সিলেটে বন্যা পরিস্থিতি

সিলেটের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গেলো এক সপ্তাহ ধরে জেলার প্রধান দুটি নদী সুরমা ও কুশিয়ারার পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এরইমধ্যে সিলেট নগরীসহ জেলার ১৩টি উপজেলা প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হাজারো গ্রাম। চলমান এ বন্যা পরিস্থিতিতে অনেকের ঘরের মজুত খাবার যেমন শেষ হয়ে গেছে, অনেকে আবার দিনের পর দিন রয়েছেন কর্মহীন। বন্যায় ভোগান্তি বাড়ছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের। বন্যার্তদের অভিযোগ, ঘরবন্দি অবস্থায়ও তারা কোনো ত্রাণ সহায়তা পাচ্ছেন না।

গণমাধ্যম ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সিলেটে কমপক্ষে ১০ থেকে ১২ লাখ মানুষ পানিবন্দি। বানভাসি মানুষের ঘর-বাড়িতে বুক ও গলা সমান পানি। এরইমধ্যে অনেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছেন। কেউ কেউ ঘরের মধ্যে মাচা বানিয়ে কোনোরকমে দিন কাটাচ্ছেন।

এদিকে চাল, ডাল ও তেল না থাকায় অনেকের ঘরে চুলা জ্বলছে না। ইঞ্জিনচালিত নৌকার শব্দ শুনলেই ত্রাণের জন্য ছুটে আসছেন বানভাসিরা। অনেকে আবার পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। সাপ, পোকামাকড় ও জোঁকের উপদ্রব বেড়েছে। একইসঙ্গে শৌচাগার ডুবে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সরকারিভাবে ত্রাণ দেওয়ার কথা বলা হলেও অনেকের ঘরেই ত্রাণের মাল পৌঁছেনি। উপজেলা সদরের সঙ্গে অধিকাংশ এলাকার মানুষের সড়ক পথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। যোগাযোগের জন্য অবস্থাসম্পন্ন মানুষ নৌকা ব্যবহার করতে পারলেও অধিকাংশ মানুষ কলার ভেলা ব্যবহার করছেন। সব মিলিয়ে মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। অনেকের বাড়িতে টানা তিন ধরে পানি উঠছে। বাধ্য হয়ে তাদের অন্যত্র উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিতে হচ্ছে। একইসঙ্গে বন্যার কারণে বাড়ির জিনিসপত্রও নষ্ট হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সিলেট কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার সকালে সিলেটের সুরমা নদীর দুটি পয়েন্টে এবং কুশিয়ারা নদীর একটি পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। যদিও স্থানীয় প্রশাসন দাবি করছে সিলেটে পর্যাপ্ত পরিমাণে ত্রাণসামগ্রী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এখনো অধিকাংশ দুর্গত মানুষের কাছে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছায়নি। যারা সামান্য পরিমাণ ত্রাণ সহায়তা পেয়েছেন, প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় তা দিয়ে তাদের বিশেষ কোনো উপকার হয়নি।

এদিকে বন্যার পানিতে বিদ্যুতের সাব-স্টেশন তলিয়ে যাওয়া ও বাসা-বাড়িতে বৈদ্যুতিক মিটারে পানি ওঠায় সিলেট নগরীর অন্তত ৫০ হাজার পরিবার বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। নগরীর দক্ষিণ সুরমা, উপশহরসহ কয়েকটি এলাকার বিদ্যুতের সাব-স্টেশন পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে এসব এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। জলাবদ্ধতা দীর্ঘায়িত হতে থাকায় খুব শিগগির এসব এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বিদ্যুৎ না থাকার কারণে ওইসব এলাকায় আতঙ্ক বেড়েছে।

খোদ বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন এলাকার বেশিরভাগ বাসিন্দা দৈনন্দিন ব্যবহার্য ও খাবার পানির সংকটে রয়েছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় দক্ষিণ সুরমা এলাকার বাসিন্দারা। সুরমা নদীর দক্ষিণ পাড়ের প্রায় সব এলাকা বন্যাকবলিত ও জলাবদ্ধ হয়ে পড়ায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

বন্যা দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সরকার ও বিত্তবান মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাম জোটের নেতারা। নেতৃবৃন্দ গত শুক্রবার রাজধানীর পুরানা পল্টনে এক সমাবেশে বলেছেন, একদিকে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি অন্যদিকে আকস্মিক বন্যা মানুষের ওপর মরার ওপর খাড়ার ঘা হয়ে এসেছে। এ সংকট নিরসনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে বানভাসিদের পাশে দাঁড়াতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.