শোষণ, বঞ্চনা, বৈষম্য নিরসনে লড়াই গড়ে তুলুন

আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন

১৯৪৭ থেকে ’৭১। পাকিস্তান আমলের ২৩ বছর বাংলাদেশের মানুষ এক দেশ দুই অর্থনীতির বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। বাঙালি অর্থনীতিবিদেরা রেহমান সোবহান, নূরুল ইসলাম, হাবিবুর রহমান, মুশাররফ হোসেন, আখলাকুর রহমান প্রমুখ গত শতাব্দীর সমগ্র ৬০’র দশক জুড়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান দুটি অঞ্চলের অর্থনীতি কাঠামোর সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্য উপলব্ধি করে আঞ্চলিক বৈষম্য ও তার রাজনৈতিক সমাধান বের করার জন্য নিয়োজিত ছিলেন। তাদের এ প্রচেষ্টা বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘দুই অর্থনীতি’ বলে খ্যাত হয়ে আছে। তাদের এ তত্ত্ব বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে ব্যবহৃত হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের উপর পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ, বঞ্ছনাকে প্রতিভাত করার জন্য। পূর্ব পাকিস্তান শশ্মান কেন?-পোস্টার, গরু ঘাস খায় পূর্ব পাকিস্তানে আর দুধ দোহন করা হয় পশ্চিম পাকিস্তানে-পোস্টার, পূর্ব পাকিস্তানে তৈরি কাগজ দিস্তা বিক্রি হয় দশ আনায়, আর এই একই কাগজ পশ্চিম পাকিস্তানে বিক্রি হয় ছয় আনায়। এ ধরণের সহজ সরল ভাষায় ‘এক দেশ দুই অর্থনীতি’-বাংলাদেশের মানুষের কাছে নিজেদের পশ্চিম পাকিস্তানিদের দ্বারা প্রতারিত হওয়ার কাহিনী উন্মোচিত করেছিল। যা বৈষম্যহীন বাংলাদেশ কায়েমের লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধে পরিণত হয়েছিল। ৭ মার্চের ভাষণে তাই মুক্তির সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম একই নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হয়েছিল।

আজ স্বাধীনতার ৫০ বছর বাদ সমাজে প্রবাহমান বৈষম্য প্রমাণ করে পাঞ্জাবী খানেরা বিতাড়িত হলেও খানদের শাসন থেকে বাংলাদেশের মানুষ মুক্ত হতে পারেনি। তাদের জায়গায় ‘বাঙালি খানে’রা আমাদের মাথার উপর জেকে বসেছে। করোনা অতিমারী আমাদের চোখের সামনে সমাজের বৈষম্যের ঘিনঘিনে ঘাঁকে উন্মোচিত করে দিয়েছে। আগে বৈষম্য ছিল এক হাজার মাইল দূরবর্তী পূর্ব আর পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে। আর এখন নগ্ন বৈষম্য তৈরি হয়েছে একই গুলশান-বনানীতে অবস্থিত বিশাল অট্টালিকারাজি আর কড়াইল বস্তির মধ্যে। একদিকে হাজার আলোর উজ্জ্বলতা, বিলাস আর অন্য দিকে ক্ষুধা আর মলিনতা। পাকিস্তান আমলে দেশের মানুষের মধ্যে বিরাজিত বৈষম্য আরো প্রসারিত, আরো গভীর হয়েছে। ধনী বাইশ পরিবারের দুই পরিবার ছিল বাঙালি। আর এখন নাকি তা লাখের কাছাকাছি। বাংলাদেশ নাকি ‘আল্ট্রা রীচ’ বা ‘অতি ধনী’দের দেশে পরিণত হয়েছে। আবার এদেশে ’৭১ সালে ভূমিহীন ছিল ৬৭ শতাংশ এখন পঞ্চাশ বছর পরে ভূমিহীনের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২ শতাংশ। কিছু লোকের অতি আয় বৃদ্ধির কারণে আমাদের মাথাপিছু আয় এখন ২,২২৭ মার্কিন ডলার। কিন্তু সরকারের হিসাবেই দেশের চার কোটি ছিয়ানব্বই লাখ মানুষের দৈনিক আয় ১.৯০ মার্কিন ডলার বা ১৬০ টাকার নীচে। অর্থাৎ এ মানুষগুলো দারিদ্রসীমার নীচে বাস করে। দেশের চা শ্রমিকদের সরকার ঘোষিত দৈনিক মজুরি মাত্র ১২০ টাকা। তাদের বাস দারিদ্রসীমার অনেক নীচে। যে বৈষম্য কমানোর জন্য ত্রিশ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছে। যে দুই অর্থনীতিকে ছিন্নভিন্ন করার জন্য দুই লাখ নারীকে যৌন সহিংসতা সহ্য করতে হয়েছে সে বৈষম্য কিন্তু দূর হয়নি তা আরো গভীরতর হয়েছে। বৈষম্যের দুই অর্থনীতি খতম হয়নি। বাংলাদেশি লুটেরা শাসকচক্র ‘এক দেশ দুই অর্থনীতি’কে সম্প্রসারিত করে ‘এক দেশ দুই নীতি’ চালু করেছে। তারা ধনীদের জন্য তোষণমূলক নীতি আর গরিব ও নিপীড়িতদের জন্য অবদমনমূলক নীতি কার্যকর করেছে। করোনাকালে সেটা বিষফোঁড়ার মত দেহের সর্বত্র প্রদর্শিত হচ্ছে।

২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়া ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র করোনাভাইরাস বিশাল পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে নাঙ্গা করে দিয়েছে। সমাজতান্ত্রিক চীন, ভিয়েতনাম, কিউবা এমনকি ভারতের কমিউনিস্ট শাসিত কেরালা রাজ্য যেভাবে করোনা মোকাবিলা করে মানব মত্যুকে সীমিত করতে সক্ষম হয়েছে সেখানে পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের পীঠস্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অসংখ্য মৃত্যু মানুষকে ভারাক্রান্ত্র করেছে। ভারতের দিল্লীসহ বিভিন্ন বড় বড় শহরে অক্সিজেনের অভাবে মানুষের মৃত্যুতে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। উত্তর প্রদেশ থেকে বহমান নদীতে শেষকৃত্যবিহীন লাশের মিছিল ছিল মানবতার পরাজয়। ৭ আগস্ট পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে করোনায় মারা গেছে ৪২ লক্ষ ৩৮ হাজার ১৪২ জন। বাংলাদেশে মারা গেছে ২২ হাজার ১৫০ জন। আমাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জানি বাংলাদেশে করোনা শনাক্ত হয়ে যত মানুষ মারা যাচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করছে। মানবিক এ বিপর্যয়ের পিছে পিছে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ধেয়ে আসছে গোটা পৃথিবীতে। পৃথিবীতে বাংলাদেশসহ কয়েকটা দেশ ছাড়া অধিকাংশ দেশ অর্থনৈতিক সংকোচন বা নেগেটিভ প্রবৃদ্ধির শিকার হয়েছে। মজার কথা করোনাকালে দেশের অর্থনীতি সংকুচিত হওয়ায় নতুবা কম প্রবৃদ্ধি অর্জিত হওয়ায় সাধারণ মানুষ তথা ৯৯ শতাংশ মানুষের জীবন সংকটগ্রস্থ হলেও গুটিকয়েক লোক যারা সমাজের ১ শতাংশ তাদের সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা পৃথিবীর সব দেশের জন্যই সত্য। বিআইডিএস’র তথ্যানুযায়ি বাংলাদেশে করোনাকালে দারিদ্রসীমার নীচে চলে গেছে এক কোটি ৪৬ লাখ মানুষ। সব মিলিয়ে এখন পাঁচ কোটি ছিয়ানব্বই লাখ মানুষ অর্থাৎ দেশের ত্রিশ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করে, যাদের দৈনিক আয় ১.৯০ মার্কিন ডলার বা ১৬০ টাকার নীচে। অন্য এক তথ্যানুযায়ী ঢাকা শহরের বিশ শতাংশ মানুষ আর্থিক অনটনের কারণে শহর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। করোনাকালে দেশের ৯৯ শতাংশ সাধারণ মানুষের যখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা তখন বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত একটা তথ্য সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির বিষাক্ত ফল আমাদের সামনে উন্মোচিত করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য থেকে জানা যায়, কোটি টাকা আছে এমন হিসাবধারীর সংখ্যা ১৯৭৫ সালে ছিল ৪৭। ২০১৫ সালে ৫৭,৫১৬। ২০২০ সালে ৮২,৬২৫। ২০২১ সালের মার্চ মাসে ৯৪,২৭২। করোনার মধ্যে ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের মার্চ মাস মাত্র এক বছরে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে ১১, ৬৪৭। এটা কী করে সম্ভব? দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনমানের অবনতির বিপরীতে গুটিকতেক লোকের রকেটগতির উন্নতি! এটাকেই আমরা বলছি গত পঞ্চাশ বছরের সরকারসমূহের ‘দুই অর্থনীতি’।

গত পঞ্চাশ বছর ধরে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত দেশ শাসন করেছে, তাদের অনুসৃত ‘এক দেশে দুই নীতি’ দেশের লুটেরা শাসন ব্যবস্থাকে পরিপুষ্ট করেছে। ফলে দেশের কৃষক, গার্মেন্ট শ্রমিকসহ অন্যান্য শ্রমিক, প্রবাসী শ্রমিকরা দেশের জিডিপি বৃদ্ধিতে যে অবদান রাখছে তা তাদের জীবনমান উন্নয়নে কোনো প্রভাব ফেলছে না। তাদের অর্জিত সম্পদে তাদের কোনো ভাগ নেই। তা মালিকগোষ্ঠীর সম্পদের পাহাড়ের উচ্চতাকেই বাড়াচ্ছে- ‘ডিম পাড়ে হাসে, খায় বাগদাসে’। সরকার মালিকগোষ্ঠীর। ফলে করোনাকালেও সরকার দুই নীতি নিয়ে চলছে। মালিকদের জন্য অ্যাইসোলেশান, শ্রমিকদের জন্য মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে কারখানায় কাজ। পরিবহণ বন্ধ রেখে কারখানা খুলে দিয়ে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শ্রমিকদের পায়ে হেঁটে দেশের দূরদূরান্ত থেকে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জে আসতে বাধ্য করা হয়েছে। শ্রমিকরা কারখানায় কাজ করবে তাদের জন্য টিকার ব্যবস্থা নাই কিন্তু যারা ঘরে আইসলেশানে থাকবে তাদের জন্য টিকা আগেই বরাদ্দ দিয়ে দেয়া হয়েছে।

শাসকশ্রেণির এ বৈষম্যমূলক নীতি যা আমাদের সমাজের উৎপাদক শেণিকে বঞ্ছিত ও প্রতারিত করছে তার অবসান ঘটাতে লুটেরা শাসকগোষ্ঠীর শাসনের অবসান ঘটানো জরুরি। শ্রেণি সংগ্রাম ভিন্ন অন্য কিছু দিয়ে এ শ্রেণি শোষণ খতম করা যাবে না। ক্ষেতে-খামারে, কলে-কারখানায় লড়াই গড়ে তোলা এখন প্রধান রাজনৈতিক কর্তব্য।

লেখক: প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.