লেনিনবাদী পার্টির গঠন-কাঠামো সার্বক্ষণিক পেশাদার বিপ্লবীর অপরিহার্যতা

ডা. মনোজ দাশ

কমিউনিস্ট পার্টির সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে রাশিয়াতে পার্টি গঠনের সময় দীর্ঘ বিতর্ক হয়েছে। পার্টি গঠনের প্রাথমিক পর্বে লেনিন বিভিন্ন ধরনের পেটিবুর্জোয়া চিন্তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে সার্বক্ষণিক পেশাদার বিপ্লবীদের নেতৃত্বে পার্টির মূল সাংগঠনিক কাঠামো গঠন করার অপরিহার্যতা প্রতিপাদন করেছেন।

এখন আর সার্বক্ষণিক পেশাদার বিপ্লবীদের নিয়ে পার্টির মূল সাংগঠনিক কাঠামো গঠন সম্পর্কে কমিউনিস্ট পার্টিগুলির মধ্যে কোনো বিতর্ক নেই। এর মানে অবশ্য এই নয় যে, সার্বক্ষণিক পেশাদার বিপ্লবীদের নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টিগুলির মধ্যে আলোচনা শেষ হয়ে গেছে। ‘সার্বক্ষণিক পেশাদার বিপ্লবী সংক্রান্ত’ লেনিনীয় চিন্তাকে খর্বিত না করে কীভাবে তাকে আরো বিস্তৃত করার মাধ্যমে সার্বক্ষণিকদের সত্যিকার বিপ্লবী পেশাদারিত্ব অর্জনের উপযোগী করে তোলা যায়, কীভাবে তাদের বিপ্লবী জীবনকে আরও উজ্জ্বল করে তুলে নতুন প্রজন্মের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যায়, এসব বিষয় নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টিগুলির মধ্যে অনেক ধরনের আলোচনা আছে। ‘সার্বক্ষণিক পেশাদার বিপ্লবী সংক্রান্ত’ লেনিনীয় চিন্তাকে বিস্তৃত ও গভীর করতে হলে লেনিনের মূল চিন্তা বোঝা দরকার।

লেনিনকে তিনটি প্রবণতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হয়েছে। অনেকে পেশাদার বিপ্লবী সংক্রান্ত ধারণার সাথেই একমত ছিলেন না। অনেকে পেশাদার বিপ্লবীদের সার্বক্ষণিক হওয়ার অপরিহার্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আবার কেউ কেউ পেশাদার বিপ্লবীদের তাত্ত্বিক এবং সাংগঠনিক সংস্কৃতিগত মান ও দক্ষতা থাকা নিয়ে লেনিনের চিন্তার সাথে দ্বিমত করেছেন। লেনিন ধৈর্য ও দক্ষতার সাথে মতাদর্শিক সংগ্রাম ও বিপ্লবী কর্মকাইেমবর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তাঁর চিন্তার যথার্থতা প্রমাণ করতে সমর্থ হন।

প্রথমত পেশাদার বিপ্লবীদের অপরিহার্যতার প্রশ্নে লেনিন বিভিন্ন ধরনের পেটিবুর্জোয়া প্রবণতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে নিজের চিন্তার যথার্থতা তুলে ধরেন। ‘কী করতে হবে’ নামক পুস্তকে পেশাদার বিপ্লবীদের অপরিহার্যতার প্রশ্নে লেনিনের যুক্তি ছিলো- ‘শ্রমিকরা ধর্মঘটে ও রাস্তার সংগ্রামে পুলিশ বা সৈন্যদের বিরুদ্ধে বিরাট শক্তি প্রদর্শন ও আত্মত্যাগ করতে পারে। একমাত্র তারাই সমগ্র আন্দোলনের ফলাফল নির্ধারণ করতে সক্ষম। কিন্তু রাজনৈতিক পুলিশের বিরুদ্ধে সংগ্রামে বিশেষ গুণাবলীর প্রয়োজন হয়ে পড়ে। যার জন্য পেশাদার বিপ্লবীর প্রয়োজন হয়।’

দ্বিতীয়ত লেনিনকে ‘কী করতে হবে’ নামক পুস্তকে পেশাদার বিপ্লবীদের ‘সার্বক্ষণিকতা’ প্রতিপাদন করে তার বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে হয়েছে। লেনিনের কাছে তারাই পেশাদার বিপ্লবী যাদের পার্টির কাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজ নেই এবং এই কাজে যারা নিজেদেরকে সম্পূর্ণরুপে উৎসর্গ করে। লেনিনের নিজের কথায়- ‘জনতার আন্দোলনের স্বার্থে কাজ করতে আমাদের তেমন মানুষ লাগবে যারা শুধুমাত্র স্যোসাল ডেমোক্রেটিক কাজ করার জন্যই নিজেদের সম্পূর্ণরূপে উৎসর্গ করবে এবং এই সমস্ত মানুষেরা অবশ্যই নিজেদের ধৈর্যের সাথে অবিচলিতভাবে পেশাদার বিপ্লবী হিসেবে গড়ে তুলবে।’

তৃতীয়ত সার্বক্ষণিক পেশাদার বিপ্লবীদের ন্যূনতম তত্ত্বগত ও সাংস্কৃতিক মান থাকার ওপরও লেনিন গুরুত্ব আরোপ করেছেন। ‘কী করতে হবে’ নামক পুস্তকে’ লেনিন বলেছেন-‘তত্ত্বের বিষয়ে যিনি দুর্বল ও নড়বড়ে, দৃষ্টিভঙ্গি যার সংকীর্ণ, যিনি নিজের ঢিলেমির পক্ষে ওকালতি করতে জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ততাকে অজুহাত হিসেবে খাড়া করেন, জনগণের মুখপাত্রের চেয়ে ট্রেড ইউনিয়ন সম্পাদকের সাথে যার বেশি সাদৃশ্য, যিনি এমন একটি বৃহত্তর এবং সাহসী পরিকল্পনা করতে পারেন নাÑ যা এমন কী বিরোধীদের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করতে পারে এবং যিনি রাজনৈতিক পুলিশের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পেশাদারি নৈপুণ্যে অনভিজ্ঞ ও আনাড়িÑএই জাতীয় ব্যক্তি পেশাদার বিপ্লবী নয়, একবারেই দুর্ভাগা অপেশাদার।’

সুতরাং লেনিনের মতে পেশাদার বিপ্লবীদের ন্যূনতম তাত্ত্বিক উপলব্ধি থাকতে হবে। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততার উপরে নির্ভর না করে জনতাকে সংগঠিত করে আন্দোলনে নিয়ে আসার সাংগঠনিক ক্ষমতা থাকতে হবে পেশাদার বিপ্লবীদের। পরিকল্পনা রচনায় রাখতে হবে সৃজনশীলতার স্বাক্ষর। রাষ্ট্রের দমন পীড়নের বিরুদ্ধে যথার্থ কৌশল নিয়ে তিনি কাজ করতে পারদর্শী হয়ে উঠবেন।

চতুর্থত শুধু মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে আগত পেশাদার বিপ্লবীদের ওপর দায়িত্ব দেয়ার কথা লেনিন বলেননি। তিনি শ্রমিকশ্রেণি থেকে পেশাদার বিপ্লবী গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। লেনিনের মতে- ‘যত বেশি সংখ্যক শ্রমিককে পারা যায় শ্রেণি সচেতন করে গড়ে তুলে পেশাদার বিপ্লবীতে পরিণত করা এবং কমিটির সদস্য করা উচিত।’

পঞ্চমত লেনিন বিপ্লবী আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছিলেন বিপ্লবের নেতৃত্বকে শ্রেণি চেতনার প্রতি অবিচল রাখতে এবং সমস্ত রকম দোদুল্যমানতা থেকে রক্ষা করতে পার্টির মূল কেন্দ্রীয় অংশ গঠিত হবে এসব সার্বক্ষণিক ন্যূনতম তাত্ত্বিক জ্ঞানসম্পন্ন সমপ্রকৃতির পেশাদার বিপ্লবীদের দিয়ে। এজন্য লেনিন অ ষবঃঃবৎ ঃড় ধ পড়সৎধফব ড়হ ড়ঁৎ ড়ৎমধহরুধঃরড়হধষ ঃধংশ নামক রচনায় উল্লেখ করেছেন- ‘যতদূর সম্ভব সমপ্রকৃতির ক্ষুদ্রতম সংখ্যার ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একদল পেশাদার বিপ্লবীদের নিয়ে গঠিত নেতৃত্বের ওপর আন্দোলনের দায়িত্ব ন্যস্ত করা উচিৎ।’

পেশাদার বিপ্লবী হতে হলে সার্বক্ষণিক হতেই হবে এবং সার্বক্ষণিক পেশাদার বিপ্লবীদের নিয়ে পার্টির মূল সাংগঠনিক কাঠামো গঠন সম্পর্কেই শুধু লেনিন সচেতন ছিলেন না। আনুষ্ঠানিকভাবে সার্বক্ষণিক হলেই উন্নত পেশাদারিত্ব অর্জিত হয়ে যায় না, এ সম্পর্কেও লেনিন যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। লেনিন উন্নত পেশাদারিত্ব অর্জনকে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেছেন। বিপ্লবী পার্টিতে সার্বক্ষণিক পেশাদার বিপ্লবী গড়ে তোলার পাশাপাশি যাতে তারা উন্নত পেশাদারিত্ব অর্জন করতে পারে তার জন্য সুুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অভিমুখী পরিকল্পনা থাকা উচিত। সার্বক্ষণিক পেশাদার বিপ্লবীদের গড়ে তোলার দায়িত্ব পার্টি নেতৃত্বকেই নেওয়া উচিৎ।

লেনিন জানতেন শুধুমাত্র পেশাদার বিপ্লবীদের নিয়ে গঠিত সংগঠন দিয়ে বিপ্লব করা সম্ভব হবে না। পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে ঋরৎংঃ ংঢ়ববপয রহ ঃযব ফরংপঁংংরড়হ ড়হ ঃযব ঢ়ধৎঃু ৎঁষবং Ñএ লেনিন বলেছেন ‘এটা কখনো ভাবা উচিত নয় যে পর্টির সব সংগঠনগুলো অবশ্যই পেশাদার বিপ্লবীদের নিয়ে গঠিত হবে। আমাদের সর্বাধিক মাত্রায় বৈচিত্রময় বিভিন্ন প্রকৃতির, স্তরের এবং বিন্যাসের সংগঠন প্রয়োজন।’ পার্টির গঠন ও কাঠামো সম্পর্কে সাধারণভাবে লেনিন মনে করতেন পার্টির দুটো অংশ থাকবে। (১) নিয়মিত ক্যাডার যারা পার্টির নেতৃস্থানীয় পার্টি কর্মী, মূলত সার্বক্ষণিক পেশাদার বিপ্লবী। (২) স্থানীয় পার্টি সংগঠনের বৃহত্তর জাল এবং লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী মানুষের সমর্থন রয়েছে এমন বৃহৎ সংখ্যার পার্টি সদস্য।

সুতরাং লেনিনের তত্ত্ব অনুযায়ী বিপ্লবী পার্টি নেতৃত্বের মূল অংশ হবে সার্বক্ষণিক পেশাদার বিপ্লবী। প্রথমত পার্টি ছাড়া এসব বিপ্লবীদের অন্য কোন পেশা নেই, কাজ নেই। দ্বিতীয়ত তাদের থাকতে হবে তত্ত্বগত জ্ঞানের ন্যূনতম চেতনা। তৃতীয়ত তাদের থাকবে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, ধারাবাহিক সাংগঠনিক অনুশীলন এবং রাজনৈতিক পুলিশসহ যাবতীয় প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে পার্টিকে রক্ষার সামর্থতা। যারা ব্যক্তিগত প্রয়োজন, নানাবিধ সুবিধা অসুবিধার উর্ধ্বে উঠে নিঃসংশয়ে-নির্দ্বিধায় ও আনন্দের সাথে বিপ্লবী জীবনের সংগ্রামে সার্বক্ষণিকভাবে লিপ্ত থাকতে সক্ষম তারাই পেশাদার বিপ্লবী।

পার্টি কাজের জন্য এ ধরনের সার্বক্ষণিক পেশাদার বিপ্লবী সংগঠক থাকা দরকার। সার্বক্ষণিক পেশাদার বিপ্লবী ছাড়া পার্টির বিপ্লবী কর্মকাণ্ড অগ্রসর করে নেওয়া যায় না। সার্বক্ষণিক কর্মী গড়ে তোলার দায়িত্ব পার্টির নেতৃত্বের। রাজনীতি-মতাদর্শ ব্যতিরেকে সার্বক্ষণিক কর্মী তৈরি হয় না। সর্বক্ষণিক কর্মীদের বিকশিত করার সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। এটাই পার্টি নেতৃত্বের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কাজ। সার্বক্ষণিক কর্মীদের ভাতার দায়িত্ব পার্টির। জীবনধারণের জন্য সর্বনিম্ন যতখানি প্রয়োজন ন্যূনতম সেই পরিমাণ ভাতা সুনিশ্চিত করা দরকার। পার্টিকে তার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা করতে হয়। সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে অগ্রসর হলে পার্টি সদস্যদের মধ্য থেকেই সার্বক্ষণিক কর্মী গড়ে তোলা সম্ভব।

আবার এটা কখনোই ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না বিপুল সংখ্যক অসার্বক্ষণিক ছাড়া সংগঠন ও বিপ্লব সম্ভব নয়। অসার্বক্ষণিক বিপুল সংখ্যক পার্টি সদস্যকে নানাভাবে সংগঠিত করে তাদের বিপ্লবী কর্মকাণ্ড ও বহুমুখী কাজে নিয়োজিত করতে না পারলে পার্টি শক্তিশালী হতে পারে না। অসার্বক্ষণিকদের মধ্যে বিপ্লবী পেশাদারিত্বের চেতনা না থাকলে শুধুমাত্র সার্বক্ষণিক দিয়ে পার্টির কাজ চলে না। পার্টি গতিশীল থাকতে পারে না। কমিউনিস্ট পার্টিতে অসার্বক্ষণিক পার্টি সদস্যকেও বিপ্লবী পেশাদারিত্বের চেতনায় কাজ করার চেষ্টা করতে হয়। বিপ্লবী লক্ষ্যে সাধ্যমতো কাজ করাটাকে অবসরকালীন বা হাল্কা দৃষ্টিভঙ্গি বা লক্ষ্যহীনভাবে গ্রহণ না করে, তাকে গুরুত্বের সাথে লক্ষ্যঅভিমুখীভাবে নিয়মিত বিপ্লবী কাজের অংশ হিসেবে দেখার নামই হচ্ছে বিপ্লবী পেশাদারিত্বের চেতনা। রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের মতো একটি গণভিত্তি সম্পন্ন বিপ্লবী পার্টি গড়ে তোলার জন্য সার্বক্ষণিক পেশাদার বিপ্লবীদের নিয়ে পার্টির মূল কেন্দ্রীয় অংশ গঠন করার পাশাপাশি বিপ্লবী পার্টিগুলোতে বিপুল সংখ্যক অসার্বক্ষণিক সদস্যদের ন্যূনতম পেশাদারিত্বের চেতনায় কাজ করা অপরিহার্য।

লেখক: সদস্য, সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.