রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল বন্ধের পাঁয়তারা রুখতে হবে

আবিদ হোসেন

সীমাহীন দুর্নীতি-লুটপাট-অব্যবস্থাপনার ফলে সম্ভাবনাময় রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো ধারাবাহিক লোকসানের কবলে ফেলে বন্ধ করার ধারাবাহিকতায় এবার চিনিকলগুলো বন্ধ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বর্তমান সরকার। গত ১০ সেপ্টেম্বর এক অফিস আদেশে দেশের সব চিনিকলের ১১টি বিষয়ের হিসাব চেয়েছে খাদ্য ও চিনিশিল্প কর্পোরেশন। গত ১৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তথ্য কর্পোরেশনে পাঠাতে বলা হয়েছে। এজন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এরই মধ্যে সরকারি ৬টি চিনিকল চলতি মৌসুমে আখ মাড়াই বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। আখ মাড়াই বন্ধ করা চিনিকলগুলো হচ্ছে– পাবনা সুগার মিল, কুষ্টিয়া সুগার মিল, পঞ্চগড় সুগার মিল, শ্যামপুর সুগার মিল, রংপুর সুগার মিল ও সেতাবগঞ্জ সুগার মিল।

সরকারি চিনিকলগুলো বিরাষ্ট্রীয়করণের মাধ্যমে মূলত চিনিখাতকে লুটেরাদের হাতে দিয়ে তুলে দেয়ার ফন্দি চলছে।

এই মৌসুমে আখচাষিরা যখন মাঠে আখ বিক্রি করার জন্য প্রস্তুত ঠিক তখনই আখ মাড়াই বন্ধ করার ঘোষণায় আখ চাষিরাও ভয়ঙ্কর সংকটে পড়ে গেছে। এদিকে চিনিকলগুলো গত মৌসুমের আখ ক্রয়ের টাকাও এখনো পরিশোধ করেনি। এর মধ্যে এই মৌসুমে আখ বিক্রি করতে না পারলে চাষিরা যে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে, সে ব্যাপারেও সরকার নির্বিকার।

বছরের পর বছর চিনিকল ও কর্পোরেশনের সীমাহীন দুর্নীতি-লুটপাট-অব্যবস্থাপনার ফলে প্রায় ৫০০০ কোটি টাকার এই খাত লোকসানে পড়েছে। অথচ প্রতিটি চিনিকলে আখ চাষি ও শ্রমিক-কর্মচারীদের শত শত কোটি টাকা বকেয়া পড়ে আছে।

লোকসানের পেছনে রয়েছে আরও নানাবিধ কারণে। দীর্ঘদিনের পুরাতন মেশিনারির কারণে চিনিকলগুলোর যন্ত্রপাতির উৎপাদন ক্ষমতাও হ্রাস পেয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় দক্ষ লোকবলের ঘাটতি, প্রশিক্ষণ না দেওয়ার দক্ষ শ্রমিকের অভাব, আখের দাম দীর্ঘদিন বকেয়া পড়ে থাকা ও মাঝে মাঝে আখ মাড়াই বন্ধ করার ফলে আখ চাষিদের অন্য ফসল উৎপাদনে ঝুকে পড়া, চিনিকলগুলোতে আখ উৎপাদনে নিজস্ব খামারের জমির পরিমাণ কম থাকা, স্বল্পসময়ে পরিপক্কতা আসে ও চিনির পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এমন উন্নত জাতের আখ বীজ উৎপাদনে অনাগ্রহতা, চাষিদের আখচাষে উদ্বৃদ্ধকরণ প্রশিক্ষণ-প্রচারণা কার্যক্রম না থাকা, চিনিকলে দুর্নীতি, লুটপাট, অব্যবস্থাপনা, ব্যয় বৃদ্ধি, উৎপাদিত চিনি বাজারজাত করার ক্ষেত্রে দুর্বলতা, আখচাষিদের সহজ শর্তে ঋণ বিতরণে জটিলতা, আখের মূল্য পরিশোধে জটিলতা ইত্যাদি নানাবিধ কারণে চিনিকলগুলোর আজ এমন বেহাল অবস্থা।

রাষ্ট্রীয় চিনিকলের সংখ্যা মোট ১৭টি। এর মধ্যে পঞ্চগড় চিনিকল, পাবনা চিনিকল, ফরিদপুর চিনিকল, মোবারকগঞ্জ চিনিকল-ঝিনাইদহ, রংপুর চিনিকল-গাইবান্ধা, রাজশাহী চিনিকল, শ্যামগঞ্জ চিনিকল-রংপুর, সেতাবগঞ্জ চিনিকল-দিনাজপুর, কুষ্টিয়া চিনিকল, কেরু এন্ড কোং বাংলাদেশ লিমিটেড-চয়াডাঙ্গা, জয়পুরহাট চিনিকল, ঝিল বাংলা চিনিকল-জামালপুর, ঠাকুরগাঁও চিনিকল নর্থ বেঙ্গল চিনিকল-নাটোর, নাটোর চিনিকল। লোকসানী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশবন্ধু চিনিকল-নরসিংদী এবং কালিয়াচাপড়া চিনিকল-কিশোরগঞ্জ যথাক্রমে ২০০২ ও ২০০৪ সালে বিরাষ্ট্রীয়করণ করে দেয়া হয়েছে।

এই চিনিকলগুলো চিনি ছাড়াও অন্যান্য বাই প্রোডাক্ট উৎপাদন করে থাকে। চিনি উৎপাদনে ব্যাপক লোকসান হলেও বাই প্রোডাক্ট উৎপাদন করে এবং স্থানীয় বাজারে রপ্তানি করে অনেক কারখানাই লাভজনক অবস্থানে রয়েছে।

সরকারি চিনিকলে উৎপাদিত চিনি গুণগত মানে উৎকৃষ্ট হলেও বাজার ব্যবস্থায় গুরুত্ব না দেয়ায় ভোক্তাদের দ্বারে দেশি চিনি পৌঁছায় না। বিদেশ থেকে অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে পরিশোধনের মাধ্যমে ব্যক্তিখাতের চিনিকলগুলো পরিকল্পিত বাজার ব্যবস্থাপনায় লাভজনক হচ্ছে। ফলে চিনি শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত কৃষক-শ্রমিক-ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ ব্যাপক সংখ্যক জনগোষ্ঠীর জীবন জীবিকা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত এ চিনিকলগুলোর সাথে নানানভাবে ব্যাপক জনগোষ্ঠীও সম্পৃক্ত। চিনিকলগুলোর ভেতরে প্রতিষ্ঠিত স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, চিকিৎসাকেন্দ্র, বাজার, যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদির সাথে স্থানীয় পর্যায়ের লাখ লাখ মানুষ সামাজিক ও আর্থিকভাবে সম্পৃক্ত। চিনিকলগুলো বন্ধ করার মধ্য দিয়ে এই সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে মানুষের দুর্ভোগের সীমা থাকবে না। যেমনটা আমরা দেখেছি আদমজী জুট মিল বন্ধ করার পর।চিনিকলগুলো ব্যক্তিখাতে দিয়ে দিলে বিপুল পরিমাণ জমিও বেহাত হয়ে যাবে।

জনগণের সম্পত্তি রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো বন্ধ না করে আংশিক যন্ত্রপাতি সংযোজন, শ্রমিক-কর্মচারীদের দক্ষ করে গড়ে তোলার কার্যক্রম গ্রহণ, ব্যবস্থাপনার অনিয়ম-দুর্নীতি কঠোরভাবে দমন করা, উৎপাদিত চিনি সাধারণ ভোক্তাদের দ্বারে পৌঁছানোর জন্য দক্ষ ও কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা, পরিশোধিত আমদানিকৃত চিনির শুল্ক বাড়ানো, পরিশোধিত চিনির স্বাস্থ্যগত ক্ষতি ও দেশি চিনির স্বাস্থ্যগত গুণাগুণ প্রচার করা, আখচাষিদের প্রশিক্ষণ, কৃষিঋণে সহজলব্যতা, আখ ক্রয়ে টাকা নগদে ও মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে বিতরণ করলে এসব কল সহজেই লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।

চিনিকলগুলো বন্ধের প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে চিনিকল এলাকাগুলোতে আখচাষি, শ্রমিক-কর্মচারীসহ বাংলাদেশ কৃষক সমিতি চিনিকল রক্ষার আন্দোলন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

পাটকলের মতো চিনিকল বন্ধের পাঁয়তারার বিরুদ্ধেও কৃষক-শ্রমিক-সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

লেখক: সংগঠক, বাংলাদেশের কনিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)।