রনেশ দাশগুপ্ত: ব্যতিক্রমী এক মানুষের কথা

মফিদুল হক

আমার জীবনের পরম সৌভাগ্য যে রণেশ দাশগুপ্তকে দেখেছি, তাঁর স্নেহ-ভালোবাসা ও প্রশ্রয় পেয়ে ধন্য হয়েছি। আমি এবং আমার মতো আর যাঁরা রণেশদাকে জেনেছি তারা অন্তরে বিশেষ তাগিদ অনুভব করি তাঁর কথা বলবার।

মনে হয়, আমরা যদি না বলি তবে কারা বলবে সেইসব কথা! বিশেষভাবে বাংলাদেশে এখন তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাধিক্য, তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রজন্ম, যে প্রজন্মের রণেশদাকে দেখার, তাঁর সান্নিধ্যে আসার, তাঁর কথা জানবার সুযোগ বিশেষ ছিল না, যদিও রণেশদা দীর্ঘজীবী হয়েছিলেন, ১৯১২ সালে তাঁর জন্ম এবং প্রয়াণ ১৯৯৭ সালের ৪ নভেম্বর, পঁচাশি বছর বয়সে।

এখানে এটাও তো স্মরণ করতে হয়, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সেই যে তিনি প্রিয় স্বদেশ এবং শহর ঢাকা ছেড়ে কলকাতায় স্বেচ্ছানির্বাসন বেছে নিলেন আর তিনি ফিরে আসেননি। ফলে জীবনের শেষ পঁচিশ বছর দেশে তাঁর বাস ছিল না। রণেশ দাশগুপ্তের সত্তা প্রবলভাবে দেশের মাটিতে প্রোথিত, তারপরও কেন তিনি নিজের জন্য নির্বাসন-দণ্ড বেছে নিলেন এর ব্যাখ্যা পাওয়া কঠিন।

কলকাতায় টিনের চালা দেয়া যে ঘরটিতে তিনি থাকতেন সেটা মনুষ্যবাসের কতটা উপযোগী তাতে সন্দেহ প্রকাশ করা চলে। কিন্তু সেখানে রণেশ দাশগুপ্ত একান্ত স্বচ্ছন্দ, কেউ এলে অবাক হবে তাঁর খোশ মেজাজ দেখে, আর যারা তাঁকে যৎসামান্য চিনেছেন তারা বুঝবেন এমন প্রফুল্লতা রণেশ দাশগুপ্ত বহাল রাখতে পারেন জীবনের সকল অভাব-অনটন-দুর্গতির মধ্যেও। অভাব-অনটন কথাটা বোধ করি এখানে সুপ্রযুক্ত হলো না, কেননা জীবনের কাছে তাঁর চাহিদা ছিল এতই সামান্য যে কোনোরকম চলবার মতো অবলম্বন পেলেই তাতে তিনি তৃপ্ত, আর কোনো বাড়তি বাসনা তাঁর মধ্যে ছিল না। কাম্য অবশ্য তাঁর ছিল, সেটা গ্রন্থপাঠের প্রবল তাগিদ থেকে উৎসারিত, সেই তাগিদে সবসময়ে তিনি বুঁদ হয়ে থেকেছেন বই এবং পত্রপত্রিকার পাতায়।

ষাটের দশকের মাঝামাঝি আমরা যখন ‘সংবাদ’ পত্রিকার দপ্তরে রণেশদাকে পাই, তখন তিনি কারাগারে যাচ্ছেন, আবার মুক্তি পাচ্ছেন, আবার বন্দি হচ্ছেন। তবে মানুষটি সবসময়ে হাসিখুশি, সাদাসিধে তাঁর জীবন, পরনে পাজামা ও ফু লহাতা সাদা শার্ট, হাতে থাকে ছাতা এবং ঢাকার রাস্তায় সর্বদা হেঁটে চলাফেরা করেন। তাঁতিবাজারে এক পরিবারের সঙ্গে থাকেন স্যাঁতসেতে সেকেলে বাড়ির দোতলার এক ঘরে, যেখানে চারপাশে বই ছড়ানো, তোষক পাতা আছে মাটিতে। ধুলোমাটিতে যদি পাতা থাকে তাঁর শয্যা, নিরাভরণ যদি হয় তাঁর জীবন, একই সাথে বিপুল সম্পদবান তাঁর ভাবজগৎ, যে-সম্পদ তিনি ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছেন, বিশ্বের সাহিত্য-শিল্প, সমাজ-পরিবর্তনের গতিপ্রকৃতি, তত্ত্ব ও কর্মের বিচিত্র ধরনের রচনায় সদা-সর্বদা অবগাহন করে। এমন মানুষকে আমরা দেখেছি অনেক কাছ থেকে, তাঁর ব্যতিক্রমী সত্তার সামনে শ্রদ্ধায় আনত হয়েছি; কিন্তু তাঁর মন-মানস-চেতনা ও জীবনবৈভবের হদিশ করতে পেরেছি তা বলা যাবে না। ফলে রণেশদা সম্পর্কে বলবার আন্তর্তাগিদ প্রবল হলেও তাঁর কর্ম ও জীবনের বিবরণী তুলে ধরা মনে হয় দুঃসাধ্য।

জীবন-পরিচিতি দেয়ার প্রচলিত যেসব পদ্ধতি রয়েছে, কোনো লেখকের ক্ষেত্রে যা প্রযোজ্য, সেই ধরনের পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থতালিকা ও সংক্ষিপ্ত গ্রন্থপরিচিতির মধ্যে রণেশ দাশগুপ্তকে পাওয়া যাবে না, তেমনটা মনে হবে একান্ত অপূর্ণ। রণেশ দাশগুপ্তের লেখক-সত্তার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিসত্তা মিলিয়ে না দেখলে তাঁর রচনাদির তাৎপর্য উপলব্ধি সম্ভব নয়। লেখক তিনি বটে, তবে লেখালেখি নিয়ে কখনো মেতে ওঠেননি, আর যখন যা লিখেছেন নিজে কখনো সেসব লেখা সংরক্ষণ ও গ্রন্থবদ্ধ করতে উদ্যোগী হননি। নিজের প্রতি ঔদাসীন্য বললে বোধ হয় কম বলা হয়, এক ধরনের আত্মঅস্বীকৃতির চর্চা তিনি করে গেছেন জীবনভর। ফলে সাহিত্য সাধনায় তিনি যত নিমগ্ন থেকেছেন সাহিত্য রচনা তত নিবিড়ভাবে করেননি।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তিনি লিখেছেন ফরমায়েশি লেখা, ছোট-বড়, খ্যাত-অখ্যাত পত্রিকা কোনো বাছবিচার তাঁর ছিল না, বরং মনে হয় ছোট কাগজ, সংকলন, সাময়িকপত্র এমন কি পাড়া-মহল্লার একুশের সংকলনের প্রতি তাঁর ছিল এক ধরনের পক্ষপাত ও প্রশ্রয়। অথচ চিন্তা, মননশীলতা, প্রজ্ঞা, সাহিত্যবোধ ও নন্দনজ্ঞানে তাঁর সমতুল্য লেখক তো বিশেষ মিলবে না। পাকিস্তান আমলে প্রকাশ পেয়েছিল তাঁর দুই মৌলিক গ্রন্থ, উপন্যাসের শিল্পরূপ এবং শিল্পীর স্বাধীনতার প্রশ্নে। প্রথম গ্রন্থে তিনি বিশ্ব-সাহিত্যের পটভূমিকায় বাংলা উপন্যাসের বিবর্তন বিচার করতে চেয়েছেন, মার্কসবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে।

তবে মার্কসবাদী বলতে সচরাচর যে রাজনৈতিক সাহিত্যবিচার আমরা দেখি তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা তাঁর বিবেচনা, বরং বলা যেতে পারে মার্কসবাদী বিশ্ববীক্ষণ তথা সমাজ ও শিল্পের সংযোগ ও পরিবর্তনময়তার বিশাল ক্যানভাসে তিনি সাহিত্যবিচারে ব্রতী হয়েছিলেন, যার ফলে তাঁর রচনা দুরূহ ও দুর্বোধ্য বলে গণ্য করেছিল পাঠকসমাজ। এটা বেশ আগ্রহোদ্দীপক ঘটনা যে, মার্কসবাদী হিসেবে মেহনতি মানুষের রাজনীতিতে সমর্পিত মানুষটি রচনাশৈলী ও রচনাবিষয়ে সাধারণের স্তরে নিজেকে আটকে রাখেননি, ব্যাপক পাঠকের কাছে বোধগম্য করার জন্য রচনার ভাব ও ভঙ্গিতে তিনি কোনো তারল্য সঞ্চার করেন না এবং এটা সচেতনভাবেই করেন, কেননা তিনি জানেন ইতিহাসের ধারায় যারা সমাজ বদলের রূপকার হবেন তাদের কাছে প্রত্যাশার মাত্রাও হবে বেশি।

মানবমুক্তির আন্দোলনে নিজেকে পুরোপুরিভাবে সমর্পণ করেছিলেন রণেশ দাশগুপ্ত। যৌবনে যুক্ত হয়েছিলেন ভারতজুড়ে জায়মান সাম্যবাদী আন্দোলনের সঙ্গে, কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে একেবারে দেহাতি মানুষদের মধ্যে যেমন কাজ করেছেন, তেমনি যুক্ত ছিলেন সাহিত্যের আন্দোলনে, সাহিত্যসৃষ্টি ও সাহিত্যবিচারের যৌথ উদ্যোগে, যা চল্লিশের দশকে রূপ নিয়েছিল ‘প্রগতি লেখক সংঘ’ হিসেবে।

লেখক সংঘের ঢাকা কেন্দ্রের মূল ব্যক্তি ছিলেন রণেশ দাশগুপ্ত, তরুণ গল্পকার সোমেন চন্দের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকার যে সংঘ সর্বভারতীয় দৃষ্টি ও সহমর্মিতা অর্জন করেছিল, ঢাকার বুদ্ধদেব বসুও তখন সংঘের কাজে সম্পৃক্ত না হয়ে পারেননি। কিন্তু উত্তাল চল্লিশ তো মুখ থুবড়ে পড়েছিল সাতচল্লিশের দেশভাগ ও সাম্প্রদায়িক রক্ষণশীল নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রে, যে কোনো উদার প্রগতিশীল ভাবনার প্রতি যে-রাষ্ট্র ছিল অসহিষ্ণু ও সহিংস।

পাকিস্তান দেশ হিসেবে শুরু থেকে নতুন এক ধরনের উপনিবেশিকতার রূপ নিয়েছিল, নামে একক ‘মুসলিম’ রাষ্ট্র হলেও কার্যত তা ছিল একের ওপর অপরের, পূর্ববাংলার ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের উপনিবেশবাদী শাসনের অভিনব রূপ। এহেন শাসন কায়েম করতে ইসলাম হয়েছিল ক্ষমতাসীনদের অবলম্বন, আর সব ধরনের বিরোধীদের ‘শির কুচল দেঙ্গে’ বা মাথা ভেঙে দেয়া ছিল তাদের অঙ্গীকার, যেমনটা বলেছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নবাবজাদা লিয়াকত আলী খান।

সদ্য-স্বাধীন পাকিস্তানে হিন্দু ও কমিউনিস্ট এই যুগল পরিচয় বাহকদের উৎপাটনের ব্যবস্থা ছিল পোক্ত, রণেশ দাশগুপ্তের মতো মানুষদের তাই কারান্তরালেই কেটেছে বেশিরভাগ সময়। কারাগারকে শিক্ষালয়ে পরিণত করেছিলেন রাজবন্দিরা, নিজেদের এবং সহবন্দিদের জন্য।

বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনের প্রথম বার্ষিকীতে কারাবন্দি মুনীর চৌধুরী বিশেষ প্রেরণা পান রণেশদার কাছ থেকে, লিখলেন ‘কবর’ নাটক, মঞ্চস্থ হলো বন্দিদের দ্বারাই। যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের পর মুক্তির স্বাদ পেলেও মুক্ত জীবন রণেশ দাশগুপ্তের জন্য কখনও স্থায়িত্ব পায়নি।

দেশভাগের সময় ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকায় তাঁর সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি, পাকিস্তান আমলে ‘সংবাদ’ পত্রিকা হয়েছিল একান্ত নির্ভর। পত্রিকার সুবাদে উদীয়মান লেখক-শিল্পীদের সঙ্গে তাঁর সংযোগ গড়ে ওঠে এবং ক্রমে বাংলার সারস্বত সমাজে তিনি নিজের জন্য আলাদা আসন করে নিতে পেরেছিলেন, যদিও তেমন আসনের জন্য কখনও তিনি লালায়িত ছিলেন না। রণেশ দাশগুপ্তের এই অর্জনের ভিত্তি ছিল তাঁর রচিত প্রবন্ধসাহিত্য, যা পাকিস্তানি ঘেরাটোপের সঙ্কীর্ণ জীবনে বাইরের দুনিয়ার শিল্প-সাহিত্যসাধনার পরিচয় বয়ে এনে জীবনে যুগিয়েছিল নতুন উপলব্ধি ও শক্তি।

তার প্রবন্ধের বিষয় অনেক ক্ষেত্রে বৈশ্বিক, তবে এই বিশ্বজনীনতা কখনই আরোপিত ছিল না। অন্যদিকে মানবের শিল্প-সাধনা তিনি সবসময়ে মিলিয়ে দেখতে চেয়েছেন স্বসমাজের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নিরিখে। ফলে মৌলিক চিন্তার আধার হয়েছে তার রচনা, যা সমকালীন চিন্তাধারা থেকে অনেক দিক দিয়ে ছিল অগ্রসর।

এহেন মানুষটি জীবনযাপনে এতো নিরাভরণ ও নিরঙ্কারী যে তাঁর কাছে পৌঁছতে কারো কোনো বেগ পেতে হতো না, সবার জন্য অবারিত ছিল তাঁর দ্বার, সকলের অন্তরে শিল্প-সাহিত্যের বোধ সঞ্চারে তিনি ছিলেন উদগ্রীব।

নন্দনভাবনার সঙ্গে মুক্তিভাবনার মিশেলে তাঁর শিল্পদৃষ্টিতে যে-প্রসারতা জীবনে ও সাহিত্যে তিনি তার প্রয়োগ ঘটিয়েছেন নিরন্তর। কোনোরকম সঙ্কীর্ণতা ও কুপমণ্ডুকতা তার মধ্যে স্থান পায়নি,‘সবারে বাসরে ভালো সঙ্গীতের সেই বাণী যেন তাঁর মর্মে গাঁথা ছিল। একই আকুতি থেকে মানবের সৃজনসাধনার সমগ্রতা বরণে সচেষ্ট ছিলেন তিনি। সাহিত্য বিশ্লেষণাত্মক তাঁর এক গ্রন্থের নাম আয়ত দৃষ্টিতে আয়ত রূপ, প্রসারিত চোখে তাকাতে চেয়েছেন সাহিত্যের ও জীবনের দিকে, যে-ধরনের দৃষ্টিপাত শিল্পের রূপরস আহরণের ক্ষমতাও করে প্রসারিত। এমনি চেতনা থেকেই উৎসারিত রণেশ দাশগুপ্তের মার্কসবাদী দর্শন, যে-মার্কসবাদ জীবন বিচারে শক্তি যোগায়, জীবন পাল্টাতে সঞ্চার করে প্রেরণা।

গ্রন্থের সূচনার প্রবন্ধ বহন করছে গ্রন্থনাম, সেখানে রণেশ দাশগুপ্ত উদ্ধৃতি দিয়েছেন শতবর্ষ আগে প্রকাশিত কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর ইতালীয় সংস্করণে এঙ্গেলস রচিত ভূমিকার একটি পংক্তি, বিপ্লবের আহবান নয়, শৃঙ্খল-মোচনের ঝনঝনানি নয়, উদ্ধৃত বাক্যে পাই অন্য আমেজ, এঙ্গেলস বলেছেন, ইতালির শ্রমিকশ্রেণী থেকে নতুন দান্তে বেরিয়ে আসবেন।

প্রসারিত দৃষ্টিতে এই বাক্যটি বিবেচনা করে রণেশ দাশগুপ্ত লিখেছেন, ‘শোষণমুক্ত সমাজের জন্য শ্রমজীবী জনগণের লড়াই রূপের জগৎকে কীভাবে সঙ্গী হিসেবে দেখে, এঙ্গেলসের উক্তিটিতে তার ইঙ্গিত রয়েছে। এক কথায় একে বলা যেতে পারে আয়ত দৃষ্টিতে আয়ত রূপের দিশা, যেমন এর বিশালতা, তেমনি এর প্রসারতা। এ শুধু ভাব নয়, এ হচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে অবিশ্রান্ত সৃষ্টি আর কাজ। দেশ দেশান্তরে যুগে যুগান্তরে মেহনতি মানুষের রূপ লাগি ঝুরে মন, তার অৎস্রর অসংখ্য অভিব্যক্তি।’

ছোট এই নিবন্ধে আরো অনেক সৃষ্টিশীলতার উদাহরণ টেনেছেন রণেশ দাশগুপ্ত, বলেছেন হাভানায় গ্রিক সঙ্গীতকার মিকিস থিওডরাকিস সুরারোপিত পাবলো নেরুদার ক্যান্টো জেনারেল অর্কেস্ট্রাবাদন পরিবেশনার কথা। এরা উভয়ে কমিউনিস্ট, সেখানে হয়তো কেউ রণেশ দাশগুপ্তের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব খুঁজে পেতে পারেন, তবে স্মরণ করতে হয় পর মুহূর্তেই তিনি বলছেন হাঙ্গেরির রূপচর্চার সাধক ড. চার্লস ফাবরির কথা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যাঁকে বক্তৃতাদানের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে। পরে ফাবরি লাহোর মিউজিয়মে কাজ করেন এবং হরপ্পা সভ্যতা খননে অংশ নেন। তাঁর রচিত উপন্যাস দি ইন্ডিয়ান ফ্লামিঙ্গো প্রসঙ্গে রণেশ দাশগুপ্ত জানান যে, বৌদ্ধ শিল্পকলার দেবী মঞ্জুশ্রীর একটি মূর্তি এবং বাস্তবজীবনে গোলাপি শাড়ি-পরা লাহোরের এক মহিলার প্রতীক ছিল ভারতীয় হংসী, ইন্ডিয়ান ফ্ল্যামিঙ্গো। বুঝতে পারা যায় কাহিনিতে পুরাকীর্তি ও বর্তমান যেভাবে মিলেমিশে যায় তা আকর্ষণ করেছিল রণেশ দাশগুপ্তকে।

রণেশ দাশগুপ্ত আরো বলেছিলেন লেস্টার হাচিনসনের কথা, ইতালি থেকে জাহাজে করে যিনি এসেছিলেন মুম্বাই, ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তুলতে, পরে ১৯২৭-২৮ সালে অভিযুক্ত হয়েছিলেন মীরাট ষড়যন্ত্র মামলায়। তো হাচিনসন প্রণীত দ্য এম্পায়ার অব দা নবাব্স্ গ্রন্থ থেকে ছোট দুই উদ্ধৃতি দিয়েছেন রণেশ দাশগুপ্ত, গোপন পার্টিগঠন বিষয়ক রোমহর্ষক কোনো ঘটনা কিংবা ভারতীয় রাজনৈতিক সংগ্রামের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নয়, রণেশ দাশগুপ্তের আয়ত দৃষ্টিতে ধরা পড়েছিল জীবনের অন্যতর রূপ, আর তাই হাচিনসন, কথিত দুই সুন্দরের উল্লেখ করেছেন রণেশ দাশগুপ্ত, লিখেছেন, “ইতালিতে কয়েকদিন ছিলেন। এক কথাতেই সেরেছেন, লিখেছেন, তাঁর মনে হয়েছিল, ইতালির আকাশটি সুন্দর, কারণ ফ্যাসিস্টরা একে ছুঁতে পারে নি।”

এরপর হাচিনসনের দৃষ্টিতে উদ্ভাসিত আরেক সুন্দরের বিবরণ দিয়ে রণেশ দাশগুপ্ত লিখেছেন, ‘গড় মুক্তেশ্বরের মেলায় সন্ধ্যা-রাতে স্নানার্থী ও স্নানার্থিণীরা নদীতে যে প্রদীপ ভাসিয়ে দিচ্ছিল, সেগুলোকে ভেসে যেতে দেখে তিনি মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, এদের ধর্মে অনেক ত্রুটি রয়েছে; কিন্তু সে নিঃসন্দেহে সুন্দর।’

আয়ত দৃষ্টিতে জীবনের বিশালতা অবলোকনের ক্ষমতা রণেশ দাশগুপ্তের ছিল, আর তাই জীবনের সৌন্দর্যরসে তিনি নিমজ্জিত হতে পেরেছিলেন, মানবের সৃষ্টিশীল সাধনা তাঁকে নিরন্তর সে-রস যুগিয়ে চলেছিল। মানবের এই সৌন্দর্যসাধনার লগ্ন হয়েই তিনি মানবের মুক্তিপথের পথিক হয়েছিলেন। এমন ব্যক্তিত্ব আমাদের জীবনে দুর্লভ, তাঁর ব্যতিক্রমী ও অন্যতর সত্তার যথাযথ উপস্থাপন তাই দুরূহ কাজ, তবে অতীব জরুরি বটে। আশা করা যায় আগামী দিনের সৌন্দর্যসাধক ও মুক্তিব্রতীরা এই কাজ সম্পাদন করবেন অনেক দক্ষতা ও সৃষ্টিশীলতার সাথে। তাহলেই প্রবাস থেকে প্রত্যাবর্তন ঘটবে রণেশ দাশগুপ্তের, যে প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষয় ছিলেন তিনি জীবনভর।

Leave a Reply

Your email address will not be published.