সময়ের সাহসী সন্তান শহীদ টিটো ও তাঁর স্বপ্ন

সৈয়দ নজরুল ইসলাম

দেশের ভাটি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার দিলালপুর ইউনিয়নের মোল্লাপাড়া গ্রামে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে জেলার একমাত্র শহীদ সৈয়দ আমিনুল হুদা টিটোর জন্ম। তিনি জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি ছিলেন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির একজন সক্রিয় কর্মী, সংগঠক এবং নেতা ছিলেন। তাঁর পিতা সৈয়দ সামছুল হুদা, মাতা রহিমা আক্তার খাতুন। সাত ভাই বোনের মধ্যে টিটো ছিলেন চতুর্থ। টিটো বাজিতপুরের সর্বস্তরের মানুষের কাছে খুবই প্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর মুখে সর্বদা হাসি খেলা করতো।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ বন্দুকের নলের ওপর ভর করে সামরিক এরশাদ অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে। এরশাদ আওয়ামী লীগ, বিএনপির সুবিধাভোগী, লোভী, ভ- রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নিয়ে এবং যুদ্ধাপরাধী দালালদের নিয়ে দল গঠন করলেন। তার ক্ষমতা দখলের পরই সারাদেশে তীব্র ছাত্র গণআন্দোলন গড়ে উঠে। কিশোরগঞ্জেও আমরা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তুলি। তখন আমি কিশোরগঞ্জ জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি, ঐ সময় জেলাব্যাপী হাজার হাজার ছাত্র/ছাত্রী বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের পতাকাতলে সমবেত হয়েছিল। তখন মনে হয়েছিল ‘বিপ্লব স্পন্দিত বুকে আমিই লেনিন’। ঐ সময় সারাদেশে স্লোগান উঠেছিল- ‘এক দফা এক দাবি এরশাদ তুই কবে যাবি’। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর স্বৈরাচার পতনের লাগাতার আন্দোলনের অংশ ছিল ‘ঢাকা অবরোধ’ কর্মসূচি। আমি তখন রাজবন্দি হিসেবে কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারে।

স্বৈরাচার এরশাদ ঢাকা অবরোধ কর্মসূচিকে বানচাল করার জন্য ঢাকামুখী সকল যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দিলে টিটো গ্রামের বাড়ি বাজিতপুর থেকে বাইসাইকেলে চড়ে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। ঢাকায় তাঁর সাথে রাজপথে ছিলেন নিকলীর ছাত্র ইউনিয়ন নেতা রিয়াজুল হক আয়াজ, ক্ষেতমজুর নেতা রবেন্দ্র বর্মনসহ অনেকেই। টিটোর পাশেই ছিলেন আরেক যোদ্ধা নূর হোসেন। তার বুকে পিঠে স্লোগান লেখা ছিল- ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক- স্বৈরাচার নিপাত যাক’।

সেদিন ঢাকার রাজপথে প্রকাশ্যে দিনের আলোর অবরোধে অংশগ্রহণকারীদের ওপর স্বাধীন বাংলাদেশের সেনাদের বর্বর হামলায় টিটো জীবন দেন। পাশে নূর হোসেন গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়ে রাজপথে। যারা টিটো, নূর হোসেনের মত অসংখ্য নেতা কর্মীদের হত্যা করেছে, নির্যাতন করেছে পরবর্তীতে সেই সেনারা তাদের বীরত্বের (!) জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন। কারণ ৭১ সালে যারা গণহত্যা চালিয়েছিল, নারী ধর্ষণ করেছিল, বাড়ি ঘরে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট করেছিল ৭৫ পরবর্তী তাদের পুরস্কৃত করে এমপি-মন্ত্রী এমন কি রাষ্ট্রপতি বানানো হয়েছিল।

দেশে বারবার ক্ষমতার বদল হয়েছে। শাষকগোষ্ঠীর বদল হয়েছে, কিন্তু নীতির বদল হয়নি। তারা ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ, গ্যাস দিতে না পারলেও জাতীয় সম্পদ তেল, গ্যাস বাইরে পাচার করতে বদ্ধপরিকর। আমরা আমজনতা পাঁচ বছর পর পর জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিয়ে আমাদের পবিত্র দায়িত্ব পালন করে নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে থাকি।

এভাবে আমরা ঘুমিয়ে ছিলাম- ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭, দীর্ঘ ১৯০ বছর।

এভাবে আমরা ঘুমিয়ে ছিলাম- ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১, দীর্ঘ ২৪ বছর।

এভাবে আমরা ঘুমিয়ে ছিলাম- ১৯৭১ থেকে ১৯৯০, দীর্ঘ ১৯ বছর।

এভাবে আমরা ঘুমিয়ে আছি- ১৯৯০ থেকে ২০১৩, দীর্ঘ ২৩ বছর।

১৮৫৭ সালে মঙ্গলপাণ্ডে আমাদের ঘুম ভাঙাতে চেয়েছিলেন- পারেননি।  ঈশাখাঁ, ফকির মজনু শাহ, তিতুমীর, ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, বাঘা যতীন আমাদের ঘুম ভাঙাতে চেয়েছিলেন। আমরা জাগিনি।

৫২-তে সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার আমাদের ঘুম ভাঙালেও আমরা আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। শহীদেরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে মায়ের ভাষা বাংলাভাষাকে প্রতিষ্ঠা করেছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় এখনো সর্বস্তরে বাংলা চালু হয়নি।

৭১ সালে বাঙালিরা জেগে উঠেছিল। মুক্তিযোদ্ধারা দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যদিয়ে একসাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতার লাল সূর্যটা ছিনিয়ে এনেছিল, ৩০ লক্ষ মানুষকে জীবন দিতে হলো, ২ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত এবং প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে ভারতে আশ্রয় নিতে হয়েছিল।

এ যুদ্ধটা ছিল বিদেশি শাসকগোষ্ঠীর হাত থেকে বাঁচার যুদ্ধ, পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে স্বাধীনতার যুদ্ধ, শাসন, শোষণ, লুটপাট ও নির্যাতন থেকে মুক্তির যুদ্ধ।

এ যুদ্ধটা কোনো আদর্শিক যুদ্ধ ছিল না। কোনো স্বপ্নপূরণের যুদ্ধ ছিল না। যে স্বপ্ন দেখতো কমরেড টিটো, কমরেড তাজুল।

স্বাধীনতার যুদ্ধে ভারত ও রাশিয়া সরাসরি আমাদের সহযোগিতা করেছিল। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ (আমেরিকা) আমাদের বিরোধিতা করেছে। তারা যুদ্ধ জাহাজ সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিল বাংলাদেশকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য। তখন রাশিয়ার পাল্টা হুমকিতে আমেরিকা তার নৌবহর ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাজ হল পৃথিবীর দেশে দেশে যুদ্ধ বাঁধিয়ে রাখা, সম্পদ লুটে নেয়া এবং দুর্বল রাষ্ট্রগুলোতে তাদের তাবেদারি সরকার প্রতিষ্ঠা করা। রিগান, বুশ, ক্লিনটন, ওবামা তাদের একটাই নীতি যুদ্ধ, আর লুণ্ঠন। আমার যা দেখছি ইরাক, আফগানিস্তান ও লিবিয়ায়। বর্তমানে গ্লোবাইজেশনের নামে মুক্ত বাজার অর্থনীতির নামে সমগ্র মানব জাতির দুশমন আমেরিকা ও তাদের সহযোগী অন্যান্য দেশ ও কোম্পানি লুটপাট করে, দুর্নীতি করে, দখল করে, তথ্য আগ্রাসন চালিয়ে পৃথিবীব্যাপী ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে।

১৯৭১ এর যুদ্ধে আমেরিকা পিছু হটলেও ৭৫ এর জঘন্য হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তারা আবার ফিরে আসে। দেশ এখন স্বাধীন, আগের মত বন্যা, খরা, দুর্ভিক্ষ, মঙ্গা বার বার আঘাত হানে না। এখন বর্গীদের মত প্রতিদিন আমাদের ঘরে হানা দেয় বাজার সিন্ডিকেটের থাবা, ডাক্তার নামক কষাইয়ের থাবা, উকিল, পুলিশ (সবাই নয়) এনজিওসহ সরকারি/বেসরকারি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানের থাবা। তারা আমাদের সেবার নামে রক্ষার নামে এসব করছে। এ প্রসেঙ্গ ভারত উপমহাদেশের প্রখ্যাত গণসংগীত শিল্পী সদ্য প্রয়াত ভূপেন হাজারিকার গান স্মর্তব্য- ‘বর্গীরা আর দেয় না হানা নেইকো জমিদার, তবু কেন এদেশ জুড়ে নিত্য হাহাকার’।

এখন কোনো বিদেশি শাসক, শোষক নেই, বর্গীরা নেই, তবু কেন বাংলার চন্দ্র, সূর্য, আকাশকে চির দারিদ্র্যের ছায়া গ্রাস করেছে?

আমাদের ৯০% ঘর বেদনায় ভরা, আমরা বন্দি কয়েদির মত অসহায়। আমরা চলেছি এক অস্থির, অনিশ্চিত, অন্ধকার সময়ের হাত ধরে। আমরা প্রতিজন অভিভাবক নিজেদের নিয়ে, আমাদের প্রিয় সন্তানদের নিয়ে, আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে সারাক্ষণ আতংকের মধ্যে থাকি।

আমাদের শিক্ষা, চিকিৎসা, জান-মালের নিরাপত্তার কোনো গ্যারান্টি নেই। আজ সব কিছু বন্দি ১০% অভিজাত (!) মানুষের হাতে। এদের হাতে শিক্ষা, চিকিৎসা, বিচার ব্যবস্থা, এদের হাতে বিভিন্ন মিডিয়া, এদের হাতে (লুটপাটের) রাজনীতি। এরা কেউ কথা রাখে না। ৪২ বছর কাটল কেউ কথা রাখেনি।

এরা মিথ্যা বলে, প্রতারণা করে আমাদের ঘুম পাড়িয়ে রাখে। আমরা সাধারণ মানুষের লোভের নেশায়, কেউ মাদকের নেশায়, কেউ সতীত্ব টিকিয়ে রাখার আত্মতৃপ্তিতে ঘুমিয়ে আছি।

যার ফলে আজকের এই অচলাবস্থা, অরাজকতা। লুটেরা শ্রেণি চায় এই ভাবেই চলুক দেশ, এতে তাদের সুবিধা কেউ প্রতিবাদ করে না। সবাই দ্রুত যেনতেন প্রকারে বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন দেখে। আজ সকল বোধ, বিবেক, বিশ্বাস পথহারা। সমাজে ভালো মানুষ, ভালোনীতি আজ পদধলিত।

এসবের হাত থেকে বাঁচতে হলে আমাদের বিবেককে জাগ্রত করতে হবে, সমাজবদলের শিক্ষা নিয়ে জেগে উঠতে হবে। জোট, মহাজোটের বাইরে বাম বিকল্প গড়ে তুলতে হবে।

সমাজ বদলের যে শিক্ষা টিটো গ্রহণ করেছিল- সে শিক্ষায় আজ যুব সমাজকে, নতুন প্রজন্মকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। কারণ বাঁচার পথ একটাই। সে পথে আমরা চলি অবিরাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published.