”সত্যিই বহুদিন ধরে আজিম ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয় নি”

জানি না, ২৫ মার্চের রাতে কেউ তাঁকে মনে করে কি না। আসলে ক’জন তাঁকে মনে রেখেছে, তাই তো জানি না। তার চেয়েও বড় কথা, ক’জনই বা জানেন শহীদ লুৎফুল আজিমের কথা, যিনি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের সেই কালো রাতে শহীদ হয়েছিলেন। সে রাতে সলিমুল্লাহ হলের ১৪৩ কক্ষে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী তাঁকে হত্যা করেছিল।

এখনও মনে আছে, আজিম ভাইয়ের সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছিল ১৯৭১ এর ১৩ই মার্চের সকালে। মনে আছে এ কারনে যে, সেদিন সকালেই তাজুল ভাই (সলিমুল্লাহ হলের ৩৩ নম্বর কক্ষের আমার সহকক্ষবাসী প্রয়াত তাজুল ইসলাম) আমাকে বকছিলেন এই বলে যে, ‘আপনি এখনো ঢাকায় বসে আছেন কি করতে? বরিশাল যাচ্ছেন না কেনো এখনো? জাহাজ-লঞ্চ যে কোনদিন বন্ধ হয়ে যাবে। ভাবেন এ সব কিছু?’ বাপ রে, সেকি বকা! ধমকের লাভাস্রোতে ভাসিয়ে দিচ্ছিলেন তিনি আমাকে।

বকা-ঝকার দায়িত্ব শেষ করে হৃষ্টচিত্তে বেরিয়ে গেলেন তাজুল ভাই। আমিও বেরুবার জন্যে কাপড়-জামা পড়ে ঘরের তালা লাগাতে লাগাতেই দেখলাম, হলের দু’অংশের বাগান পেরিয়ে আমাদের পূর্ব অংশের টানা বারান্দায় উঠে আসছেন আজিম ভাই। গনিতের ছাত্র ছিলেন তিনি। আমাদের এ দিকটায় তিনি আসছিলেন সম্ভবত তাঁর সতীর্থ মতিন ভাইয়ের সঙ্গে বাহাস করতে। অনবরত রাজনৈতিক তর্ক করতেন দু’জন। আজিম ভাই ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়াপন্হী) ছিলেন। মতিন ভাইয়ের রাজনৈতিক পক্ষপাতের কথা আজ আর মনে নেই। ভুলে গেছি।

কিন্তু এটা কখনো ভুলি নি যে হলের পূর্ব অংশের ৩৩ নম্বর কক্ষে স্হায়ীভাবে উঠে আসার আগে পশ্চিম অংশের ১৪৩ নম্বর কক্ষে দিন পনেরোর জন্যে অস্হায়ীভাবে আজিম ভাইয়ের সহকক্ষবাসী ছিলাম আমি। মনে আছে একমাথা কালো চুলে লম্বা মুখে মোটা কাচের চশমার পেছনে ভীষন একজোড়া উজ্জ্বল চোখ ছিল আজিম ভাইয়ের। কিন্তু মৃদুভাষী ছিলেন তিনি। নরম গলায় কথা বলতেন – তখন তাঁর চকচকে চোখেও একটি নরম ছায়া নামতো। হলের বহু কিছু তিনিই আমাকে চিনিয়েছিলেন।

ঐ পনের দিনে অনেক গল্প করেছিলেন তিনি নিজের সম্পর্কে। বাবা মায়ের বিয়ের ১৪ বছর পর মাত্র ৭ মাসে জন্ম নেয়া সন্তান ছিলেন আজিম ভাই। সেই সময় তূলোর মাঝে রেখে বড় করা হয়েছিল তাঁকে।ভারী স্নেহময় ছিলেন তিনি। খাবার ঘরে আমি একটু দেরী করে যেতে চাইতাম। আমার জন্যে তিনি প্রতিদিন অপেক্ষা করতেন।

১৯৭০ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পরে ত্রাণকাজ করার জন্যে আজিম ভাই চলে গেছিলেন দক্ষিণাঞ্চলে – চর ফ্যাশন এলাকায়। একমাস ছিলেন তিনি সেখানে। জলের মধ্যে কাজ করতে করতে তাঁর দু’পা সাদা হয়ে গিয়েছিল তাঁর। ‘পরোপকার করা আমার মজ্জাগত’, হাসতে হাসতে বলেছিলেন তিনি একদিন আমাকে।

১৯৭১ সালের ১৩ই মার্চ ঐ দিন বারান্দা দিয়ে উঠে আসতে আসতে স্মিতহাস্যে আমাকে বলেছিলেন তিনি, ‘কতদিন আপনার সঙ্গে দেখা হয় না’। তারপর বাঁয়ে মোড় নিয়ে মতিন ভাইয়ের কক্ষের দিকে চলে গেলন। অপসৃয়মান তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অনেকটা অন্যমনস্কভাবে ভাবলাম, সত্যিই বহুদিন ধরে আজিম ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয় নি।

আজিম ভাইয়ের সহপাঠী বন্ধু খালেদা আক্তারের কাছে শোনা, ১৯৭১ এর ২২ শে মার্চ আজিম ভাই চার পাতার একটি চিঠি লিখেছিলেন, যার পুরোটাই ছিল দেশের স্বাধীনতায় আমাদের করনীয় দিকনির্দেশনা। খালেদা আপারা গনিত বিভাগের ১৯৭২ এর একুশে সঙ্কলনে চিঠিটা ছাপিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন।

১৯৭১ সালের ১৩ মার্চের মাত্র ১২ দিন পরেই ২৫ শে মার্চের কাল রাত্রিতে সলিমুল্লাহ হলে তাঁর কক্ষেই গুলি করে আর বেয়োনেট খুঁচিয়ে পাকিস্তানী বর্বরেরা হত্যা করে শহীদ লুৎফুল আজিম কে। শুনেছি ২৮ শে মার্চ আমাদের বন্ধু নিজাম (শহীদ নিজামুদ্দীন আজাদ) ঐ ১৪৩ নম্বর কক্ষে গিয়েছিলে। না, নিজামকেও তো জিজ্ঞেস করতে পারবো না। সে ও তো মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছে ১৯৭১ এর নভেম্বরে।

মাঝে মাঝে মনে হয়, আহা, সেদিন কেন দু’দন্ড দাঁড়িয়ে আজিম ভাইয়ের সঙ্গে গল্প করি নি? কেন প্রশ্ন করি নি, কবে তিনি ঢাকা ছাড়বেন? কেন জানতে চাই নি কি নিয়ে আজ তিনি বাক্-বিতন্ডা করবেন মতিন ভাইয়ের সঙ্গে? কিন্তু আজ এ সব ভেবে কি আর হবে? ‘কেঁদেও তো আজ পাবো না তাঁকে অজস্র বর্ষার জলাধারে!’

ছবিসূত্র: শহীদ লুৎফুল আজিমের ছবিটি তাঁর সহপাঠী খালেদা আখতারের সৌজন্যে প্রাপ্ত। ১৯৬৯ এ কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে তোলা।

লেখক: সেলিম জাহান, সাবেক অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।