সাম্প্রদায়িকতার বিষদাঁত ভেঙে দাও

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং আবহমান বাংলার অন্যতম সার্বজনীন সামাজিক উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজায় সারাদেশে এবার নতুন মাত্রার তাণ্ডব ও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস সংঘটিত হয়েছে। গত ১৩ অক্টোবর মহাঅষ্টমীর দিনে সকালবেলায় কুমিল্লার একটি মণ্ডপে হনুমান ঠাকুরের পায়ের ওপর থেকে পবিত্র কোরআন শরীফ উদ্ধারকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। অনেকটা সময় পার করে দিয়ে পুলিশ জনসমক্ষে যে তথ্য-প্রমাণ প্রকাশ করেছে তাতে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় যে, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে, পরিকল্পিতভাবে রাতের আঁধারে, মণ্ডপে সবার অগোচরে কোরআন শরীফ রেখে আসা হয়েছে। আর সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই সকালে হইচই সৃষ্টি করে মণ্ডপে হামলা করা হয়েছে এবং সেই সহিংসতা সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

কুমিল্লার ঘটনার জের ধরে সেদিনই চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে যে হামলা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে তাতে পুলিশ গুলি চালালে পাঁচজন নিহত হয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশ করেছে গণমাধ্যম। এই ঘটনার পরম্পরায় সারাদেশে অন্তত সাতজন নিহত হওয়ার সংবাদ গণমাধ্যমে এসেছে। সারাদেশে বিদ্যুৎবেগে ছড়িয়ে পড়া সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসে নোয়াখালী, চাঁদপুর, রংপুর, কুড়িগ্রাম, ফেনী, মৌলভীবাজার, চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, বান্দরবান, কক্সবাজার, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জে শতাধিক মন্দির ও মণ্ডপ এবং প্রায় দেড় শতাধিক হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের বসতবাড়ি, দোকানঘর, প্রতিষ্ঠানে হামলা, অগ্নিসংযোগ, ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর হলো এসব ঘটনার মধ্যদিয়ে গোটা দেশকে চরম ভীতি, আতঙ্ক, নিরাপত্তাহীনতা ও বিষাদে ঢেকে দেয়া হয়েছে। উৎসব রূপান্তরিত হয়েছে বিস্ময় বিমূঢ় আতঙ্কে।

গত এক সপ্তাহে দেশব্যাপী সংগঠিত এসব সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ও সহিংসতার ঘটনায় সরকারের চরম ব্যর্থতা স্পষ্ট। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাৎক্ষণিক কর্তব্য পালনে প্রশাসনের অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারাসহ ওয়াকিবহাল মহল ও বিশিষ্টজনেরা এসব হামলায় স্থানীয় সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের যুক্ত থাকার অভিযোগ তুলেছেন শুরু থেকেই।

দুর্গাপূজা শেষ হলেও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস থামেনি। গত ১৭ অক্টোবর রংপুরের পীরগঞ্জে এক তরুণ ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার পোস্ট দিয়েছে এমন প্রচার সৃষ্টি করে জেলেপল্লিতে অর্ধশতাধিক বাড়ি-ঘর আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। গরিব মানুষের সহায়-সম্বল লুট হয়েছে, ভস্মীভূত হয়েছে আশ্রয় ও সঞ্চয়। উন্মাদনার আগুনে জীবন্ত দগ্ধ হয়েছে অবলা প্রাণী। এসব ক্ষয়ক্ষতির অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ হয়তো সম্ভব, কিন্তু দেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী এবং ধর্ম ও বিশ্বাস নির্বিশেষে সংবেদনশীল সব মানুষের যে অপূরণীয় মানসিক ট্রমা হয়েছে, তার প্রতিকার হবে কী দিয়ে?

আমরা সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছিলাম। এ দেশের মানুষের সেই সংগ্রামের চেতনাকে ভাষায় প্রকাশ করতে গিয়ে ১৯৭১ সালে গোবিন্দ হালদারের লেখা ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি/ মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি’ গানটি আমরা যুদ্ধের ময়দানে প্রাণ উজাড় করে গাইতাম। স্বাধীন বাংলাদেশ ৫০ বছর অতিক্রম করেছে। মুক্তিযুদ্ধের এতগুলো বছর পর আজ আমাদের স্বপ্নে লালিত সেই ফুলের বাগান আগুনে পুড়ে অঙ্গার, লুটতরাজে তছনছ হওয়া ধ্বংসস্তুপ। একটি মুখের হাসির জন্য আমরা যে অস্ত্র ধারণ করেছিলাম, তার বদলে নিপীড়িতের আর্তনাদ আর বিষাদমাখা মুখে চোখের জলই আজ আমাদেরকে দেখতে হচ্ছে। সাম্প্রদায়িকতার এই উত্থান দেশের জন্য কেবল বেদনা ও গ্লানির বিষয়ই শুধু নয়, তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারার অবমাননাই কেবল নয়-তা দেশের অস্তিত্বের জন্যও মহাবিপদ বটে।

কেন বর্তমান সময়ে এসে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন আমরা হচ্ছি! একাত্তরের পরাজিত এবং পরে পুনর্বাসিত পাকিস্তানি ভাবধারার অনুচর সাম্প্রদায়িক শক্তিকে আমরা ’৭১-এ পরাভূত করতে সক্ষম হয়ে থাকলেও এই অশুভ শক্তিকে তখন আমরা পরিপূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করতে পারিনি। জামায়াত-শিবিরসহ এই প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী এখন আবার ফণা তুলেছে। আমাদের দেশের শাসকগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদেই আজকের এমন বিপজ্জনক অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। আমরা বার বার দাবি করেছি-স্বাধীনতাবিরোধী এই কুচক্রীদের কমান্ড সেন্টার, যোগাযোগের নেটওয়ার্ক এবং অর্থের উৎস ইত্যাদি সমূলে ধ্বংস করতে হবে। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা আমাদের কথা শুনেনি। বিএনপি রাজনৈতিকভাবে এই শক্তিকে পুনর্বাসিত করেছে। আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতার লোভে বিএনপির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে এসব অপশক্তিকে তার পক্ষে রাখার চেষ্টা করেছে, মদদ যুগিয়েছে। এখনো এই দুই দল একই নীতি অনুসরণ করছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, শাসকদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও লালন-পালনের মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিপদ কেবল ধর্মান্ধ প্রতিক্রিয়াশীল ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসী ক্যাডারবাহিনী রূপেই বিরাজ করছে না। সাম্প্রদায়িকতা দিন দিন দেশের ‘সামাজিক মনস্তত্ত্বে’ আসন গেড়ে বসছে। এর দায়-দায়িত্ব শাসকদেরই নিতে হবে। বর্তমান সরকার হেফাজতকে খুশি করতে গিয়ে পাঠ্যপুস্তক ও সিলেবাসকে সাম্প্রদায়িক ধারায় পরিবর্তন করেছে। প্রগতিশীল বিভিন্ন লেখক, এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ দেয়াসহ পাঠ্যপুস্তকের বিভিন্ন ছবি, শব্দ পরিবর্তনের জন্য হেফাজতের দেয়া প্রেসক্রিপশন অনুসারে পাঠ্যপুস্তক ও সিলেবাস নতুন করে মুদ্রিত হয়েছে। ‘কওমি জননী’ উপাধি পাওয়ার মূল্য হিসেবে আমাদের অনেক মূল্যবান অর্জনের অনেক কিছুই বিসর্জন দিতে হয়েছে। শাসকদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় আজ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, মানুষের মনস্তত্ত্বে সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্র ও প্রশাসনের লোকেরাও এ থেকে মুক্ত নয়। ফলে সাম্প্রদায়িক হামলা ও সহিংসতা মোকাবিলার কাজে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন যথার্থভাবে ভূমিকা রাখতে পারছে না। ‘সর্ষের মধ্যেই ভূত’ থাকলে ভূত তাড়াবে কে?

সাম্প্রদায়িকতার উত্থানের পেছনের আরও একটি কারণ হলো, জাতীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনে যেনতেন উপায়ে বিজয়ী হওয়ার উদ্দেশ্যে শক্তির সমীকরণ সপক্ষে রাখার উদ্দেশ্যে লুটেরা বুর্জোয়া শ্রেণির দলগুলো সাম্প্রদায়িকতার কার্ড নির্বিচারে খেলে চলেছে। রাজনৈতিক স্বার্থে সাম্প্রদায়িকতার ব্যবহারে কেউ কারো চেয়ে পিছিয়ে নেই। পাশাপাশি উপমহাদেশের অন্যান্য দেশেও সাম্প্রদায়িকতা বড় সমস্যা হিসেবে বিরাজ করছে। ভারতের একচেটিয়া বৃহৎ পুঁজির স্বার্থরক্ষাকরী ধর্মান্ধ হিন্দুত্ববাদী সরকার তার স্বার্থে সাম্প্রদায়িকতার নানান নোংরা খেলা খেলে থাকে। গোটা উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িকতার সংকট আজ একটি গুরুতর বিপদ ও ঝুঁকি হিসেবে বিরাজ করছে। এই বাস্তবতার মধ্যেই সাম্রাজ্যবাদী ও আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তিগুলো তাদের রণকৌশলগত স্বার্থে সাম্প্রদায়িকতা এবং মৌলবাদী শক্তিকে ব্যবহার করে চলেছে। বাংলাদেশ এসবের প্রভাবের বাইরে নয়।

আরেকটি গুরুতর বিষয় হলো, শাসকরা তাদের স্বার্থেই সমাজে সাম্প্রদায়িকতাকে টিকিয়ে রাখে। সাম্প্রদায়িকতার ইস্যু জিইয়ে রাখার মধ্য দিয়ে জনগণের ভাত-কাপড়-স্বাস্থ্য-চিকিৎসা ও অধিকারের সংগ্রামকে আড়াল করে রাখার জন্যও তারা এই কৌশল প্রয়োগ করে থাকে। সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে দিয়ে দ্রব্যমূল্যের চরম ঊর্ধ্বগতি এবং সীমাহীন লুটপাটের চাপে মানুষের দুর্বিষহ জীবন থেকে উৎসরিত প্রতিবাদ ও শ্রমিকের ন্যায্য মজুরির দাবিকে মাটি চাপা দেয়া যায়। সাম্প্রদায়িকতার আগুন জ্বেলে ভোটাধিকার এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি থেকে মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেয়া যায়। আর এ সকল কারণেই দেশের ও সমাজের চূড়ান্ত সর্বনাশ করে হলেও শাসকরা এমন আগুন নিয়ে খেলে চলেছে। ক্ষমতার এই খেলার সবচেয়ে অসহায় শিকারে পরিণত হচ্ছে সংখ্যালঘু মানুষ। বাড়িঘর, দোকানপাট, ঠাকুর, মন্দির, মণ্ডপের সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে তাদের আশা-ভরসা, আস্থা-বিশ্বাসও। সংখ্যালঘু মানুষই নয়, দেশের প্রায় সব মানুষের জীবনই এর ফলে বিপর্যস্ত হয়। এসব ঘটনায় মানুষে মানুষে সম্প্রীতি বিনষ্ট হয়ে দেশে বিপর্যয়ের বিপদ বেড়ে চলেছে।

আসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও সমাজতন্ত্র অভিমুখীন শোষণমুক্ত সমাজ নির্মাণের জন্য ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ উৎসর্গ করেছে। আজ শুধু বাংলাদেশ থেকেই নয় গোটা উপমহাদেশ থেকে সাম্প্রদায়িকতাকে নিশ্চিহ্ন করা এ অঞ্চলের মানুষের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক কর্তব্য। এই সংগ্রামে বিজয়ী হওয়ার জন্য জনগণের ভাত-কাপড়, রুটি-রুজি, স্বাস্থ্য-চিকিৎসা, ভোটাধিকার-গণতন্ত্রের সংগ্রাম এবং সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী লড়াই একইসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। অপরাপর এসব সংগ্রাম থেকে সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সংগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করলে সফলতা আসবে না। ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন এবং সাম্প্রদায়িক আক্রমণ প্রতিহত করেই আমাদের সমাজবিপ্লবের সংগ্রাম এগিয়ে নিতে হবে। গড়ে তুলতে হবে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি। মহান মুক্তিযুদ্ধের পথ ধরে দেশ পরিচালনা করতে হবে। এর মাধ্যমেই আমরা সাম্প্রদায়িকতার বিষদাঁত ভাঙব-এটাই হোক আমাদের অঙ্গিকার।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি। 

Leave a Reply

Your email address will not be published.