দুই মাস ধরে রান্না করা খাবার বিতরণ চলছে সিপিবির

রাজবাড়ী প্রতিনিধি, আবুল কালাম:

দীর্ঘ দুই মাসের বেশি সময় ধরে হতদরিদ্র ছিন্নমূল মানুষের মধ্যে রান্না করা খাদ্য বিতরণ করে চলেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) রাজবাড়ী জেলা কমিটি। খাদ্য বিতরণ ছাড়াও ৬ষ্ঠ বারের মত ১৪০টি পরিবারের বাড়িতে চাল, ডাল, তেল, চিনি, আটা, সাবান, সুজি উপহার হিসাবে পৌঁছে দিয়েছে।

বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাস দেখা দিলে দেশে গত ২৫ মার্চ থেকে লকডাউন ঘোষণা দিয়ে সরকার দেশের ট্রেন বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়। ট্রেন চলাচল বন্ধ হওয়ায় এবং লকডাউনের কারণে দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলা পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী জেলাসহ বিভিন্ন জেলার ২ শতাধিক ক্ষেতমজুর রাজবাড়ী রেলওয়ে স্টেশনে আটকা পড়ে যান। করোনাভাইরাস ও লকডাউনের কারণে কৃষক এদের কাজে রাখে না। আটকে পড়া এসব ক্ষেতমজুর ও ছিন্নমূল মানুষ পড়ে যান চরম খাদ্য সংকটে।

যাদের সামান্য কিছু টাকা ছিল তাদেরও হোটেল রেস্তরা বন্ধ থাকার কারণে কিনে খাবার উপায় ছিল না। তাদের চরম খাদ্য সংকটের কারণে রাজবাড়ী জেলা কমিউনিস্ট পার্টি রেল স্টেশন সংলগ্ন ফুলতলায় রান্না করা খাবার বিতরণ শুরু করে। প্রতিদিন ৩ বেলা সকাল-দুপুর-রাতে ১৫০ থেকে ২০০ মানুষের মধ্যে এ খাদ্য বিতরণ করা

শুরু হয়। রান্নাকরা খাবার ও ত্রান-সামগ্রী বিতরণে উদ্যোগ গ্রহন করে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন সিপিবি জেলা কমিটির সদস্য আবুল কালাম, শহর কমিটির সম্পাদক আব্দুস সাত্তার মন্ডল, শুভাকাঙ্ক্ষী আব্দুর রহিম ডাবলু, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের রাজবাড়ী সদর উপজেলা কমিটির সাবেক কমান্ডার আব্দুল জলিল মিয়া।

একই সঙ্গে তাদের ঘরে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। রাজবাড়ী থেকে পদ্মা নদীর ওপারে নাজিরগঞ্জ ঘাটে আটকে থাকা খালি ট্রাক ও মাইক্রোবাসে তাদের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো সম্ভব হয়। এভাবে ২৬৪ জনকে বিভিন্ন জেলায় তাদের ঘরে ফেরানিশ্চিত করা হয়। তাদের বাড়ি পাঠানোর পরেও প্রতিদিন খাদ্য গ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে।

এ সময়ে রাজবাড়ী জেলার বিভিন্ন গ্রামের কৃষকদের সঙ্গে করে ২৫০ জন ক্ষেতমজুরকে কাজে পাঠানো হয়। প্রতিদিন রান্না করা খাদ্য বিতরণ, ঘরে ফেরানো ও কাজে পাঠানোর উভয় কাজই চলতে থাকে। প্রতিদিন ১৫০-২০০ মানুষকে খাবার সরবরাহ করা দূরুহ হয়ে পড়ে।

রান্না করা খাবার বিতরণ, ঘরে ফেরা ও কাজে পাঠানোর ঘটনা, ফেসবুক আইডি থেকে প্রচারের কারণে অনেক বন্ধু আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন। অনেকেই বাড়ি থেকে রান্না করা খাবার এনে পৌঁছে দেন। কেউ কেউ চাল ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করেন। শহর ও গ্রাম এলাকার বহু নারী-পুরুষ খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি নিজ চোখে দেখে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।

এই মানবিক কাজ রাজবাড়ী জেলায় খুবই প্রচার পায়। এসময়ই সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে বিভিন্ন জেলার ত্রাণ চুরির ঘটনা প্রকাশ পায়। রান্না করা খাবার বিতরণ স্থলে কমিউনিস্ট পার্টি একটি রিলিফ চোরের কুশপুত্তলিকা তৈরি করে রাস্তার পাশে বঁাঁশে বেধে ত্রাণ চোরদের কঠোর শাস্তির দাবিতে ফেস্টুন টানিয়ে রাখে। পরে কেন্দ্রীয় ভাবে রিলিফ চুরির প্রতিবাদে কর্মসূচি ঘোষণা করা হলে রিলিফ চোরের কুশপুত্তলিকা দাহ করে কর্মসূচি পালন করা হয়। এ কর্মসূচি চলার সময় শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে ২/৩শত মানুষ উপস্থিত থেকে ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ করেন। অনেকেই পায়ের জুতা, সেন্ডেল খুলে ত্রাণ চোরের স্ট্যাচুতে আঘাত করতে দেখা যায়। পথচারীরা এখনও ঢিল ছুড়ে, থুথু দিয়ে প্রতিদিন রিলিফ চোরের প্রতি ঘৃণা জানাচ্ছেন।

রোজার মাসে ৩ বেলার পরিবর্তে ২ বেলা রান্না করা খাবার দেয়া হয়। গত ১৫/২০দিন আগে ধান কাটা শুরু হবার পর অধিকাংশ কর্মক্ষম ক্ষেতমজুর ধান কাটার কাজে চলে গেছে। তারপরও গ্রাম থেকে নিঃস্ব হয়ে আসা বেশ কিছু নারী পুরুষের ঠিকানা এখনো রাজবাড়ী রেল স্টেশন। ভিক্ষুক, মানসিক ভারসাম্যহীন, শারীরিক প্রতিবন্ধী সেই ৪০/৫০জন মানুষকে এখনও রান্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।

এছাড়া করোনাভাইরাসের কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া নিম্ন আয়ের মানুষকে শবে বরাত, ঈদুল ফিতরসহ ৬ষ্ঠ বারের মত ১৪০টি পরিবারকে চাল, ডাল, তেল, সুজি, সেমাই, আটা, সাবান সরবরাহ করা হয়েছে। করোনায় আক্রান্ত ২টি ক্ষেতমজুর পরিবারকে ১ মাসের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। রাজবাড়ী জেলা কমিউনিস্ট পার্টির এ ত্রাণ তৎপরতা স্থানীয় পত্র পত্রিকায় গুরুত্বের সাথে প্রকাশ পেয়েছে এবং স্থানীয়ভাবে মানুষের প্রশংসা লাভ করেছে।