লীলা নাগ আমাদের লড়াইয়ের প্রেরণা

লাকী আক্তার

গত ১১ জুন সংবাদপত্রের পাতায় লীলা নাগের পৈতৃক বাড়ি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার খবর পড়ছিলাম। পত্রিকা মারফত জানলাম, মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও ইউনিয়নের পাঁচগাঁও গ্রামে লীলা নাগের স্মৃতিবিজড়িত ভিটামাটির চিহ্নটুকু মুছে যাওয়ার পথে। মন খারাপ হওয়ার মতই একটি ঘটনা। আমাদের দেশে ইতিহাস সংরক্ষণ, তা নিয়ে গবেষণা করা, প্রজন্মকে ইতিহাস সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দেয়ার প্রচেষ্টা খুব কমই দেখা যায়। লীলা নাগ পাঠ এবং তাঁর ইতিহাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জানানো নৈতিকভাবে আমাদের দায়িত্ব। কেননা আমাদের ইতিহাসে লীলা নাগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র। তিনি উপমহাদেশের স্বাধীনতা ও নারী জাগরণের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার সময়কালের লড়াইকে অগ্রসর করেছেন।

১৯০০ সালের ২ অক্টোবর লীলা নাগের জন্ম। তার বাবা গিরিশ চন্দ্র নাগ ছিলেন আসামের গোয়ালপাড়া মহকুমার প্রশাসক। তার মায়ের নাম কুঞ্জলতা। বাবার গ্রামের বাড়ি মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁওতে। মূলত পিতার কাছ থেকেই হাতেখড়ি হয় লীলা নাগের, এরপর কলকাতার ব্রাহ্ম গালর্স স্কুল, ১৯১১-১৭ সাল পর্যন্ত ঢাকার ইডেন হাইস্কুল, তারপর ১৯১৭ সালে কলকাতার বেথুন কলেজে আইএ এবং ১৯২১ সালে মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে বিএ পাস করেন। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে, তিনি মাস্টার্সে ভর্তি হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষালাভ করা প্রথম নারী। সেসময় সহশিক্ষা না থাকলেও এরপর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীরা ভর্তি হন। শুধু পড়াশোনা নয়, ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলায়ও তিনি ছিলেন অগ্রসর। তার বহুমুখী প্রতিভার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিনি ছিলেন তুমুল জনপ্রিয়। ১৯৩৯ সালে অন্যতম বিপ্লবী ও দার্শনিক অনিল রায়ের সঙ্গে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

শিক্ষাজীবন শেষ করেই তিনি স্বদেশী আন্দোলনে যুক্ত হোন। নারীদের অগ্রসর করার জন্য তিনি গড়ে তোলেন দীপালী সংঘ। আর দীপালী সংঘের কাজের বাইরেও নিজে যুক্ত ছিলেন বিপ্লবী কর্মকান্ডে। দীপালী সংঘের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে নতুন ধারার নারীদের সংগ্রাম আর লড়াইকে এগিয়ে নেন তিনি। এলাকায় এলাকায় স্টাডি সার্কেলের মাধ্যমে নারীদের বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত করতে থাকেন। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় পাড়ায় পাড়ায় দীপালী সংঘের প্রসার হতে থাকে। দলে দলে জাগরণের মন্ত্রে দীক্ষিত এসকল নারীরা পরবর্তীকালে বহুমাত্রিক লড়াইয়ে এগিয়ে আসেন। এরই ধারাবাহিকতায় ‘জয়শ্রী’ নামে নারীদের জন্য পত্রিকা প্রকাশ করতে থাকেন। ‘জয়শ্রী’ পত্রিকার প্রচার এবং প্রসারের মধ্য দিয়ে তিনি নারী জাগরণের বার্তা সমাজের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে দেন।

এরপর পর্যায়ক্রমে তিনি গড়ে তোলেন ‘নারী শিক্ষা মন্দির’সহ ১২টি অবৈতানিক প্রাথমিক স্কুল এবং শিল্প শিক্ষা ও বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্র ‘দীপালি ছাত্রী সংঘ’ (১৯২৬) এবং ‘মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি’ যার মাধ্যমে নারীরা অস্ত্র চালনা প্রশিক্ষণ ও লাঠি খেলা শেখেন। এরপর ১৯২৫ সালে ‘শ্রীসংঘ’ বিপ্লবী দলের সাথে যুক্ত করেন নিজেকে। স্বাধীনতার সংগ্রামের লক্ষ্যে নিয়োজিত এ দলের সাথে যুক্ত হয়ে নিজেকে আরও শাণিত করে তোলেন লীলা নাগ। ক্রমেই বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে এগিয়ে যেতে থাকেন লীলা নাগ।

যেহেতু তিনি এই দলে নাম লিখান এবং অসংখ্য নারীদের অনুপ্রেরণা ছিলেন তিনি, তাই স্বাধীনতার অমোঘ বাণীতে দীক্ষিত হয়ে, দলে দলে নারীরা তার সাথে শ্রীসংঘে সমবেত হতে থাকে। নারীরা যুক্ত হওয়ায় সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন আরও অগ্রসর হতে থাকে। এই লড়াইয়ের সাথে সাথে, অনগ্রসর নারীরা নিজেদের ওপর শোষণ নির্যাতন এর প্রতিবাদে নিজেদের এগিয়ে নেয়ার অনুপ্রেরণা পায়। তাছাড়া নারীরা যাতে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়, সে প্রয়াস ছিলো লীলা নাগের। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ১৯২৭-২৮ সালের দিকে নির্যাতিত, নিগৃহীত নারীদের আশ্রয় ও সাহায্যার্থে ‘নারী আত্মরক্ষা ফান্ড’ গঠন করেন তিনি। এরপর ১৯৩০ সালের দিকে ‘মহিলা সত্যাগ্রহ কমিটি’র উদ্যোগে ঢাকার নারীরা ‘লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনে’ যোগ দেন। এ লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন লীলা নাগ এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন আশালতা সেন। লীলা নাগ শ্রীসংঘের দায়িত্ব নেয়ার পর, দলে দলে দীপালী সংঘের মধ্যে অসংখ্য অগ্রসর মেয়েরা শ্রীসংঘে যোগ দেয়ায় বিপ্লবী আন্দোলন জোরদার হতে থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় সেসময় অস্ত্রাগারের ভাণ্ডার রক্ষার দায়িত্ব অনেক নারীরা পালন করে, যাদেরকে লীলানাগ দীপালী সংঘে এবং পর্যায়ক্রমে শ্রীসংঘের মাধ্যমে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যুক্ত করেছিলো।

১৯৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর লীলা নাগ গ্রেফতার হয়। লীলা নাগ ছিলেন ভারতবর্ষে বিনা বিচারে আটক প্রথম নারী রাজবন্দি। তারপর তার অনেক নারী সহকর্মী গ্রেপ্তার ও বন্দি হন। সেসময় জেলে গিয়েও বিপ্লবী কর্মকাণ্ড চলমান থাকতো। এমনকি সাংগঠনিক কাজকর্ম, দলীয় কর্মীদের নির্দেশনা জেল থেকে নেতারা বিভিন্নভাবে পাঠাতেন। অনুরূপভাবে এসকল কাজ লীলা নাগ জেলে থেকেও চলমান রাখেন। তিনি তার সহযোদ্ধাদ্ধের লড়াই এর বিভিন্ন নির্দেশনা পাঠাতে থাকেন।

১৯৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর থেকে ১৯৩৭ সালের ৮ অক্টোবর পর্যন্ত লীলা নাগ ঢাকা, রাজশাহী, সিউড়ী, মেদেনীপুর জেল ও হিজলী মহিলা বন্দীশালায় আটক ছিলেন। ১৯৩২ সালের এপ্রিল মাসে তিনি জেলে অনশন করেন। অনশনের কারণে তাঁকে শাস্তি দিয়ে হিজলী বন্দীশালায় পাঠানো হয়। ১৯৩৬ সালের ২৮ এপ্রিল হিজলী বন্দীশালায় দ্বিতীয়বার অনশন শুরু করলে তাঁকে মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেলে স্থানান্তর করা হয়। এখানে তাঁকে নির্জন সেলে রাখা হয়। ১৯৩৬ সালের ৪ মে তিনি অনশন ভঙ্গ করেন। দীর্ঘ ৬ বছর কারাগারে থেকে ১৯৩৭ সালের ৮ অক্টোবর তিনি কারামুক্ত হন। কারাগার থেকে মুক্ত হলে, ১৯৩৮ সালে সিলেটের নারী সম্মেলনে লীলা নাগ সম্বর্ধিত হন।

সংগঠন এবং বিপ্লবী আদর্শ প্রচারের জন্য লীলা নাগ আজীবন নিজের কর্মপ্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। উদ্বুদ্ধ করেছেন নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলকে। স্বাধীনতা সংগ্রামের নেশায় তারা তাদের সকল কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন। তিনি তার জীবদ্দশায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষের সাহচর্যে এসেছিলেন।

রাজনৈতিক আদর্শ প্রচারের সাথে সাথে নারীদের সংগ্রামের মধ্যে নিয়ে আসার জন্য তার অব্যাহত প্রচেষ্টা ছিলো। কারণ তিনি এটা বুঝেছিলেন যে সমাজের বৃহত্তর অংশকে পেছনে ফেলে কোন লড়াই সংগ্রামে বিজয় অর্জন করা সম্ভব নয়। আর এমনিতেই সে সমাজ ছিল পশ্চাপদপদ, সেখানে নারীরা ছিলো শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। আর নিগৃহীত, নিপীড়িত, আর্থিকভাবে অসচ্ছল এসকল নারীদেরকে পড়াশোনা, জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন তিনি। আর নিরন্তর বিপ্লবী চর্চার মধ্যে বৃহত্তর নারী সমাজের কাছে তিনি পৌঁছে গেছেন পত্রিকার মাধ্যমে, ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে। এসকল প্রচেষ্টায় নিরাশ হতে হয়নি তাকে। পরবর্তীতে তাদের অনুপ্রেরণায় প্রীতিলতারা বের হয়ে এসেছিলেন। আরও অসংখ্য নারীরা সমাজের জন্য লড়াই-সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছেন।

লীলা নাগ ছিলেন এসকল সংগ্রামীদের নারীদের জন্য অনেক বড় প্রেরণার উৎস। ব্রিটিশবিরোধী এই সংগ্রামীদের সম্পর্কে জানা, ইতিহাস পাঠ, এসকল সংগ্রামীদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহ রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব এবং কর্ত্যব্যের মধ্যে পড়ে। তাই এত বছর পর যখন তার ভিটেমাটি দখল হয়ে যাওয়ার কথা শুনি, তা আমাদের ব্যথিত করে।

দেখতে দেখতে সময় অনেক পেরিয়েছে। আমরা আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামেরও প্রায় ৫০ বছর অতিক্রান্ত করেছি। এখন প্রতি বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নারী-পুরুষের হার প্রায় সমান। এখন অনেক অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নারীরা আছেন। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র এবং সমাজ এখনও পুরুষতান্ত্রিক। দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থ সরকারগুলো দেখে না, যেহেতু সরকারগুলো জনবান্ধব নয়। আর অনিরাপদ এই রাষ্ট্রে নারীর নিরাপত্তা বলা যায় শূন্যের কোঠায়। এখনও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নন। আর শোষকের শোষণের চিত্রটা পাল্টেছে কিন্তু আরও প্রকটভাবে।

এরকম অবস্থায় আমাদের লড়াই আরও গভীরভাবে চালিয়ে যাওয়ার বিকল্প নাই। সত্যিকারের আলোকিত মানুষ তৈরি করা দরকার। শিক্ষার সঠিক বার্তা এবং সমাজ প্রগতির লড়াইকে অগ্রসর করতে দেশব্যাপী আমাদের লড়াই চালাতে হবে। গণআন্দোলন গড়ে তোলার জন্য মানুষকে দীক্ষিত করতে, লীলা নাগের মতই পাড়ায় পাড়ায় স্টাডি সার্কেলের মাধ্যমে বিপ্লবীদের গড়ে তোলার কোনও বিকল্প নাই। লীলা নাগের মতো মানুষ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাদের রাজনৈতিক লড়াইটাকেই এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। অবিলম্বে সরকারিভাবে লীলা নাগের স্মৃতিবিজড়িত ভিটেভূমি রক্ষার দাবি জানাই।

লীলা নাগ লাল সালাম।

লেখক: সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.