মোজাফফর আহমদ রচিত ‘কিছু কথা’ বইয়ে কমিউনিস্ট পার্টি সম্পর্কে বক্তব্য

পাক-ভারত-বাংলা উপমহাদেশে গরিব ও দুঃখী মানুষের পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি জন্ম নেয় ১৯২০ সালে। কমরেড মুজফফর আহমদ সাহেব ছিলেন ইহার প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। জন্মলগ্ন থেকেই কমিউনিস্ট পার্টিকে অনেক প্রতিকূল ও প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে কাজ করতে হয়েছে।

ভারত সরকার কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে ১৯২২ সালে পেশোয়ার ষড়যন্ত্র মামলা, ১৯২৪ সালে কানপুর ষড়যন্ত্র মামলা ও ১৯২৯ সালে মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করেন। জন্মের পর হতেই কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি থেকে যায়। ১৯৩৭ সালে বাংলায় হক সাহেবের নেতৃত্বে কৃষক-প্রজাপার্টি ও মুসলিম লীগ কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা কায়েম হওয়ায় ব্যক্তি স্বাধীনতার কিছুটা প্রসার ঘটে। তার ফলশ্রুতিতে ১৯৩৭-৩৯ এ সময়টায় কমিউনিস্ট পার্টির ওপর থেকে নিষেধজ্ঞা প্রত্যাহার হয়।

১৯৪৩ সালে ইংরেজ শাসক সৃষ্ট (গধহ সধফব) যে মহাদুর্ভিক্ষ দেখা দেয় তাতে একমাত্র কমিউনিস্ট পার্টি ভূখা মানুষের পাশে দাঁড়ায়, খাদ্যের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে, লঙ্গরখানা খোলার দাবি তুলে। সরকার কিছু কিছু লঙ্গরখানা খুলতে বাধ্য হয়। হিন্দু-মুসলমানের জন্য আলাদা লঙ্গরখানা খোলা হয়। কমিউনিস্ট স্বেচ্ছাসেবীরা সেইসব লঙ্গরখানায় ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে; যাতে খাদ্য চুরি না হয় সেদিকে তীক্ষè নজর রাখে; সবাই যাতে খাদ্য পায় সেই চেষ্টা করে। লঙ্গরখানাগুলি প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগন্য হওয়ার ফলে অনাহারে মানুষ মরা বন্ধ করা যায়নি।

১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টি অংশগ্রহণ করে এবং তিনটি আসন লাভ করে। নির্বাচনের কিছুদিন পর ১৯৪৬ সনের ১৬ আগস্ট মুসলিম লীগ কর্তৃক প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস ঘোষণার ফলে কলিকাতায় হিন্দু-মুসলমান ভয়াবহ দাঙ্গা বাঁধে। তখন একমাত্র কমিউনিস্ট পার্টিই সংঘবদ্ধভাবে দাঙ্গার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। সে সময় নোয়াখালী ও হাসনাবাদে (কুমিল্লা) দাঙ্গা প্রতিরোধে কমিউনিস্ট কর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নেয় এবং শক্তিশালী বাহিনী গড়ে দাঙ্গার বিস্তার প্রতিরোধ করে।

কমরেড: মুজাফ্ফর আহমেদ

দেশভাগের পর থেকেই সরকারের হিংস্র দমননীতি চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে– ব্যাপক লুটতরাজ, নির্মম মারপিঠ, মিথ্যা মামলা, নারী ধর্ষণ এখানে-ওখানে গুলি, হতাহত, গ্রেপ্তার, গ্রেপ্তারি-পরোয়ানা, গ্রেপ্তারের পর কথা আদায়ের জন্য অকথ্য নির্যাতন–এভাবে পার্টি, কৃষক সমিতির অফিস এবং কৃষক সমিতির সংগঠন ও সংগঠিত এলাকাগুলিকে তছনছ করে দেয়া হয়। গ্রেপ্তারের পর প্রখ্যাত নেত্রী ইলা মিত্রের ওপর বিভৎস অত্যাচার করা হয়–অনবরত কিল-ঘুষি, লাথি, বেত দিয়ে বেধড়ক মারপিট, চুল উপড়ে ফেলা ইত্যাদি। ইলা মিত্রের দেহকে ক্ষত-বিক্ষত ও তাঁকে জ্ঞানহীন করে ফেলা হয়। জ্ঞানহীন অবস্থায় নরপশুরা তার মানসম্ভ্রম লুট করে নেয়।

১৯৫০ সনে নূরুল আমীন সরকার রাজশাহী জেলে গুলি চালিয়ে ৭ জন কমিউনিস্ট বন্দিকে হত্যা করে। দেশ বিভাগ, সরকারের প্রচণ্ড দমননীতি ও ভয়াবহ দাঙ্গাজনিত কারণে প্রগতিমনা নেতা ও কর্মীরা প্রায় সবাই দেশ ছেড়ে চলে যায়। ফলে, পার্টি দারুণভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সময় আদর্শ, রাজনীতি ও অভিজ্ঞতার দিক থেকে সম্পূর্ণ ‘আবাত্তি’ (অপরিপক্ক) মুসলিম ক্যাডারদের নিয়ে পার্টিকে পুনর্গঠিত করতে হয়।

এই ‘আবাত্তি’ ক্যাডারদের নিয়েই পার্টি ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে এবং বিশেষ অবদানও রাখে। বলার অপেক্ষা রাখে না, ’৫২ সালে ভাষার যে ঐতিহাসিক সংগ্রাম শুরু হয়েছিল সে সংগ্রামের সফল পরিসমাপ্তি হয়েছিল ১৯৭১ সনের ১৬ ডিসেম্বর।

১৯৫৪ সালের ৮ মার্চ পূর্ববঙ্গে সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। কমিউনিস্ট পার্টিই সর্বপ্রথম নির্বাচনে লীগ বিরোধী যুক্তফ্রন্ট গঠনের আওয়াজ তুলে। নেজামে ইসলাম ধুয়া তুলে, কমিউনিস্টদের যুক্তফ্রন্টে নেয়া হলে নেজামে ইসলাম সে ফ্রন্টে থাকবে না। এই নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়। সে সময় কমিউনিস্ট পার্টি ঘোষণা করে, পার্টিকে বাদ দিয়েও যদি স্বৈরাচারী মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয় তা হলেও কমিউনিস্ট পার্টি যুক্তফ্রন্টকে সর্বোতভাবে সমর্থন করবে। কমিউনিস্ট পার্টির এ ঘোষণা পূর্ববঙ্গের সমস্ত দেশ প্রেমিক ও গণতান্ত্রিক মহলে বিশেষভাবে অভিনন্দিত হয়। কমিউনিস্ট পার্টি এই নির্বাচনে স্বনামে ৪টি আসন লাভ করে। তাছাড়া যুক্তফ্রন্টের টিকিটে নির্বাচিত হয় ২২ জন পার্টির সদস্য ও দরদি। পরবর্তীতে সংসদ সদস্যদের ভোটে গণপরিষদে নির্বাচিত হয় একজন।

১৯৫৪ সালের ৪ জুন আবার কমিউনিস্ট পার্টিকে বেআইনি গোষণা করা হয়। দেশবিভাগ, ভয়াবহ দাঙ্গা, পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা ও নৃশংস দমননীতির ফলে দারুণভাবে দুর্বল হয়ে পড়া সত্ত্বেও পূর্ববঙ্গের কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৩৭ সন থেকে ১৯৬৬ সন পর্যন্ত শ্রমজীবী জনগণের সঙ্গে থেকে সাম্রাজ্যবাদ, দেশীয় শোষক-শাসক গোষ্ঠী এবং পূর্ব-পশ্চিম বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটানা আপসহীন সংগ্রাম চালিয়ে যায়।

১৯৬৬ সালের ডিসেম্বর মাসে চীন-সোভিয়েত মতভেদের দরুন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিতে চিড় ধরে। এক অংশ বের হয়ে যায়। কমিউনিস্ট পার্টি আবারও দুর্বল হয়। তৎসত্ত্বেও ১৯৬৯ সনের জানুয়ারি মাসে সারা পূর্ব পাকিস্তানে আইয়ুববিরোধী গণঅভ্যুত্থানে এবং ১৯৭১ সনে বাংলাদেশের জনগণের মুক্তি সংগ্রামে কমিউনিস্ট পার্টি প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে।

দেশ বিভাগের পরে পূর্ববঙ্গের কমিউনিস্ট পার্টিকে ভিত্তি করে ১৯৪৮ সালের ৬ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল–এই দুই দশক ধরে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের জাতীয় অধিকার এবং শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, যুব প্রভৃতি জনগণের ন্যায়সঙ্গত অধিকারসমূহের জন্য সাম্রাজ্যবাদের সহযোগী প্রতিক্রিয়াশীল মুসলিম লীগ সরকার ও অন্যান্য শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গিয়েছিল। ঐ সময়কালে সারাদেশে পার্টির প্রায় একশত নেতা ও কর্মী শহীদ হয়েছিল।

কিন্তু ঐ নৃশংস দমননীতি সত্ত্বেও কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৩৭-৩৮ সন থেকে ১৯৬৮ সন–এই তিন দশক ধরে শ্রমজীবী জনগণের সঙ্গে মিলে সাম্রাজ্যবাদ ও দেশীয় শোষক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে একটানা আপসহীন সংগ্রাম চালিয়েছিল।

১৯৬৮ সালের পরে ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে সারা পূর্ব পাকিস্তানে আইয়ুব বিরোধী গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সনে বাংলাদেশের জনগণের মুক্তি সংগ্রামে কমিউনিস্ট পার্টি প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছিল। ‘৭১ সালের মুক্তি সংগ্রামের সাফল্যের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ জন্মগ্রহণ করে। পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিতে রূপান্তরিত হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.