লকডাউনের বিরোধিতা ইউরোপে

করোনাতে যেই মহাদেশ সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তা হচ্ছে ইউরোপ। গত ফেব্রয়ারি মাস থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নতুন করে করোনার নয়া স্ট্রেন ভয়ঙ্কর রূপ নিচ্ছে। নতুন করে করোনা সংক্রমণ কে রুখতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে লকডাউন নতুন করে শুরু হয়েছে। পূর্বে এই লকডাউনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল গোটা বিশ্বের মানুষ এবং অর্থনীতি। তাই লকডাউনের প্রতিবাদে লন্ডনে পথে নামেন বহু মানুষ। শুধুমাত্র লন্ডন নয় জার্মানিতেও আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে ক্যাসেল শহরে ২০ হাজার মানুষ সরকারের লকডাউনের সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করে সমাবেশ সংগঠিত করেন তারা। অস্ট্রিয়া, ফিনল্যান্ড, রোমানিয়া, সুইজারল্যান্ড থেকেও লকডাউনের বিরোধীতা করে আওয়াজ উঠে আসছে মানুষের পক্ষ থেকে। এর আগে করোনা অতিমারীর তৃতীয় প্রকোপের আশঙ্কায় কাঁপছে ইউরোপের একের পর এক দেশ। সম্প্রতি কয়েক সপ্তাহ ধরে বেড়ে চলেছে ফ্রান্স এবং পোল্যান্ডের করোনা আক্রান্তের সংখ্যা। সেই থেকে বিশেষজ্ঞদের অনুমান খুব শীঘ্রই তৃতীয় দফায় ভাইরাস আঘাত হানতে চলেছে। সেই সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে ফের একবার লকডাউনের পথে হাঁটছে দুই দেশ। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস সহ দেশের ১৬টি এলাকার ২কোটি ১০ লক্ষ মানুষ নতুন করে লকডাউনের কবলে পড়তে চলেছেন। পোল্যান্ডে রেস্তোরাঁ, ক্লাব, সহ জরুরি পরিষেবার আওতার বাইরে থাকা সমস্ত সংস্থা ৩ সপ্তাহের জন্য বন্ধ করা হয়েছে। একইসঙ্গে ফ্রান্সের প্রতিবেশি জার্মানিতেও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে কোভিড আক্রান্তের সংখ্যা। সেদেশের চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল ইঙ্গিত দিয়েছেন ফের একবার সার্বিক লকডাউন জারি করা হতে পারে দেশ জুড়ে। ২০ মার্চ মধ্যরাত থেকে লকডাউন জারি হয়েছে ফ্রান্সে। যদিও গত লকডাউনের তুলনায় নাগরিক দের বেশ কিছু ছাড় দেওয়ার ঘোষণা করেছে ফ্রান্সের সরকার। লকডাউন জারি হলেও এখনও ফ্রান্সের স্কুলগুলি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। করোনা অতিমারী শুরুর সময় থেকে ৪২ লক্ষ ফরাসি মারণ ভাইরাসে আক্রান্ত হন। ইতিমধ্যেই ৯২ হাজার ফরাসি এই ভাইরাসের কবলে প্রাণ হারিয়েছেন।

পোল্যান্ডে ২১ মার্চ থেকে লকডাউন জারি হয়েছে। সেদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রক সূত্রে দাবি, বর্তমান আক্রান্তের ৬০ শতাংশ ব্রিটিশ স্ট্রেনে আক্রান্ত। পোল্যান্ডে ২০ লক্ষের বেশি মানুষ করোনা আক্রান্ত হন। প্রাণ হারিয়েছেন ৪৯ হাজারের বেশি পোলিশ নাগরিক। জার্মানির তরফ থেকে জানানো হয়েছে, তারা পোল্যান্ডের পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে। সেদেশ থেকে জার্মানিতে প্রবেশের আগে কোভিড নেগেটিভ রিপোর্ট দেখানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে উৎপাদিত অ্যাস্ট্রাজেনেকা কোম্পানির করোনার টিকা রপ্তানির বিষয়ে কড়া অবস্থান নিচ্ছে ইইউ। এদিকে অ্যামেরিকায় সেই কোম্পানির ভ্যাকসিন ট্রায়ালে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। একে করোনার টিকার আকাল, তার উপর একটি টিকা কোম্পানির ভাবমূর্তি ও আচরণ নিয়ে সংশয় ইউরোপীয় ইউনিয়নে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। একাধিক কারণে রোষের মুখে পড়ছে ব্রিটিশ-সুইডিশ ওষুধ কোম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকা। টিকার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নিয়ে বার বার অনিশ্চয়তার পর আপাতত আবার ছাড়পত্র পেলেও অনেক মানুষ এই কোম্পানির টিকা নিতে চাইছেন না। তার উপর ইইউ-র সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী যথেষ্ট পরিমাণ করোনা টিকা সরবরাহ করতে একাধিকবার ব্যর্থ হচ্ছে এই কোম্পানি।

চাপের মুখে অ্যাস্ট্রাজেনেকা: ইউরোপীয় ইউনিয়নে উৎপাদিত অ্যাস্ট্রাজেনেকা কোম্পানির করোনার টিকা রপ্তানির বিষয়ে কড়া অবস্থান নিচ্ছে ইইউ। এদিকে অ্যামেরিকায় সেই কোম্পানির ভ্যাকসিন ট্রায়ালে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। একে করোনার টিকার আকাল, তার উপর একটি টিকা কোম্পানির ভাবমূর্তি ও আচরণ নিয়ে সংশয় ইউরোপীয় ইউনিয়নে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। একাধিক কারণে রোষের মুখে পড়ছে ব্রিটিশ-সুইডিশ ওষুধ কোম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকা। টিকার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নিয়ে বার বার অনিশ্চয়তার পর আপাতত আবার ছাড়পত্র পেলেও অনেক মানুষ এই কোম্পানির টিকা নিতে চাইছেন না। তার উপর ইইউ-র সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী যথেষ্ট পরিমাণ করোনা টিকা সরবরাহ করতে একাধিকবার ব্যর্থ হচ্ছে এই কোম্পানি।

এমন প্রেক্ষাপটে ইইউ দেশগুলিতে উৎপাদিত টিকা বাইরে রপ্তানির উপর কড়া নিয়ন্ত্রণ চালু করছে ব্রাসেলস।বিশেষ করে অ্যাস্ট্রাজেনেকা কোম্পানির সরবরাহের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছে ইইউ। ইউরোপীয় কমিশন রপ্তানির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সংশোধন করতে চলেছে। এর আওতায় সরাসরি রপ্তানির উপর নিষেধাজ্ঞা চাপানো না হলেও যে দেশে টিকা রপ্তানি করা হচ্ছে, সেই দেশ থেকে সরবরাহের উপর বাধানিষেধ বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ সরবরাহ একতরফা হলে চলবে না। উল্লেখ্য, ইইউ কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডেয়ার লাইয়েন আগেই এ বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। ইইউ শীর্ষ বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে। অ্যাস্ট্রাজেনেকা কোম্পানির প্রতি এমন কড়া মনোভাবের পেছনে ব্রিটেনের এক বড় ভূমিকা রয়েছে। ইইউ কমিশনের স্বাস্থ্য দফতরের প্রধান সান্ড্রা গালিনা ইইউ পার্লামেন্টে জানিয়েছেন, যে অ্যাস্ট্রাজেনেকা গত মাস পর্যন্ত ব্রিটেনে সরবরাহে কোনো ঘাটতি রাখেনি। শুধু ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত ইইউ থেকে প্রায় এক কোটি টিকা সে দেশে পাঠানো হয়েছে। অথচ বোঝাপড়া অনুযায়ী ইইউ যথেষ্ট টিকা পাচ্ছে না। ব্রিটেনে উৎপাদিত একটি টিকাও ইইউ-তে আসে নি। অ্যাস্ট্রাজেনেকা কোম্পানির কাছে দশ কোটিরও বেশি টিকা অর্ডার দিলেও তার এক চতুর্থাংশ হাতে পায় নি ইইউ। ফলে সেই কোম্পানির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে চলেছে। এমন অভিযোগের মুখে ব্রিটেন কিছুটা চাপের মুখে পড়েছে। ভারতের এক কারখানা থেকে অ্যাস্ট্রাজেনেকা সরবরাহে বিলম্বের ফলে টিকার সরবরাহ কমে গেছে। তার উপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের কড়া মনোভাব পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে। নেদারল্যান্ডসে সেই কোম্পানির এক কারখানায় উৎপাদন শুরু হলেই ব্রিটেন সেখান থেকে টিকা পেতে আগ্রহী।

ইইউ-র অভিযোগের মুখে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন প্রথমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখালেও এখন আলোচনার মাধ্যমে সংকট মেটানোর আশা প্রকাশ করছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও প্রবল সমালোচনার মুখে পড়ছে অ্যাস্ট্রাজেনকা। টিকা তৈরির প্রস্তুতির সময়ে পরীক্ষার ক্ষেত্রে সেই কোম্পানি নিরপেক্ষভাবে সব তথ্য বিবেচনা না করে শুধু সুবিধাজনক তথ্য বেছে নিয়ে টিকার কার্যকারিতা তুলে ধরেছিল বলে অভিযোগ করেছে জাতীয় অ্যালার্জি ও ছোঁয়াচে রোগ প্রতিষ্ঠান। অ্যাস্ট্রাজেনেকা অবশ্য ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নতুন তথ্য প্রকাশ করার অঙ্গীকার করে অভিযোগ খণ্ডন করার অঙ্গীকার করেছে। এদিকে টিকা নেবার পর ফ্রান্সে এক মেডিকাল ছাত্রের মৃত্যুর তদন্ত শুরু হয়েছে। ফলে নানা কারণে অ্যাস্ট্রাজেনেকা চাপের মুখে পড়ছে।

সূত্র: সাপ্তাহিক একতা।

শেয়ার করুন

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin

Leave a Reply