর দেয়া যাক সংবিধানে এ বিষয়ে কী লেখা আছে, সেদিকে। প্রথমেই দেখা যাক, সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি শিরোনামে যা লেখা আছে, সেটি। এখানে ৯ নং অনুচ্ছেদে লেখা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিগণ সমন্বয়ে গঠিত স্থানীয় শাসন-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানসমূহকে উৎসাহ দান করিবেন’। এখানে ‘সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিগণ’ এবং তাদের ‘সমন্বয়ে গঠিত স্থানীয় শাসন-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান’ শব্দগুলো থেকে এ বিষয়ে সাংবিধানিক ব্যবস্থার মর্মকথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার পরে সংবিধানের ১১ নং অনুচ্ছেদে গণতন্ত্র প্রসঙ্গে বলা হয়েছে এবং ‘…প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে’। এখানে বিষয়টি আরো সুনির্দিষ্ট হয়েছে ‘সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে’ শব্দগুলো ব্যবহারে মাধ্যমে। অবশ্য সংবিধানের এসব বয়ান সম্পর্কে কেউ বলার চেষ্টা করতে পারেন যে, এগুলো তো রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি সম্পর্কিত কথা। এসব হল রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। এসব এখনই অনুসরণ করার আইনগত কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কথাটি সত্য। তা হলে এবার নজর দেয়া যাক, সংবিধানের অন্যত্র এ বিষয়ে কী বলা আছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সংবিধানের চতুর্থ ভাগের (নির্বাহী বিভাগ সংক্রান্ত) তৃতীয় পরিচ্ছদটি। ‘স্থানীয় শাসন’ শিরোনামে এখানে যা বলা হয়েছে, তা আইনত বাধ্যতামূলকভাবে অনুসরণীয়। এখানে ৫৯ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনভার প্রদান করা হইবে।’এখানে ‘প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনভার’ শব্দের দ্বারা স্পষ্টতই স্ব-স্ব ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, পৌর এলাকা ইত্যাদির কথাই বলা হয়েছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় শাসনের ভার ‘আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর’ অর্পণের কথা সংবিধানে বলা হয়েছে। এসব থেকে একথাই প্রতীয়মান হয় যে, ইউনিয়নসমূহে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য সদস্য, উপজেলাসমূহে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস-চেয়ারম্যান ও অন্যান্য সদস্য প্রমুখের ওপর সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় শাসন ভার অর্পিত হবে। এখানে সংসদ সদস্য অথবা ইউএনও-কে কর্তৃক প্রদানের প্রশ্ন কোনক্রমেই আসতে পারে না।

জাতীয় সংসদের সদস্যরা যেমন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস-চেয়ারম্যান কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ অথবা পৌরসভার চেয়ারম্যানবৃন্দও সমভাবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। তবে সবাই ভিন্ন ভিন্ন স্তরের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। কেউ কারো চেয়ে ‘কম নির্বাচিত’ বা ‘কম জনপ্রতিনিধি’ নয়। এখন প্রশ্ন দাঁড়ায়, কোন্ জনপ্রতিনিধি তাহলে কোন্ দায়িত্ব পালন করবে? উত্তর অতি সহজ। যে প্রতিনিধি যে কাজের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন, তিনি সেই দায়িত্ব পালন করবেন। সংসদ সদস্যগণ নির্বাচিত হয়েছেন তার এলাকার জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে প্রথমত দেশের আইন প্রণয়ন ও দ্বিতীয়ত কেন্দ্রীয় সরকারের কাজের তত্ত্বাবধানের জন্য। এ দুটি কাজ সম্পাদন করা তাদের দায়িত্ব। উপজেলা পরিষদের দায়িত্ব পালনের জন্য তারা নির্বাচিত হননি। উপজেলা পরিষদের কাজে নাক গলানো (কর্তৃত্ব করা তো দূরের কথা) মোটেও তাদের দায়িত্ব নয়।

আর, আমলাতন্ত্রের প্রতিনিধি হিসেবে ইউএনও, ডিসি প্রমুখের কর্তব্য হলো সংশ্লিষ্ট স্থানীয় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কর্তৃতের অধীনে থেকে কাজ করা। এর কোনো রকম ব্যত্যয়ের অর্থ হবে ‘সংবিধানের প্রাধান্য’ হিসেবে চিহ্নিত “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগন”মর্মে সংবিধানের মৌলিক বিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো। এই অবস্থার অবসান ঘটাতে হবে।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি।

শেয়ার করুন

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin