শাহবাগে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক মঞ্চ’র প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক সমাবেশ

দেশজুড়ে চলমান সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, অব্যাহত শিক্ষক নির্যাতন, নিপীড়ন, লাঞ্ছনা এবং বিচারহীনতার অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে আগামী ২৯ থেকে ৩১ জুলাই, ৩ দিন দেশব্যাপী কর্মসূচি পালন করছে “প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক মঞ্চ”।

দেশব্যাপী এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয়ভাবে গত ২৯ জুলাই শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৪টায় শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে অনুষ্ঠিত হয় প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক সমাবেশ।

উল্লেখ্য, “প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক মঞ্চ”-এর এ কর্মসূচিতে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, প্রগতি লেখক সংঘ, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, সমাজ অনুশীলন কেন্দ্র, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, প্রাচ্যনাট, আরণ্যক, বটতলা, থিয়েটার বায়ান্ন সংগঠনসমূহ যুক্ত রয়েছে।

“শিক্ষা-সংস্কৃতি-মনুষ্যত্ব রক্ষায় — রুখো সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস” এই শ্লোগান নিয়ে আয়োজিত সমাবেশের শুরুতে দু’টি দলীয় গণসঙ্গীত পরিবেশন করেন উদীচীর শিল্পীরা। তারা পরিবেশন করেন, “এ মাটি নয় জঙ্গিবাদের, এ মাটি মানবতার” এবং “এ লড়াই বাঁচার লড়াই, লড়াইয়ে জিততে হবে” গান দু’টি। এরপর সমসাময়িক বিষয়ের উপর নির্মিত পথনাটক পরিবেশন করে প্রাচ্যনাট।

https://www.facebook.com/ekota.live/videos/881524509483335

এরপর বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি অধ্যাপক বদিউর রহমান-এর সভাপতিত্বে শুরু হয় আলোচনা পর্ব। এ পর্বে বক্তব্য রাখেন চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র-এর জাকির হোসেন, সমাজ অনুশীলন কেন্দ্র-এর রঘু অভিজিৎ রায়, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর-এর শফিকুর রহমান শহীদ, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম এম আকাশ, প্রগতি লেখক সংঘ-এর সহ-সভাপতি শামসুজ্জামান হীরা এবং কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর-এর চেয়ারপারসন মাহফুজা খানম। একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি বেলায়েত হোসেন, প্রগতি লেখক সংঘ-এর সভাপতি গোলাম কিবরিয়া পিনু, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর-এর আলী আহমেদ নান্টু, জাহিদ মোস্তফা, সুমন সরদার, আনোয়ার কামাল, স. ম. কামাল, রেজওয়ানুল করিম সুমন।

আলোচনা পর্বের পর শুরু হয় সাংস্কৃতিক পরিবেশনা পর্ব। এ পর্বের শুরুতে গণসঙ্গীত পরিবেশন করে কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর-এর শিশু শিল্পীরা। বৃন্দ আবৃত্তি পরিবেশন করেন উদীচীর বাচিক শিল্পীরা। গণসঙ্গীত ও নৃত্য নিয়ে মঞ্চে আসেন চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। গণসঙ্গীত পরিবেশন করে কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর।

এছাড়া, সবশেষে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী পথনাটক ‘অজ্ঞাতনামা’ পরিবেশন করে উদীচী কেন্দ্রীয় নাটক বিভাগ। নাটকটি রচনা করেছেন উদীচী’র সাবেক সহ-সভাপতি অধ্যাপক রতন সিদ্দিকী এবং নির্দেশনা দিয়েছেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি প্রবীর সরদার। এছাড়া, অনুষ্ঠানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরোটা সময় জুড়ে রং-তুলিতে প্রতিবাদ শিরোনামে প্রতিবাদী চিত্রাঙ্কনে অংশগ্রহণ করেন দেশের প্রথিতযশা চিত্রশিল্পী জাহিম মোস্তফা, রাশেদুল হুদা, কিরীটি রঞ্জন বিশ্বাস, সোহাগ বায়েজিদ, টাইগার নাজির এবং সনাতন মালো। প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক সমাবেশটি সঞ্চালনা করেন উদীচীর সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে একই কৌশল অবলম্বন করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্ম অবমাননার ভুয়া অভিযোগ তুলে দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছে। প্রায় প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রেই অপরাধীরা একই কৌশল অবলম্বন করলেও সে কৌশল ঠেকাতে বারবারই ব্যর্থ হয়েছে পুলিশ ও প্রশাসন। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে তাদেরকে এসব অপকর্মের সহযোগীর ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। এছাড়া অধিকাংশ অপরাধের ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখা গেছে। শুধু হিন্দু বা আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষদের নির্যাতনই নয়, গত কয়েক বছরে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে শিক্ষক লাঞ্ছনা, নির্যাতন, নিপীড়নের ঘটনাও। নারায়ণগঞ্জের শ্যামল কান্তি ভক্ত থেকে শুরু করে নওগাঁর আমোদিনী পাল, মুন্সীগঞ্জের বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মন্ডল, নড়াইলের অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস, রাজশাহীর গোদাগাড়ীর অধ্যক্ষ সেলিম রেজা বা আশুলিয়ার কলেজ শিক্ষক উৎপল কুমার সরকার পর্যন্ত- একের পর এক শিক্ষক লাঞ্ছিত, নির্যাতিত, নিপীড়িত এমনকি হত্যাকাণ্ডের শিকারও হচ্ছেন।

গত কয়েক বছর ধরে এতোগুলো অমানবিক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী অপরাধ ঘটানো হলেও, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দাবিদার সরকার ক্ষমতায় থেকেও সেসব ঘটনার কোনটিরই সুষ্ঠু বিচার সম্পন্ন করতে পারেনি।

কক্সবাজারের রামু, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর বা যশোরের মালোপাড়া, সুনামগঞ্জের শাল্লা, কুমিল্লার নানুয়ার দীঘিরপাড় বা সম্প্রতি নড়াইলের লোহাগড়ায় যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতর ঘটনা ঘটেছে তার কোনটিরই প্রকৃত অপরাধী আজও ধরা পড়েনি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চুনোপুটি বা তৃণমূল পর্যায়ের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করেছে সরকার। এই বিচারহীনতার অপসংস্কৃতির কারণেই অপরাধীরা নিশ্চিন্তে নতুন নতুন অপরাধ করার সাহস পায়। প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো মনে করে এ অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর এখনই সময়। সাধারণ জনগণকে সচেতন করে এই বিচারহীনতার অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে উদ্বুদ্ধ করে তুলতে হবে। প্রতিটি সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বা শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনার পেছনের কুশীলবদের যাতে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক মঞ্চ-এর তিন দিনের দেশব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে ২৯ জুলাই রাজধানী ছাড়াও আরো বেশ কয়েকটি জেলায় প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। আগামীকাল ৩০ জুলাইও কয়েকটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।

কর্মসূচির শেষ দিন অর্থাৎ ৩১ জুলাই রোববার ঢাকায় সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে এবং প্রতিটি জেলায় জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.