সিপিবি’র দ্বাদশ কংগ্রেসে গৃহীত প্রস্তাবনাবলী

১. শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া সম্পর্কে

মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে জলাঞ্জলি দিয়ে রাষ্ট্রীয় কল-কারখানা বিরাষ্ট্রীয়করণের নামে লুটপাট করা হচ্ছে। সিপিবি’র দ্বাদশ কংগ্রেস লুটপাট আর সস্তা শ্রমের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা নব্য ধনিক শ্রেণির চরম শোষণ নির্যাতন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে নিম্নবর্ণিত দাবিতে ঐক্যবদ্ধ করে আন্দোলন-সংগ্রাম অগ্রসর করার আহ্বান জানাচ্ছে :

১।    স্থায়ী মজুরি কমিশন এবং তার অধীনে একাধিক মজুরি বোর্ড গঠন করে প্রতি বছর মজুরি নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। বাজার দর, উৎপাদনশীলতা ও সুষম শ্রমশক্তি এবং মাথাপিছু আয়ের সূচক বিবেচনায় নিয়ে সকল শ্রমিকের জন্য জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। মুদ্রাস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য বিবেচনা করে মজুরি স্থিতিশীল রাখার স্বার্থে মহার্ঘ ভাতা প্রদান করতে হবে।

২।    আইএলও কনভেনশন অনুসারে শ্রম আইন ও বিধিমালা প্রনয়ণ করে অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারসহ অপরাপর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

৩।   বর্তমান শ্রম আইনের শ্রমিক স্বার্থবিরোধী ধারাসমূহ বাতিল করতে হবে। ইপিজেড ও স্পেশাল ইকোনমিক জোনে একই আইন কার্যকর করতে হবে।

৪।    ছাঁটাই-নির্যাতন-দমননীতি বন্ধ করতে হবে। শ্রমিক ও নেতৃবৃন্দের নামে দায়েরকৃত হয়রানি ও ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ প্রত্যাহার করতে হবে।

৫।   ভুলনীতি, দুর্নীতি ও অপচয় রোধ করে বন্ধকৃত রাষ্ট্রায়ত্ব পাটকল, চিনিকল, সূতা ও বস্ত্রকল আধুনিকায়ন করে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় চালু করতে হবে।

৬।   গার্মেন্ট, ট্যানারি, নির্মাণ, পরিবহন ও হকারসহ গ্রাম-শহরে সকল শ্রমজীবী মানুষের জন্য ভর্তুকি মূল্যে রেশন ও আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

৭।    সমকাজে সমমজুরি নিশ্চিত করতে হবে। ৬ মাস স্ববেতনে প্রসূতিকালীন ছুটি আইন করে কার্যকর করতে হবে। শিল্পাঞ্চল ভিত্তি শ্রমজীবীদের জন্য হাসপাতাল স্থাপন করতে হবে।

৮।   রিকশা-ভ্যান, ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজি বাইক, নির্মাণ, দোকান কর্মচারী, হোটেল-পর্যটন, গৃহ, চাতাল, করাতকল, পাদুকা, লেগুনা, পার্লার, হকার-ফেরিওয়ালা, বেকারী, পুস্তক বাঁধাই, মুদ্রণ, দর্জি, লোকাল গার্মেন্টস ও প্রাইভেট কার চালকসহ সকল শ্রমজীবী মানুষের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, সামাজিক সুরক্ষা, পরিচয়পত্র ইত্যাদি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এসকল শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা, ন্যায্য মজুরি, চাকুরির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

৯।   আউটসোর্সিংয়ের নামে ন্যায্য মজুরি, চাকুরির সুরক্ষা ও আইনানুগ অধিকার হরণ করা চলবে না।

১০।  নিরাপদ কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত করতে হবে। দুর্ঘটনায় নিহত ও স্থায়ী অক্ষম শ্রমিকদের আইএলও কনভেনশন-১২১ অনুসারে ভবিষ্যৎ জীবনের আয়ের সমান ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আহত ও পঙ্গু শ্রমিকদের সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। অগ্নিকাণ্ড ও ভবন ধ্বসের জন্য দায়ী মালিক ও সরকারি দায়িত্বরতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। সরকারি-বেসরকারি সকল শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য দুর্ঘটনা বীমা চালু এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

১১।   প্রবাসী শ্রমিকদের বিদেশে যেতে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান ও রাষ্ট্রীয় খরচে প্রশিক্ষণ এবং মেডিকেল চেকআপের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রবাসে মৃত্যুবরণকারী ও আহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রবাসী শ্রমিকদের অভিবাসন ব্যয় কমাতে হবে। প্রবাসে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার থাকতে হবে।

১২।  সব ক্ষেত্রের শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

১৩।  শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য রেশনিং, জীবন বীমার ব্যবস্থা করতে হবে।

২. শিল্প সম্পর্কে

বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে উৎপাদনযন্ত্র, উৎপাদনব্যবস্থা ও বণ্টন প্রণালীসমূহের মালিক বা নিয়ন্ত্রক হবে জনগণ এবং এই উদ্দেশ্যে মালিকানা ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় মালিকানা, সমবায়ী মালিকানা এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত সীমার মধ্যে ব্যক্তি মালিকানা অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শোষণহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাকে প্রধান্য দেওয়া হয়েছে অথচ রাষ্ট্রীয় কলকারখানাকে বিরাষ্ট্রীয়করণ করা হয়েছে। ৮টি ইপিজেড করা হয়েছে। ১০০ টি ইকোনোমিক জোন গড়ে তোলা হচ্ছে। ইপিজেড ও ইকোনোমিক জোনে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার না থাকায় শ্রমিকদের উপর চরম শোষণ-নির্যাতন চলছে যার ফলে এসব শিল্পের উৎপাদশীলতা বিকশিত হচ্ছে না। আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর বৃহৎ শিল্পে এবং শ্রমঘন বৃহৎ শিল্পে সর্বত্রই নানাবিধ কৌশল পরিবর্তন করে শোষণের মাত্রা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম দমন করতে শিল্প পুলিশ গঠন করা হয়েছে।

নয়া উদারীকরণ বাজার অর্থনীতির ফলে পুঁজিপতিশ্রেণির ব্যক্তি স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।

প্রায় ৪০ হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প রয়েছে। এ সকল শিল্প রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত এবং এ সকল শিল্পে কোনো প্রকার আইন কানুন মানা হয় না।

এমতাবস্থায় আমরা দাবি জানাচ্ছি,

১।    বন্ধকৃত পাটকল ও চিনিকলসহ সকল কল-কারখানা রাষ্ট্রীয় মালিকানায় চালু করতে হবে। এসকল কল-কারখানা আধুনিকায়ন করে দুর্নীতিমুক্ত দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচালনা করতে হবে।

২।    সকল শিল্প কারখানায় সুষম শ্রমশক্তি নিশ্চিত করতে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

৩।   শিল্প পুলিশ প্রত্যাহার করতে হবে।

৪।    যে সকল কারখানায় সময়মত মজুরিসহ শ্রমিকদের পাওনা দিতে ব্যর্থ হয় এবং আইনানুভাবে চালাতে ব্যর্থ হয় সে সকল কারখানা অধিগ্রহণ করে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় চালাতে হবে।

৫।   সংবিধানের ১০নং অনুচ্ছেদ অনুসারে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার নীতিতে শিল্প নীতি প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিল্প পরিচালনা করতে হবে।

৬।   ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে এবং আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

৩. জাতীয় ন্যূনতম মজুরি সম্পর্কে

মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত দেশে আমরা সুবর্ণজয়ন্তী পালন করলাম। দেশকে মধ্যম আয়ের দেশ বলা হচ্ছে। মাথাপিছু আয় বলা হচ্ছে ২৫৯১ ডলার। দেশীয় মুদ্রায় ২ লাখ ২০ হাজার টাকা। এই আয়ের অগ্রগতির অন্যতম অংশীদার দেশের শ্রমজীবী মানুষ। প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত শ্রমিকরা মানবেতর জীবন যাপন করলেও বসে নেই। অথচ এখনও পর্যন্ত ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়নি। বেতন বৈষম্য চরমে।

সিপিবির কংগ্রেস অবিলম্বে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ২০,০০০ (বিশ হাজার) টাকা নির্ধারণ বাস্তবায়ন এবং মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনা করে প্রতি বছর বৃদ্ধি করার দাবি জানাচ্ছে।

সিপিবির কংগ্রেস সর্বত্র বেতন বৈষম্য দূর করে বেতন অনুপাত ১:৫ নির্ধারণের জোর দাবি জানাচ্ছে।

জাতীয় মজুরি নির্ধারণ ও বেতন অনুপাতে নির্ধারণে ক্ষমতাসীনদের বাধ্য করতে এ দাবিতে দেশব্যাপী জনমত গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছে।

৪. কৃষি ও কৃষক সম্পর্কে

দেশের অর্থনীতিতে কৃষকের অবদান কেউ অস্বীকার করে না। কৃষক নিজস্ব প্রচেষ্টায় নানামুখী কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে বহুমুখী উৎপাদনের ধারায় কৃষিকে এগিয়ে নিচ্ছেন। এই কৃষক এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগুচ্ছে।

এই কংগ্রেস দাবি করে যে-

১।    কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নের লক্ষ্যে খোদ কৃষকের হাতে জমি, প্রয়োজনীয় অর্থ, কৃষি উপকরণ ও আধুনিক প্রযুক্তি প্রদান করতে হবে।

২।    খাদ্য শস্যসহ অর্থকরী ফসলের লাভজনক দামের নিশ্চয়তা বিধান উৎপাদন ব্যয় ও সামগ্রিক জীবন যাত্রার ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে কৃষি পণ্যের যুক্তিসঙ্গত দাম নির্ধারণ ও উৎপাদক কৃষক খাতে ফসলের লাভজনক দাম পায় তা নিশ্চিত করা।

৩।   সার বীজ কীটনাশক ও সেচযন্ত্র প্রভৃতি উপকরণের দাম কমানো।

৪।    কৃষকদের স্বার্থে ও গ্রামীণ অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে কৃষি পণ্য সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করতে হবে।

৫।   কৃষকদের প্রয়োজনীয় পুঁজি সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে দিতে হবে। মহাজনী ও এনজিও ঋণের শোষণ প্রতিরোধ করতে হবে।

৬।   উৎপাদন সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ প্রভৃতি বহুমুখী সমবায় ও কৃষিতে উৎপাদিকা শক্তি বিকাশের নীতির ভিত্তিতে কৃষি ও ড্যাম উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন।

৭।    কৃষিনির্ভর কল কারখানা গড়ে তুলতে হবে।

৮।   শ্রমবীমা চালু করতে হবে।

৯।   বিএডিসিকে সচল করা।

১০। বাজেটে কৃষিখাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিতে হবে।

১১।   অকৃষি ভূমি মালিকদের কাছ থেকে কৃষি জমি উদ্ধার করে প্রকৃত কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে।

১২। কৃষি জমিতে অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না। শিল্প কারখানার মালিকেরা কি পরিমাণ জমি গ্রহণ করতে পারবে তার সিলিং নির্ধারণ করতে হবে।

১৩। সরকারি উদ্যোগে বিষমুক্ত খাদ্য শস্য উৎপাদনে ব্যবস্থা গ্রহণ ও এক্ষেত্রে বিশেষ সহায়তা প্রদান করতে হবে।

১৪। সারের ও বীজের মূল্যবৃদ্ধির সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম রোধ করতে হবে।

১৫। বিনা সুদে কৃষি ঋণ চালু করা।

১৬। ইউনিয়নভিত্তিক ক্রয়কেন্দ্র চালু করা। মধ্যসত্বভোগীদের শোষণ ও নির্যাতনের তাণ্ডব রোধে ব্যবস্থা গ্রহণ।

১৭। কৃষিপণ্য সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগে কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ করা।

১৮। উপকূলীয় জেলাসমূহের চলমান ও ভবিষ্যৎ বিপর্যয় রোধে কৃষি জমি রক্ষায় যুগোপযোগী ব্যবস্থা গ্রহণ।

১৯। কীটনাশকের অতিরিক্ত প্রয়োগ রোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়াস এবং ভেষজ কীটনাশক ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা।

২০। বিদেশ নির্ভরতা কমিয়ে বীজের উপর দেশীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।

৫. হাওর সম্পর্কে

দেশের খাদ্যের অন্যতম যোগানদাতা হাওরের কথা-কান্না দেশের স্বার্থে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে ঐ অঞ্চলের কৃষি ও কৃষক রক্ষায় এই কংগ্রেস দাবি করছে যে-

১।    হাওরে এক ফসলী বোরো ধানের লাভজনক দামসহ সকল সমস্যার নিরসন করতে হবে।

২।    আগাম বন্যার কবল থেকে হাওরের ফসল রক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে। পর্যায়ক্রমে বাঁধগুলিতে রাবার ড্যাম নির্মাণসহ নদী-খাল-বিল খনন করে স্থায়ী পাড় ভরাট করতে হবে। হাওরের শস্যবীমা চালু করতে হবে।

৩।   হাওরে কৃষকের উৎপাদিত সব ধান সরকার নির্ধারিত দামে ক্রয় বিক্রয়ের নিশ্চয়তা দিতে হবে।

৪।    শুকনো মৌসুমে গ্রামে গ্রামে স্ট্যাম্প-মুচলেকা নিয়ে ধান কাটার মুহূর্তেই ধান কিনে কৃষকের গোলায় মজুদ রাখা এবং পরে নৌ-চলাচল হলে ধানের দাম থেকে ব্যয় কাটিয়ে মূল ক্রয়কেন্দ্রকে ধান সংগ্রহ করার পদক্ষেপ নিতে হবে।

৫। গোপাটগুলি পাকা করে অটো মিলে নেওয়া ও ভেজাধান মিলিং করার ব্যবস্থাসহ হাওরের কৃষির একটি স্থায়ী ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করতে হবে।

৬।   ইজারাদারকে তার ‘সীমানার বাইরে না যাওয়া’র নির্দেশ বলবৎ ও কার্যকর রেখে ভাসান পানিতে মাছ ধরার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

৭। বর্ষার কড়াল ঢেউ থেকে হাওরের গ্রামগুলি রক্ষার্থে সাশ্রয়ীমূল্যে সিসিব্লক বিতরণ করতে হবে।

৮। হাওরের শাক-সবজি সমৃদ্ধ এলাকাগুলি বাছাই করে এলাকা অনুপাতে কোল্ডস্টোরেজ স্থাপন করতে হবে।

৯। হাওরে গড়ে ওঠে আন্তঃজেলা রাস্তার পাশে পোশাক কারখানা ও এলাকাভিত্তিক শিল্প-কারখানা স্থাপন ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে।

১০। হাওরের বিভিন্ন উপজেলা ও জেলায় স্থায়ী ও ভাড়া গুদামের ব্যবস্থা করতে হবে।

১১। দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে হাওরের কৃষকদের আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থা নিশ্চিত ও কার্যকর করতে হবে।

১২। হাওর সংক্রান্ত বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে চরম দুর্নীতি ও লুটপাট বন্ধ করতে হবে।

৬. দ্রব্যমূল্য ও নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যাদির দাম হু হু করে বাড়ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে ভেজাল খাদ্যে বাজার সয়লাব। এই অবস্থায় বেঁচে থাকার জন্য নিরাপদ ও কম মূল্য নিত্যপণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারকে বাধ্য করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ক)   টিসিবির কার্যক্রমকে দুর্নীতিমুক্ত ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। সেই সাথে সরকারি উদ্যোগে নিত্যপণ্যের বাফার স্টক গড়ে তুলে বাজার পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

খ)    চালসহ দেশে উৎপাদিত সকল পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে পরিবহন ব্যবসায়ী চাঁদাবাজ ও মজুদদারদের দৌরাত্ম্য কঠোর হাতে দমন ও বাজারে প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে।

গ)    আমদানিকৃত পণ্যের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে বিকল্প আমদানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

ঘ)    সমাজের সকলকে আয়ভিত্তিক শ্রেণি বিভাজন করে নিম্ন আয়ের মানুষদের স্থায়ী রেশনিং ব্যবস্থা চালু করে ন্যায্য দামে চাল, তেল, ডাল, চিনিসহ সকল নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সাপ্তাহিক ভিত্তিতে সরবরাহ করতে হবে।

ঙ)    গ্রামীণ এলাকায় প্রতি ইউনিয়নে এবং শহর এলাকায় প্রতি ওয়ার্ডে ন্যায্যমূল্যের দোকান চালু করতে হবে।

চ)    আপদকালীন সংকট মোকাবেলায় ওপেন মার্কেট সেল ও কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি চালু করতে হবে।

ছ)    দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিত্য পণ্যের উপর ভ্যাট/ট্যাক্স মওকুফ করে প্রয়োজনে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়াতে হবে।

জ)   উৎপাদক ও ক্রেতা সমবায় গড়ে তুলতে হবে।

ঝ)   অবাধ ‘খোলাবাজার দর্শন’ এবং ‘মার্কেট ফান্ডামেন্টালিজম’ এর নীতি থেকে বেরিয়ে নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তিকে জনগণের সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

৭. বিদেশে লুটেরাদের অর্থপাচার সম্পর্কে

বাংলাদেশ ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রতিবেদনে জানা গেছে, প্রধানত: সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, কানাডা, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া, হংকং, থাইল্যান্ডে দেশ থেকে অবৈধভাবে অর্থ পাচার করে লুটেরা-অতি ধনীরা তাদের পরিবার-পরিজনের জন্য বিশাল সম্পদ ভিত্তি তৈরি করেছেন। ওইসব দেশগুলোতে বেগমপাড়া বলে কথিত অঞ্চল ও অর্থপাচার নিয়ে দেশে-বিদেশে বিক্ষোভ সংগঠিত হচ্ছে। এইসব অর্থপাচার জমছে মূলত বাণিজ্য কারসাজি ও হুন্ডির মাধ্যমে। এই ধারা এখনো অব্যাহত আছে। প্রাপ্ত হিসেবে মতে গত ১৬ বছরে পাচার-হওয়া অর্থের পরিমাণ ১১ লাখ কোটি টাকা ওই সময়ের জাতীয় বাজেটের ২৭ শতাংশ অনেকে মনে করেন এই তথ্য আংশিক। আমরা অবিলম্বে অর্থ প্রচারকারীদের নামের তালিকা প্রকাশের দাবি জানাই।

ইতিমধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে স্বয়ং ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে বলেছেন যে এদের মধ্যে অসৎ ব্যবসায়ী ও রাজনীতিক আছেন।

এই কংগ্রেস এই অর্থপাচার সম্পর্কে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি করেছে। একই সাথে এ ধরনের পাচার বন্ধ করার জন্য নতুনভাবে কঠোর আইন প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছে এই পাচারকৃত অর্থ ফেরত এনে তা উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির দাবি জানাচ্ছে।

৮. ভোটাধিকার ও নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার সম্পর্কে

মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সংবিধানে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটাধিকার ও এর মধ্য দিয়ে নির্বাচিতদের শাসন করার কথা থাকলেও আজ জনগণের ভোটাধিকার লুণ্ঠিত হয়েছে।

এই ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে নতুন মাত্রায় লড়াই সংগ্রাম গড়ে তোলা জরুরি কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালে সারাদেশের সব প্রান্ত থেকে ২২ দিনের পথ যাত্রা শেষে ঢাকায় সমবেত হয়েছিল। ‘আমার ভোট আমি দেব যাকে খুশি তাকে দেব’-এই দাবিতে সারাদেশে মানুষকে উদ্দীপ্ত করা হয়েছিল। ওই বছর গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরশাসকদের পরাজয়ের পর মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছিল।

এই ধারা রক্ষা করা যায়নি। বরং ভোটাধিকার হরণের নতুন নতুন কারসাজি সংগঠিত করা হচ্ছে। এই অবস্থায় জনগণের ভোট দেওয়া ও ভোটে দাঁড়ানোর সমঅধিকার নিশ্চিত করতে নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের জন্য এ কংগ্রেস জোর দাবি জানাচ্ছে।

এজন্য জাতীয় সংসদে সংখ্যানুপাতিক ব্যবস্থা প্রবর্তনসহ নির্বাচনকে টাকার খেলা পেশীশক্তি প্রশাসনিক কারসাজি সাম্প্রদায়িকতা আঞ্চলিকতার ব্যবস্থা মুক্ত করতে হবে।

১।    গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠন ও নির্বাচনকালীন তদারকি সরকার নিশ্চিত করতে হবে।

২।    নির্বাচনের পুরো ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে।

৩।   স্থানীয় সরকারের কার্যক্রম নিশ্চিত করতে সংসদসহ অন্যান্যদের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।

৪।    সাংসদরা সংবিধান অনুযায়ী যাতে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে তা নিশ্চিত করতে হবে।

৫।   সর্বত্র আমলাসহ প্রশাসনিক দৌরাত্ম বন্ধ করতে হবে।

৬।   সর্বত্র স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

৭।    সিপিবির এই কংগ্রেস দ্রুত ভোটাধিকার নিশ্চিত ও নির্বাচন ব্যবস্থা বদলে গণআন্দোন গড়ে তুলতে দেশব্যাপী সংগ্রাম গড়ে তুলতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে।

[সংক্ষেপিত, পরবর্তীতে আরও প্রস্তাব প্রকাশিত হবে]

Leave a Reply

Your email address will not be published.