রাজনৈতিক দলে গণতন্ত্র ও কেন্দ্রিকতা

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম :

।। ১ ।।

গণতন্ত্রের জন্য এ দেশের মানুষ বহুদিন সংগ্রাম করেছে। এজন্য তারা বুকের রক্ত দিয়েছে। এই সংগ্রামে নানা সময় সাময়িক বিজয়ও তারা অর্জন করেছে। কিন্তু সে বিজয় ধরে রাখতে পারেনি। গণতন্ত্র তাদের কাছে অনেকটাই যেন ‘সোনার হরিণ’ হয়ে থাকছে। নানাবিধ কারণে এটি ঘটছে। সেসব কারণের মধ্যে প্রধান হলো, – দেশে অব্যাহতভাবে বহাল থাকা শোষণভিত্তিক আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা। এদেশের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো দেশি-বিদেশি ‘লুটেরা শোষকদের’ স্বার্থ দেখা। ‘গণতন্ত্রের’ চর্চা হলো সেই লক্ষ্যের সাথে সাংঘর্ষিক। ফলে ‘গণতন্ত্র’ হরণ করে হলেও ‘শোষকের স্বার্থকে ‘ বজায় রাখা হচ্ছে।

‘গণতন্ত্র’ কোনো ‘ফাঁকা বুলি’ নয়। এর মর্মবাণী খুবই গভীর। গণতন্ত্রের মর্মার্থ হলো ‘জনগণের ইচ্ছানুসারে’ একটি রাষ্ট্রের যাবতীয় কাজ সম্পাদিত হওয়া। গণতন্ত্রের পথে চলতে হলে তার প্রতিফলন ঘটতে হবে দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিকসহ সমস্ত ক্ষেত্রে ও ব্যবস্থাতে। কিন্তু, ‘গণতান্ত্রিক’ বলে দাবিদার বেশির ভাগ রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে তো বটেই, এমনকি রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও গণতন্ত্রের অনেক উপাদান অনুপস্থিত থাকে। আমাদের দেশে গণতন্ত্রের হাল-হকিকত তেমনই। মুখে আছে কিন্তু কাজে নেই। নেই তার অন্তঃসার। এমনকি, মুখে মুখে থাকলেও তা ‘এই আছে তো এই নেই’।

বলা হয়ে থাকে যে, দেশে ‘গণতন্ত্রহীনতা’র কারণ হলো দেশের রাজনীতিতে ‘গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি’র দুর্বলতা বা অভাব। কথাটি কিছুটা সত্য বটে। এ কথার সঙ্গে যুক্ত করে অনেকে আবার বলার চেষ্টা করেন যে, ‘দলের ভেতরে গণতন্ত্র’ না থাকার কারণেই আজ দেশের রাজনীতিতে ‘গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি’ নেই, তথা ‘গণতন্ত্র’ নেই। এ কথারও কিছু সত্যতা আছে। তবে, ‘গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি’ ও ‘গণতন্ত্রে’র অনুপস্থিতির জন্য এটিই মূল কারণ নয়। গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে মৌলিক সমস্যা দেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার স্বরূপের মধ্যে নিহিত। সে বিষয় নিয়ে পৃথকভাবে আলোচনা প্রয়োজন। এখানে শুধু ‘রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে’ গণতন্ত্র চর্চা সম্পর্কে কিছু প্রসঙ্গের অবতারণা করব।

।। ২ ।।

ছোট হোক বা বড় হোক, কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠন শুধু একজন ব্যক্তিকে নিয়ে গঠিত হয় না। দল গঠনের ক্ষেত্রে একটি প্রাথমিক শর্ত হলো দলে একাধিক সদস্য থাকতে হবে। যেহেতু একাধিক ব্যক্তিকে নিয়ে দলকে চলতে হয় সে কারণে দলের প্রত্যেক সদস্যের পক্ষে পরিপূর্ণ শতভাগ পরিমাণে ‘যা ইচ্ছা তাই করার অধিকার’ ভোগ করা সম্ভব হতে পারে না। ‘নিজের আপন ইচ্ছা’কে কিছুটা হলেও ‘দলের যৌথ ইচ্ছা’র কাছে সমর্পণ না করলে দল গঠন করা যায় না। এই সাধারণ কথাটি একটি স্বতঃসিদ্ধ সত্য। ‘দল’ বা ‘সংগঠন’ করার অর্থই হলো ‘নৈরাজ্যবাদ’ বা ‘অরাজপন্থা’ (anarchism)-কে নাকচ করে কম-বেশি পরিমাণে ‘যা ইচ্ছা তাই করার অধিকার’ স্বেচ্ছায় ত্যাগ করা।

দলের সদস্যদের ক্ষেত্রে তাই বিবেচ্য বিষয়টি ‘যা ইচ্ছা তাই করার অধিকারে’র প্রসঙ্গ নয়। বিবেচ্য বিষয়টি হলো, ‘নিজের আপন ইচ্ছা’কে যেটুকু ‘দলের যৌথ ইচ্ছা’র কাছে সমর্পণ করা হচ্ছে, তার ওপর কর্তৃত্ব করবে কে বা কারা। অর্থাৎ, দলের কাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে দলে অন্তর্ভুক্ত সদস্যদের কতটা বিধিসম্মত অধিকার থাকবে- সেটি। মূলত এর দ্বারাই পরিমাপ করা সম্ভব যে, একটি দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র কার্যকর রয়েছে কি না এবং থাকলে তা কতটা রয়েছে।

দলের নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে দুটি উপাদান থাকে। একটি হলো— সেই নীতিটি যারা প্রণয়ন করে সেই উপাদান, অর্থাৎ যাকে তার বিষয়গত উপাদান বা subject বলে আখ্যায়িত করা হয়। আর অপরটি হলো যার ওপর নীতিটি প্রয়োগ করা হয়, অর্থাৎ যাকে আখ্যায়িত করা হয় তার বিষয়ীগত উপাদান বা object হিসেবে। দলের সদস্যরা দল পরিচালনায় ও তার কাজকর্মে শুধু ‘object’ হয়ে না থেকে কতটা ‘subject’-এর ভূমিকা পালনের সুযোগ পাচ্ছে সেটিই হলো দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের উপস্থিতির মাপকাঠি। অর্থাৎ, দলে গণতন্ত্র নিশ্চিত হওয়াটা নির্ভর করে দল পরিচালনায় দলের সব সদস্য ভূমিকা রাখার সুযোগ পাচ্ছে কি না এবং পেলেও তা কতটা পাচ্ছে তার ওপরে।

একটি দলের ওপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দলের নিম্নোক্ত তিনটি উপাদানের ওপর মূলত নির্ভর করে। এগুলো হলো :
(ক) দলের নীতি, আদর্শ ও কর্মকৌশল।
(খ) দলের সংগঠন-কাঠামো।
(গ) দলের অর্থ-সম্পদ।
দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রে প্রথমেই যে বিষয়টির প্রতি বিশেষ নজর দেয়া আবশ্যক, তা হলো—দলের নীতি, আদর্শ ও কর্মকৌশল নির্ধারণের প্রক্রিয়ার সঙ্গে দলের প্রত্যেক সদস্যকে যুক্ত রাখা হচ্ছে কি না। প্রতিটি সদস্যের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ভূমিকা ও অবদান রাখার সুযোগ আছে কি না। দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা বাস্তবে অর্থপূর্ণ করে তুলতে হলে এটিই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ।

এক্ষেত্রে আরেকটি জরুরি কর্তব্য হলো, দলের সাংগঠনিক কাঠামোকে গণতান্ত্রিক ধারায় পরিচালনা করা। এজন্য গুরুত্বপূর্ণ ও আবশ্যিক কতক কাজ হলো :
ক। ব্যক্তিনেতৃত্বের বদলে যৌথনেতৃত্ব নিশ্চিত করা।
খ। নির্বাচনের মাধ্যমে সব স্তরের কমিটি গঠনের ব্যবস্থা করা।
গ। সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিধান কার্যকর করা।
ঘ। ব্যক্তিপূজার প্রবণতা রোধ করা
ঙ। পরিবারতন্ত্রের ধারা বন্ধ করা।—ইত্যাদি।

একইসঙ্গে এক্ষেত্রে যা নিশ্চিত করা আবশ্যক তা হলো—দলীয় তহবিল পরিচালনায় গণতান্ত্রিক চর্চা। দলের অর্থ-সম্পদ পরিচালনার ক্ষেত্রে যেসব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা একান্ত কর্তব্য সেগুলো হলো:
১/ ফান্ড সম্পর্কে স্বচ্ছতা।
২/ আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব রক্ষা।
৩/ ফান্ড সংগ্রহে সকলের অংশগ্রহণ।
৩/ খরচে অগ্রাধিকার নির্ধারণে যৌথভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ।
৪/ নিয়মিতভাবে হিসাবপত্র চেক-আপ করার ব্যবস্থা।—ইত্যাদি।

এসব প্রসঙ্গগুলো শুধু পাঠ্যবইয়ের একাডেমিক বিষয় নয়। এসব বিষয়ের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত রয়েছে একটি রাজনৈতিক দলের ‘মৌলিক চরিত্রে’র বিষয়টি। এ বিষয়টিকে সবচেয়ে আগে বিবেচনায় রাখতে হবে। যেকোনো রাজনৈতিক দলের মৌলিক বৈশিষ্ট্য ও চরিত্র চিহ্নিত হয় তার যে তিনটি উপাদানের ভিত্তিতে, সেগুলো হলো :
(ক) তার শ্রেণিভিত্তি
(খ) তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-কর্মসূচি
(গ) তার মতাদর্শ।

একটি দলের মৌলিক চরিত্র তার এই তিনটি বৈশিষ্ট্যের স্বরূপ দ্বারাই নির্ধারিত হয়। দলের সাংগঠনিক নীতি তার সেই মৌলিক চরিত্র থেকে ভিন্ন হতে পারে না। যেমন কিনা, কোনো একটি রাজনৈতিক দলের নীতি-আদর্শই যদি হয় ‘লুটপাটতন্ত্র’, তা হলে সেই নীতি বজায় রেখে দলের নেতৃত্বে যদি ‘একনায়কত্বে’র বদলে ‘যৌথ নেতৃত্ব’ও প্রতিষ্ঠা করা হয়, কিংবা এমনকি দলের সব সদস্যকেও যদি নীতি নির্ধারণের কর্তৃত্ব দেয়া হয়, তাহলেও যা ছিল ‘ব্যক্তিগত কর্তৃত্বে লুটপাট’, তা তখন হয়ে উঠবে ‘যৌথ কর্তৃত্বে লুটপাট’। এক্ষেত্রে ‘কর্তৃত্বের বিকেন্দ্রীকরণ’ পরিণত হবে ‘লুটপাটের বিকেন্দ্রীকরণে’।

মার্ক্সবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত একটি কমিউনিস্ট পার্টির মৌলিক চরিত্র নির্ধারিত হয় যেসব বৈশিষ্ট্য দ্বারা, সেগুলো হলো :
(ক) শ্রমিকশ্রেণি ও মেহনতি মানুষের পার্টি হিসেবে তার শ্রেণিভিত্তি,
(খ) সমাজতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী সমাজ ও সভ্যতা নির্মাণের উদ্দেশ্যে তার লক্ষ্য ও কর্মসূচি,
(গ) তার মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের মতাদর্শগত ভিত্তি।

এমন একটি পার্টির ‘সাংগঠনিক নীতি’র ভিত্তিকে আবশ্যিকভাবে এসবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। সেই নীতি হলো ‘গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা’র নীতি। এসব মৌলিক বৈশিষ্ট্য ও সাংগঠনিক নীতির ক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটলে সেটি আর ‘কমিউনিস্ট পার্টি’ থাকে না। একটি কমিউনিস্ট পার্টির নিয়ম-কানুন-বিধি-বিধান ইত্যাদি স্থান-কালের পরিপ্রেক্ষিতে নির্ধারণ করতে হয় ঠিকই, কিন্তু সেগুলো কোনোভাবেই ‘গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা’র মৌলিক নীতিমালার বাইরে রচিত হতে পারে না।

১৯৯৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির ‘বিলোপবাদী’ দলত্যাগীরা পার্টিকে তার এই তিনটি মৌলিক ভিত্তি থেকে প্রতারণামূলকভাবে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছিল। একইসঙ্গে তারা পার্টির ‘গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা’র নীতিও বিলুপ্ত করতে চেয়েছিল। ‘রূপান্তর’ আর ‘সৃজনশীলতা’র ভ্রান্ত ব্যাখ্যা দিয়ে তারা বস্তাপচা তত্ত্ব হাজির করেছিল। তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল কমিউনিস্ট পার্টিকে ‘বিলুপ্ত’ করা।

দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চার প্রসঙ্গে আবার ফিরে আসা যাক। এ কথা মনে রাখতে হবে যে, অন্য অনেক কিছুর মতো গণতন্ত্রেরও যেমন একটা সারসত্তা (content) থাকে, আবার তার থাকে একটি সুনির্দিষ্ট রূপও (form)। বুর্জোয়া মতাদর্শের তাত্ত্বিকরা সাধারণত গণতন্ত্রের content-কে মোটেই বিবেচনায় নিতে চান না। তারা তার form-কেই একচ্ছত্র প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। অন্যদিকে যান্ত্রিক মার্ক্সবাদীরা অনেক সময়ই গণতন্ত্রের content-কে মূল বিষয় হিসেবে গণ্য করতে গিয়ে তার form-কে একটি অপ্রয়োজনীয় ও তাচ্ছিল্যের বিষয় হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। ভাবটা যেন এমন যে, গণতন্ত্রের উদ্ভাবিত formগুলো (যা সাধারণ মানুষের দীর্ঘ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে উদ্ভাবিত ও অর্জিত হয়েছে, এবং যা আজ সভ্যতার সাধারণ সঞ্চয় হয়ে উঠেছে) নিছকই বুর্জোয়াদের ব্যাপার। আর তাই সেগুলো ঢালাওভাবে পরিত্যাজ্য। আসলে মার্ক্সবাদীদের প্রকৃত কর্তব্য হলো, ইতিহাসের ধারায় গণসংগ্রামের মাধ্যমে উদ্ভাবিত গণতন্ত্রের সার্বজনীন form-কে সমাজতান্ত্রিক content সম্পন্ন করে তোলার জন্য সংগ্রাম করা। কোন form যদি সেই নতুন content-কে ধারণের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, সেক্ষেত্রে মার্ক্সবাদীদের কর্তব্য হলো তাকে বদলে দিয়ে নতুন form-এ উত্তরণ ঘটানো। মনে রাখা দরকার যে, content এবং form, একটি আরেকটির সঙ্গে দ্বান্দ্বিকভাবে সম্পর্কিত এবং একটি অপরটিকে যেমন প্রভাবিত করে, তেমনি এগুলো একে অপরের দ্বারা প্রভাবিত হয়। তবে, সার্বিক বিবেচনায় content-ই হয় চূড়ান্ত নিয়ামক।

এসব কথা ‘গণতন্ত্রে’র ক্ষেত্রে সাধারণভাবে যেমন সত্য, ‘রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চা’র ক্ষেত্রেও সেগুলো সমানভাবে সত্য। তাই, রাজনৈতিক দলের মৌলিক চরিত্র (content) অর্থাৎ, তার শ্রেণিভিত্তি, লক্ষ্য এবং আদর্শ নিয়ে মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ যেমন একটি প্রয়োজনীয় কাজ, তেমনি তার পাশাপাশি দলের সাংগঠনিক নিয়ম-কানুন, বিধি-বিধান ও সেসবের বাস্তব প্রয়োগ তথা (form) সম্পর্কে আলোচনাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই বিবেচনা থেকে আমাদের দেশের বিভিন্ন দলে তার সদস্যরা দলীয় নীতি ও কর্মকৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাস্তবে কতটা সুযোগ পায়, সেদিকে এবার একটু দৃষ্টি দেয়া যাক।

।। ৩ ।।

আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ইত্যাদি বুর্জোয়া ধারার দলগুলোতে দলের প্রাথমিক সদস্যদের দলীয় নীতি নির্ধারণে প্রত্যক্ষ ভূমিকা গ্রহণের কোনো ব্যবস্থা নেই। এমনকি সে বিষয়ে সদস্যদের কোনো ভূমিকা যে আদৌ থাকতে পারে সে সম্পর্কে ন্যূনতম বিবেচনা কিংবা ধারণাও এসব দলে প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। নেতাদের পেছনে জমায়েত হয়ে ‘জিন্দাবাদ’ দেয়াটাই যেন সাধারণ সদস্যদের একমাত্র দায়িত্ব। নীতি ও কর্মকৌশল নির্ধারণের কাজটি যেন একচ্ছত্রভাবে ‘নেতাদের’ জন্য সংরক্ষিত বিষয়। নেতা বা নেত্রীর উচ্চারিত ‘বাণী’ই দলের নীতি ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত বলে গণ্য করা হয়। নেতা বা নেত্রীর দ্বারাই ‘ঘোষণা’ করা হয় দলের কর্মকর্তা ও কমিটির ‘তালিকা’। দলীয় সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে দলের প্রাথমিক সদস্যদেরকে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত করার ধারণাটিও এসব দলে এখনো প্রায় পরিপূর্ণভাবে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ হয়ে আছে। অথচ এই বিষয়টিই হলো দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

জামায়াতে ইসলামী বা এধরনের সাম্প্রদায়িক দলগুলো ‘গণতন্ত্রের চর্চা’র ক্ষেত্রে আরো এক ধাপ পিছিয়ে আছে। বুর্জোয়া দলে বিরাজমান ‘একনায়কতন্ত্র’, ‘পরিবারতন্ত্র’ ইত্যাদির চেয়ে আরো পশ্চাৎমুখী ‘আমিরতন্ত্রে’র ব্যবস্থা এসব ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলে চালু রয়েছে। একক ব্যক্তির ‘আমিরত্বে’র হাতে এসব দলের সাংগঠনিক নেতৃত্ব কেন্দ্রীভূত থাকে। শুধু তাই নয়, তার হাতে আধ্যাত্মিক নেতৃত্বও ন্যস্ত করা হয়ে থাকে। এসব দলের সাংগঠনিক নীতিতেও মধ্যযুগীয় সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী চিন্তাধারার প্রতিফলন স্পষ্টভাবে প্রকাশিত।

।। ৪ ।।

কমিউনিস্ট পার্টিসহ মার্ক্সবাদী দলগুলোতে ‘অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চা’র ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বহুলাংশেই ভিন্ন রকম। এসব দল ‘গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা’র নীতি অনুসরণ করে। ‘গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা’ নিয়ে অপপ্রচার আছে। এ নিয়ে এরূপ একটি ভ্রান্তি ছড়ানো হয় যে, কমিউনিস্ট পার্টি হলো ‘ক্যাডারভিত্তিক’ ও ‘রেজিমেন্টেড’ দল। একারণে এসব দলে ‘অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের’ কোনো সুযোগ নেই।

কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো এই যে, কমিউনিস্ট পার্টির মতো দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ‘গণতন্ত্র’ ও ‘কেন্দ্রিকতা’—এই উভয় উপাদানের সমন্বয়ের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়ে থাকে। সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদের লক্ষ্যে ‘সমাজবিপ্লব’ সম্পন্ন করতে হলে শ্রেণিসংগ্রামের কঠোর পথ ছাড়া সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এটি একটি সার্বিক ‘শ্রেণিযুদ্ধে’র ব্যাপার। যুগ যুগ ধরে চলে আসা শোষণভিত্তিক ব্যবস্থা বিশ্বব্যাপী ও সর্বত্র আজও অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, মতাদর্শিক, নৈতিক ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রে আধিপত্ব প্রতিষ্ঠা করে রেখেছে। শোষণের ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য বুর্জোয়া শ্রেণি প্রবল বল প্রয়োগের যন্ত্র হিসেবে ‘রাষ্ট্র’ ও তার নিপীড়নের বাহিনীসহ সব ধরনের হাতিয়ার মজুদ ও ব্যবহার করছে। শ্রেণিসংগ্রাম ও গণসংগ্রামের মাধ্যমে ‘পাল্টা বল প্রয়োগ’ ব্যতীত বুর্জোয়া শাসনের জিঞ্জির চুরমার করা সম্ভব নয়। ইতিহাস থেকে দেখা যায় যে অতীতের সব ‘বিপ্লবে’র সফলতার জন্য এরূপ ‘বল প্রয়োগ’ করতে হয়েছে।

‘শ্রেণিযুদ্ধে’ জয়যুক্ত হওয়ার জন্য ‘সংগঠন’ই হলো মেহনতি মানুষের প্রধান অস্ত্র ও অবলম্বন। উপযুক্ত সংগঠন ছাড়া এ লড়াইয়ে জয়যুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম কেবল ‘ভাবধারাগত’ সংগ্রামের একটি বিষয় নয়। সে সংগ্রামের মূল উপাদান হলো বাস্তব শ্রেণিস্বার্থের দ্বন্দ্ব-আশ্রিত সংগ্রাম। তাই, সেই সংগ্রামে সফলতার জন্য কমিউনিস্ট পার্টিকে সুশৃঙ্খল বিপ্লবী ধারায় তার কাজ পরিচালনা করতে হয়। সংগঠনকেও সেকারণে উপযুক্ত শৃঙ্খলার ধারায় গড়ে তুলতে হয়।

সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে অগ্রনায়কের দায়িত্ব ‘শ্রমিকশ্রেণি ও মেহনতি মানুষ’কে পালন করতে হবে। এটিই ইতিহাসের শিক্ষা। কিন্তু সমাজের সব মেহনতি মানুষের চেতনার উন্মেষ ও বিকাশ একসঙ্গে ও সমানতালে হয় না। তাই, শ্রেণি হিসেবে বৃহত্তর শ্রমিকশ্রেণিকে সমাজ বিপ্লবে অগ্রনায়কের ভূমিকা পালন করতে হলে তাদের একটি ‘বর্শাফলক’ তথা ‘অগ্রবাহিনী’ থাকা আবশ্যক হয়। কমিউনিস্ট পার্টির দায়িত্ব হলো মেহনতি মানুষের সেরূপ ‘অগ্রবাহিনী’র ভূমিকা পালন করা। একারণে উচ্চ আদর্শনিষ্ঠা, নীতিবোধ ও প্রগতিবাদী বিপ্লবী চেতনা ও কর্মকাণ্ডে পরিক্ষিত ব্যক্তিদেরই পার্টির সদস্যপদ দেয়া হয়। ‘বিপ্লবী শৃঙ্খলা’সম্পন্ন শক্তি হয়ে ওঠার জন্য পার্টি সদস্যপদ প্রদানের ক্ষেত্রে এ বিবেচনাটি একটি আবশ্যিক ও অপরিহার্য শর্ত। পার্টিকে জনগণের সঙ্গে, বিশেষত মেহনতি মানুষের সঙ্গে, নিবিড় ও একাত্ম সম্পর্ক রেখে চলা প্রয়োজন। তাকে মেহনতি জনতার ‘পাশে’ এবং একইসঙ্গে তাদের ‘সামনে’ থাকা আবশ্যক। পার্টি সদস্যদের ‘পেশাজীবী বিপ্লবী’ হওয়া আবশ্যক। তাদের অনেকেরই ‘স্বার্বক্ষণিক’ পার্টির কাজে নিয়োজিত থাকা প্রয়োজন।

পার্টিকে ‘একশিলা’ (monolithic) কাঠামো সম্পন্ন হতে হয়। সেজন্য যা অপরিহার্য তা হলো পার্টিতে
ক) যেকোনো নির্দিষ্ট সময়ে সব সদস্যের করণীয় হিসেবে একটি মাত্র অনুসরণীয় ‘সাধারণ লাইন’ থাকা,
খ) একাধিক পার্টি-কেন্দ্রের অস্তিত্ব থাকার সুযোগ না থাকা,
গ) পার্টি সদস্যদের নিজ-নিজ পার্টি-সংগঠনে যেকোনো বিষয়ে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের অধিকার এবং ‘পার্টি কংগ্রেসসহ ঊর্ধতন পার্টি-সংগঠনের কাছে তার কোনো প্রস্তাব, বক্তব্য ও আবেদন পেশ করা’র পূর্ণ সুযোগ নিশ্চিত করা।
ঘ) ‘পার্টির ঐক্য রক্ষা … নিয়ম-শৃঙ্খলা ও গঠনতন্ত্র মেনে চলা’ নিশ্চিত করা।

পার্টির এই ‘একশিলা’ (monolithic) চরিত্র ও কাঠামো বজায় রাখা অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে অবহেলার অর্থ দাঁড়াবে সমাজবিপ্লবের কাজে শ্রমিকশ্রেণিকে ‘নিরস্ত্র’ (disarm) করে রাখা। সমাজবিপ্লবের জন্য একটি সুশৃঙ্খল ও বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলা অপরিহার্য। এই প্রক্রিয়াকে ‘নির্বিচার কাঠামোবিরোধিতা’র নৈরাজ্যবাদী চিন্তা ও চর্চা নিরুৎসাহিত ও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

কমিউনিস্ট পার্টিতে তার ‘একশিলা’ চরিত্র ও বিপ্লবী শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক বিধি-বিধানের চর্চা করা হয়। এই বিপ্লবী শৃঙ্খলা ‘হুকুমের দাস’ নির্ভর তথাকথিত ‘রেজিমেন্টেশন’ নয়। একটি মার্ক্সবাদী দলে শৃঙ্খলা আসে আত্মসচেতন উপলব্ধি ও নিয়মানুবর্তিতা থেকে। গণতান্ত্রিক বিধানের ভিত্তিতে। সেরূপ নিয়মানুবর্তিতাই পার্টিতে বাস্তবে চর্চা করা হয়। কোনোক্রমেই তা ‘হুকুমের দাস’-এর প্রক্রিয়ায় করা হয় না।

একটি মার্ক্সবাদী দল পরিচালিত হয় গণতান্ত্রিকভাবে ৪ বছর পর পর অনুষ্ঠিত পার্টি কংগ্রেসে অনুমোদিত তার নীতি-নির্ধারণী দলিল অনুসারে।
পার্টি পরিচালনায় দলের সদস্যদের ভূমিকা পালন নিশ্চিত করা হয় যেসব ব্যবস্থার মাধ্যমে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে —

ক) পার্টির অনুসরণীয় দলিল রচনায় অংশগ্রহণ,
খ) পার্টির নীতি-কর্মকৌশল নির্ধারণ ও তদারকি,
গ) কেন্দ্রসহ পার্টির সব স্তরে ব্যক্তি-নেতৃত্বের বদলে গোপন ব্যালটে যৌথ নেতৃত্ব নির্বাচন,
ঘ) নেতৃত্বের কাজের ক্ষেত্রে তৃণমূলের সব সদস্যের সর্বক্ষণ প্রত্যক্ষ তদারকির সুযোগ,
ঙ) সমালোচনা-আত্মসমালোচনার ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ,
চ) সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কাছে যেকোনো সময় যেকোনো প্রস্তাব পাঠানোর অধিকার ও সুযোগ—ইত্যাদি।

কমিউনিস্ট পার্টিতে এসব হলো বাধ্যতামূলক চর্চার বিষয়। এসব সুযোগকে পার্টির সাধারণ সদস্যদের প্রতি দলের নেতা-নেত্রীদের ‘বদান্যতা’ বলে গণ্য করা হয় না। সদস্যদের এসব সুযোগ ও অধিকারকে তাদের সন্তুষ্ট রাখার জন্য পদক্ষেপ নয়, বরং সেটিকে দলের জন্য একটি মূল্যবান সম্পদ ও শক্তির উৎস বলে গণ্য করা হয়। সামষ্টিক প্রজ্ঞা (collective wisdom) সবসময়ই ব্যক্তিগত প্রজ্ঞা (personal wisdom)-এর চেয়ে অধিকতর অভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা (probability) বেশি থাকে। বিজ্ঞান সেকথাই বলে। তাই কমিউনিস্ট পার্টি তার সদস্যদের থেকে মতামত ও পরামর্শ গ্রহণ করে সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারটাকে ‘অহেতুক ঝামেলা’ বলে মনে করে না। বরং, যৌথতার এরূপ চর্চাকে সঠিক নীতি-কৌশল নির্ধারণের জন্য একটি মূল্যবান সম্পদ বলে বিবেচনা করে। তবে তা করতে গিয়ে ‘বিপ্লবী শৃঙ্খলার’ প্রয়োজনিয়তার কথা সে ভুলে বসে থাকে না। পার্টি যে একটি ‘ডিবেটিং ক্লাব’ নয়, তা যে বিপ্লবী শ্রেণিসংগ্রাম পরিচালনার জন্য ‘ভ্যানগার্ড’দের একটি সংস্থা—সে কথাটি সে সবসময় তার বিবেচনায় রাখে।

।। ৫ ।।

অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চার বিষয়ে বুর্জোয়া দলগুলো এভাবে ভাবতে ও চলতে অপারগ। তাদের শ্রেণিগত বৈশিষ্ট্য ও সীমাবদ্ধতার কারণেই তাদের এই অপারগতা। আমাদের দেশে ‘বুর্জোয়া-পেটি বুর্জোয়া’ শ্রেণির মধ্যে এখনো অতীতের সামন্ততান্ত্রিক চিন্তা ও চর্চার এক ধরনের রেশ রয়ে গেছে। তার প্রতিফলন দেখা যায় নেতা-নেত্রী ও সদস্যদের মধ্যে সম্পর্কের মধ্যে। তা এখনও হয়ে রয়েছে অনেকটা ‘রাজা’ ও ‘প্রজা’র মধ্যকার সম্পর্কের মতো। তা থেকেই চলছে একধরনের ‘ভক্তিবাদের’ চর্চা। চলছে ব্যক্তি-পূজা, নেতা-নেত্রীর নামে জিকির, ভজন, ‘হিরো ওয়ারশিপ’ ইত্যাদি। এর ফলে দলের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে ‘তোষামোদির’ ও ‘ভক্তি প্রদর্শনে’র প্রতিযোগিতার কালচার।

বুর্জোয়া দলগুলো একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার আধুনিক ‘পশ্চিমা’ ব্যবস্থাকে অনুসরণ করতে চেষ্টা করে। যেটাকে ‘corporate culture’ বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের বর্তমান যুগে এই প্রবণতা আরো প্রবল হয়ে উঠেছে। বড় বড় কর্পোরেশন যেভাবে প্রধান প্রশাসকের তথা CEO-এর একক হুকুমে ‘হায়ার অ্যান্ড ফায়ার’-এর কমান্ড সিস্টেমে, প্রমোটার নিয়োগ করে, ‘লোভ অথবা ভয়’-এর দ্বারা সৃষ্ট প্রণোদনাকে ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের জন্য আপাত চোখ ধাঁধানো সফলতা এনে দেয়, রাজনৈতিক দলকেও তারা সেই ‘সফল কর্পোরেশনে’র ধারায় চালাতে পারবে বলে মনে করে। তাদের ভাবনায় ‘দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রে’র ব্যাপারটি শুধু বেমানানই নয়, দলের সফল অগ্রগতির জন্য তাকে বরঞ্চ প্রতিবন্ধক বলে তারা মনে করে।

কমিউনিস্ট, বামপন্থি ও প্রগতিবাদীদেরকে ক্রমাগতভাবে সাম্প্রদায়িক ও দক্ষিণপন্থি শক্তি এবং সাম্রাজ্যবাদের সরাসরি আক্রমণ ও প্রোপাগান্ডা, মিথ্যাচার, অপপ্রচারের প্রত্যক্ষ হামলার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে এসব শক্তির প্রত্যক্ষ আক্রমণের পাশাপাশি আছে নানা শক্তির অ-প্রত্যক্ষ হামলাও। দেশে এখনও ‘বুর্জোয়া-পেটি বুর্জোয়া’ ধারার দলগুলোর প্রাধান্য থাকায় তাদের অনুসৃত ভাবধারা ও সাংগঠনিক রীতি-নীতি-সংস্কৃতির ‘অনুকরণজাত প্রভাব’ (demonstrative effect) সংক্রামিত হচ্ছে। এমনকি, বাম ও কমিউনিস্ট মহলেও তার কুপ্রভাবের অনুপ্রবেশ ঘটছে। ‘উত্তর-আধুনিকতাবাদ’ (post-modernism) ‘অরাজপন্থা’ (anarchism), ‘সুশীল সমাজ’ (NGO) মতবাদ, ‘অদৃষ্টবাদ’ (fatalism), ‘প্রয়োগবাদ’ (pragmatism) ইত্যাদি নানা প্রকারের ভাবধারার অনুপ্রবেশ সেখানেও ঘটছে। সীমিত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিক্ষিত পেটি-বুর্জোয়া তরুণ সমাজের একাংশকে এসব মতবাদের ‘মন ভোলানো’ হাতছানি প্রভাবিত করতে পারছে। বাস্তব শ্রেণিসংগ্রামের দুর্বলতার সুযোগ, চটকদার নতুন কিছুর রোমান্টিক আকর্ষণ ও ‘প্রগতিশীলতার’ লেবেল ধারণ করায় এসব ‘প্রথা বহির্ভূত’ ভাবধারা ও চিন্তা তাদের অনেককে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হচ্ছে। অভিজ্ঞতা একথা বলে যে, কমিউনিস্টদের নীতিনিষ্ঠ অবস্থানকে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করার জন্য এসব ভাবধারাকে সাম্রাজ্যবাদ ও লুটেরা ধনিকশ্রেণি তার মতাদর্শগত ‘পঞ্চম বাহিনী’র ভূমিকায় নিয়োজিত করে থাকে। এই কুপ্রভাব সম্পর্কে কমিউনিস্ট, বামপন্থি ও প্রগতিবাদীদের সতর্ক থাকতে হবে। তাছাড়া তাদেরকে ক্রমাগতভাবে সাম্প্রদায়িক ও দক্ষিণপন্থী শক্তি এবং সাম্রাজ্যবাদের প্রোপাগান্ডা, মিথ্যাচার, অপপ্রচারের সরাসরি আক্রমণের সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

লেখাটি শেষ করবো একথা উল্লেখ করে যে একটি শোষণমূলক বৈষম্যের সমাজে ‘গণতন্ত্রের’ পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সম্ভব হলেও শোষণ ও বৈষম্যর ব্যবস্থা বজায় থাকলে ষোলআনা পরিপূর্ণ ‘গনতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। সেজন্য সমাজতন্ত্র কায়েম করতে হবে। এবং তার জন্য মেহনতি মানুষের সচেতন ও সংগঠিত ভূমিকা ও তার অগ্রবাহিনী হিসেবে একটি বিপ্লবী পার্টির অস্তিত্ব অপরিহার্য। কমিউনিস্ট পার্টি হলো সেরকম দল। তার সেই জনসম্পৃক্ত বিপ্লবী চরিত্রকে সবরকম আঘাত থেকে রক্ষা করতে হবে।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)