লড়াই-সংগ্রামের ৪৩ বছরে দীপ্ত পথচলার অঙ্গীকার যুব ইউনিয়নের

লড়াই-সংগ্রাম ও ঐতিহ্যে ৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ ঘুণে ধরা সমাজ পরিবর্তনে দীপ্ত পথচলা অঙ্গীকার করেছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সংগঠনটি দুই দিনব্যাপি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আয়োজন করেছিলো।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন ২৮ আগস্ট, বুধবার সকাল ৮টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি হাফিজ আদনান রিয়াদ ও সাধারণ সম্পাদক খান আসাদুজ্জামান মাসুমের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় কমিটি এবং সংগঠনের ঢাকা মহানগরের সভাপতি হাবীব ইমন ও সাধারণ সম্পাদক রাসেল ইসলাম সুজনের নেতৃত্বে ঢাকা মহানগর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সকল গণআন্দোলনের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেন।

দ্বিতীয় দিন ৩০ আগস্ট শুক্রবার বিকাল ৪টায় রাজধানীর মণি সিংহ সড়ক থেকে বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের সাবেক ও বর্তমান নেতৃবৃন্দের অংশগ্রহণে বর্ণাঢ্য র‌্যালি করেন রাজধানীর পল্টন প্রেসক্লাব এলাকায়। র‌্যালিটি ডেঙ্গুসহ শিক্ষা ও কর্মসংস্থান দাবিতে ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুন সম্বলিক ফেস্টুনসহ লাল তারার নীল পতাকায় সজ্জিত ছিল। পরে পুরানা পল্টনের মুক্তি ভবনের মৈত্রী মিলনায়তনে পুনর্মিলনী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। কবিতা-গান, শুভেচ্ছা বিনিময় আর স্মৃতিচারণে মধ্যে পুনর্মিলনী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি সাজানো হয় । এসব আয়োজনে শামিল হয়েছেন, যারা যুব ইউনিয়নের দর্শনকে চর্চা করেছেন যুগ যুগ ধরে। উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠাকাল থেকে জড়িত প্রবীণ থেকে বর্তমান সময়ের তরুণরাও।

স্মৃতিচারণে ও পুনর্মিলনীতে উঠে এসেছে ৪৩ বছরের নানা প্রতিবন্ধকতা, নানা সংগ্রাম- লড়াই, বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে পথচলার কথা। এ পথচলায় একদিকে যেমন গণমানুষের পাশে থেকে যুব সমাজের পথ নির্মাণ ও নির্দেশ করেছে, অন্যদিকে মানুষের জীবনবোধ ও অধিকার আদায়ের রাজনৈতিক সংগ্রামেও নেতৃত্ব দিয়েছে। দেশের প্রতিটি দূর্যোগ দুর্বিপাকে মানুষের জন্য সহযোগিতার অনন্য দৃষ্টান্ত রেখেছে যুব ইউনিয়ন। সেই সাথে আন্তজার্তিক সংগ্রামে, সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ ও দেশে দেশে মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে যুব ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ অব্যাহত রয়েছে।

স্মরণ করা হয় ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রথম শহীদ সোমেন চন্দ, চট্টগ্রাম বিদ্রোহের শহীদদের. নৃশংসভাবে নিহত হওয়া রাঙ্গামাটি জেলার সভাপতি শহীদ আবদুর রশিদ, নব্বই গণআন্দোলনে শহীদ কমরেড তাজুল ইসলাম, নূর হোসেন, আমিনুল হুদা টিটোকে। স্মরণ করা হয় যিনি গত প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতে উপস্থিত হয়ে ছিলেন, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের সেই সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য মাইনুদ্দিন আহমেদ জালালকে।

শুক্রবার বিকালে মৈত্রী মিলনায়তনে আলোচনা সভার শুরুতে সঙ্গীত পরিবেশন করেন উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সদস্যরা। পরে সংগঠনের সভাপতি হাফিজ আদনান রিয়াদের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক খান আসাদুজ্জামান মাসুমের সঞ্চালনায় যুব ইউনিয়নের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস পাঠ করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর কমিটির সভাপতি হাবীব ইমন।

এ সময় বক্তব্য রাখেন, সাবেক যুব ইউনিয়ন নেতা অ্যাড. সুব্রত চৌধুরী, সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য কামরুজ্জামান ননী, তারিক হোসেন মিঠুল, সিপিবি’র সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, যুব ইউনিয়নের সাবেক কোষাধ্যক্ষ গৌরঙ্গ মল্লিক, ক্ষেতমজুর সমিতির সভাপতি অ্যাড. সোহেল আহমেদ, ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মেহেদী হাসান নোবেল, যুব ইউনিয়নের প্রেসিডিয়াম সদস্য শিশির চক্রবর্তী, সাংগঠনিক সম্পাদক আশিকুল ইসলাম জুয়েল, ঢাকা জেলা সভাপতি সিয়াম সারোয়ার জামিল, জাতীয় যুব জোটের সভাপতি রোকুনুজ্জামান রোকন, বাংলাদেশ যুব আন্দোলনের সভাপতি মুশাহিদ আহম্মেদ প্রমুখ।

এ সময় বিভিন্ন ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। শুধু আনন্দ সম্মিলন হয় নি, বরং এ সময়ে যুবকদের লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার জন্য সংগঠিত হওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। যুবকদের এই পুনর্মিলনী আড্ডায় উঠে এসেছে সম-সাময়িক আন্দোলনগুলোর কথা,উঠে এসেছে অতীতে যুবকদের বিভিন্ন অবদানের কথা, এসেছে সমাজ পরিবর্তনের লড়াইয়ে তাদের ভূমিকা রাখার কথা, অন্ধ দলদাসত্ব-প্রদর্শনবাদীতার বিপরীতে মানুষের জন্য লড়াইয়ে প্রগতিমুখী যুবকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ করার কথা। সাম্যের স্বপ্নতাড়িত চোখে বাস্তবকে গলিয়ে নতুন ভবিষ্যতের ছাঁচ গড়বার দায়িত্ব নেবে বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন-এই কথাটিই বারবার উচ্চারিত হলো।

উল্লেখ্য, যুব আন্দোলন, নতুন কাজের ধারা, মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতায় অসীম তারুণ্য নিয়ে ১৯৭৬ সালের ২৮ আগস্ট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন। গোপীবাগে কমরেড সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিকের বাসার ছাদে মাত্র ছাত্র আন্দোলন শেষ করা ১৫-২০ জন যুবক, যাদের অধিকাংশই ছিল মুক্তিযোদ্ধা, তাদের প্রাথমিক প্রচেষ্টায় তৎকালীন গুমোট পরিবেশে সাহসের সাথে মোকাবেলা করার জন্য যে সংগঠন গড়ে উঠেছিল তার নাম ‘গণতান্ত্রিক যুব ইউনিয়ন’। ফলশ্রুতিতে এ অঞ্চলে যুবকদের প্রকৃত আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়। এর মধ্য দিয়ে যুব সমাজের ভেতর দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সাম্রাজ্যবাদ-ফ্যাসিবাদবিরোধী ও শূন্যপদে নিয়োগদানে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পুরো দেশে। ১৯৭৭ সালের ৯-১০জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত প্রথম সম্মেলনে এর নাম হয় ‘বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন’।

Leave a Reply

Your email address will not be published.