সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংহতি দিবস

আবহমানকাল থেকে ১ জানুয়ারি নতুন বছরের বারতা ঘোষণা করলেও বিগত চার দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে তা ভিন্ন এক চেতনার বার্তা বহন করে আসছে। কেননা ১ জানুয়ারি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংহতি দিবস। ১৯৭৩ সালের এই দিনে ভিয়েতনামে মুক্তিকামী মানুষের ওপর চলমান মার্কিন বোমা হামলা এবং আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে ভিয়েতনাম সংহতি দিবসে শহীদ হন ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মতিউল ইসলাম এবং মির্জা কাদেরুল ইসলাম। শহীদ মতিউল ইসলাম ও মির্জা কাদেরুল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের সাহসী সৈনিক। ভিয়েতনামে মার্কিন সেনাদের বর্বরতার প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিঃশেষে প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। দূরপ্রাচ্যের ভিয়েতনামিরা যখন নাপাম বোমায় ক্ষত-বিক্ষত, হাজার মাইল দূরে থেকেও সে ক্ষতের বেদনা বুকে ধারণ করে, প্রতিবাদে শামিল হওয়ার মন্ত্র বৃথা হতে দেননি এ দুই মহানায়ক। লাঞ্ছনা, বঞ্চনা, অন্যায় আর শোষণ দলে মাথা উঁচু করে মৃত্যুই যে নবজীবনের গান রচনা করে তা তারা প্রমাণ করেছিলেন। তাদের সে আত্মত্যাগ এখনো প্রেরণা যোগাচ্ছে লড়াইয়ের।

১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি ভিয়েতনামের জনগণের বীরোচিত সংগ্রামে সংহতি প্রকাশের লক্ষ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন আর ডাকসু’র যৌথ উদ্যোগে ‘ভিয়েতনাম সংহতি দিবস’ পালনের ডাক দেয়। ডাকসু’র তৎকালীন ভিপি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মাহবুব জামান প্রমুখের নেতৃত্বে সেদিন এক বিশাল মিছিল বের হয়ে মতিঝিলের ‘আদমনি কোর্ট’ ভবনে অবস্থিত দূতাবাস অভিমুখে এগিয়ে যায়। মিছিলটি ঢাকা প্রেসক্লাবের বিপরীতে তোপখানা রোডে অবস্থিত মার্কিন তথ্য কেন্দ্রের (ইউসিস) সামনে আসতেই পুলিশ মিছিলে গুলি চালায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার মতিউল ইসলাম ও ঢাকা কলেজের ছাত্র টাঙ্গাইলের সন্তান মির্জা কাদেরুল ইসলাম গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদের মৃত্যু বরণ করেন। মতিউলের বয়স তখন ২১ বছর, কাদেরুলের ১৭। জহুরুল হক হলের ১৪৮ নং কক্ষের আবাসিক ছাত্র মতিউল তখন ছাত্র ইউনিয়ন হল শাখার প্রচার সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন।

পরবর্তীতে গুলিবিদ্ধ হবার স্থানে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংহতি স্তম্ভ নির্মাণ করা হয় এবং প্রতিবছর ওই দিনটি ‘সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন শুরু হয়। পরবর্তীকালে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে নিজ দেশে যুদ্ধে পরাজিত করে স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক ভিয়েতনাম প্রতিষ্ঠিত হবার কয়েক বছর পর শহীদ মতিউল-কাদেরুলকে ভিয়েতনামে তাদের জাতীয় বীরের মর্যাদা দেয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে বর্তমানে নানা কারণে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেছে। যদিও পেরিয়ে গেছে ৪৭ বছর। সাম্রাজ্যবাদের হিংস্রতা আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। দেশে দেশে যুদ্ধ বাধিয়ে বাজার, প্রাকৃতিক সম্পদ লুটে নেয়ার আস্ফালনে মত্ত তারা। সাম্রাজ্যের লাভের নিক্তিতে মানুষ আর প্রকৃতিকে প্রতিনিয়ত করে তুলছে বিপন্ন।

সম্পদলোভী শকুনের হিংস্র দৃষ্টি থেকে একচুলও নিরাপদ নয় বাংলাদেশ। আমাদের দেশের বন্দর, তেল, গ্যাস, কয়লা আর প্রাকৃতিক সম্পদ দখলে মরিয়া তারা। সামরিক হুমকির পাশাপাশি তাঁবেদার ক্ষমতা কাঠামো আর মুক্তবাজার অর্থনীতির মারপ্যাঁচে একটু একটু করে গিলে নিতে চাইছে আমাদের স্বদেশকে। আমাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, সার্বভৌমত্ব, মনোজগত সবই করায়ত্ব করতে চায় আজকের সাম্রাজ্যবাদ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধেরও তীব্র বিরোধিতা করেছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। কিন্তু বাংলার মুক্তিকামী মেহনতি জনগণ তাদের রক্তচক্ষু উপড়ে ফেলে স্বাধীনতার লাল সূর্যকে ঠিকই ছিনিয়ে এনেছে।

আশার কথা, পুঁজিবাদের ব্যর্থতা অন্যায়, আর শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে দিকে দিকে প্রতিবাদের দামামা বাজছে। শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি মানুষের দেয়ালে ঠেকা পিঠ ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। ভোগবাদের ঠুলি উপড়ে ফেলে দেশে দেশে তরুণ-যুবক- শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনে হচ্ছে। সেদিন আসলেই আর দূরে নয়, যেদিন পৃথিবীর প্রতি ইঞ্চি ভূমি থেকে উচ্ছেদ হবে সাম্রাজ্যবাদ, মানুষ মুক্তি পাবে এ ঘৃণ্য অপশক্তির হাত থেকে। অন্যায়-শোষণ আর প্রতিরোধ-প্রতিশোধে নিশ্চিহ্ন হোক সাম্রাজ্যবাদ।