লুটপাটতন্ত্র থামাতে ভোট লুটেরাদের পরাজিত করতে হবে

আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন

বাংলাদেশের একান্ন বছরের মধ্যে আওয়ামী লীগ একাই তেইশ বছরের অধিককাল দেশ শাসন করেছে। দুই বছরের সেনাসমর্থিত ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিনের শাসনের অব্যবহিতকালে ভাত ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলে ‘দিন বদলের কর্মসূচি’ দিয়ে আওয়ামী লীগ ২০০৯ সাল থেকে টানা প্রায় পৌনে চৌদ্দ বছর ক্ষমতায় রয়েছে। ভাত ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার বদলে মানুষকে ক্রমাগত ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে।

গত ১২ অক্টোবর অনুষ্ঠিত গাইবান্ধা-৫ আসনের বিরোধীদলবিহীন উপ-নির্বাচনও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার ক্ষমতা এ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের নাই, রিগিংয়ের জন্য ভোটগ্রহণ স্থগিত করার মাধ্যমে তা পুনরায় প্রমাণিত হয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ও ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রহসনের নির্বাচন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। নির্বাচন নিয়ে গত পঞ্চাশ বছর ধরে ক্ষমতাসীন দলসমূহের ছিনিমিনি খেলার কারণে দেশের মানুষ মনে করে দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার ও মতামতের প্রতিফলন ঘটানোর জন্য প্রয়োজন নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তদারকি সরকারের অধীনে অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু নির্বাচন।

এ নির্বাচন হতে হবে কালোটাকা, পেশীশক্তি, ধর্ম ও প্রশাসনের অপব্যবহার মুক্ত। বাম গণতান্ত্রিক জোট তাদের ১১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে ঘোষিত দাবিনামার প্রথম দাবিতে বলেছে- “বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার বা দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন নয়, নির্বাচনকালীন দল নিরপেক্ষ তদারকি সরকারের অধীনে কালো টাকা, পেশীশক্তি, সাম্প্রদায়িকতা, আঞ্চলিকতামুক্ত পরিবেশে নির্বাচন দিতে হবে। নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দিয়ে সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও ঋণখেলাপি-ব্যাংক ডাকাত, অর্থপাচারকারী, কালো টাকার মালিক, দুর্নীতিবাজদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা, না ভোটের বিধান ও প্রতিনিধি প্রত্যাহারসহ নির্বাচনী ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করতে হবে। সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করতে হবে।”

যে ভোটাধিকারের জন্য গত শতাব্দির আশির দশকে স্বৈরাচারী এরশাদের বিরুদ্ধে শ্রেণি-পেশা, দল-মত নির্বিশেষে অসংখ্য মানুষ আত্মদান করেছে সে ভোটাধিকার, সে গণতন্ত্র গত ৩২ বছর যাবত এরশাদোত্তর ক্ষমতাসীন দলগুলো দ্বারা পদদলিত। গত ১৪ বছরে তা চূড়ান্ত রূপ পরিগ্রহ করেছে। ভোট লুট করে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সম্পদ লুটেরাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে ভোট লুটেরারা। ভোট লুটেরা আর সম্পদ লুটেরা মিলেমিশে দেশে লুটপাটতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে।

ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি যে কোন সময়ের তুলনায় বেশি। সরকারি হিসাব অনুযায়ী গত আগস্ট মাসে মূল্যস্ফীতির ছিল ৯ দশমিক ৫ শতাংশ যা গত এগার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। চলতি বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ। জুনে তা বেড়ে হয় ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। জুলাইয়ে সেটি সামান্য কমে হয় ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। আগস্ট মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয় ৯.৫ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে তা সামান্য কমে হয় ৯.১ শতাংশ।

মূল্যস্ফীতির জন্য দায়ি করা হচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে। যুদ্ধের দোহাই দিয়ে গত ৫ আগস্ট সরকার জ্বালানি তেলের দাম ৪২ থেকে ৫১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে। এতে পণ্য পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সব পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়। মূল্যস্ফীতি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায়। সরকারের সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) যে তথ্য প্রদান করে তাতে মানুষের আস্থা কম। মানুষ বাস্তব জীবন দিয়ে যে মূল্যস্ফীতি অনুভব করে বিবিএসের হিসাবে তার প্রতিফলন নেই। দৈনন্দিন ব্যবহার্য্য থেকে বিলাসদ্রব্য এমন কোন পণ্য নেই যার দাম গত ছয় মাসে বৃদ্ধি পায়নি। বাস্তব মূল্যস্ফীতি প্রদর্শিত মূল্যস্ফীতির তুলনায় অনেক বেশি। অপরদিকে বিবিএসের তথ্য থেকেই দেখা যাচ্ছে সেপ্টেম্বর মাসে গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ ও গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১০ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ২ দশমিক ২৪ শতাংশ কমে গেছে। এ সবগুলোই সরকারের হিসাব যার সাথে বাস্তবের ব্যাপক ফারাক রয়েছে। তারপরও তথ্যগুলো প্রমাণ করে মানুষের দৈনন্দিন জীবন যাপন কত কষ্টকর হয়ে উঠেছে।

চলতি বছরের ২১ মার্চ ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের শতভাগ জনগণকে বিদ্যুতের আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এ উপলক্ষে সারা দেশে উৎসব পালিত হয়। সরকার এটিকে মুজিব বর্ষের অন্যতম অর্জন বলে ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু সরকারের এ সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণায় দেশের মানুষ আজ নাকাল। গ্রাম-শহর সর্বত্র দিনে কয়েকবার লোডশেডিং হচ্ছে। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ি গত রোববার, ৯ অক্টোবর জ্বালানি সংকট, রক্ষণাবেক্ষণ প্রভৃতি কারণে দেশের ১৫০টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৪৫টি কেন্দ্রে কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়নি। এর বাইরেও জ্বালানির অভাবে ৪২টি কেন্দ্র সক্ষমতা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারেনি। গ্যাস না পেয়ে আটটি কেন্দ্র এবং জ্বালানি তেল না পেয়ে দুটি কেন্দ্র চালুই করা যায়নি। ৩১টি কেন্দ্রের কারিগরি সমস্যার কারণে সক্ষমতার চেয়ে কম উৎপাদন হয়েছে। কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ২১ হাজার ৭১০ মেগাওয়াটের বিপরীতে দিনে সর্বোচ্চ ১২ হাজার ৩৮৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে। দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের প্রকৃত চাহিদা প্রায় ১৬ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ বর্তমানে দৈনিক সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে। উক্ত দৈনিকটি তাদের জেলা প্রতিনিধিদের বরাতে জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঐ দিন গ্রাহক পর্যায়ে দুই থেকে বার ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, আগামী নভেম্বর মাসের আগে লোডশেডিং পরিস্থিতির উন্নতির আশা নেই। এর আগে অবশ্য তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন অক্টোবর থেকে কোনো লোডশেডিং থাকবে না। সরকারের সকল প্রতিশ্রুতির মতই ছয় মাসের মাথায় শতভাগ বিদ্যুতায়নের সাফল্য ফাঁকা বুলিতে পরিণত হয়েছে।

২০২১ সালের আগস্ট মাসে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল সর্বোচ্চ ৪, ৮০৪ কোটি মার্কিন ডলার। এ বছরের সেপ্টেম্বরে তা কমে হয়েছে ৩, ৬৯৭ কোটি মার্কিন ডলার। রিজার্ভ থেকে ৮০০ কোটি ডলার নিয়ে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলসহ (ইডিএফ) একাধিক তহবিল করা হয়েছে। এ তহবিল থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের ঋণ প্রদান করায় তা সহজ নগদায়নযোগ্য নয় বিধায় আইএমএফ এই ৮০০ কোটি ডলারকে রিজার্ভ থেকে আলাদা করার পরামর্শ দিয়েছে। ফলে প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ হচ্ছে ২, ৮৯৭ কোটি ডলার। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের তিনটি উৎসের দুইটি রপ্তানি খাত, প্রবাসী আয় খাতে সেপ্টেম্বর মাসে আয় কমেছে। ডলারের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কার্ব মার্কেটে ডলারের দাম বেশি হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ হ্রাস পাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ক্রমহ্রাসমান। এটি আগামী দিনের জন্য একটা গভীর অশনি সংকেত।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কারণে আগামী ২০২৩ সাল বাংলাদেশের জন্য গভীর সংকটময় হবে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও তাই মনে করেন। তিনি আসন্ন খাদ্য সংকটের কথা বলছেন। কৌতুক করে কুপি জ্বালানোর জন্য রেড়িব তেলের কথা বলছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির ফলে জ্বালানি সংকটের কারণে দেশে যে বিদ্যুৎ ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে দেখে শুনে মনে হচ্ছে তার শেষ পরিণতি শ্রীলংকার মত ভয়ারহ রুপ নিতে পারে। ২০১৭ থেকে ২০২২ শ্রীলংকা মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ হয়েছিল সেখান থেকে নিম্নআয়ের দেশে অবনমিত হওয়া সময়ে ব্যাপার মাত্র। টেকসই উন্নয়নের সংকটের কারণে আজ শ্রীলংকা এ পরিস্থিতির সম্মুখীন। একই পথে এগুচ্ছে বাংলাদেশ।

গত চৌদ্দ বছর যাবত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় রয়েছে। তারা মানুষকে ভোটাধিকার বঞ্চিত করেছে। এ সময়কালে শ্রমজীবী মানুষের কষ্টার্জিত আয়ের এগার লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। করোনাকালে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আয় কমে গেছে আর গুটি কয়েক ক্ষমতাসীন মানুষের সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু করোনাকালে একুশ মাসে কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ১৯, ৩৫১ জন। আর নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নীচে নেমে গেছে ৩ কোটি মানুষ। এটা হয়েছে লুটেরা ধনিকগোষ্ঠীর লুটপাটের কারণে। এরা একদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে বঞ্চিত করে সম্পদ লুট করে বট গাছ থেকে জোড়া বট গাছ হচ্ছে।

অন্যদিকে সম্পদ লুটপাটকে পাকাপোক্ত করার জন্য ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মত ২০২৪ সালেও ভোট লুটের পরিকল্পনা করছে। সামনের দিনগুলি তাই আর্থিক, রাজনৈতিক উভয় কারণে বাংলাদেশের জন্য একটা সংকটকাল। অপরদিকে এটা কঠিন সংগ্রামের সময়ও বটে। লড়াইয়ের মাধ্যমে লুটেরাদের উৎখাত করে লুটপাটতন্ত্রকে হটাতে না পারলে এক কঠিন দুঃসময়ে আমারা নিপতিত হবো। তাই লুটপাটতন্ত্র থামাতে ভোট লুটেরাদের পরাজিত করতেই হবে।

লেখক: সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)।

Leave a Reply

Your email address will not be published.