শাবিপ্রবি’র আন্দোলন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ

অভিনু কিবরিয়া ইসলাম

শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে যে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন তা গোটা দেশে বিশাল সাড়া ফেলেছে। সাধারণ মানুষ এই আন্দোলনে সহমর্মিতা দেখিয়েছেন। শিক্ষার্থীরা ১৬৩ ঘণ্টা অনশন করার পর আশ্বাসের প্রেক্ষিতে অনশন ভাঙলেও উপাচার্যের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। এই আন্দোলন এবং আন্দোলন দমাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও রাষ্ট্রশক্তির যৌথ আক্রমণ আরো একবার দেখিয়ে দিলো যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ক্ষমতাসীনরা কতটা মরিয়া। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসিত তো নয়ই, বরং এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রশক্তির প্রতিনিধি বা ‘সুবাহদার’ হিসেবে উপাচার্য নিযুক্ত হন, এবং যে কোনো পরিস্থিতিতে সেই প্রতিনিধিকে রক্ষা করতে রাষ্ট্রশক্তি তার সর্বশক্তি ও কৌশল ব্যবহার করে। শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের শক্তি অবশ্য রাষ্ট্রশক্তিকেও কখনো কখনো পিছু হটতে বাধ্য করে।

বাস্তবতা হলো, আজকের দিনে উপাচার্য রাষ্ট্রশক্তির প্রেরিত প্রতিনিধিই শুধু নয়, নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিজেই হয়ে ওঠেন প্রতাপশালী শাসক। বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিশেষত নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, যা ৭৩-এর অধ্যাদেশের অন্তর্ভুক্ত নয়, সেখানে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকে খোলাখুলিভাবে আইনি স্বীকৃতি দেয়ার পাশাপাশি, উপাচার্যকে দেয়া হয়েছে অপরিসীম নির্বাহী ক্ষমতা। এর ফলে উপাচার্যের পদ নিছক একটি দলীয় পদে পরিণত হয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ না করলে কেউ উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান না। সুতরাং শাবিপ্রবির ঘটনা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই ধরনের স্বেচ্ছাচারিতামূলক, জবরদস্তিমূলক ও অগণতান্ত্রিক শাসন চলে। শিক্ষক নিয়োগ থেকে উপাচার্য নিয়োগ, সবখানেই চলে ক্ষমতাসীন দলের একচ্ছত্র দাপট। ছাত্রদের মধ্যেও তৈরি করা হয় অনুগত লাঠিয়াল বাহিনী। এই পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি।

আমাদের দেশের মুক্তিসংগ্রাম ও তার পটভূমি প্রস্তুত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের একটা বড় ভূমিকা ছিলো। সেই বাস্তবতায়, ৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আইনে যে পরিবর্তন আনা হয়, তা শতভাগ স্বায়ত্তশাসনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলো কি না, সে বিতর্ক এড়িয়েও বলা যায়, সেই অধ্যাদেশ বহুক্ষেত্রে ইতিবাচক ছিলো। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে জনগণের মধ্যে আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছিলো, নতুন রাষ্ট্রে ও সমাজে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। তার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও হয়ে উঠবে মুক্তবুদ্ধিচর্চার কেন্দ্র এবং অধিকতর গণতান্ত্রিক। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে তার উল্টো। সামরিক শাসকেরা ক্ষমতায় আসার পর সংগতভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতা খর্ব করার চেষ্টা করবে, এবং তা করেছেও– কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো ৯০-এ গণতান্ত্রিক সংগ্রামের পরও যে সরকারগুলো এসেছে তারাও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আইন এমনভাবে তৈরি করেছে যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন খর্ব করা যায়, আরো নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যায়।

ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বর্তমানে ৭৩ সালের আইন ও অধ্যাদেশ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। সেখানেও নানাভাবে দলীয়করণসহ, সরকারের নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা স্বায়ত্তশাসনকে খর্ব করছে, একথা সত্যি। তবে, যেখানে সময়ের সাথে সাথেবিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আরো স্বায়ত্তশাসন ও গণতন্ত্র নিশ্চিত করা দরকার ছিলো, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আইনগতভাবেই আরো নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে এবং শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় তাদের মতামত প্রদানের জায়গাগুলোকে নানাভাবে সংকুচিত করা হয়েছে। এর কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যাক।

উপাচার্য নিয়োগ ও চ্যান্সেলরের সন্তুষ্টি

আমরা দেখি, ১৯৮০ সালের ২৭ ডিসেম্বর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় আইনটি পাস হয়। ৭৩-এর আইনগুলোর থেকে এর কিছু মৌলিক পার্থক্য আমরা লক্ষ্য করি। ৭৩-এ বিশ্ববিদ্যালয়ের যে আইনগুলো আমরা দেখি সেখানে চ্যান্সেলর ভাইস-চ্যান্সেলরকে নিয়োগ দেন সিনেটে নির্বাচিত তিন সদস্যের একটি প্যানেল থেকে। সিনেটে শিক্ষক-ছাত্র-রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েটের প্রতিনিধি থাকায়, ভাইস চ্যান্সেলর নির্বাচনে শিক্ষক-ছাত্রদের মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে সেখান থেকে সরে আসা শুরু হয়। এই আইনের ১০ এর ১ ধারায় বলা আছে ‘ চ্যান্সেলর যে শর্তাবলি নির্ধারণ করিয়া দিবেন, সেইমতো তিনি চার বৎসরের জন্য ভাইস-চ্যান্সেলর নিয়োগ করিবেন’। সুতরাং রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহীকে নিয়োগ দেওয়া হবে। এই বিধান, এর পরে যেসকল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে, তার আইনে দুএকটি শব্দের হেরফের করে রেখে দেওয়া হয়েছে। গণতান্ত্রিক বলে পরিচিত সরকারগুলো এর কোনো পরিবর্তন আনেনি, সামরিক শাসকের আমলের আইনের এই ধারাকে তারা রেখে দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের ১০ এর ১ ধারাতে বলা আছে, ‘চ্যান্সেলর, তদ্কর্তৃক নির্ধারিত শর্তে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ এমন একজন ব্যক্তিকে চার বৎসর মেয়াদের জন্য ভাইস-চ্যান্সেলর পদে নিয়োগদান করিবেন’। অন্যান্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনেও তা-ই।

১৯৯৮ সালে ‘গণতান্ত্রিক’ সরকারের আমলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে যুক্ত করা হয় যে- ‘উপ-ধারা (১) এ যাহা কিছুই থাকুক না কেন, চ্যান্সেলরের সন্তোষানুযায়ী ভাইস-চ্যান্সেলর স্বপদে অধিষ্ঠিত থাকিবেন।’ (১০-এর ২ উপধারা, বশেমুকৃবি আইন)। বলাবাহুল্য এর পরের সরকারগুলো নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের ক্ষেত্রে এই ধারাটি রেখে দেন। এই আইনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ আরো পাকাপোক্ত হয়, এবং ‘চ্যান্সেলরের সন্তোষানুযায়ী’ বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতে ভাইস চ্যান্সেলর বাধ্য থাকেন। একদিকে নিয়োগ যেহেতু হচ্ছে চ্যান্সেলরের মাধ্যমে এবং টিকেও থাকতে হচ্ছে ‘চ্যান্সেলরের সন্তোষানুযায়ী’, সুতরাং ভাইস চ্যান্সেলর হবার দৌড়ে এবং ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে টিকে থাকতে মুখ্য যোগ্যতা হয়ে পড়ছে সরকারের তোষণ। আবার চ্যান্সেলরের সন্তুষ্টি থাকলে, বিশ্ববিদ্যালয়ে যেহেতু ভাইস-চ্যান্সেলরই সর্বেসর্বা– তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে সেখানে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করার কোনো দায় নেই উপাচার্যের।

বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতন্ত্র হরণ

৮০ সালের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে সিনেটের কোনো অস্তিত্ব নেই। সিন্ডিকেটেও শিক্ষক বা ছাত্রদের নির্বাচিত প্রতিনিধির কোনো সুযোগ নেই। দুইজন ডিন থাকবেন বটে, তাও আবার পালাক্রমে চ্যান্সেলর ও সিন্ডিকেট কর্তৃক মনোনীত। (ইবি আইন, ১৯/১/ঙ) দুইজন শিক্ষকও থাকবেন, তারাও মনোনীত হবেন চ্যান্সেলরের দ্বারাই। অর্থাৎ চ্যান্সেলরের অনুগ্রহ ব্যতীত বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী ফোরামে কারো প্রবেশাধিকার নেই। এই ধারাবাহিকতাও পরবর্তীতে অন্যান্য আইনগুলোতে কমবেশি বহাল আছে (শাবিপ্রবি ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেট থাকলেও তাতে শিক্ষক প্রতিনিধির সংখ্যা কম, সিনেটের ক্ষমতাও খর্বিত)।

২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে ১১টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন পাস করা হয়। এই সকল আইনে সিন্ডিকেট প্রতিস্থাপিত হয় রিজেন্ট বোর্ড দ্বারা। এই রিজেন্ট বোর্ডই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পরিষদ, যা এমনভাবে গঠিত যে, সেখানে সাধারণ শিক্ষক বা ছাত্রের মতামত প্রতিফলনের সুযোগ নেই। চ্যান্সেলর তথা সরকার কর্তৃক নিয়োগকৃত ভিসি এই রিজেন্ট বোর্ডে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন, এই রিজেন্ট বোর্ডেই নির্ধারিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধি বা প্রবিধানগুলো। রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রন থাকে এই রিজেন্ট বোর্ডের ওপর।

যদিও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘রিজেন্ট বোডর্’ -এ নির্বাচিত তিনজন শিক্ষক প্রতিনিধি থাকার কথা আছে, যারা সকল শিক্ষকের ভোটে নির্বাচিত হবেন না, নির্বাচিত হবেন একাডেমিক কাউন্সিল দ্বারা। সেই একাডেমিক কাউন্সিলেরও গঠন এমন, যাতে শিক্ষকদের প্রকৃত মতামতের প্রতিফলন ঘটানো বেশ দুরূহ। স্বায়ত্তশাসিত বলে পরিচিত চারটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিন নির্বাচন হয় না, জেষ্ঠ্যতার ভিত্তিতে, বাই রোটেশন, উপাচার্যের অনুমোদনসাপেক্ষে ডিন নিয়োগ দেওয়া হয়, ফলে তার জবাবদিহিতার জায়গাও থাকে না। সবমিলিয়ে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে সংবিধি বা প্রবিধান তৈরি করার যে সকল কাঠামো আছে, তাতে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষক শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণের সুযোগ নেই বা একেবারেই সীমিত। প্রশাসনিক দায়িত্ব বা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম-কানুনের সুবিধা পেতে তাই ক্ষমতাসীনদের তোষামোদ করার বিকল্প নেই, ‘উপরমহল’ ছাড়া কারো প্রতি জবাবদিহিতাও নেই।

উপাচার্যের একচ্ছত্র ক্ষমতা ও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কায়েম

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে আরেকটি যে ধারা যুক্ত হয় যা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও গণতন্ত্রকে আরো সীমিত করে দেয়, তা হলো ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন কর্তৃপক্ষ বা প্রতিষ্ঠানের কোন সিদ্ধান্ত-প্রস্তাবের সাথে ভাইস-চ্যান্সেলর একমত না হইলে, তিনি সেই সিদ্ধান্ত-প্রস্তাবের বাস্তবায়ন বন্ধ রাখিতে পারেন এবং রায়ের জন্য চ্যান্সেলরের নিকট তাহা পাঠাইতে পারেন এবং সেই ব্যাপারে চ্যান্সেলরের রায় চূড়ান্ত হইবে’। (১১ এর ৮ উপধারা, ইবি আইন)। এই ধারাটিই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আইনে কিছুটা পরিবর্তিত আকারে রেখে দেয়া হয়েছে। অথচ ৭৩ এর অধ্যাদেশে এ ধারায় চ্যান্সেলর নয়, সিন্ডিকেটই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আবার সিন্ডিকেট যেহেতু সিনেটের কাছে দায়বদ্ধ থাকে, সেখানে কিছুটা সুযোগ থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেকহোল্ডারদের মতামত প্রতিফলিত করার। সেই সুযোগটিও খর্ব করা হয়েছে। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, ‘সরকারি’ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর এর মতের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন বডির কোনো সিদ্ধান্ত বা প্রস্তাব নেওয়া কার্যত অসম্ভব। ভাইস-চ্যান্সেলরকে যেহেতু চ্যান্সেলর নিজেই নিয়োগ দেন, তাও আবার রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর পরামর্শ অনুযায়ী, সুতরাং আইনগতভাবেও ভাইস চ্যান্সেলরের শুধুমাত্র চ্যান্সেলর বা সরকারের প্রতি অনুগত থাকলেই চলে।

আরেকটি উদাহরণ দেয়া যাক। ১৯৮৭ সালে পাস হয় দেশের প্রথম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শাবিপ্রবির আইন। এই আইনে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় আইনের অগণতান্ত্রিক ধারাগুলো মোটাদাগে বহাল তো ছিলোই উপরন্তু চ্যান্সেলরকে আরো ক্ষমতাবান করতে আরো একটি ধারা যুক্ত করা হয়, যা পরবর্তীতে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনেও যুক্ত হয়। ধারাটি হলো- ‘চ্যান্সেলরের নিকট যদি সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হয় যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কাজকর্ম গুরুতরভাবে বিঘিœত হওয়ার মত অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করিতেছে, তাহা হইলে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কাজকর্ম চালু রাখার স্বার্থে প্রয়োজনীয় আদেশ ও নির্দেশ দিতে পারিবেন এবং অনুরূপ আদেশ ও নির্দেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য বাধ্যতামূলক হইবে এবং ভাইস-চ্যান্সেলর উক্ত আদেশ বা নির্দেশ কার্যকর করিবেন।’ (১০ এর ৪ উপধারা, শাবিপ্রবি আইন/ ৯ এর ৫ উপধারা, যবিপ্রবি আইন) সুতরাং চ্যান্সেলর চাইলে কিংবা তার কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি চলছে বলে ‘প্রতীয়মান’ হলে তিনি যেকোনো আদেশ বা নির্দেশ দিতে পারবেন, যা মানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ সকলেই বাধ্য। সুতরাং সরকারের কোন নীতির বিরুদ্ধে যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবস্থান নেওয়া কিংবা সে লক্ষ্যে কোনো কর্মসূচি পালন কার্যত অসম্ভব। এই আদেশ নির্দেশের ধরন কেমন হবে, তাও নির্দিষ্ট করা নেই।

শিক্ষক-ছাত্রদের রাজনৈতিক অধিকার হরণ

স্বায়ত্তশাসিত ৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরির শর্তাবলি অংশে স্পষ্ট করা ছিলো, `The service conditions shall be determined without aû prejudice to the freedom of the teacher or officer to hold aû political views and to keep association with aû lawful organisation outside the University and shall be clearly stated in the contract.’ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে এই ধারাটি ফেলে দেয়া হয় এবং পরবর্তীতে শাবিপ্রবি আইনে স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হয়, ‘কোন শিক্ষক বা কর্মকর্তার রাজনৈতিক মতামত পোষণের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন না করিয়া তাঁহার চাকুরীর শর্তাবলী নির্ধারণ করিতে হইবে, তবে তিনি তাঁহার উক্ত মতামত প্রচার করিতে পারিবেন না বা তিনি নিজেকে কোন রাজনৈতিক সংগঠনের সহিত জড়িত করিতে পারিবেন না’ (শাবিপ্রবি আইন, ৫১ এর ২ উপধারা)। এর পরে এই ধারাটি পরে স্থাপিত অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনগুলোতেও দেখা যায়। ২০০৫ সালের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে এই ধারাটি আরো ছোট হয়ে আসে, ‘ কোন শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারী কোন রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্য হইতে পারিবেন না’। (৪৪-এর ২ উপধারা, জবি আইন)।

সংবিধানে নাগরিকদের রাজনীতি করা, সংগঠন করার অধিকার আছে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নেই। কিন্তু রাজনীতি কি বন্ধ আছে? শিক্ষকেরা কি রাজনীতি করছেন না? বরং বড় বড় পদে যেতে আরো নির্লজ্জভাবে শিক্ষকরা দলীয় লেজুরবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়ছেন। অন্যদিকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অথচ ক্ষমতাসীন দলের নামে ছাত্রদের একাংশ ঠিকই প্রশাসনের ছত্রছায়ায় ও প্রশ্রয়ে প্রভাব বিস্তার করছে, এবং সময়ে সময়ে তার প্রশাসনের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবেও গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমন করতে ব্যবহৃত হচ্ছে।

আমাদের দেশে ক্ষমতায় যেসকল রাজনৈতিক দল পালাক্রমে এসেছে, তাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তাদের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। এ কারণেই সামরিক শাসকের সময়কালীন আইন পরবর্তী সময়ে টিকে গেছে, সরকারগুলো পূর্বতন সরকারের অগণতান্ত্রিক আইনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে এবং ক্ষেত্রবিশেষে পূর্বতনের চেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে, আইনী ও বেআইনি উভয় পন্থায়। এর ধারাবাহিকতায় বিশ্ববিদ্যালয় আর বিশ্ববিদ্যালয় থাকছে না, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে। শাবিপ্রবির আন্দোলন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে এই বাস্তবতা আরো একবার দেখিয়ে দিলো। সুতরাং শাবিপ্রবির এই আন্দোলন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও গণতন্ত্রায়ণ নিশ্চিত করার বৃহত্তর লড়াইয়েরই অংশ।

লেখক: শিক্ষক, যবিপ্রবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.