রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল রাষ্ট্রীয়ভাবে চালুর বিকল্প নেই

এস এ রশীদ

পাট বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফসল। পাট ও পাটজাত পণ্যের বিদেশে চাহিদা ও আমাদের রপ্তানির সুযোগের কথা বিবেচনায় একথা নিশ্চিত বলা যায়, “পাট আমাদের কৃষির ভিত্তি ও পাটশিল্প দেশের ভবিষ্যৎ”।

পৃথিবীব্যাপী মানুষ প্লাস্টিক পণ্য বর্জন এবং পাটপণ্য বহুমুখীকরণ করে ব্যবহারের দিকে ঝুকছে। পাটের জীবনবৃত্তান্ত আমাদের দেশের বিজ্ঞানী আবিষ্কার করেছেন, এটা আমাদের গর্ব। আমাদের পাটের মান পৃথিবীসেরা। অথচ সব ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা পায়ে ঠেলে খুঁড়া অজুহাত দেখিয়ে ২০২০ বছরের ৩০ জুনের এক নোটিশে ২ জুলাই রাতের অন্ধকারে পুলিশ-বিজিবি সাঁজোয়া যান নিয়ে করোনা পরিস্থিতির মধ্যে দেশে চালু থাকা ২৫টি পাটকল বন্ধ করে দেয়া হয়।

৩০ জুন ২০০১ এশিয়ায় সর্ববৃহৎ আদমজী জুট মিল বন্ধের দিন। ২ জুলাই গভীর রাত্রে কোথাও কোথাও সেদিন গুলি করে শ্রমিককে ভয় দেখানো হয়েছিল। বন্ধের নোটিশ দেখে শ্রমিকরা সেদিন কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। হাজার শ্রমিকরা সেদিন মেশিনের শব্দ থামিয়ে আহাজারি করতে থাকে, চোখের জলে ভিজে যায় যন্ত্রপাতি। মাথা নিচু করে বের হয়ে আসে শ্রমিক। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, লোকসানের এই বোঝা সরকার আর বইতে পারছে না। শ্রমিকদের জন্য পাটকলের এই লোকসান হয়েছে।

শ্রমিকরা কড়া ভাষায় সেদিন জবাব দিয়েছিলেন, “আমরা মিলের প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করি না, আমরা পাট ক্রয় করি না, আমরা বিদেশে পাটপণ্য রপ্তানি করি না। লোকসানের জন্য আমরা কোনোভাবেই দায়ী নই”। লোকসানের জন্য দায়ী পাট মন্ত্রণালয়, বিজেএমসি, মিলের মাথাভারী প্রশাসন। তাদের ভুলনীতি- দুর্নীতি ধামাচাপা দিতে পাটকলের এই লোকসান নাটক সাজানো হয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে পাটের ভরা মৌসুমে পাট কেনা হয় না, বাজারে যখন পাট থাকে না তখন বেশি দামে খারাপ মানের পাট ক্রয় করা হয় ব্যবসায়ীর কাছ থেকে। কথিত আছে, মিলের টাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যোগসাজশে কম দামে পাট কিনে রাখে, অন্যত্র পরে বেশি দামে সরবরাহ করে।

৭৭টি পাটকল চালানো সেই মাথাভারী প্রশাসন দিয়ে ২৫টি পাটকল চালালে যা হয়। পাটমন্ত্রী বলেছিলেন, ১৯৭৫ সালের পর থেকে পাটকলে ১০ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে, কিন্তু কেউ বলছে না- ৫০ বছরে এই শিল্প কত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে। কত মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। কত মানুষের জীবনযাত্রার মান বেড়েছে। পাট মন্ত্রণালয় আগে থেকে সিবিএ ও নন-সিবিএ নেতৃবৃন্দকে ঢাকায় ডেকে বৈঠক করে যে কী সান্ত¡না দিয়েছিলেন, ফিরে এসে তারা আজ পর্যন্ত মুখ খুলেনি। নেতৃবৃন্দ কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে চুপ হয়ে গিয়েছেন, সেটা এখন শ্রমিকদের মুখে মুখে। কোনো কোনো পত্রপত্রিকায়ও এসব কাহিনি প্রকাশ হয়েছিল। বন্ধ হচ্ছে এমন খবরে বামপন্থি রাজনৈতিক দল শ্রমিক সংগঠন প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে। বন্ধ ঘোষণার পর সিবিএ-নন সিবিএ, শ্রমিক সংগঠন, সাধারণ শ্রমিক রাস্তায় নামতে সাহস পায়নি। বাম গণতান্ত্রিক জোট ঢাকাসহ সারা দেশে পতিবাদ আন্দোলন শুরু করে।

পরবর্তীতে খুলনা-যশোর, সিরাজগঞ্জ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, নরসিংদিতে প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল-নাগরিক সমাজ-ছাত্র -শ্রমিক কৃষকদের নিয়ে জোরালো আন্দোলন শুরু হয়। খুলনাতে সবচেয়ে বড় আন্দোলন সংগঠিত হয়। এক পর্যায়ে জেল জুলুম হামলা গুলি টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ পর্যন্ত গড়ায়। গতি বছরের ১৯ অক্টোবর আটরা শিল্পাঞ্চলে রাজপথ অবরোধ করলে পুলিশ বিনা উস্কানিতে বেধড়ক মারপিট করে, টিয়াল সেল, গুলি ছোড়ে। আহত হন শতাধিক নেতাকর্মী। গ্রেপ্তার হয় ১৪ জন আন্দোলনকারী। পরবর্তীতে জামিনে মুক্তি পান তারা।

মিথ্যা মামলা মাথায় নিয়ে এখনও নেতৃবৃন্দ লড়াই সংগ্রামে আছেন। ২৫ টি পাটকলে ২৪ হাজার ৯০৬ জন স্হায়ী শ্রমিক। ১৮ হাজার ২০০ বদলি, ৭ হাজার দৈনিকভিত্তিক শ্রমিক। তার সাথে মিল এলাকার ছোট বড় ব্যবসায়ী, হাজার হাজার পাট চাষী, পাট সরবরাহকারী, মিলের ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য জিনিস সরবরাহকারী, মিলের উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানিকারকসহ আরো লক্ষ লক্ষ মানুষ পাটকলের সাথে প্রত্যেক ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ১ কোটিরও বেশি মানুষ।

বন্ধের সময় বলা হয়েছিল তিন মাসের মধ্যে শ্রমিকদের সকল পাওনা পরিশোধ করা হবে ও মিল নতুনভাবে চলু করা হবে। গত এক বছর ধরে ৯২ শতাংশ স্থায়ী শ্রমিকদের ৫০ শতাংশ টাকা নগদ পরিশোধ করা হয়েছে। নানা ত্রুটির কথা বলে বাকিদের টাকা এখনও দেওয়া হয়নি। দৈনিক ভিত্তিক শ্রমিক, দৈনিক হাজিরায় কর্মচারী দিয়ে পরিচালিত রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি পাটকলের বকেয়া ও ২০১৩ সালের থেকে অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিকদের কোনো টাকা এখনও পরিশোধ করা হয়নি। টাকা পাওয়া অধিকাংশ শ্রমিকের সার্ভিস টাইম কম ফলে যে সামান্য টাকা পেয়েছে তাতে ঋণের টাকা পরিশোধের পরে ভাল কিছু কিছু করবে সে অবস্থায় কেউ নেই।

শ্রম আইন অমান্য করে পাওনা পরিশোধ না করে মিলের আবাসিক এলাকা থেকে শ্রমিকদের জোরপূর্বক বের করে দেওয়া হয়েছে। টাকা পেয়ে অধিকাংশ শ্রমিক গ্রামে ফিরে গেছেন। টাকা না পাওয়া শ্রমিক দূর্বিষহ জীবন যাপন করেছেন। পাটকলের শ্রমিকরা অন্য কাজ তেমন একটা করতে পারে না ফলে উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারছে না। শ্রমিকরা আশা করেছিল, যেভাবেই হোক মিল চালু হবে, কিন্তু সে আশার গুড়েবালি। মিলের মূল্যবান যন্ত্রপাতি, আবাসিক এলাকায় শ্রমিকদের ফেলে যাওয়া অবকাঠামোর অংশ, গাছপালা চুরি হয়ে যাচ্ছে।

দেশবাসী মনে করেছিল স্কপের ঘোষণা অনুযায়ী ১২ শত কোটি টাকা দিয়ে আধুনিকায়ন করে রাষ্ট্রীয়ভাবে পাটকল চালু করবে। কিন্ত সরকার সে দিকে না হেটে ৬০০ কোটি টাকা খরচ করে বন্ধ করে দিল। সরকার এখন লিজ দেওয়ার মতো ভুল পথে হাঁটছে। দেশের লুটেরা ধনীদের কাছে দীর্ঘমেয়াদি লিজ দিয়ে জনগণের সম্পদের ওপর জনগণের মালিকানা থেকে বঞ্চিত করতে চায়। শত শত একর দামি জমি, অবকাঠামো, হাজার হাজার ছোট বড় গাছ পালা, সড়ক -রেল-নদী পরিবেষ্টিত মনোরম পরিবেশে গড়ে উঠা জনগণের এই সম্পদের ওপর লুটেরাদের তীক্ষ্ম দৃষ্টি রয়েছে অনেক আগে থেকে। তাইতো লুটেরা ব্যবসায়ী নির্ভর সংসদের অনির্বাচিত এমপি-মন্ত্রী পাটকল বন্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সরকারি মিল কিনে সেই ঋণ পরিশোধ না করে, মিল না চালিয়ে অন্যাত্রে বিনিয়োগ করা, বিদেশে টাকা পাচার করার ঘটনা সেই আশির দশক থেকে হয়ে আসছে।

আমাদের আশেপাশে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান এভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। দেশবাসীর কাছে এখন পরিষ্কার, কার স্বার্থে রাষ্ট্রীয় পাটকল বন্ধ করা হয়েছে, কেনইবা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠছে শত শত ব্যক্তিমালিকানাধীন পাটকল। যেখানে শ্রম আইন অমান্য করে দৈনিক ভিত্তিক শ্রমিক দিয়ে, ন্যূনতম মজুরি বিবেচনায় না নিয়ে ১০/১২ ঘণ্টা কাজ করিয়ে দৈনিক হাজিরা ১৪০ টাকা থেকে ২০০ টাকা দেওয়া হয়। গরিবের শ্রম শোষণ করে কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধা না দিয়ে লুটেরা মালিকরা মুনাফা নিয়ে সম্পদের পাহাড় বানাচ্ছে। ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করে বিদেশে টাকা পাচার করছে। সরকার এই সকল লুটেরা মালিকের কাছে জিম্মি হয়ে গেছে। এই সকল মালিকরা টাকার জোরে এমপি, মন্ত্রী, কখনও সরকারের নীতি নির্ধারণে বড় ভুমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে। অনির্বাচিত সরকারের সাথে থাকা অধিকাংশ ক্ষমতাবানরা নিজেই দুর্নীতি লুটপাটের মধ্যে এমনভাবে জড়িয়ে পড়েছে যে, বড় কোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না। ব্যাংক বীমা অফিস সচিবালয়ে পুকুর চুরি বন্ধ করে সাগর চুরি শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের সাথে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের ইতিহাস যুক্ত। ৫৪ যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ২৩ দফায় পাটকলের কথা ছিল। ১৯৬৯ সালের ১১দফায় পাটকল রাষ্টায়ত্ত করার দাবি যুক্ত হয়েছিল। হাজার হাজার পাটকলের শ্রমিক সেদিন মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। সেইসব বিবেচনায় স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু ৭৭ টি পাটকল রাষ্ট্রায়ত্ত করে ছিলেন।

আজ স্বাধীনতার ৫০ বছর পর বঙ্গবন্ধুর জন্মের শতবার্ষিকীতে তাঁরই কন্যা অতীতের শাসকদের মত দেশ বিদেশে পাট-পাটজাত পণ্যের চাহিদার কথা ভুলে গিয়ে পাটশিল্পকে ধ্বংসের যড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন। বাংলাদেশ সারা বিশ্বে সোনালী আঁশের দেশ বলে পরিচিত, সেই সোনালী আঁশের ভবিষ্যৎ এই অগণতান্ত্রিক সরকার গলা টিপে হত্যা করছে। শ্রমিক হারিয়েছে তার কষ্টে পাওয়া চাকুরি, সারা জীবনের অবলম্বন, যে কাজে শ্রমিক নিজেকে তিলে তিলে দক্ষ করে গড়ে তুলেছে।

এখন চাকরির বয়স থাকা সত্যেও জীবনে আর কোনো সরকারি চাকরি সে পাবে না। কৃষক হারালো পাট বিক্রির নির্ভরযাগ্য ক্রেতা, উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্যের নিশ্চয়তা। লোকসানের অজুহাতে মিল বন্ধ করে দিয়ে দেশকে গভীর সংকটের মধ্যে ফেলেছে। দেশে ব্যবহৃত পাটপণ্যের দাম বেড়েছে। পাটের বস্তা প্রায় সবই রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলই উৎপাদন করে। ৫৪ টাকার বস্তা এখন ১১০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। চাল, গম, চিনি, ডাল পাটের বস্তায় বাজারজাতকরণের আইন অমান্য হচ্ছে। কোটি মানুষের এই গভীর সংকট আগামীতে গোটা জাতিকে ভোগ করতে হবে।

ফলে কৃষি বাঁচাতে শিল্প বাঁচাতে দেশ বাঁচাতে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল রাষ্ট্রীয়ভাবে চালুর কোনো বিকল্প নেই। তাই দেশের ভবিষ্যৎ এর কথা বিবেচনায় পাটকল বন্ধের এক বছর পূর্তিতে এসে সরকারের আশা করি শুভবুদ্ধির উদয় হবে। সরকার অবিলম্বে সকল শ্রমিকের বকেয়া মজুরি দ্রুত পরিশোধ করে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল চালু ও আধুনিকায়ন করবে।

গত ২ জুলাই পাটের সাথে সম্পৃক্ত সকলে রাষ্ট্রায়ত্ত পাট শিল্পের কালো রাত্রি পালন করেছে। ২ জুলাই সামনে রেখে করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও আন্দোলনকারী সংগঠনগুলি ঢাকাসহ সারাদেশে বড় বড় কর্মসূচি গ্রহণ করেও শেষ মুহূর্তে লগডাউনের জন্য তা তারা করতে পারেনি। ঈদের আগে বদলি শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা কিছু শ্রমিক পরিশোধ করা হয়েছিল ঈদের পরে দেওয়া হলেও এখন নানা কারণ দেখিয়ে বেশ কিছু শ্রমিককে টাকা দেয়া হয়নি। অস্থায়ী দৈনিক ভিত্তিক শ্রমিক কর্মচারীদের দিয়ে পরিচালিত ৫ টিকে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের শ্রমিকরা এখনও কোন বকেয়া টাকা পায়নি। তারাও পাওনা পরিশোধের দাবিতে নানা কর্মসূচি পালন করছে।

অতি সম্প্রতি জানা গেছে, সৌদি আরব পাটকল চালানোর সম্মতি প্রকাশ করেছে। এখন জরুরি হলো, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল রাষ্ট্রীয়ভাবে চালুর দাবিতে দেশপ্রেমিক সকল ব্যক্তি ও শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে শ্রমিকদের সংগঠিত করে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা। কেবলমাত্র ঐক্যবদ্ধ লড়াই-সংগ্রামই পারে এই আন্দলনে বিজয় অর্জন করতে।

লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.