শত প্রতিঘাতে অবিচল থাকা এক বিপ্লবী

কাজী রিতা  

রক্তের জাত আছে কিনা জানিনা, যদি থাকে, তবে আমি অবশ্যই জাতহীন। -ইলা মিত্র

ইলা মিত্র একটি বিপ্লবের নাম। একটি দর্শনের নাম। নারী আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, সাঁওতাল আন্দোলনের লড়াকু নাম ইলা মিত্র। গরিব-দুঃখী খেটে খাওয়া কৃষক-চাষির অধিকার ও মুক্তির আন্দোলনে যিনি নিজের জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছেন তিনি হলেন নাচোলের রানী মা ইলা মিত্র। সাঁওতালদের কাছে ইলা মিত্র মায়ের মত, তারা তাঁকে রাণী মা বলে ডাকতো। কমিউনিস্ট পার্টি, সাম্যবাদ ও সমাজতন্ত্র বলতে সাঁওতালরা রাণী মাকেই বুঝতেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, পাকিস্তানী আধিপত্য, জমিদার-জোতদারদের শাসন-শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে কৃষকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন যা তেভাগা আন্দোলন নামে খ্যাত, সেই আন্দোলনের পুরো ভাগে ছিলেন ইলা মিত্র। আন্দোলনের মাধ্যমে শোষিত, নিগৃহীত কৃষকদের ন্যায্য দাবি প্রতিষ্ঠা করে তিনি বাংলার কৃষকের দুর্দশা ঘোচানোর সংকল্প গ্রহণ করেছিলেন। মুসলিম লীগ সরকারের পুলিশ বাহিনীর বর্বরোচিত নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তিনি।

ইলা মিত্র জন্মেছিলেন ১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর কলকাতায়। বাবা নগেন্দ্রনাথ সেন ছিলেন বেঙ্গলের ডেপুটি অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল। তাদের আদি নিবাস তৎকালীন যশোরের ঝিনাইদহের বাগুটিয়া গ্রামে হলেও বাবার কর্মসূত্রে শৈশব ও কৈশোরের দীর্ঘ সময় তাঁকে কাটাতে হয়েছে কলকাতায়। পড়াশোনা করেছেন বেথুন স্কুল ও কলেজে। কিশোরী ইলা সেন (পারিবারিক পদবী) ছোটবেলা থেকেই ছিলেন খেলাধুলায় অত্যন্ত পারদর্শী। রাজ্য জুনিয়র অ্যাথলেটিক চ্যাম্পিয়ন যিনি একাধারে সাঁতার, বাস্কেটবল ও ব্যাডমিন্টন খেলায়ও ছিলেন সমান দক্ষ। ১৯৪০ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকের জন্য নির্বাচিত হওয়া তিনিই প্রথম বাঙালি মেয়ে।

পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে অলিম্পিক বাতিল হয়ে যাওয়ায় তার আর সেই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা হয়নি। খেলাধুলা ছাড়াও অভিনয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ইলা মিত্রের ছিল সমান বিচরণ। ইলা মিত্র বেথুন কলেজে পড়াশুনা করার সময় নারী আন্দোলনের মধ্যদিয়ে রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। ১৯৪৩ সালে তিনি যখন বেথুন কলেজে বাংলা বিভাগে সম্মান শ্রেণির ছাত্রী তখন কলকাতার মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির সদস্য হন। ওই একই সালে বিধবা হিন্দু কোড বিলের পক্ষে আন্দোলনে যোগ দেন। তিনি মাত্র ১৮ বছর বয়সেই ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৪৫ সালে ইলা সেনের বিয়ে হয় বিপ্লবী কমিউনিস্ট নেতা রমেণ মিত্রের সাথে। শ্বশুরবাড়ির রক্ষণশীল জমিদার বাড়ির অন্দরমহলের বন্দিত্বে যখন ইলা মিত্রের প্রাণ ওষ্ঠাগত ঠিক সেই সময় কিছুটা মুক্তির স্বাদ নিয়ে আসে গ্রামবাসীর একটি প্রস্তাব– রমেণ মিত্রের এক বন্ধুর পৃষ্ঠপোষকতায় বাড়ির কাছেই কৃষ্ণগোবিন্দপুর হাটে মেয়েদের জন্য একটি স্কুল খোলা হয়। গ্রামবাসীর দাবিতে তাদের রাণী মা অর্থাৎ ইলা মিত্রের ওপর দায়িত্ব পড়ে স্কুল পরিচালনার। মাত্র ৩ জন ছাত্রী নিয়ে স্কুলটি শুরু করলেও ইলা মিত্রের আন্তরিক প্রচেষ্টায় অল্প কিছুদিনের মধ্যে ছাত্রী সংখ্যা বেড়ে ৫০ এ উন্নীত হয়। আর এর মাধ্যমেই শুরু হয় সংগ্রামী ইলা মিত্রের পথ চলা।

১৯৪৩ সালে অর্থাৎ বাংলা ১৩৫০ সনে বাংলায় দেখা দেয় দূর্ভিক্ষ, যা পঞ্চাশের মন্বন্তর নামে পরিচিত। এই দূর্ভিক্ষের সময় কৃষকের ওপর শোষণের মাত্রা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। তিন ভাগের দুই ভাগ ফসল কৃষকের এই দাবি নিয়ে সংগঠিত হয় তেভাগা আন্দোলন। কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক সমিতি চাষিদের সংগঠিত করে আন্দোলন জোরদার করতে থাকে। আর এই আন্দোলনে ইলা মিত্র ও রমেণ মিত্র সরাসরি মাঠ পর্যায়ে কৃষক সংগঠনের সাথে যুক্ত হন।

১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা শুরু হলে কমিউনিস্ট পার্টি দাঙ্গা বিধ্বস্ত এলাকায় সেবা ও পুনর্বাসনের কাজ করতে এগিয়ে আসে এসময় ইলা মিত্র নোয়াখালীর দাঙ্গা বিধ্বস্ত হাসনাবাদে পুনর্বাসনের কাজে চলে যান। ১৯৪৯ সালে নাচোলে ফিরে আসেন, তার নেতৃত্বে হাজার হাজার ভূমিহীন কৃষক সংগঠিত হয়। নাচোল অঞ্চলে তেভাগার বাস্তব রূপ দিতে চেষ্টা করেন তারা। এই আন্দোলনে পুলিশ তাদের ওপর নির্যাতন চালায়। ঘরবাড়ি ধ্বংস করে, গুলি করে হত্যা করে অসংখ্য মানুষকে, নারী ধর্ষণ, শিশুর ওপর চলে যৌন নির্যাতন। আন্দোলনের শাস্তি হিসেবে তৎকালীন পাকিস্তানীদের রোষে ১৯৫০-১৯৫৪ সাল পর্যন্ত রাজশাহীর কারাগারে বন্দি ছিলেন ইলা মিত্র। যেখানে তাঁর ওপর চালানো হয় পাশবিক অত্যাচার, জেলে বন্দি অবস্থায় তাকে হতে হয় ধর্ষিত। কারাবন্দি অবস্থায় তিনি যে নির্মতার শিকার হন তা তাঁর জবানবন্দিতেই প্রতিফলিত হয়েছে- ‘‘এরপর আমার ডান পায়ের গোড়ালিতে একটা পেরেক ফুটিয়ে দেয়া হলো। সে সময় আধা অচেতন অবস্থায় পড়ে থেকে আমি এসআইকে বিড়বিড় করে বলতে শুনলাম- আমরা আবার রাতে আসছি এবং তুমি যদি স্বীকার না করো তাহলে সেপাইরা তোমাকে ধর্ষণ করবে। গভীর রাতে এসআই ও সেপাইরা ফিরে এলো এবং তারা আবার সেই হুমকি দিল। কিন্তু যেহেতু তখনো কিছু বলতে রাজি হলাম না, তখন তিন-চারজন আমাকে ধরে রাখল এবং একজন সেপাই সত্যি সত্যি আমাকে ধর্ষণ করতে শুরু করল। এর অল্পক্ষণ পরেই আমি অজ্ঞান হয়ে পড়লাম।’’ এই নির্যাতনের মধ্যদিয়ে প্রকাশ পায় শোষক শাসক বাহিনী একজন নারীর ওপর কতটা নির্মম হতে পারে। নির্যাতনের ভয়াবহতার দরুন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে ১৯৫৪ সালে চিকিৎসার জন্য তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের যুক্তফ্রন্ট সরকার ইলা মিত্রকে প্যারোলে মুক্তি দেয়। এরপর তিনি কলকাতায় দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হলেও সেখানেই থেকে যান। পরবর্তী জীবনে ইলা মিত্র ভারতের বিধান সভার সদস্য হন, তিনি ভারতের মহিলা ফেডারেশনের জাতীয় পরিষদ সদস্য, পশ্চিমবঙ্গ মহিলা সমিতির সহ-সভানেত্রী এবং ভারত ও সোভিয়েত সাংস্কৃতিক সমিতির সহ-সভানেত্রী ছিলেন। এর মধ্যে ১৯৬২ সালে চীনের ভারতবর্ষ আক্রমণের সময় এবং ১৯৭০, ১৯৭২ সালে মোট চারবার বন্দি হন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ইলা মিত্র এবং রমেন্দ্র মিত্র অকৃত্রিম বন্ধুর মতো শরণার্থীদের পাশে ছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৪ সালে ইলা মিত্র একবার শিক্ষক সমিতির সম্মেলনে যোগদানের জন্য বাংলাদেশে আসেন। এরপর ১৯৯৬ সালের ৪ নভেম্বর তেভাগা আন্দোলনের ৫০তম বার্ষিকী উদযাপনের অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য ঢাকায় আসেন।

লেখালেখিতেই ইলা মিত্র তাঁর স্বকীয়তা দেখিয়েছেন। তাঁর লেখা বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- জেলখানার চিঠি, মনেপ্রাণে- ২খণ্ড। এছাড়া অনুবাদ করেছেন লেনিনের জীবনী, হিরোশিমার মেয়ে এবং বেশকিছু রুশগল্প, যা আধুনিক রুশ গল্প নামে প্রকাশিত হয়েছে। হিরোশিমার মেয়ে বইটির জন্য তিনি ‘সোভিয়েত ল্যান্ড নেহেরু’ পুরস্কার লাভ করেন।

ইলা মিত্র ভোগ করেছেন অমানুষিক নির্যাতন, তবুও থেমে যাননি শোষণ মুক্তির আদর্শের লড়াইয়ে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সাধারণ মানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করে গেছেন এই সংগ্রামী মহিয়সী নারী। কৃষক আন্দোলনে যোগ দিয়ে শোষিতের পাশে দাঁড়িয়েছেন আবার শিক্ষকতা করে অগণিত শিক্ষার্থীকে আলোর পথ দেখিয়েছেন। এই দর্শন আজ ক্রমশ ফিকে হয়ে যাচ্ছে- যা হবার কথা ছিল না। কিন্তু আমরা তা ভুলে ক্রমশ যেন পেছন পথে হাঁটছি। তাই আমাদের সংগ্রাম ও সংকল্প পুনরায় শাণিত করতে ইলা মিত্রের আদর্শ ও জীবনবোধকে প্রেরণা হিসেবে নিতে হবে।

২০০২ সালের ১৩ অক্টোবর ৭৭ বছর বয়সে নারী জাগরণ ও কৃষক আন্দোলনের এই কিংবদন্তি কৃষকনেত্রীর জীবনাবসান হয়।

জয়তু ইলা মিত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published.