সাম্প্রদায়িকতায় স্বাধীনতা অধরা

আমরা এবছর স্বাধীনতার ৫০ বছরে পদার্পণ করছি। অথচ মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে শাসকগোষ্ঠী মৌলবাদী শক্তির সাথে আপসের পথ বেছে নিয়েছে। যে পথ বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনছে। এই মৌলবাদী শক্তি সরকারের ছত্রছায়ায় বেড়ে উঠছে। আর শাসকগোষ্ঠীর আশ্রয়-প্রশয়ে একের পর এক জঙ্গি-সন্ত্রাসী কায়দায় হামলা করছে। শুধুমাত্র ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার হেফাজতকে তোষামদ করে তাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী রাজনীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার হিন্দু অধ্যুষিত নোয়াগাঁও গ্রামে হামলা চালিয়ে ৬০-৮০টি বাড়িঘর ভাঙচুর ও আসবাবপত্র তছনছ করা হয়। এই হামলার অংশগ্রহণ করে হেফাজতে ইসলামীর অনুসারীরা। হেফাজতের স্থানীয় নেতাকর্মীরা গ্রামবাসীদের উত্তেজিত করে লাঠি, বল্লম, রামদা, কিরিচসহ নানা ধরনের দেশীয় অস্ত্র সজ্জিত হয়ে হাজার হাজার হামলাকারীদের নিয়ে নোয়াগাঁও গ্রামে আক্রমণ করে হামলা ও লুটপাট চালায়। একাধিক পারিবারিক মন্দির ভাঙচুর করে, কষ্টিপাথরের মূর্তি নিয়ে যায়। হামলাকারীরা প্রতিটি ঘর থেকে টাকা-পয়সা, স্বর্ণালংকার ও মূল্যবান জিনিস লুট করে নিয়ে যায়।

হাজারো মানুষের আক্রমণে গ্রাম ছেড়ে আত্মগোপনে যায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজন। এ ঘটনায় শাল্লা থানায় দুটি মামলা হয়েছে, যার একটি দায়ের করেছে পুলিশ। সেখানে ‘অজ্ঞাতপরিচয়’ দেড় হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। অন্য মামলাটি করেছেন হবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান বিবেকানন্দ মজুমদার বকুল। সেখানে ৮০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

শাল্লায় যে ন্যাক্কারজনক বর্বর সাম্প্রদায়িক হামলা চালানো হয়েছে, তা ঠেকাতে প্রশাসনের নীরব ভূমিকায় দেশবাসী ক্ষুব্ধ। ক্ষমতায় টিকে থাকতে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে তোষণের যে নীতি বর্তমান সরকার নিয়েছে, তারই ফলাফলে এই চিহ্নিত সাম্প্রদায়িক শক্তি বেপরোয়া হয়ে গিয়েছে। সাম্প্রদায়িক শক্তির পরামর্শে পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন, বিভিন্ন উসকানিমূলক বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেও নিশ্চুপ থাকা, একের পর এক সাম্প্রদায়িক হামলার বিচার না করা ইত্যাদি এই অপশক্তির উত্থানে মদদ যুগিয়েছে।

অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে দেশ স্বাধীন করলেও স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তির আগ মুহূর্তে হিন্দু ধর্মালম্বীদের গ্রামে আক্রমণ প্রমাণ করে গত পঞ্চাশ বছরে শাসকশ্রেণি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র তৈরি করা থেকে অনেক পিছিয়ে আছে।

ক্ষমতাসীন শ্রেণির একদল সম্প্রদায়িক জামাতকে আরেকদল হেফাজতকে প্রশ্রয় দিয়ে দেশে সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতিকে আস্কারা দিচ্ছে। এর আগে কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ওপর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নাসিরনগরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলা, ধর্ম অবমাননার নামে লালমনিরহাটে মানুষ মারার বিচার না হওয়ায় মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তি একের পর এক অপকর্ম করার সুযোগ পাচ্ছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এ ধরনের হামলাকে প্রশয় দিচ্ছে। আগের ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হলে, দোষীরা শাস্তি পেলে জামাত-হেফাজতের মতো সরকারের মদদপুষ্টরা এ ধরনের বর্বরোচিত হামলা চালানোর সাহস কিছুতেই পেতো না।

দেশকে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ধারায় অগ্রসর করার লক্ষ্যে এই সাম্প্রদায়িক শক্তি ও তাদের তোষণকারীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিকল্প শক্তিকে শক্তিশালী করতে হবে। সাম্প্রদায়িক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারসমূহকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও নিরাপত্তা প্রদান করতে হবে। পাশাপাশি মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক লুটপাটকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও শাস্তির আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতেও স্বাধীনতা অধরাই থাকবে, সব স্বপ্ন হবে ধুলিস্যাৎ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.