লুটপাটতন্ত্র দুঃশাসন থেকে মুক্তি পেতে প্রয়োজন গণঅভ্যুত্থানের জোর প্রস্তুতি

একতা টিভির বিশেষ প্রতিবেদন:

গত ক’দিন যাবত বিভিন্ন পর্যায়ের দুর্নীতি ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’। একটার পর একটা ঘটনা উন্মোচিত হচ্ছে আর মানুষ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়ছে। এ মুহূর্তে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে ‘ক্যাসিনো বাণিজ্য’। এতদিন মানুষ হাউজি আর জুয়ার কথাই জানতো।

এখন এ-ও জেনেছে, ঢাকা শহরের অভিজাত বিনোদন ক্লাব, স্পোর্টস ক্লাব, পেশাজীবী ক্লাব সবগুলোর আয়ের প্রধান উৎস নাকি জুয়া আর হাউজি। এখন আবিষ্কার হয়েছে কেবল ঢাকা শহরেই ৬০ থেকে ১০০টি ক্যাসিনো রয়েছে তথাকথিত ক্লাবগুলোর আড়ালে।

এখন সবাই জানে ঢাকা শহরের ক্যাসিনো ব্যবসার প্রধান নিয়ন্ত্রক ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের যুব সংগঠন আওয়ামী যুবলীগের বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ। এরইমধ্যে ‘ক্যাসিনো বাণিজ্য’সহ বিভিন্ন অভিযোগে সংগঠনটির একাধিক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অনেক নেতা নজরবন্দি আছেন। কেবল যুবলীগ নয় আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের শীর্ষ নেতাসহ বেশ কয়েকজন নেতার নামও উঠে এসেছে ক্যাসিনো ব্যবসার সাথে জড়িতদের তালিকায়।

একটি দৈনিক পত্রিকা তাদের সূত্রের বরাতে খবর দিয়েছে ক্যাসিনো নামে রাজধানীতে জমজমাট ১২টি ক্লাব আছে। এসব জুয়ার আসর থেকে যুবলীগের নামে দৈনিক ভিত্তিতে বিপুল পরিমাণ চাঁদা তোলা হয়। প্রতিটি ক্লাব থেকে দৈনিক চাঁদা নির্ধারণ করা আছে ১০ লাখ টাকা। সে হিসাবে দৈনিক চাঁদার পরিমাণ ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। তাতে মাসে চাঁদা ওঠে ৩৬ কোটি, বছরে ৪৩২ কোটি টাকা। যুবলীগ ছাড়াও বিশাল অঙ্কের এই টাকার ভাগ যায় সরকারি দলের বিভিন্ন প্রভাবশালী নেতাদের পকেটে।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্রের অভ্যন্তরে ক্যাসিনোর খোঁজ পাওয়ায় হতাশ এবং ক্ষুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা ড. শেখ বাতেন সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন- ‘মুক্তিযোদ্ধা ক্লাবের ক্যাসিনো নিয়ে কিছু বলার দায় আছে আমার।

আমি আজকে মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, ওই ক্লাবের সঙ্গে কেনো মুক্তিযোদ্ধা নেই। মুক্তিযোদ্ধাদের নামে ক্লাব করে জুয়ার অধিকার আপনাদের কে দিলো? আমাদের বেইজ্জৎ করার অধিকার কে দিলো? ওখানে প্রতিরাতে যে পরিমাণ টাকার ট্রানজাংকশন হয়, কে কতো পায়, শুনে আমি তাজ্জব।

অথচ ভাত কাপড়ের জন্য কষ্ট পাই আমরা, আমাদের তরুণেরা, এমনি কি রক্ত সম্পর্কের আপনজনেরা। ওই নামে যারা ক্লাব খুলেছে, তাদের হ্যান্ডকাপ যেনো কখনো খোলা না হয়। তাদের আলাদা শাস্তি হোক, আমাদের নাম ব্যবহার করে লুটতরাজের জন্য।’

গণিকাবৃত্তি ও জুয়াখেলা নিরোধের জন্য রাষ্ট্রের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করার দিক নির্দেশনা সুস্পষ্টভাবে বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(২) ধারায় বলা আছে। তারপরও থানার একশ গজের মধ্যে দীর্ঘদিন যাবত রাত-দিন চব্বিশ ঘণ্টা দুই শিফটে ক্যাসিনো পরিচালিত হচ্ছে, এর দায়িত্ব কে নেবে? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘বিনা অনুমতিতে এগুলো পরিচালিত হচ্ছে’- এটুকু স্বীকার করাই কি যথেষ্ট?

ক্যাসিনো বাণিজ্য আলোচনায় আসার আগে আলোচ্য বিষয় ছিলো ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতার কোটি টাকার চাঁদাবাজি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে ক্যাম্পাসের অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের ১,৪৪৫ কোটি টাকার ৬ শতাংশ ৮৬ কোটি টাকা কমিশন দাবি করে সাংগঠনিক নেত্রী শেখ হাসিনার বিরাগভাজন হয়ে পদ হারিয়েছেন ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী।

পদচ্যুত হয়ে রাব্বানী উল্টো অভিযোগ করেছেন, ‘জাবি উপাচার্য অধ্যাপিকা ফারজানা ইসলামের স্বামী এবং ছেলে একটি বড় অঙ্কের কমিশন পাওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ শাখাকে ব্যবহার করেছে এবং ঈদুল আজহার আগে জাবি ছাত্রলীগকে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা দিয়েছে।’

এর আগে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে একটা বালিশের দাম ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা, সেই বালিশ ফ্ল্যাটে তুলতে খরচ দেখানো হয়েছে ৭৬০ টাকা। যে বইয়ের বাজারমূল্য সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা স্বাস্থ্য অধিদফতর সেই বই কিনেছে ৮৫ হাজার ৫০০ টাকায়।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালটির অব্যবহৃত ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের (আইসিইউ) জন্য একটি পর্দা কেনা হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩৭ লাখ টাকা দিয়ে। ১০ হাজার টাকার ডিজিটাল ব্লাড প্রেশার মেশিন কেনা হয়েছে ১০ লাখ ২৫ হাজার টাকায়। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সন্দ্বীপ চ্যানেলের ভাঙন প্রতিরোধে গৃহিত একটি প্রকল্পের পাঁচটি সাইনবোর্ড তৈরিতে ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে ২৭ লাখ টাকা।

সিল ও স্ট্যাম্প খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা। খাগড়াছড়ির ৬-আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) ঘর মেরামতকাজে মাত্র দুই বান টিনের দাম দেখানো হয়েছে ১৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি টিনের দাম ধরা হয়েছে এক লাখ টাকা। বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি প্রকল্পে ক্লিনারের বেতন ধরা হয়েছে প্রতি মাসে ৪ লক্ষ ২০ হাজার টাকা। এই যে ভয়াবহ ও লাগামহীন দুর্নীতি- এগুলো হচ্ছে বিদ্যমান রাষ্ট্র পরিচালনা প্রণালীর ব্যবস্থাপনাগত বৈশিষ্ট্য।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সেলিম রেজা নিউটন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন- ‘সবাই মিলে ভাগবাটোয়ারা করে রাষ্ট্রকে দোহন করে খাওয়ার একটা গণতান্ত্রিক সিস্টেম চালু হয়েছে। এগুলোকে “দুর্নীতি” বললে সংজ্ঞাটা সংকীর্ণ হয়ে যায়। এগুলো স্রফে “দুর্নীতি”র দৃষ্টান্ত নয়, এসবই এখন রাজনীতি।

বর্তমান রাষ্ট্রযন্ত্রের রাজনৈতিক অর্থনীতি। ..বর্তমান সরকার বলতে গেলে নতুন যেটা করেছেন সেটা হলো, এই সিস্টেমটাকে সম্পূর্ণ সর্বজনীন করে তুলেছেন। বিপুল মাত্রায় বিকেন্দ্রায়িত করে তুলেছেন। পুরোপুরি ‘গণতান্ত্রিক’ করে তুলেছেন পার্টির ভেতরে। নতুন এই সিস্টেমেটিক প্রক্রিয়ায় প্রত্যেকের ভাগ সুনির্দিষ্টভাবে, সুশৃঙ্খলভাবে বণ্টন করা আছে।’

বর্তমান সরকার টানা এগারো বছর ক্ষমতায় আছে। এ সময়কালে ‘উন্নয়নের রাজনীতি’র নামে লুটপাটতন্ত্রকে গভীরতর করা হয়েছে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি প্রোথিত করা হয়েছে। মেহনতি কৃষক, শ্রমিক, প্রবাসী শ্রমিকের কষ্টার্জিত আয় বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। বছরে ৭০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে। রাষ্ট্র পরিচালনার সাথে যুক্ত আমলা আর রাজনৈতিক ব্যক্তিরা উন্নয়নের রাজনীতির নামে ভাগবাটোয়ারা করে দেশে লুটপাটতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। ছাত্রলীগ-যুবলীগের লুটপাট, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এর সামান্য অংশ মাত্রই। ব্যাপক অংশ এখনো অপ্রকাশিত রয়ে গেছে।

মাঝে মাঝে লোক দেখানো ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও ঘুষ-দুর্নীতি-লুটপাট এমনভাবে সর্বজনীন, বিকেন্দ্রীভূত হয়েছে ক্ষমতাসীন শাসকশ্রেণির পক্ষে তা থেকে বেরিয়ে আসার কোনো পথ নেই। এই যে ভয়াবহ ও লাগামহীন দুর্নীতি- এগুলো হচ্ছে রোগের লক্ষণ। আসল রোগ হচ্ছে গণতন্ত্রহীনতা-জবাবদিহিতাহীনতা। লুটপাট কায়েম রাখার জন্য প্রয়োজন দুঃশাসন এবং দুঃশাসন লুটপাটকে বিস্তৃত করে, গভীরতর করে। লুটেরারা তাই একজোট হয়ে জনগণের ভোটাধিকার হরণকারী নৈশকালীন নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নেয়।

বিপ্লব যদি হয় আমূল পরিবর্তন তাহলে গণআন্দোলন, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিপ্লব ঘটানো ছাড়া এই লুটপাটতন্ত্র, দুঃশাসন থেকে মুক্তির ভিন্ন কোনো পথ নাই। তাই এখনই প্রয়োজন গণআন্দোলন, গণঅভ্যুত্থানের জোর প্রস্তুতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.