লোভের বলি ধরিত্রী, প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ

মীর মোশাররফ হোসেন  

গত কয়েক মাস ধরে গ্লাসগো সম্মেলন নিয়ে ব্যাপক হাউকাউ হচ্ছিল, এই হবে, সেই হবে। কিন্তু সম্মেলন শুরুর দুদিন যেতে না যেতেই সবাই বুঝে গেছে গল্পের গরু গাছে উঠানো হলেও, বাস্তব বড় তিতা। পরিস্থিতি এখন দেখেন। সবাই ঠান্ডা মেরে বসে আছে। যে প্রত্যাশার ফানুস ওড়ানো হয়েছিল, তা সত্যিই চুপসে গেছে। সবাই বুঝে গেছে, বিশ্ব নেতাদের মুনাফার চাহিদার কাছে পরিবেশ তুচ্ছ। মানুষ, প্রাণীকূলের অস্তিত্বের প্রশ্ন তাদের অগ্রাধিকার তালিকায় অনেক নিচে।

গ্লাসগোতে হচ্ছে কপ২৬। মানে কপের ২৬তম আয়োজন। কপ মানে হচ্ছে কনফারেন্স অব পার্টিজ। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বার্ষিক সম্মেলন। তা কারা কারা এই সম্মেলনে যান। সবাই। কপের এই ‘পার্টির’ মধ্যে তুলনামূলক বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশ যেমন আছে, কম নিঃসরণ করেও বেশি ভুক্তভোগী হওয়া বিভিন্ন দেশও আছে। আর আছে দোষ চাপানোর খেলা। সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলো দোষ চাপাবে উন্নয়নশীল আর গরিব দেশগুলোর ওপর। বলবে, তোমরা কার্বন নিঃসরণ কমাও, অথচ ক্ষতিপূরণ চাইলেই তাদের যত ‘ব্লা, ব্লা, ব্লা’। অথচ এক যুগ আগে তারাই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ২০২০ সালের মধ্যে জলবায়ু তহবিলে তারা বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার দেবে, যা দিয়ে বাংলাদেশের মতো ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে; চেষ্টা করবে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে যত দ্রুত সম্ভব ‘কার্বন নিরপেক্ষ’ দেশ হওয়ার।

আর একটা প্রতিশ্রুতি তথাকথিত বিশ্বনেতারা আমাদের দিয়েছিলেন। ৬ বছর আগে, কপ-২১ এ তারা বলেছিলেন, বিশ্বের তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে ২ ডিগ্রির বেশি হলে ভয়াবহ তাণ্ডব শুরু হবে; বৃষ্টি, খরা, দাবানল, ঝড়. জলোচ্ছ্বাস, সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস, চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার তীব্রতা বৃদ্ধির মতো নানান কিছু এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে যে সেটিকে আর কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না। কী কী যে হতে পারে, তা গত কয়েক বছরে আমরা খানিকটা টেরও পাচ্ছি। অসময়ে বৃষ্টি, বন্যা হচ্ছে। তাপমাত্রার আগুনের হল্লা টের পাওয়া যাচ্ছে। দাবানল মাইলের পর মাইল এলাকা পুড়ে ছারখার করে দিচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় বছরের পর খরা লেগে থাকছে। একটা দুর্যোগ যেতে না যেতেই দেখা যাচ্ছে আরেকটা দুর্যোগ। এবং সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে এখন প্রত্যেকটি দুর্যোগের স্থায়ীত্ব ও তীব্রতা আগের সময়ের তুলনায় অনেক অনেক বেশি।

যা হোক, ২০১৫ সালে, কপ-২১ এ ‘বিশ্বের মহান নেতারা’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তারা যেভাবেই হোক তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে ২ ডিগ্রির বেশি যেন না হয়, তার জন্য সব করবেন। ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষ দুনিয়া বানাতে কার্বন নিঃসরণ নির্ভর শিল্প ব্যবস্থা আমূল বদলে ফেলবেন, আরও হাতিঘোড়া মারবেন। এই প্রতিশ্রুতি দেওয়ার বছর কয়েক পরই সুর বদলে গেল যুক্তরাষ্ট্রের; তাদের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিলেন। স্বাভাবিকভাবেই আস্ত চুক্তি পড়ে গেল ঝুঁকির মধ্যে; পশ্চিমা দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে টানাহেঁচড়া করে, হাতে-পায়ে ধরে; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র নাছোড়বান্দা। ট্রাম্পের পরিষ্কার অবস্থান, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্র চীনের কাছে ব্যবসায় হারতে রাজি নয়।

ট্রাম্প যাওয়ার পর বাইডেন এলেন। তিনি পুরনো প্রতিশ্রুতিতে ফিরলেন। এবং তাদের প্রত্যাবর্তনের কারণেই এবারের জলবায়ু সম্মেলনকে ঘিরে প্রত্যাশার হাইপ অনেকখানি উঠে গিয়েছিল। ভাবা হচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ফিরে এমন সব প্রতিশ্রুতি দেবে, যা সারা দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দেবে। যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ইউরোপও বাধ্য হবে। তারা অন্যদের সঙ্গে দরকষাকষি করবে, এবং শেষতক দুনিয়ার তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে দেড় ডিগ্রির বেশি হবে না, তা নিশ্চিতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে বছরে ১০০ বিলিয়নের বেশি ডলার দেওয়ার মারমার কাটকাট একটা চুক্তি হবে।

সম্মেলন শেষ হওয়ার তারিখ ১২ নভেম্বর। তার মধ্যে এই দুই প্রত্যাশার অন্তত একটাও পূরণ হবে এমন চুক্তির আশা দেখছি না। পর্বতের মূষিক প্রসবের মতো একখান চুক্তি এসেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বন বিনাশের অবসানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে করা ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে শতাধিক রাষ্ট্র। তাতে আবার বাংলাদেশ, ভারতের মতো অনেক দেশ নেই। এদিকে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেও চুক্তি নিয়ে সমালোচনায় নেমেছে ইন্দোনেশিয়া। এর আগে ২০১৪ সালেও বন ধ্বংস কমিয়ে আনতে একটা চুক্তি হয়েছিল, যা বাস্তবায়ন করা যায়নি; এবারও একই কাণ্ড ঘটবে বলে বিশেষজ্ঞরা আগে থেকেই অনুমান করছেন।

তো সবকিছুর দায় কার? কেন চীনের- এমনটাই মনে হবে বিবিসি, সিএনএনের মতো পশ্চিমা গণমাধ্যমের রব দেখলে। চীনের তো দায় আছেই। সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করে তারা। কিন্তু পার ক্যাপিটা হিসেবে? মানে, জনসংখ্যা অনুপাতে কার্বন নিঃসরণ- সেখানে চীনের স্থান অনেক নিচে। উপরে আছে উত্তর আমেরিকার শিল্পোন্নত দেশগুলো, ইউরোপ আর মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্রগুলো। অথচ সব দায় চীনের, তারা কার্বন নিঃসরণ করে দুনিয়ার বারোটা বাজিয়ে ফেলছে, উদ্ধারকর্তা হিসেবে আছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (কিন্তু পার ক্যাপিটায় তারা যে চীনের বাপ, সেকথাটা বলা যাবে না কিন্তু)।

তাও চীন বলেছে, তারা কার্বন নিরপেক্ষ দেশ হবে ২০৬০ এর আগেই। অর্থ্যাৎ ওই সময়ের মধ্যেই তারা তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় কয়লা এবং অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার অনেক কমিয়ে আনবে। বিদেশে কয়লাখনি বা কয়লানির্ভর প্রকল্পে বিনিয়োগ বন্ধেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বেইজিং। আর এদিকে ভারত কার্বন নিঃসরণ করে চীনের চারভাগের একভাগ, অথচ তাদের কার্বন নিরপেক্ষ দেশ হতে লাগবে ২০৭০ সাল। নরেন্দ্র মোদীর এই প্রতিশ্রুতির পর চীনবিরোধী পশ্চিমা দেশগুলোর দশা হয়েছে এমন- শ্যাম রাখি না কূল রাখি।

মোদ্দা কথা, সবার এই দড়ি টানাটানিতে এটা পরিষ্কার- পুঁজির বিকাশ সবার কাছেই ধরিত্রীর ভালো থাকার চেয়েও বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনৈতিক শক্তি অন্যদের তুলনায় ভালো। ভূখণ্ড চীনের চেয়ে ছোট হলেও জনসংখ্যা অনুপাতে তাদের কার্বন নিঃসরণ বেশি, জ্বালানি ‘কনজামপশান’ও বেশি; তারা ২০৫০ এর মধ্যে পরিবেশবান্ধব জ্বালানিতে চলে যাওয়ার ক্ষেত্রেও নিমরাজি। এখন চীন-ভারত যখন বলছে ২০৫০ এ পারবে না, তখন তাদেরও পোয়াবারো। ‘কনজামপশান’ না কমালেই তো চলছে। প্রফিট বিফোর প্ল্যানেটের যে মতবাদ তারা কয়েক শতাব্দী ধরে চাপিয়ে দিতে পেরেছে, তা আরও কিছুদিন তো আওড়ানো যাবে!

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য তহবিলে টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির বেলাতেও লবডঙ্কা। দিচ্ছি, দেবো, জলবায়ুর পরিবর্তনে আমাদের যে ক্ষতি তা কাটিয়ে ওঠার পর যতটুকু পারবো ততটুকু দেবো- এসব পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সব বাহানা শোনা যাচ্ছে। এতসব রঙ-তামাশা অবশ্য তরুণ-বামপন্থিদের চোখে ঠুলি পরাতে পারছে না। তারা মাঠে নেমেছে। গ্লাসগো সম্মেলনের বাইরে তাদের চিৎকার পশ্চিমা গণমাধ্যমে স্থান না পেলেও বিশ্বজুড়ে বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। সোজা ভাষায় তারা বলছে- পুঁজিবাদ বিশ্বকে ছিবড়ে বানিয়ে ফেলছে, মানুষ আর প্রাণীকূলের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। এর পাল্টায় প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষার ব্যবস্থাপনার দিকে পৃথিবীর স্টিয়ারিংকে ঘুরিয়ে দিতে হবে। মোটো ঠিক করতে হবে- প্ল্যানেট বিফোর প্রফিট। লাল পতাকা হাতে তাদের মিছিল, সমাবেশ, রাস্তা অবরোধ পৃথিবীকে বেঁচে থাকার জন্য খানিকটা হলেও শ্বাস যোগাচ্ছে; লোভী বেনিয়ার দল যে তাকে মেরে ফেলতে উদ্যত।

লেখক: সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published.