শ্রমজীবীদের ওপর আক্রমণ প্রতিহত কর

আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন 

সারা পৃথিবীর মত বাংলাদেশেও করোনা অতিমারির থাবায় মানুষের জীবন জীবিকা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। অপরিকল্পিত লকডাউন, শাটডাউন দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা চলছে। করোনা পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে যে আন্তরিকতার সাথে মোকাবিলা করার প্রয়োজন ছিল তা সরকার ও শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

টিকা ব্যবস্থাপনায় সরকার পরিপূর্ণভাবে ব্যর্থ। শাসকদলের প্রধান ব্যবসায়ী নেতাকে অবৈধভাবে মুনাফার সুযোগ করে দিতে অনেক উৎস থাকার পরও কেবল ভারতের উপর নির্ভরশীলতা দেশে টিকা ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার প্রধান কারণ। দেশে টিকা উৎপাদনে উদ্যোগ গ্রহণে অনীহার পেছনে রয়েছে মুৎসুদ্দী বুর্জোয়াদের মুনাফার খেলা। ফলে হু-হু করে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। ধনিকগোষ্ঠীর সরকারের করোনা মোকাবিলার নীতির মধ্যে শ্রেণি বৈষম্য সুস্পষ্ট। তারা দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষানুযায়ি এখন পযর্ন্ত প্রতিটি ইউনিয়ন-উপজেলায় নমুনা সংগ্রহ কেন্দ্র খুলতে পারেনি। দেশের ১২৮টি পিসিআর ল্যাবের ৮৯টি ঢাকায় স্থাপিত হয়েছে। দেশের মাত্র ৩৭ জেলায় পিসিআর ল্যাব আছে। এর মধ্যে কয়েকটি অকার্যকর রয়েছে। সাধারণভাবে করোনা মোকাবিলায় সরকারের নীতিসৃষ্ট বৈষম্যের নিষ্ঠুর শিকার গ্রামের মানুষ। গ্রাম-শহরের সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র মানুষরা রয়ে গেছে করোনা চিকিৎসা সুবিধার বাইরে। টিকার সুবিধা ভোগ করছে শহরের বিশেষ করে বড় বড় সিটির অপেক্ষাকৃত সুবিধাভোগীরা। সর্বজনীন না করে ক্যাটাগরি নির্ধারণ করে দিয়ে টিকা প্রাপ্তির উপর কন্ট্রোল নিশ্চিত করা হয়েছে সমাজের অপেক্ষাকৃত সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের।

করোনাকালে লকডাউন, শাটডাউন ইত্যাদির মাধ্যমে ঘরে থাকার হুকুম হয়েছে। করোনা মোকাবিলা করতে হলে সঙ্গনিরোধ বা আইসোলেশন জরুরি। কিন্তু এটা কি কেবল একটা গোষ্ঠীর জন্য দরকার। যদি তা না হয় তবে কেন ঘোষিত, অঘোষিতভাবে সকল কারখানা খোলা রাখা হলো। গত বছর লকডাউনের সময় গার্মেন্ট শ্রমিকদের ছুটি দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হলো। বাস-রেল সব বন্ধ রেখে তাদের কাজে যোগ দেয়ার নির্দেশ দেয়া হলো। শত শত মাইল নানা বাহনে চড়ে, পায়ে হেঁটে হাজার হাজার টাকা খরচ করে কর্মস্থলে এসে শ্রমিকরা জানলো তাদের আবার বাড়ি চলে যেতে হবে। এবার লকডাউন নয় শাটডাউন। এবার সব বন্ধ। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বন্ধ। সচিবালয় বন্ধ। সব দপ্তর বন্ধ। শুধু খোলা কল কারখানা। শ্রমিকদের, বস্তিবাসীদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার মনগড়া পরিসংখ্যান ছড়িয়ে দিয়ে কারখানা খোলা রাখার ন্যায্যতা দেয়া হচ্ছে। প্রশ্ন একটাই- সচিবসাহেবের জীবনের মূল্য আছে, শ্রমিকের জীবনের কি কোনো মূল্য নাই?

এটা শ্রমজীবী মানুষের প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গীরই প্রতিফলন। লকডাইন-শাটডাউনে সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঘরে বসে থেকে মাস শেষে বেতন পাবেন, ঈদে বোনাস পাবেন, উৎসব বোনাস পাবেন। কিন্তু শ্রমিকরা কাজ না করলে মজুরি পাবেন না। আর যারা দিন আনে দিন খায়- রিকশাওয়ালা, মুটেমজুর, মাটিকাটার শ্রমিক, নানা ধরণের মিস্ত্রি যারা দৈনিক মজুরিতে কাজ করে তাদের দৈনন্দিন গ্রাসাচ্ছাদন হবে কোথা থেকে। লুটেরাদের এ সরকার মালিকের মুনাফার নিশ্চিয়তা দিলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন ও জীবিকার নিশ্চয়তা তার কাছে নাই। লকডাউন দিয়ে মানুষকে ঘরে থাকার নির্দেশ দিচ্ছে সরকার কিন্তু যাদের ঘর নাই তারা ফিরবে কোথায়? চলমান লকডাউন-শাটডাউনে মালিকরা-সরকারি কমকর্তারা ঘরে আছেন। নিরাপদে আছেন। কিন্তু যে শ্রমিকদের কারখানায় যেতে বাধ্য করা হচ্ছে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কেউ কি জেগে আছেন?

এই করোনার মধ্যে গত ৮ জুলাই ২০২১, বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে কর্ণঘোপে সজিব গ্রুপের হাসেম ফুড এন্ড বেভারেজ কারখানা তথা সেজান জুস কারখানায় এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়। এতে সরকারি ঘোষণামতে ৫২ জন শ্রমিক নিহত ও শতাধিক শ্রমিক আহত হয়েছে। বাম গণতান্ত্রিক জোট কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদের একটি প্রতিনিধি দল গত ১২ জুলাই সেজান জুস কারখানা সরেজমিন পরিদর্শন করে ১৪ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে জানান- কারখানার ৬ তলা ভবনটি বিল্ডিং কোড মেনে তৈরি করা হয়নি। ভবনটি বানানো হয়েছিল গোডাউন হিসেবে ব্যবহারের জন্য। ভবনের ৩৪ হাজার বর্গফুটের প্রতি ফ্লোরের গেট অগ্নিকাণ্ডের সময় তালা বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। কমপক্ষে ৪টি সিঁড়ি থাকার কথা থাকলেও মাত্র দুইটি সিঁড়ি ছিল এবং সিঁড়িতে বৈদ্যুতিক বাতির কোনো ব্যবস্থা ছিল না।

অগ্নিকাণ্ডের সময় একটি সিঁড়ির চিলেকোঠার প্রান্ত ছিল তালাবদ্ধ। যা সম্পূর্ণ বেআইনী। শ্রম বিধিমালা অনুসারে প্রতি ১০০০ বর্গ মিটারের ফ্লোরের জন্য প্রতি ফ্লোরে একই স্থানে ২০০ লিটার পানি ভর্তি পাত্র এবং ৪টি বিশেষভাবে চিহ্নিত খালি বালতি, হোজরিল, ফায়ার এক্সটিংগুইসার থাকার কথা। কেমিক্যাল, তেল জাতীয় দাহ্য পদার্থ থাকলে পানিতে তা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না বলে সেখানে কার্বন-ডাইঅক্সাইড ফোম থাকা আবশ্যক। সেজান কারখানায় কোনো ফোম ছিল না। বহুতল ভবনের নিচতলায় দড়ির জাল সংরক্ষণ করার বিধান থাকলেও তা ছিল না। কারখানা করতে গেলে সরকারের ২৩টি নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন লাগে এবং প্রতিবছর তা রিনিউ করতে হয়। বাম জোটের নেতৃবৃন্দ পরিদর্শন শেষে তাদের পর্যবেক্ষণে সিদ্ধান্ত নেয় সেজান জুস এর অগ্নিকাণ্ডে শ্রমিকদের মৃত্যু এবং আহত হওয়ার ঘটনা নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি মালিক ও সরকার প্রশাসনের অবহেলা, গাফিলতিজনিত ও কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড। কারণ মালিক বিধি অনুসরণ করে কারখানা নির্মাণ করেনি, বিভিন্ন সরকারি কর্তৃপক্ষের পরিদর্শক যথাযথ পরিদর্শন করেনি এবং উপযুক্ত কমপ্লায়েন্স ছাড়া ছাড়পত্র দিয়েছে এবং তা বছর বছর পুনঃঅনুমোদন দিয়েছে। বাম জোটের প্রতিনিধিদল তাদের পর্যবেক্ষণে আরো জানিয়েছেন, বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুসারে ১৪ বছর বা তার কম বয়সের শিশু নিয়োগ নিষিদ্ধ কিন্তু ঐ কারখানায় ১২/১৪ বছরের শতাধিক শিশুকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। তারা পর্যবেক্ষণে আরো বলেন, সেজান জুসের মালিক ব্যাংক থেকে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। ঐ ঋণের টাকা আত্মসাতের উদ্দেশ্যে মালিক পক্ষ থেকেই আগুন লাগানো হয়েছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা দরকার।

গত দশ বছরে পোষাক কারখানা বহির্ভূত অন্যান্য কারখানায় ৪৫৩টি অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৬৯৭ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। সেজান কারখানার শ্রমিকদের বক্তব্য অনুযায়ি ঘটনার পনের দিন আগে আরেকবার আগুন লেগেছিল সেজান কারখানা কম্পাউন্ডে। এ পর্যন্ত ডজনখানেক বার আগুন লেগেছে সেজান কারখানা এলাকায়। ১৯৯০ সালে মিরপুরের সারাকা গার্মেন্ট কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে শ্রমিক হত্যার ঘটনা অনেকের মনে আছে নিশ্চয়ই। কিভাবে তালাবদ্ধ রেখে শ্রমিকদের আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল। তখন শ্রমিক আন্দোলন থেকে আওয়াজ উঠেছিল ‘কারাখানা নয় যেন কারাগার’, ‘কাজ করতে এসে মরতে চাই না’। সারাকা, ফনিক্স, তাজরীন, আরো অসংখ্য কারখানা হয়ে সেজান জুস কারখানার ঘটনা একই। কারাখানায় তালাবদ্ধ রেখে শ্রমিক হত্যা। দারিদ্রকরণ প্রক্রিয়ায় নিঃস্ব হয়ে জীবন বাঁচাতে গ্রাম থেকে শহরে এসে কারখানায় ঢুকে অঙ্গার হয়ে অজ্ঞাত পরিচয় নিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে শ্রমিকরা। এটা গ্রাম-শহরের মেহনতি মানুষের ওপর ধনিক শ্রেণির নিষ্ঠুর শ্রেণি আক্রমণ।

শ্রমিকদের ওপর সেজান গ্রুপের মালিক শ্রেণির নিষ্ঠুর আক্রমণের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণিকে প্রতিআক্রমণ পরিচালনা করতে হবে। সেজন্য সেজানের শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়ে অন্যান্য কারখানার শ্রমিকদেরও আওয়াজ তোলা দরকার-

১) নিহত-আহত-নিখোঁজ শ্রমিকদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা করতে হবে;

২) সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত শ্রমিকদের পরিবার প্রতি আইএলও কনভেনশন ১২১ অনুযায়ি আজীবন আয়ের সমান অর্থাৎ ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে;

৩) আহতদের উন্নত চিকিৎসা-পুনর্বাসন-ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে;

৪) নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির মাধ্যমে তদন্ত করে অগ্নিকাণ্ডের কারণ, অনিয়মসহ প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করতে হবে;

৫) মালিক হাসেমসহ দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও গাফিলতির জন্য দায়ী কলকারখানা পরিদর্শক, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, শিল্প মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সকল সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনা, বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে;

৬) ঈদের পূর্বেই শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-বোনাস-ওভারটাইম পরিশোধ করতে হবে।

শুধু মাত্র আগুন দিয়ে নয়, করোনাকালে শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করিয়ে তাদের পাওনা মজুরি পরিশোধ করছে না মালিকরা। শ্রম আইন অনুযায়ী পরবর্তী মাসের ৮ তারিখের মধ্যে মজুরি পরিশোধ করার কথা কিন্তু অনেক গার্মেন্ট কারখানায় এখন পর্যন্ত জুন মাসের বেতন পরিশোধ করা হয়নি। জিলহজ্জ মাসের ১ তারিখ মন্ত্রী, এমপি, আমলা সবাই ঈদ বোনাস পেলেও শ্রমিকদের অপেক্ষা করতে হবে ৯ তারিখ পর্যন্ত। শ্রম প্রতিমন্ত্রী মালিকদের এ ধরণের প্রশ্রয় দেন কারণ তারা মনে করেন শ্রমিকদের আবার ঈদ কী? গাজীপুরের বড়বাড়ির ন্যাশনাল কেমিক্যাল কারখানা বে-আইনীভাবে বন্ধ করে দিয়েছে লুটেরা মালিক এমএনএইচ বুলু। শ্রমিকদের দীর্ঘ লড়াইয়ের ফলে মালিক চুক্তি করতে বাধ্য হয়ে পুনরায় চুক্তি ভঙ্গ করেছে। তিন মাসের বকেয়া বেতন ও বোনাসের দাবিতে শ্রমিকরা রাজপথে লড়াই করছে। সরকারের পুলিশ মালিকের পক্ষ নিয়েছে। লাখ লাখ মটর ও ব্যাটারিচালিত রিকশা মালিক ও শ্রমিকদের জীবিকা ছিনিয়ে নিতে উদ্যত সরকার। তাদের ওপর সড়কে নিষ্ঠুর নিপীড়ণ চালাচ্ছে আইনশৃংখলা রক্ষা বাহিনী।

কয়েকটা মাত্র ঘটনার উল্লেখ করলাম। আসলে মালিক-পুলিশ-প্রশাসন চারদিক থেকে শ্রমজীবী মানুষের ওপর আক্রমণ শানাচ্ছে। শ্রমিকদের কোনো সম্মান নাই। তাদের জীবনের কোনে মূল্য নাই। দেশে মাথাপিছু আয় ২, ২২৭ মার্কিন ডলার। আর একজন শ্রমিক অগ্নিকাণ্ডে নিহত হলে তার পরিবার সরকারের কাছ থেকে পায় ২, ৩৫৩ মার্কিন ডলার। কত তুচ্ছ এ জীবন!!

দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ লকডাউনে কীভাবে জীবন বাঁচাবে তার তোয়াক্কা করে না আমলা নির্ভর এই লুটেরা সরকার। কিন্তু এ শ্রমিকরা দেশে-বিদেশে কাজ করে দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। দেশের রিজার্ভ রেকর্ডের পর রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অপর দিকে শ্রমিকের কষ্টার্জিত এ বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে পাচার করে দিচ্ছে লুটেরা মালিক, দুর্নীতিবাজ আমলা আর নষ্ট রাজনীতিকরা। নিজেদের মুনাফা বাড়িয়ে নিতে শ্রমিকদের ওপর শোষণের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে এ ত্রয়ী-চক্র। শ্রমিকদের উপর চারিদিক থেকে নিষ্ঠুর আক্রমণ তাই বাড়ছে। লুটেরা শোষক শ্রেণিকে পরাজিত করতে দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। শ্রমজীবী-মেহনতি মানুষের ওপর ক্রমবর্ধমান আক্রমণ প্রতিহত করতে হবে।

লেখক: প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.