সোভিয়েত আমলে নারীমুক্তি

লাকী আক্তার

সোভিয়েত এর সময়কালের নারীমুক্তি সংক্ষেপে বলা একটু কষ্টসাধ্য। কেননা নানাবিধ বিষয় এটার সাথে সম্পৃক্ত। তবু কিছু বিষয়ের অবতারণা করলাম। তৎকালীন রাশিয়া বহু জাতিগোষ্ঠীর দেশ। স্বাভাবিকভাবেই রাশিয়ান নারীরা ছিলো বহুসংস্কৃতিতে বিদ্যমান সমাজের অংশ। তাছাড়া গ্রামীণ-শহুরে, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী থেকে আগত নারী আর বিভিন্ন শ্রেণিপেশার নারীদের বৈষম্যের ধরনও ছিলো ভিন্ন। তবে গ্রামীণ এবং শহুরে নারীদের মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ছিলো। এই বহু পার্থক্যের নারীদের সমস্যাগুলো সোভিয়েত আমলে কিভাবে সামনে নিয়ে এসেছিলো এবং সমাধানে সচেষ্ট হয়েছিলো সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়।

বিপ্লবের আগের প্রায় এক শতকের জীবনযাত্রা পর্যালোচনা দেখলে বোঝা যায়, কিভাবে নারীরা শুধুমাত্র গৃহস্থালি কাজের মধ্যেই সম্পৃক্ত ছিলো। নারীদের ভাবা হতো তারা শুধু নিমগ্ন থাকবেন গৃহস্থালি কাজে। যেমন ঘরদোর পরিষ্কার রাখা, রান্না করা, কাপড় বোনা ইত্যাদি। গ্রামীণ কৃষির সাথে সম্পৃক্ত নারীরা এই সকল কাজের পাশাপাশি ফসল উৎপাদনে ভূমিকা রাখতেন। চাষাবাদের সময়ে ফসলের মাঠ প্রস্তুতকরণ, বীজ বপন, আগাছা পরিষ্কার, পরিচর্যা কিংবা ফসল তোলার সময় নারীদের অবধারিতভাবেই তাদের স্বামীর সাথে ফসলের মাঠে কাজ করতে হতো।

আঠারো শতকের আগে রাশিয়ার কৃষি সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোয় নারীদের বিয়ের বয়স ছিল সাধারণভাবে ১২ বছর। বিয়ের ক্ষেত্রে নারীরা নিজেরা কোন মতামত প্রদান করতে পারতেন না। বিয়ের ক্ষেত্রে অবশ্যই তাদের পরিবারের সায় এবং মতামত গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। যদিও ১৬৪৯ সালের আইন অনুযায়ী, রাশিয়ায় নারীদেরকে ১৫ বছরের আগে বিয়ে দেয়ার কোন বিধান ছিল না।

শহরের দিকে কিছুটা এই নিয়ম অনুসরণ করলেও, গ্রামাঞ্চলে এই আইন তেমন মানা হতো না। তাছাড়া যেসকল নারীরা সরকার মালিকানার জমিতে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করতেন, সেসকল অবিবাহিত নারীদের বিবাহ প্রদানের ক্ষেত্রে শুধু পরিবার নয় সেখানকার গ্রামের জন্য গঠিত গ্রাম্য পরিষদের অনুমতি প্রয়োজন হতো। আর বিধবা বিবাহের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন হতো অনেক রকমের অনুমতির। ১২ বছরের মধ্যে নারীদের বিবাহ এবং অধিক সন্তান জন্মদানের দরুন বিপ্লবের পূর্বের সময়কালে মাতৃমৃত্যুহার এবং শিশুমৃত্যুহার ক্রমশও বাড়ছিলো। গড়ে রাশিয়ায় নারীরা  সেসময়ে প্রায় ৭ জন সন্তানের জন্ম দিতেন। পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণায় আচ্ছন্ন সেসময়কার পরিবারগুলোতে নারীরা পুত্র সন্তানের জন্ম দিলে পরিবারে তাদের অবস্থান অনেক শক্ত হতো। আর অধিক পুত্র সন্তানের জন্মদান পরিবারে নারীর অবস্থান আরও পাকাপোক্ত করতো।

যেহেতু কৃষক পরিবারগুলোতে মাঠে কাজ করার জন্য অধিক লোকের দরকার এবং ফসলের মাঠে বাইরে থেকে লোক এনে মজুরি দিয়ে কাজ করানোর সক্ষমতা ছিলো না সেই পরিবারগুলোর, তাই পরিবারের লোকেদের ওপরই তাদের নির্ভর করতে হতো। এজন্য নারীদের অধিক সন্তান জন্মদান করতে হতো।

সোভিয়েত বিপ্লবের পূর্ববর্তী নারীদের এই ক্রমাগত শোষণের চিত্র বদলে দেয়ার শপথ নিয়েই বিপ্লব অগ্রসর হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন নারীদের সমতার কথা সামনে নিয়ে আসে। সে সমতা ছিলো অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রীয়, সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক। (সোভিয়েত ইউনিয়নের গঠনতন্ত্র, চ্যাপ্টার ১০, ১৯৩৬)

সোভিয়েতের সত্তর বছরে নারীদের সমতা বিধানে নানামাত্রিক ভূমিকা গ্রহণ করে। শিক্ষা, আত্মোন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, খেলাধুলায় অংশগ্রহণ এবং বিপুল পরিমাণ নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ এবং তার নিরাপত্তা বিধান সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজ ব্যবস্থাকে অনন্য জায়গায় নিয়ে যায়। ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লব রাশিয়ায়  নারী এবং পুরুষের আইনত এবং কার্যকর সমতা প্রতিষ্ঠা করেছিলো।

বিপ্লবের প্রস্তুতিকালে লেনিন নারীদের কমিউনিস্ট বিপ্লবে অংশগ্রহণ করার জন্য আগ্রহী করে তোলেন। লেনিন দেখেছিলেন নারীরা কিভাবে অর্থনৈতিকভাবে তাদের স্বামীদের, ওপর নির্ভরশীল। তাদের  জীবন ব্যয়িত হচ্ছে অনুৎপাদনশীল খাতে। গৃহস্থালি কর্মযজ্ঞ, রান্নাঘর, নার্সারি, সন্তান জন্মদানের এই চক্রে নারীরা আবদ্ধ। বলশেভিক বিপ্লবের  লক্ষ্য ছিলো তাই নারীমুক্তি। বিপ্লব ছাড়া এই নারীমুক্তি ছিলো অসম্ভব। সোভিয়েত নারীদের  অর্থনৈতিক ভাবে সক্ষম করে তোলার প্রয়াস থেকে বিপুল নারীসমাজকে শ্রমবাজারে যুক্ত করা হয়। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯২৩ সালের দিকে নারী শ্রমিকের সংখ্যা ছিলো ৪২৩২০০ আর ১৯৩০ সালে এটা এসে দাঁড়ায় ৮৮৫৯০০ জনে। নারীদের কাজের নিরাপদ পরিবেশ তৈরি এবং নিরাপত্তা বিধানের জন্য সরকারিভাবে সন্তান লালন পালনের ব্যবস্থা করা হয়। (সূত্র: গোল্ডম্যান, উয়েন্ডি জে, জেন্ডার এন্ড ইন্ডাস্ট্রি ইন স্টালিন’স রাশিয়া, ক্যাম্ব্রিজ, ইউকে ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০০২)

নতুন কমিউনিস্ট সরকার ১৯১৮ সালে প্রথম ফ্যামিলি কোড চালু করে। এই আইনের মধ্য দিয়ে চার্চ থেকে বিয়েকে আলাদা করে ফেলা হয়। এবং দম্পতিরা তাদের নিজেদের সন্তানের পদবী দেয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা পায়। অবৈধ সন্তানাদিদের বৈধ সন্তানাদিদের মতন সমান অধিকার প্রদান করা হয় এই আইনের মাধ্যমে। মায়েদের অধিকার নিশ্চিত করা হয়। এবং এই আইনের মধ্য দিয়ে নারীরা বিচ্ছেদের অধিকার পান।

১৯২০ সালে সোভিয়েত নারীদের গর্ভপাত বৈধ করে দেয়। ইতোপূর্বে অবৈধ থাকার দরুন বিপুল সংখ্যক নারী গর্ভপাত করতে গিয়ে মারা যেতেন কিংবা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তেন। গর্ভপাত বৈধ করে দেয়া এবং নারীদের উন্নত চিকিৎসা প্রদান ছিলো ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ভূমিকা। পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম আইন করা ছিলো কোন প্রথম ঘটনা।

তাছাড়া ১৯২২ সালে বৈবাহিক ধর্ষণকে অবৈধ হিসেবে ঘোষণা করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। শ্রম আইনও নারীদের অনেক এগিয়ে নেয়। অসুস্থ হলে নারীদের ইনসুরেন্সের সমতা বিধান করা হয়, ৮ সপ্তাহের সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং নারী পুরুষের জন্য একটি মিনিমাম মজুরির সমতা বিধান করা হয়। প্রত্যেকের জন্যই সবেতনে ছুটির ব্যবস্থা ছিলো। এই বিধানগুলি সোভিয়েত রাশিয়া করেছিল, একটি নারীপুরুষ নির্বিশেষে একটি গুণগত শ্রমশক্তির তৈরির প্রয়াসে। রাশিয়ার প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে এগুলো ছিলো এগিয়ে যাওয়ার যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

নারীমুক্তির সাথে সম্পর্কিত বিষয়গুলো মনিটরিং এর জন্য অল রাশিয়ান কমিউনিস্ট পার্টি (বলশেভিক) একটি বিশেষায়িত শাখা খুলে, যার নাম দেয়া হয় ‘জেনোথডেল’ (১৯২০)। ১৯১৯ সালে এটি মূলত সূচনা করেন  রাশিয়ার বলশেভিক পার্টির বিপ্লবী নেতা আলেক্সান্দ্রা কোলোন্তাই এবং ইনিসা আরমান্দ। এটা ছিলো অল রাশিয়ান কমিউনিস্ট পার্টি (বলশেভিক) কেন্দ্রীয় কমিটির আওতাধীন একটি নারী সেক্রেটারিয়েট।

অবশ্য ১৯৩০ সালে এই বিশেষায়িত শাখাটি বন্ধ করে দেয়া হয়। এর পেছনে যে তত্ত্ব ছিলো তা হলো, ‘ব্যক্তিগত সম্পদের বিলোপ এবং উৎপাদনের উপায়সমূহ জাতীয়করণের মধ্য দিয়েই সোভিয়েতে নারী সংক্রান্ত বিষয়গুলোর মীমাংসা করা হয়েছে।’বিপ্লবকে স্থায়িত্ব প্রদানে বিপুল নারীরা বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে এগিয়ে আসেন।

১৯২৫ সালের দিকে রাশিয়াতে প্রচুর বিবাহ বিচ্ছেদ বাড়তে থাকে। তখন জেনোথডেল একটি নতুন পরিবার পরিকল্পনা আইন ঘোষণা করে৷ এই সাধারণ আইন ছিলো দম্পতিদের আইনত বিধান ছাড়া  একসাথে বসবাসের অধিকার। এক বছর পর তারা এই আইন এবং নারীদের সামগ্রিক অবস্থা পুনর্মূল্যায়ন করে। এরপর নতুন করে বিবাহ আইন প্রণয়ন করা হয়। তারা দেখে যে আগের আইনের ফলাফল স্বরূপ নারীদের প্রতি বৈষম্য বাড়ছে। নারীদের আর্থিকভাবে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রেখে পুরুষদের ছেড়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এমনকি গর্ভবতী হলেও ছেড়ে যাচ্ছে এবং শিশুদের প্রতি কোন দায়িত্ব পালন করছে না। এমনকি নারীরা তাদের কোন অর্থনৈতিক প্রাপ্য পাচ্ছে না, যেহেতু আইনত এক্ষেত্রে পুরুষদের কোন বাধা নেই এবং উল্লেখযোগ্যভাবে গৃহহীন শিশুর সংখ্যাও  বাড়ছিলো। সেকারণে ১৯২৬ সালের নতুন বিবাহ আইনে নিবন্ধিত এং অনিবন্ধিত  সকল  দম্পতিদের মধ্যে  নারীদের সমান অধিকার প্রদানের কথা বলা হয়।

আরও বহু বিষয়ে তারা উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলো। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে প্রায় ৮৪৭৬ জন্য নারী রেড আর্মিতে এবং সোভিয়েত নেভিতে যোগদান করে।

সোভিয়েত এর সময়কালে নারীদের মানুষ হিসেবে মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়। এবং একথা অনস্বীকার্য যে বলশেভিক বিপ্লব পৃথিবীকে দেখিয়েছে নারীমুক্তি ছাড়া বিপ্লব যেমন অসম্ভব, তেমনি বিপ্লব ছাড়াও নারীমুক্তি কোনভাবেই সম্ভব নয়।

লেখক: সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.