সেলসম্যান মনিরের ‘গোল্ডেন’ মনির হয়ে ওঠা

নব্বইয়ের দশকে গাউছিয়া মার্কেটের একটি কাপড়ের দোকানের সেলসম্যান হিসেবে কাজ করতেন মনির। সময়ের ব্যবধানে মনির বড় ধরনের স্বর্ণ চোরাচালানকারী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর নাম হয়ে যায় ‘গোল্ডেন’ মনির। ভূমিদস্যুতার মাধ্যমে মনির অসংখ্য প্লটের মালিকও হয়েছেন।

সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানিয়েছেন র‍্যাবের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ।

দোকানের সেলসম্যান মনির হোসেন ওরফে ‘গোল্ডেন’ মনিরকে অবৈধ অস্ত্র, মাদক ও বিদেশি মুদ্রা রাখার অভিযোগে র‍্যাব গ্রেপ্তার করেছে।

গতকাল শুক্রবার রাত ১১টা থেকে মনিরের মেরুল বাড্ডার ১৩ নম্বর রোডের ৪১ নম্বর বাড়িতে অভিযান শুরু করে র‍্যাব।

অভিযান শুরুর সাড়ে ১২ ঘণ্টা পর (২১ নভেম্বর) শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় এক প্রেস বিফ্রিংয়ে রাজধানীর গাউছিয়া মার্কেটের কাপড়ের দোকানের সাধারণ বিক্রয়কর্মী মনিরের ‘গোল্ডেন মনির’ হয়ে ওঠার গল্প জানান র‍্যাবের পরিচালক (আইন ও মিডিয়া) লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ।

তিনি বলেন, ‘অভিযানকালে মনিরের বাসা থেকে ১০টি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা (বাংলাদেশি নয় লাখ টাকা), ৬০০ ভরি সোনা (প্রায় আট কেজি) ও এক কোটি নয় লাখ টাকা নগদ জব্দ করেছি।’

‘অভিযুক্ত মনির হোসেন ওরফে গোল্ডেন মনির মূলত একজন হুন্ডি ব্যবসায়ী, স্বর্ণ চোরাকারবারি এবং ভূমির দালাল। তিনি একটি গাড়ির শোরুমের সত্ত্বাধিকারী। পাশাপাশি গাউছিয়াতে একটি স্বর্ণের দোকানের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে’, বলেন তিনি।

এই র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা তার বাসা থেকে দুটি বিলাসবহুল অনুমোদনহীন বিদেশি গাড়ি জব্দ করেছি। যার একেকটির মূল্য প্রায় তিন কোটি টাকা। পাশাপাশি তার কার সিলেকশন থেকেও তিনটি বিলাসবহুল অনুমোদহীন গাড়ি জব্দ করা হয়েছে।’

আশিক বিল্লাহ বলেন, ‘ভূমিদস্যুতার মাধ্যমে মনির অসংখ্য প্লটের মালিক হয়েছেন। রাজউক থেকে প্লটসংক্রান্ত সরকারি নথিপত্র চুরি করে এবং অবৈধভাবে রাজউকের বিভিন্ন কর্মকর্তাকে দাপ্তরিক কাজে ব্যবহার করে রাজউক, পূর্বাচল, বাড্ডা, নিকুঞ্জ, উত্তরা এবং কেরানীগঞ্জে নামে-বেনামে অন্তত দুই শতাধিক প্লট নিজের করে নেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মনির ৩০টির বেশি প্লটের কথা স্বীকার করেছেন।’

র‍্যাবের মুখপাত্র আশিক বিল্লাহ আরও বলেন, ‘রাজউকের ৭০টি ফ্ল্যাটের নথি নিয়ে গিয়ে আইনবহির্ভূতভাবে হেফাজতে রাখায় ২০১৯ সালে মনিরের বিরুদ্ধে রাজউক কর্তৃপক্ষ একটি মামলা করে। সেটি চলমান রয়েছে। এ ছাড়া অনৈতিকভাবে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে বিপুল সম্পদ অর্জন করায় তাঁর বিরুদ্ধে দুদকের মামলা চলছে।’

আশিক বিল্লাহ বলেন, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ভূমি জালিয়াতি সম্পর্কে মনির বলেছেন, ২০০১ সালে তৎকালীন প্রভাবশালী মন্ত্রী, গণপূর্ত কর্মকর্তা ও রাজউকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক করে তিনি রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ভূমি জালিয়াতি শুরু করেন।’

ঢাকা-সিঙ্গাপুর–ভারত, এই রুটে তিনি প্রথমে লাগেজে করে কাপড়, কসমেটিক, ইলেকট্রনিকস, কম্পিউটারসামগ্রী, মোবাইল, ঘড়িসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে আনা-নেওয়া করতেন। এই কাজগুলো করতে করতে তিনি লাগেজ স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িয়ে পড়েন। বায়তুল মোকাররমে একটি জুয়েলারি দোকান দেন, যা তার এই চোরাকারবারি কাজে সাহায্য করে। সময়ের ব্যবধানে মনির বড় ধরনের স্বর্ণ চোরাচালানকারী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

র‍্যাবের এই মুখপাত্র আরও বলেন, ‘মনির হোসেনকে অবৈধ কাজে কারা সহায়তা করেছেন, সে তথ্যগুলো অনুসন্ধানে তাঁরা দুদক, বিআরটিএ, সিআইডি ও এনবিআরকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানাবেন।’

মনিরের কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা আছে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে আশিক বিল্লাহ বলেন, ‘একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। সেই দলটির অর্থ জোগানদাতা হিসেবেও তিনি কাজ করেন। তবে দলের নাম উল্লেখ করেননি আশিক বিল্লাহ।’