শ্রেণি ও শ্রেণি সংগ্রাম, লেনিনের দৃষ্টিতে

সাজেদুল হক রুবেল 

একশত বায়ান্ন বছর পূর্বে ২২ এপ্রিল জন্ম নিয়েছিলেন ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন। উলিয়ানভ যার আসল নাম ছিলো। কিন্তু শুধুমাত্র রাশিয়ার শ্রমজীবী মানুষ নয়, সারা দুনিয়ায় তিনি খ্যাত লেনিন নামেই। ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লব সমগ্র মানবজাতির ইতিহাসের যুগান্তকারী মাইলফলকে রূপান্তরিত হয়েছে, যা রাশিয়াকে উল্টে দিয়েছে, আবার দুনিয়াকে বা যুগকেও পাল্টে দিয়েছে। কার্ল মার্ক্স বলেছিলে- এতদিন দার্শনিকেরা দুনিয়াকে শুধু ব্যাখ্যা করেছেন, এখন দরকার দুনিয়াকে পাল্টানো। লেনিন বলেছিলেন, আমাদের বিপ্লবীদের একটা সংগঠন দাও, রাশিয়াকে উল্টিয়ে দেবো।

সেই দুনিয়াকে পাল্টানোর ও রাশিয়াকে উল্টানো, ১৯১৭ এর বলশেভিক বিপ্লব। যার বৈপ্লবিক তত্ত্ব কমরেড লেনিনের এপ্রিল থিসিসের দুঃসাহসী উচ্চারণ ছিল। লেনিনের বৈপ্লবিক নেতৃত্বে পুঁজিবাদী বিশ্বে সে সময়ের অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া এক দেশ রাশিয়ায় শ্রমিক শ্রেণি রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে মেহনতি মানুষের রাজ কায়েম করে, ধাপে ধাপে আঁকাবাকা পথে সমাজতন্ত্র বিনির্মাণে অগ্রসর হয়। শতবর্ষ পেরিয়ে আজও লেনিন পৃথিবীর শ্রমিক শ্রেণি তথা সমাজ বদলের স্বপ্নকে ধারণ করা, লালন করা, চর্চা করা, প্রগতিশীল মানুষদের কাছে প্রাসঙ্গিক। আজ লেনিনের জন্মদিনে বুর্জোয়া সমাজে বিপ্লবের অগ্রসর বাহিনী শ্রমিক শ্রেণি এবং তাঁর শ্রেণি সংগ্রাম সম্পর্কিত লেনিনের দৃষ্টিভঙ্গী জানার সামান্য প্রয়াস আমরা এই অতি ছোট প্রবন্ধে সংক্ষেপে গ্রহণ করেছি। যদিও একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা উত্থাপনের মধ্য দিয়ে এটা সম্পূর্ণ করা দুঃসাধ্য। হয়তো শুধুমাত্র একটা রূপরেখাই দেয়া যায়। পুরো বিষয়টি যথার্থ উপলব্ধির জন্য দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে আরো পরিসরে আরো আলোচনা, প্রতি আলোচনা, মত-দ্বিমত-ঐক্যমতের প্রয়োজন হবে। লেনিনের দৃষ্টিভঙ্গী আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেড্রিক এঙ্গেলস্ এর এই সম্পর্কিত আলোচনাও প্রাসঙ্গিক। তথাকথিত তৃতীয় বিশে^ নানা মাত্রার ও ধরনের শ্রেণি সংগ্রামের রূপগুলি নিয়েও পর্যালোচনা প্রয়োজন।

মার্ক্সের ঐতিহাসিক বস্তুবাদী দর্শনে শ্রেণি ও শ্রেণি সংগ্রামের গুরুত্ব অপরিসীম। মূলত এই প্রত্যয়টিকে ঘিরে তার সমস্ত আর্থসামাজিক চিন্তা চেতনা আবর্তিত হয়েছে। তিনি বলেছেন ‘সমগ্র মানব সভ্যতার ইতিহাস হলো শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস’। (অবশ্য টীকা ছিল- ‘শ্রেণিহীন সমাজের জন্য তা সত্য নয়।’)

মার্ক্সের পূর্বেও বুর্জোয়া তাত্ত্বিকেরা শ্রেণি সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করেছেন। এদের মধ্যে এডাম স্মিথ ও রিকার্ডোর নাম উল্লেখযোগ্য। তবে কার্ল মার্ক্স শ্রেণি সম্পর্কে নতুন কতগুলো যুক্তির কথা বলেছেন যেমন –

# উৎপাদন শক্তির বিকাশের বিশেষ ঐতিহাসিক স্তরের সঙ্গে শ্রেণির অস্তিত্ব ও শ্রেণির বিশেষ রূপটি জড়িত।

# বুর্জোয়া সমাজ থেকে সাম্যবাদী সমাজে উত্তরণের সময় সাময়িকভাবে সর্বহারা একনায়কতন্ত্র সৃষ্টি হয় শ্রেণি সংগ্রামের নিজের প্রয়োজনে। সমাজতন্ত্রের মধ্যেই সাম্যবাদে উত্তরণের জন্য তাই শ্রেণিও থাকে, শ্রেণিসংগ্রামও থাকে। সাম্যবাদী সমাজে শ্রেণিও থাকবে না এবং শ্রেণিসংগ্রামও থাকবে না। সেটি হবে ভবিষ্যতে উৎপাদন শক্তির চরম বিকাশের ফলে সৃষ্ট এক মুক্ত মানুষের মুক্ত মানবিক সমাজ।

# শ্রমিক শ্রেণি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে শ্রমিক শ্রেণির একনায়কতন্ত্রকে নানা রূপে ব্যবহার করে দীর্ঘ সময় ধরে ক্রমে ক্রমে শ্রেণিভেদ ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে বিলোপ করে শ্রেণিহীন সমাজের গোড়া পত্তন করে। এই উত্তরণ পর্বে মাঝপথে তাই দুর্ঘটনা ও পশ্চাদাপসারণ বা এমনকি প্রতিবিপ্লবও সম্ভব। তাতে হতাশ না হয়ে আমাদের খুঁজে দেখতে হবে কি কারণে তা হয়েছিল এবং ভবিষ্যতে আমরা নিশ্চয় সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করবো না।

এবার সরাসরি লেনিনের বক্তব্যের দিকে মনোযোগ দেয়া যাক –

‘শ্রেণি’ প্রত্যয়- মার্ক্সীয় দর্শনে শ্রেণি একটি মুখ্য উপাদান হলেও কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেড্রিক এঙ্গেলস্ কোথাও তার সুনির্দিষ্ট সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করে নাই। পুঁজি গ্রন্থের তৃতীয় ভল্যুমের শেষ অধ্যায়ের শিরোনামটি হচ্ছে ‘শ্রেণিসমূহ’। দুর্ভাগ্যবশতঃ এই অধ্যায়টি অসম্পূর্ণ- পুঁজি মহাগ্রন্থ তাই শেষ হয়েছে একটি ট্র্যাজিক বাক্য দিয়ে, [Here the Manuscripts breaks off——] । শ্রেণি সম্পর্কে মার্ক্সবাদী ধারণার একটি অপেক্ষাকৃত সুস্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা পাওয়া যায় লেনিনের সংজ্ঞার মাধ্যমে। তিনি চারটি মাত্রার মাধ্যমে শ্রেণি প্রত্যয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। লেনিনের ÔA Great BeginningÕ [Commuinist Subbolneks, June 1919, V-29, P=408-434], নিবন্ধে শ্রেণির যে সংজ্ঞা তা এ রকম-

“শ্রেণিসমূহ হলো জনগণের মধ্যে অবস্থিত বড় বড় গোষ্ঠী যারা পরস্পর থেকে পৃথক হয়েছে সামাজিক উৎপাদন পদ্ধতিতে ইতিহাস নির্ধারিত স্থান দখল করে, উৎপাদনের উপায়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক দিয়ে (অধিকাংশ ক্ষেত্রে আইনের মাধ্যমে তা নির্ধারিত এবং সূত্রবদ্ধ করা হয়ে থাকে।) শ্রমের সামাজিক সংগঠনে তাদের ভূমিকা দিয়ে এবং যে সামাজিক সম্পদ তারা ব্যবহার করে তাতে তাদের অংশের পরিমাণ এবং তা আহরণের ধরন দিয়ে।”

লেনিন কর্তৃক প্রদত্ত শ্রেণির এই সংজ্ঞার মধ্যে চারটি মাত্রা এবং শর্ত রয়েছে। যেমন:

১. সামাজিক উৎপাদন পদ্ধতিতে ইতিহাস নির্ধারিত স্থান।

২. উৎপাদন উপায় সমূহের সঙ্গে সম্পর্ক।

৩. শ্রমের সামাজিক সংগঠনে ভূমিকা।

৪. সামাজিক সম্পদে অংশের পরিমাণ ও তা আহরণের ধরন।

এখানে চারটি শর্তের মধ্যে ‘উৎপাদনের উপায় সমূহের সঙ্গে সম্পর্ক’ হলো প্রধান বা মূখ্য বিষয় যা উৎপাদন পদ্ধতির ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলায়। সমাজের শ্রেণি বিভাজন চিরন্তন কোনো ঘটনা ছিল না। আদিম সাম্যবাদী সমাজে কোনো শ্রেণির অস্তিত্ব ছিল না, শ্রেণি বিভাজন, দ্বন্দ্বও ছিলো না। সে সমাজে উৎপাদন অত্যন্ত নীচু মাত্রায় ছিলো। তা দিয়ে শুধু জীবন বাঁচানোর জন্য ক্ষুধা মেটানো সম্ভব ছিল। সম্পদ সঞ্চয় করা কোনো মতেই সম্ভব ছিল না। এক সময়ের সমাজে উৎপাদিকা শক্তি বিকশিত হওয়ায় উৎপাদন বেড়ে যাওয়াতে উদ্বৃত্ত উৎপাদনের সূচনা হয়। এভাবেই মানুষ উদ্বৃত্ত সম্পদ সঞ্চয় করা শুরু করে এবং উৎপাদনের উপায় সমূহ ব্যক্তিগত মালিকানাধীন করার ঘটনা ঘটতে শুরু করে। একদিকে ব্যক্তিগত সম্পত্তির সৃষ্টি হয়, অপরদিকে শ্রম বিভাজন ঘটতে থাকে। এভাবেই কালক্রমে আদিম সাম্যবাদী সমাজে সামাজিক মালিকানাধীন সম্পত্তির স্থলে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব ঘটে এবং মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক শ্রেণি বৈষম্য সৃষ্টি করে। উৎপাদনের উপায়ের মালিকানা হতে বঞ্চিত মানুষের দল, উৎপাদনের উপায়ের মালিকদের অধীনে কাজ করতে শুরু করে এবং এই প্রক্রিয়াতেই আদিম সাম্যবাদী সমাজ ভেঙ্গে দিয়ে শ্রেণি বিভক্ত সমাজের জন্ম দেয়। এ ছাড়াও এ সময়ে গোত্রে গোত্রে যুদ্ধ এবং পরাজিতদের দাস বানানোর মধ্য দিয়েই দাসভিত্তিক সমাজের উদ্ভব হয়। মানুষের সভ্যতার বিকাশের ইতিহাসে এরূপে পরস্পর বিরোধী শোষণ ও শোষিত শ্রেণির আবির্ভাব ঘটে। মানুষের মধ্যে শোষণ ও শোষিতের বিভাজনই তিক্ত সংগ্রামের উৎস এবং মানব ইতিহাসে শ্রেণি সংগ্রামের শুরু তখন থেকেই।

পরবর্তী প্রতিটি সমাজেই উৎপাদন প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিগুলোর সাথে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় জড়িত অ-মালিক শক্তিগুলোর একটি বিবাদ অনিবার্য হয়ে উঠে। আর এই বিভাদের মাধ্যমে সূত্রপাত ঘটে শ্রেণি দ্বন্দ্বের, শ্রেণি সংগ্রামের।

দাসভিত্তিক সমাজে দাস মালিক ও দাসের মধ্যে শ্রেণি সংগ্রাম।

সামন্তবাদী সমাজে ভূমি মালিক বা জমিদার বা সামন্তের সাথে ভূমি দাসের মধ্যে শ্রেণি সংগ্রাম।

পুঁজিবাদী সমাজে পুঁজিপতি ও শ্রমিকের মধ্যে শ্রেণি সংগ্রাম।

শুধুমাত্র পুঁজিবাদী সমাজ গজে উঠার ফলে আধুনিক শ্রমিক শ্রেণির আবির্ভাব ঘটেছে। শ্রমশক্তির বিনিময়ে যারা মজুরী নিয়ে জীবন চালায় তারাই শ্রমিক শ্রেণি, অন্যভাবে বললে যারা মূল্যের জন্ম দেয়, তারাই শ্রমিক। আর যারা ঐ মূল্য উদ্বৃত মূল্য থেকে একাংশ আত্মসাৎ করে তারাই পুঁজিপতি।

বর্তমানের পুঁজিবাদী সমাজে মৌলিক শ্রেণি (Basic Class) যেমন পুঁজিপতি ও শ্রমিক তেমনিই এই দুই শ্রেণির মাঝে নানা অমৌলিক শ্রেণির অস্তিত্ব আছে যেমন- মধ্যবিত্ত স্তরের মানুষরা যারা পুরো শ্রমিকও নন আবার পুরো বুর্জোয়া মালিকও নন।

শ্রেণি সংগ্রামের তিনটি রূপ শ্রেণিবিভক্ত সমাজগুলিতে দেখা যায়:

১. অর্থনীতিবাদী সংগ্রাম: অর্থনৈতিক উৎপাদনে বিভিন্ন শ্রেণির অংশ বা পরিমাণ নিয়ে দর কষাকষির সংগ্রাম।

২. রাজনৈতিক সংগ্রাম: শাসক শ্রেণি যে রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে টিকে থাকে সেই ক্ষমতা কেন্দ্র করে বিভিন্ন শ্রেণির লড়াই।

৩. মতাদার্শিক সংগ্রাম: বিভিন্ন শ্রেণির বিভিন্ন চিন্তা ও মতাদর্শ রয়েছে সেগুলির মধ্যে সংগ্রাম।

সমাজ বিকাশের নিয়মানুসারে পুঁজিবাদী উৎপাদন প্রণালীর জটিল শ্রমবিভাজনের কারণে বুর্জোয়া ও শ্রমিক শ্রেণির গঠন প্রকৃতি সমস্তর ভিত্তিক (Homogeneous) হয় না। বুর্জোয়া শ্রেণির মধ্যে তাই বিভিন্ন স্তর আছে যেমন- বৃহৎ বুর্জোয়া, একচেটিয়া বুর্জোয়া, লুটেরা বুর্জোয়া, ফ্যাসিস্ট বুর্জোয়া, ফিনান্সিয়াল বুর্জোয়া, পাতি বুর্জোয়া, মধ্য বুর্জোয়া, ক্ষুদে বুর্জোয়া, ইত্যাদি স্তরে বিভক্ত বুর্জোয়া। এদের মধ্যে স্বার্থ, নেতৃত্বের প্রশ্নে লড়াই সংগ্রাম যুদ্ধের মতো ঘটনা ঘটে। রক্তাক্ত খুনোখুনির ইতিহাসও ব্যাপক যা আজও ঘটে চলেছে। বুর্জোয়াদের মধ্যে যতই যুুদ্ধ বিগ্রহ থাকুক না কেন ‘যদি কখনো পুঁজিবাদী ব্যবস্থা উচ্ছেদের অবস্থার সৃষ্টি হয় তখন সকল স্তরের বুর্জোয়া শ্রেণি ও তাদের দলসমূহ একাট্টা হয়ে পুঁজিবাদ রক্ষার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। তখন তাদের কাছে গণতন্ত্র, মানবতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সবকিছুই তুচ্ছ। এখানে মনে রাখার বিষয়টি হলো বুর্জোয়া শ্রেণি নিয়ামক স্বার্থ নিহিত রয়েছে শ্রমিক শ্রেণি কর্তৃক সৃষ্ট উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাৎ করার মধ্যে।

পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিক শ্রেণিও অসমস্তর ভিত্তিক (Heterogeneous) হওয়ায় শ্রমিক শ্রেণিরও বহুস্তর এবং একাধিক পার্টির অস্তিত্ব রয়েছে। শ্রেণির কাঠামোর মধ্যেই শ্রমিকরাও বিভিন্ন বাহিনীতে বিভক্ত হয়ে থাকে। যেমন: পরিবহন শ্রমিক, কলকারখানার শ্রমিক, অফিস আদালতের কর্মচারী, কৃষি শ্রমিক, দোকান কর্মচারী, বিশাল বেকার বাহিনী ইত্যাদি। জাতীয়তা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, পেশা, ভূগোল, নানবিধ কারণে শ্রমিক শ্রেণির পরস্পরের মধ্যে পার্থক্য বা বৈচিত্র্য রয়েছে। সুতরাং শ্রমিক শ্রেণির গঠনও অসমস্তরভুক্ত (Heterogeneous)।

শ্রমিক শ্রেণি অসদৃশ হলেও তাদের নিয়ামক (Vital) স্বার্থ এক ও অভিন্ন। শ্রমিকের শ্রমে তৈরি হওয়া উদ্বৃত্ত মূল্য বুর্জোয়ারা আত্মসাৎ করে। উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাৎ না করলে বুর্জোয়া শ্রেণি বলে কোনো শ্রেণি বেঁচে থাকতে পারে না। এই উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাৎ এর অপর নাম শোষণ। আর পুঁজিবাদী সমাজ শোষণ ভিত্তিক সমাজ। শ্রমিক শ্রেণি যত স্তরেই বিভক্ত থাকুক কিংবা নিজেকে যতই স্বাধীন ভাবুক না কেন, বেঁচে থাকার জন্য তাকে শ্রম বিক্রি করতে হয় বুর্জোয়া শ্রেণির কাছে। এই পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিক শ্রেণি নিয়োগকারী মালিকের কাছে মজুরী দাসত্বে বন্দী হয়ে থাকে। এই মজুরী দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়াতেই নিহিত রয়েছে শ্রমিকের নিয়ামক স্বার্থ (Vital Interest)। পুঁজিবাদী সমাজের মূল দ্বন্দ্ব হলো শ্রম ও পুঁজির মধ্যে দ্বন্দ্ব, শ্রমিক শ্রেণি ও বুর্জোয়ার মধ্যে দ্বন্দ্ব। রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে বুর্জোয়া শ্রেণির উচ্ছেদ ও পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার অবসানই এই দ্বন্দ্বের নিরসন ঘটাবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এরপরও সমাজতন্ত্রে শ্রেণি থেকে যায় তবে সেই শ্রেণিবিরোধগুলি লেনিনের মতে ‘অবৈরিতামূলক’। সমাজতন্ত্রে শ্রমিক, কৃষক ও বুদ্ধিজীবী, সকলেই শ্রমজীবী তাই প্রশাসক বা ম্যানেজাররাও শ্রম করেই জীবিকা নির্বাহ করার কথা। কেউ কারো উদ্বৃত্তমূল্য আত্মসাৎ করতে পারেন না। সামাজিক মালিকানায় সমাজিক উদ্বৃত্ত সামাজিক কল্যাণে ব্যবহৃত হয়। শ্রেণিভেদ ও রাষ্ট্র ক্রমশ শুকিয়ে যাওয়ার কথাই লেনিন তার ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’ গ্রন্থে বলে গেছেন।

শ্রমিক শ্রেণির নিয়ামক স্বার্থ ও বিষয়গত অবস্থানই তাকে সংগঠিত হয়ে পার্টি গঠন করতে বাধ্য করেছে।

মানুষের উপর মানুষের শোষণের অবসান ঘটিয়ে মুক্ত মানবের মুক্ত সমাজ গঠন, অর্থাৎ সাম্যবাদ বা কমিউনিজম প্রতিষ্ঠাই শ্রমিক শ্রেণির ঐতিহাসিক মিশন। তবে এই উপলব্ধি শ্রমিক শ্রেণির ভেতর থেকে (From Within) আপনা আপনি আসে না। বেঁচে থাকার জন্য কাজ ও মজুরীর লড়াই (অর্থনীতিবাদী সংগ্রাম) শ্রমিক শ্রেণির ভেতর থেকে স্বতঃস্ফুর্তভাবে আসে। কিন্তু শোষণ মুক্তির লড়াই বা মুক্ত মানবের মুক্ত সমাজ গড়ার চেতনা তথা বৈজ্ঞানিক মতাদর্শ শ্রমিক শ্রেণির বাইরে থেকে (From Without) শিক্ষিতদেরই নিয়ে যেতে হয়।

শ্রমিক শ্রেণি যতক্ষণ তার চূড়ান্ত লক্ষ্য (শোষণ মুক্তি) সম্পর্কে সচেতনতা অর্জন না করতে পারে ততক্ষণ তার শক্তি সুপ্ত অবস্থায় (Class in itself) থেকে যায়।

শ্রমিক শ্রেণি যখন তার আদর্শ সম্বন্ধে সচেতন হয়ে রাজনৈতিক লড়াইয়ের জন্য সক্রিয় হয় তখন তাকে বিপ্লবী সামাজিক শক্তি (Class for itself) হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

কমিউনিস্ট পার্টির কর্তব্য হচ্ছে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক-ভাবাদর্শিক সকল ফ্রন্টে বহুমুখী শ্রেণিসংগ্রামের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক বিপ্লব, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও অবশেষে সাম্যবাদী বিপ্লব সম্পন্ন করা। এটাই কমিউনিস্ট ও কমিউনিস্ট পার্টির জন্য লেনিন দিবসের শিক্ষা।

লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.