রানা প্লাজা শ্রমিক হত্যাকাণ্ড: বিচারহীনতার ৯ বছর, দ্রুত বিচার দাবি

অবিলম্বে রানা প্লাজা, তাজরিন ও সেজান জুস কারখানাসহ সকল শ্রমিক হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার দাবি করেছে গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।

একইসাথে ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা দিবসে সমগ্র গার্মেন্ট শিল্পে সাধারণ ছুটি ঘোষণা, রানা প্লাজার জমি অধিগ্রহণ করে স্থায়ীভাবে অক্ষম শ্রমিকদের পুনর্বাসন এবং নিহত-আহত-নিখোঁজ শ্রমিকদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে গার্মেন্ট শ্রমিক টিইউসি’র নেতৃবৃন্দ।

২৪ এপ্রিল, রবিবার দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে রানা প্লাজা শ্রমিক হত্যাকাণ্ড দিবস পালিত হয়েছে। সকাল ৯টায় সাভারে রানা প্লাজার সামনে অবস্থিত স্মৃতিস্তম্ভ এবং জুরাইন কবরস্থানে নিহত শ্রমিকদের কবরে পুষ্পমালা অর্পণ এবং সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সকাল ৯টায় রানা প্লাজার সামনে গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র’র পুষ্পমাল্য অর্পণ পরবর্তী সমাবেশে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার বলেন, হাজারো শ্রমিকের মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচার গত ৯ বছরেও সম্পন্ন হয়নি। এতগুলো বছর অতিক্রান্ত হলেও, কেন রানা প্লাজা শ্রমিক হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন না হয়ে উল্টো গ্রেপ্তারকৃত মালিকসহ দায়ীদের মুক্তি দেয়া হয়েছে তার জবাব সরকারকে দিতে হবে। তিনি সরকারের পক্ষ থেকে দায়ী ব্যক্তিদের রক্ষা চেষ্টার নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে সকল শ্রমিক হত্যাকাণ্ডে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান। তিনি বলেন, একের পর এক শ্রমিক হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ায় ঘটনার ক্রমাগত পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

জলি তালুকদার আরও বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি অতীতের সকল নজির অতিক্রম করেছে। শ্রমিকের জীবন বাঁচানোর পদক্ষেপ হিসেবেই সরকারকে অবিলম্বে মজুরি বৃদ্ধির ঘোষণা দিতে হবে। তিনি বলেন, পৃথিবীর সর্বোচ্চ রপ্তানী করেও সর্বনিম্ন মজুরি পাওয়া শ্রমিকরা আজ তিল পরিমাণ মাসিক আয় নিয়ে সাগর সমান জীবনব্যয়ের মুখোমুখি অসহায় দাঁড়িয়ে আছে। তিনি বলেন, শ্রমিকের ক্ষোভ গণবিস্ফোরণে রূপ নেয়ার পূর্বেই সরকার মজুরি বৃদ্ধির উদ্যোগ নিলে তা সব পক্ষের জন্য ভালো হবে। তিনি অবিলম্বে জাতীয় নিম্নতম মজুরি ২০ হাজার টাকা ঘোষণার দাবি জানান।

সাভারের রানা প্লাজার সামনে পুষ্পমাল্য অর্পণ শেষে গার্মেন্ট শ্রমিক টিইউসি সাভার-আশুলিয়া আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি সাইফুল আল মামুনের সভাপতিত্বে এবং অঞ্চলিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক কে এম মিন্টুর পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন সিপিবি সাভার উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাজেদা বেগম সাজু, রানা প্লাজা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি এমদাদুল ইসলাম, গার্মেন্ট শ্রমিক টিইউসি’র কেন্দ্রীয়নেতা মোহাম্মদ শাজাহান, প্রকৌশলী রুহুল আমীন, মঞ্জুরুল ইসলাম এবং কাজী ফিরোজ প্রমুখ। সমাবেশ শেষে একটি ক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।

সকাল ৯টায় জুরাইন কবরস্থানে নিহত শ্রমিকদের কবরে পুষ্পমালা অর্পণ করা হয়। এসময় অনুষ্ঠিত সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের প্রাক্তণ সাধারণ সম্পাদক সাদেকুর রহমান শামীম বলেন, পঙ্গু হয়ে যাওয়া শ্রমিকদের জন্য স্থায়ী পুনর্বাসন খুব জরুরি হওয়া সত্ত্বেও সে ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ এখনও গ্রহণ করা হয়নি। তিনি আহত ও স্থায়ীভাবে অক্ষম শ্রমিকদের পুনর্বাসন ও সুচিকিৎসার দাবি জানান। তিনি রানা প্লাজার জায়গা অধিগ্রহণ করে তাদের স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন কাজে সেই জায়গা ব্যবহার করার দাবি জানান। তিনি বলেন চিকিৎসার অভাবে, অনাহারে-অর্ধাহারে অনেক আহত ও অক্ষম শ্রমিক মানবেতরভাবে দিনাতিপাত করছে।

জুরাইনের সমাবেশে গার্মেন্ট শ্রমিক টিইউসি’র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন বলেন, বর্তমান সময়ে দেশের শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষের ওপর সীমাহীন জুলুম-নির্যাতন নেমে এসেছে। এই অবস্থায় সরকার খাদ্য, চিকিৎসা, চাকুরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় শ্রমজীবী মানুষ ভয়াবহ সংকটের মুখে পতিত হয়েছে। তিনি অব্যাহত শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ, ঈদের আগে গার্মেন্ট শ্রমিকদের সকল বকেয়াসহ এপ্রিল মাসের পূর্ণ বেতন এবং পূর্ণাঙ্গ ঈদ বোনাস পরিশেধের দাবি জানান।

জুরাইন কবরস্থানে পুষ্পমাল্য অর্পণ শেষে অনুষ্ঠিত সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন গার্মেন্ট শ্রমিক টিইউসি’র কোষাধ্যক্ষ এম এ শাহীন, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মঞ্জুর মঈন, সিপিবি ঢাকা কমিটির সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য সাইফুল ইসলাম সমীর, গার্মেন্ট টিইউসির কেন্দ্রীয় নেতা নুরুল ইসলাম, জনি আরাফ খান, হোসেন আলী, শাহীন আলম প্রমুখ। এ সময় বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র’র পক্ষ থেকেও নিহত শ্রমিকদের কবরে পুষ্পমাল্য অর্পণ করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.