শিক্ষক লাঞ্ছনার শেষ কোথায়

শিক্ষক জাতির মেরুদণ্ড–এই কথা মিথ্যে প্রমাণিত হচ্ছে বারবার। প্রতিদিন আমাদের শিক্ষক লাঞ্ছনার খবর শুনতে হচ্ছে। শিক্ষকদের যেখানে আমাদের শ্রদ্ধার আসনে স্থান দেওয়া উচিত, সেখানে প্রতিনিয়ত শিক্ষকদের অপমানিত করছি। এতে দেশ কোনদিকে এগিয়ে যাচ্ছে তা আমরা জানি না। শিক্ষক অপমানের ঘটনায় জাতি হিসেবে আমরা কোথায় এগিয়ে যাচ্ছি তা কেউ উপলব্ধিও করতে পারছে না।

একটু পেছনের দিকে ফিরে গেলে দেখা যাবে, ২০১৬ সালে নারায়ণগঞ্জের একটি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তিকে কান ধরে সবার সামনে ওঠবস করিয়েছিলেন তৎকালীন সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান। এরপর এ ধরনের ঘটনা আরও অনেক। কয়েক মাস আগে বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলকে জেল যেতে হয়েছে। শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলের অপরাধ ছিল তিনি বিজ্ঞানের পক্ষে কথা বলেছিলেন। এর মধ্যে ঘটেছে আরও অনেক ঘটনা। এক ছাত্র একজন শিক্ষককে এমন পিটিয়েছে যে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

এরপর নড়াইলের মির্জাপুর কলেজের এক শিক্ষার্থীর ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে কয়েকজন শিক্ষার্থী এবং এলাকাবাসী অধ্যক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে যান। এসময় পরিস্থিতি বিবেচনায় অধ্যক্ষ পুলিশকে ঘটনাটি জানান এবং সুরাহা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু একটি মহল এ ঘটনাকে পুঁজি করে শিক্ষার্থীকে রক্ষার মিথ্যা অভিযোগ এনে সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়ায়। একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে কলেজে হামলা চালিয়ে তিন হিন্দু ধর্মাবলম্বী শিক্ষকের মোটরসাইকেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এসময় স্বপন কুমার বিশ্বাসের পাশাপাশি বাংলা বিভাগের শিক্ষক শ্যামল কুমার ঘোষকেও নির্মমভাবে আহত করে। পরবর্তীতে শতাধিক পুলিশ এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী ওই অধ্যক্ষকে জুতার মালা পরায়। যার ছবি এবং ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এ ঘটনা শুধু ওই শিক্ষকের জন্য নয়, গোটা বাংলাদেশের জন্য একটি লজ্জাজনক ঘটনা।

এরপর আশুলিয়া এলাকায় উৎপল কুমার সরকার নামের একজন শিক্ষককে আশরাফুল ইসলাম জিতু নামের দশম শ্রেণির এক ছাত্র ক্রিকেট খেলার স্টাম্প দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে দুদিন চিকিৎসা নিয়েও জীবন রক্ষা হয়নি তাঁর। এরপর দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, প্রখ্যাত নাট্যকার, উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সাবেক সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. রতন সিদ্দিকীর বাসভবনে তুচ্ছ কারণে অতর্কিত হামলা এবং ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, প্রায় সব ঘটনায় টার্গেট সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিক্ষক। এটা এক ধরনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার পরিকল্পিত চেষ্টা। আর এসব ঘটনার প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রশাসনের উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়। আওয়ামী লীগ সরকারের সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী রাজনীতি, সংগঠনের তোষণ এবং এই ধরনের ঘটনার বিচারহীনতার সংস্কৃতিই বারবার এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অবস্থান না নিয়ে সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ শিক্ষাব্যবস্থায় সাম্প্রদায়িকীকরণ করেছে। যার ফলে সমাজে সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তির বিস্তার ঘটে চলেছে, যা মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনার বিপরীত। এ সমাজ অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে, ছাত্র শিক্ষককে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। এর থেকে উত্তরণে সচেতন সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সর্বত্র মানুষের অংশগ্রহণ, গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে হবে। অবিলম্বে শিক্ষকদের হেনস্তার সাথে জড়িতদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আর এ অবস্থা থেকে উত্তরণে প্রতিনিয়ত অসাম্প্রদায়িক চেতনা জাগ্রত করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.