শতবর্ষে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি

আবুল খায়ের

১৯২১-এর ১ জুলাই চীনের শিল্পনগরী সাংহাইয়ের নদীবক্ষে এক নৌকার উপর জন্মগ্রহণ করেছিল চীনের কমিউনিস্ট পার্টি। তারপর থেকে আজ অবধি শতবর্ষের অভিযাত্রায় শতকোটি মানুষের দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করে মেহনতী মানুষের যে অভূতপূর্ব জাগরণ সিপিসি ঘটিয়েছে তা ইতিহাসের পৃষ্ঠায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে।

আফিম যুদ্ধ থেকে শুরু করে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব পর্যন্ত কালপর্ব জুড়ে চীনের ইতিহাসে পশ্চিমা দেশগুলোর যে ভূমিকা চিহ্নিত হয়ে আছে সে ভূমিকা থেকে তারা বিন্দুমাত্রও সরে আসেনি। প্রলেতারিয়েত ও বুর্জোয়ার দ্বন্দ্ব বৈরমূলক। এখানে শক্তির ভূমিকা নির্ধারক। এটি স্পষ্ট হয় সম্প্রতি দক্ষিণ চীন সাগর, তাইওয়ান ও হংকংয়ে অস্থিতিশীলতা তৈরিতে ইঙ্গ-মার্কিন চক্রান্তে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে শিনজিয়ান প্রদেশে উইঘুর সংখ্যালঘু জাতিসত্তার মানবাধিকার নিয়ে দানবদের মিথ্যাচার। একতরফাভাবে আরোপিত নানাবিধ অন্যায্য অসম শর্তের কবলে পড়ে চীন-মার্কিন সম্পর্কের দ্বান্দ্বিকতা বাণিজ্যের বিকাশকে মন্থর করেছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ‘আলাস্কা আলোচনায়’ এসব অবাঞ্ঝিত ঘটনায় দৃঢ়তার সাথে স্বীয় মতামত ব্যক্ত করেছে গণচীন।

একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের সূচনালগ্নে মরনোন্মুখ একচেটিয়া পুঁজিবাদ শয্যাশায়ী অবস্থা থেকে অর্থনীতি ও বাণিজ্যে চরম সংরক্ষণবাদী নীতি গ্রহণ করেছে। স্ব-সৃষ্ট প্রতিষ্ঠান ও নীতিমালা নিজেই ভেঙে ফেলছে। নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করছে। যেন নিজেই নিজের শত্রু হয়ে উঠেছে! শত্রু তৈরি করে একচেটিয়ার স্বার্থে ধর্মকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করছে। শতবর্ষ আগে ঘোষিত মুমুর্ষু পুঁজিবাদ দীর্ঘকাল সংকটে থেকে সমাধিস্থ হওয়ার আগে গোটা বিশ্বকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে মুনাফা লুটছে।

মালথাসের কুখ্যাত জনসংখ্যা নীতির ঘোরতর সমর্থক একচেটিয়া পুঁজিপতি শ্রেণী সর্বোচ্চ মুনাফা লুটতে পুঁজির দাসত্ব করছে। শুধু শ্রমিকের মজুরি-দাসত্ব না, দুনিয়া নীরবে দেখছে গোটা মানব জাতিকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে পুঁজিপতির পুঁজির-দাসত্ব! যেমনটা ১৬০ বছর আগে প্রবচন হয়েছিল এই কথায় যে, ‘পুঁজি হাঙ্গামা-সংঘর্ষ থেকে পালায় ও ভারী ভীরু, কথাটা সত্যি তবে সম্পূর্ণ করে বলা হলো না। আগে যেমন বলা হতো, প্রকৃতি শূন্য ঘৃণা করে, পুঁজিও তেমনি মুনাফাহীনতা বা অতি কম মুনাফা থেকে পালায়। যথেষ্ট মুনাফার ক্ষেত্রে পুঁজি ভারী সাহসী। সুনিশ্চিত শতকরা দশে যে কোনো জায়গায় পুঁজির বিনিয়োগ সম্ভব করবে; সুনিশ্চিত শতকরা কুড়িতে সৃষ্টি করবে আগ্রহ; শতকরা পঞ্চাশে রীতিমত ঔদ্ধত্য; শতকরা একশ’য় তা সমস্ত মানবিক নিয়ম পদদলিত করতে প্রস্তুত থাকবে; শতকরা তিনশ’য় এমন অপরাধ নেই যাতে সে কুণ্ঠিত, এমন ঝুঁকি নেই যা সে নেবে না, এমন কি মালিকের ফাঁসি হবার সম্ভাবনা সত্ত্বেও। যদি হাঙ্গামা ও সংঘর্ষে মুনাফা আসে, তবে অবাধে দুয়েরই উস্কানী দেবে সে। যা বলা হলো, তা যথেষ্ট প্রমাণিত হয়ে গেছে চোরাচালান ও ক্রীতদাস বাণিজ্যে।’ কথাগুলো তাৎপর্যপূর্ণ এবং আজও প্রযোজ্য।সুতরাং আগামীতে সাম্রাজ্যবাদের পেতে রাখা বেড়াজাল ছিন্ন করে এগুতে হলে দেশে দেশে অর্থনৈতিক বিকাশ ত্বরান্বিত করে বিশ্বজনীন কর্মসূচী প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। যেমনটা ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড কর্মসূচী’, মহাকাশ কর্মসূচীসহ আরো বহুবিধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে চীন বাস্তবায়ন করে চলেছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, গত শতাব্দীর ’৯০-এর দশকের শুরুতে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের সবচেয়ে বিপর্যস্ত ঘটনা ছিল বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি। ১৮৭১-এর প্রলেতারীয় একনায়কত্বহীন ‘প্যারি কমিউন’ টিকে ছিল ৭১ দিন। ৭৩ বছর টিকে থাকা সোভিয়েত ইউনিয়নকে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হতে দেয়নি ইউরো-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। উপরন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নকে ধ্বংস করতে সামাজ্যবাদী যুদ্ধবাজ গোষ্ঠী সম্ভাব্য সকলপন্থা অবলম্বন করেছে। এসব সত্ত্বেও সোভিয়েত ইউনিয়ন আপন বলয় তৈরি করে নবোদ্ভূত গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সাম্রাজ্যবাদের সকল ষড়যন্ত্র ভেদ করে এগিয়েছে। বিশ্বব্যাপী যুদ্ধের সম্ভাবনাকে স্থানিক পর্যায়ে নামিয়ে এনে তা আলোচনার টেবিলে স্থাপনের চেষ্টা করেছে। দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শান্তি আন্দোলন গড়ে তুলেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির নিরাপদ ছাতার নীচে বেড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন ও দেশে দেশে জাতীয় মুক্তি আন্দোলন। চীন, কোরিয়া, কিউবা, ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ বিপ্লবের ইতিহাস তার জ্বলন্ত প্রমাণ। সোভিয়েত ইউনয়িনভূক্ত ১৫টি প্রজাতন্ত্র স্বাধীন হয় সম্পূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায়। প্রজাতন্ত্রসমূহের স্বাধীন হওয়ার বিধান সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক সংবিধানে যেভাবে সংরক্ষিত ছিল, ঠিক সেভাবেই তা অক্ষরে অক্ষরে অনুসৃত হয়েছে। প্রজাতন্ত্রগুলো বিনা রক্তপাতে শান্তিপূর্ণভাবে সম্পূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। মানব জাতির ইতিহাসে এটি এক বিরল ঘটনা। সুতরাং ‘মুখে এক কথা আর কাজে আরেক কথা’ বুর্জোয়া গণতন্ত্রের শঠতাপূর্ণ পাশবিকতার বিপরীতে সামাজিকীকৃত গণতন্ত্র তথা সমাজতন্ত্র সাংবিধানিক অঙ্গীকার রক্ষায় সর্বমানবের প্রতি নিবেদিত মানবিক গণতন্ত্র তথা প্রলেতারীয় গণতন্ত্রের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছে। মানব ইতিহাসে সোভিয়েত জনগণের বীরত্ব ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান যুগে যুগে নতমস্তকে স্মরণ করতেই হবে। সোভিয়েত সমাজতন্ত্র বেঁচে আছে বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের চেতনায়।

প্রকৃতপক্ষে মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী মতাদর্শ ও সোভিয়েত বিপ্লবের লাল পতাকার সার্থক উত্তরাধিকার চীনা কমিউনিস্ট পার্টি। শতবর্ষের অগ্রযাত্রায় চীনের কমিউনিস্ট পার্টি’র নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছে যুগান্তকারী সব ঘটনা। শতাব্দী জুড়ে বৈপ্লবিক আন্দোলন বিকশিত করে তা সফল পরিণতির দিকে এগিয়ে নিতে মার্ক্সীয় দর্শনের তত্ত্ব ও অনুশীলন তথা দ্বান্দ্বিক বস্তবাদী দর্শনের পদ্ধতিগত যে সাফল্য চীনের কমিউনিস্ট পার্টি দেখিয়েছে তা অনুসরণীয়। বিশ্ব বিপ্লবের নেতৃত্ব এখন চীনা কমিউনিস্ট পার্টির হাতে। ইতিহাস তা প্রমাণ করেছে। একদা আফিম খাইয়ে যে জাতিকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিল বৃটিশ সাম্র  াজ্যবাদ, সেই জাতির ঘুম ভাঙিয়েছে কমিউনিস্ট পার্টি। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি পাঁচ সহস্রাধিক বছরের ইতিহাস মন্থন করে ইতিহাসের অমোঘ-অনিবার্যতাকে স্থাপন করেছে সেই স্বাভাবিকতায়, যেখানে মানব জাতির বৃহত্তম শাখা মনুষ্য সভ্যতাকে কমিউনিজমে উত্তরণে নেতৃত্ব দিবে। শতাব্দীব্যাপী সংঘটিত অসংখ্য মহত্তর কর্মকাণ্ডের সে-সব স্পষ্ট করেছে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি। ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি’র নেতৃত্বে ‘লং মার্চ’ এবং মানব জাতির ইতিহাসে এ ধরণের ঘটনা প্রথম। ‘একটি ইশতেহার, একটি প্রচার বাহিনী, একটি বীজ বপনকারী যন্ত্র’ হিসেবে ‘লং মার্চ’ মানব জাতিকে প্রত্যক্ষ করিয়েছে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি। আদতে ‘লং মার্চ’ একটি ইশতেহার। ১৮৪৮-এর কমিউনিস্ট ইশতেহারের প্রায়োগিক রূপের দেখা মেলে চৈনিক রূপে ১৯৩৪-এর অক্টোবর থেকে ১৯৩৬-এর অক্টোবর কালপর্বে চীন ভূখণ্ডে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে ‘লং মার্চে’। যেন কমিউনিস্ট ইশতেহারে মুদ্রিত অক্ষরগুলো মানবরূপে ‘লং মার্চ’ করলো ঘোষিত লক্ষ্য কমিউনিজমের দিকে!

চীনা সমাজতন্ত্রের নেতৃত্বদানকারী চীনের কমিউনিস্ট পার্টি শতবর্ষ পূর্বে বিভিন্ন কমিউনিস্ট গ্রুপের ৫৭ জন কমিউনিস্ট সদস্যের ১২ জন প্রতিনিধি নিয়ে ছোট্ট লাল নৌকায় চেপে চীনে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার অগ্রযাত্রায় একদা যে ‘লং মার্চ’ শুরু করেছিল, আজও তা শেষ হয়নি। চীনা প্রলেতারিয়েত আন্তর্জাতিক প্রলেতারীয় শ্রেণীকে নবতর লং মার্চে শামিল করেছে। মনুষ্য সভ্যতার বিকাশের অসীম সম্ভাবনা নিয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি বিশ্ব অর্থনীতির সবল-সমর্থ বিকাশের দরোজা খুলে দিয়েছে। দেশে দেশে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন সংগঠিত করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কমিউনিজম বাস্তবায়ন করে গ্রহান্তরের অভিযাত্রায় মানব জাতিকে এগিয়ে নিতে বিশ্ব জুড়ে কমিউনিস্ট সমাজ প্রতিষ্ঠার কোন বিকল্প নেই!

লেখক: সংগঠক; কমিউনিস্ট কর্মী সংঘ। 

Leave a Reply

Your email address will not be published.