মূল্য বৃদ্ধি, লুটপাট-দুর্নীতি ঠেকাও কর্তৃত্ববাদী সরকার হঠাও

অনিরুদ্ধ দাশ অঞ্জন   

দ্রব্যমূল্যের ‘পাগলা ঘোড়া’ ছুটেই চলেছে। চাল, ডাল, তেল, আটা, চিনি, পেঁয়াজ, রসুন, সবজিসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম লাগামহীনভাবে বাড়ছে। ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে জনগণের কাঁধে চেপেছে রান্নার গ্যাসের বাড়তি দাম। ব্যবসায়ীদের স্বার্থে সরকার আবারও ১২ কেজি সিলিন্ডারের এলপিজির দাম বাড়িয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ‘পাগলা ঘোড়া’র ধাক্কায় সাধারণ মানুষ এখন দিশেহারা।

গণবিরোধী সরকার আর অবৈধ সিন্ডিকেটের যোগসাজশে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। নিয়মিত বাজার তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেই। বাজারের পাশাপাশি গণবিরোধী কর্তৃত্ববাদী সরকারকেও অবৈধ ব্যবসায়ী-সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে। লুটেরা, মুনাফাখোর, মজুদদারদের ‘পাহারাদার’ হিসেবে গণবিরোধী সরকার ব্যবসায়ী-সিন্ডিকেটকে রক্ষা করছে।

সাধারণ মানুষের প্রতি ‘বিনা ভোটের সরকারে’র কোনো দায় নেই। করোনার আঘাতে এমনিতেই সাধারণ মানুষ বিপর্যস্ত। এর মধ্যে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বোঝা মানুষ আর কিছুতেই সইতে পারছে না। প্রতিদিনের খাবারের তালিকা ছোট করতে হচ্ছে।

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে হলে অবৈধ ব্যবসায়ী-সিন্ডিকেট ভেঙে দেয়া, লুটেরা-মজুদদার-মুনাফাখোর-মধ্যস্বত্বভোগীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, গরিব মানুষের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু, গণবণ্টন ব্যবস্থা চালু, টিসিবির কার্যক্রম জোরদার, ন্যায্য মূল্যের দোকান চালু, ‘বাফার স্টক’ গড়ে তোলা, উৎপাদক ও ক্রেতা সমবায় গড়ে তোলাসহ গণমুখী নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। কিন্তু গণবিরোধী কর্তৃত্ববাদী সরকার তা করবে না।

চালের দাম বাড়ার ‘কারণ’টা কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক ‘আবিষ্কার’ করে ফেলেছেন। অন্য দেশের মানুষের চেয়ে আমরা দ্বিগুণ ভাত খাই বলেই নাকি চালের দাম বেড়ে গেছে! এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘আমরা অনেক বেশি ভাত খাই। যদি ভাতের এই কনজাম্পশন (খাওয়া) কমাতে পারি, তাহলে চালের চাহিদা অনেকটাই কমে যাবে। আমরা একেকজন দিনে প্রায় ৪০০ গ্রাম চাল খাই, পৃথিবীর অনেক দেশে ২০০ গ্রামও খায় না।’

ভাতের ওপর চাপ কমাতে বেশি করে আলু খাওয়ার কথা বলেছিলেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। পরবর্তী সময়ে মইন ইউ আহমেদও এরশাদের মতো করে বলেছিলেন, ‘বেশি করে আলু খান, ভাতের ওপর চাপ কমান’। বছর দুই আগে চিনির দাম বাড়ার প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্তব্য করেছিলেন যে, বেশি চিনি খেলে ডায়াবেটিস হয়, তাই চিনির দাম বৃদ্ধি ভালো হয়েছে। জনগণের প্রতি শাসকদের নির্মম রসিকতার যেন শেষ নেই!

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করে কৃষিমন্ত্রী মানুষের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে দিয়েছেন! দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য মন্ত্রী মহোদয় দেশের মানুষকে দায়ী করতে গিয়ে ভুলভাল কথাবার্তা বলে ফেলেছেন। তাঁর কথার সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই। জনসমর্থনহীন সরকারের মন্ত্রী তো এমনই বলবেন।

দেশের অনেক মানুষ তিন বেলা পেট পুরে খেতেই পায় না। অনেক মানুষকে ক্ষুধা নিয়ে ঘুমাতে যেতে হয়। যে দেশের অধিকাংশ মানুষ ভাতের সঙ্গে খাওয়ার তরকারি জোগাড় করতে হিমশিম খায়, সেই দেশের মানুষকে কৃষিমন্ত্রী পুষ্টিকর খাবার দুধ, মাছ, মাংস, ডিম, ফলমূল প্রভৃতি খাবার গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন।

ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে ১১৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৬ নম্বরে। ২০২০ সালে অবস্থান ছিল ৭৫ নম্বরে। তার মানে হচ্ছে, দেশে ক্ষুধা বেড়েছে। আর কৃষিমন্ত্রী উল্টো বেশি খাওয়ার কথা বললেন। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি এবং বাংলাদেশ সরকারের করা যৌথ সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এখনও ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ অর্থাৎ প্রতি আটজনের মধ্যে একজনের পুষ্টিকর খাবার জোগাড়ের ক্ষমতা নেই।

তীব্র খাদ্যসংকটের ফলে পুষ্টিহীনতা দেখা দেয়। অপুষ্টির গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচক হচ্ছে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে খর্বকায় হওয়ার হার। বাংলাদেশে এই বয়সী শিশুদের এক-তৃতীয়াংশ খর্বকায়। এটা বাংলাদেশের সার্বিক পুষ্টি-পরিস্থিতির একটা ধারণা দেয়। এই সূচকে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। বেড়ে ওঠা এবং সব রকম বিকাশের জন্য, বাংলাদেশের মাত্র ৭ শতাংশ পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু প্রয়োজনীয় যথেষ্ট বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবার পায়।

করোনার কারণে গত দেড় বছরে শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তের বড় অংশই গভীর সংকটে। বেশির ভাগ মানুষের আয় কমে গেছে। দেশের সরকারি ও বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান বলছে, দেশে দারিদ্র্য বেড়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, দেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার (আপার পোভার্টি রেট) বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপে দেখা গেছে, দেশে বেকারত্ব বেড়েছে ১০ গুণ। কাজ হারিয়ে শহর ছেড়ে মানুষ ছুটে চলছে গ্রামের দিকে। এ অনিশ্চিত ছুটে চলার যেন শেষ নেই!

করোনাকালে দেশে বৈষম্য অনেক বেড়েছে। সাধারণ মানুষের আয় কমলেও কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ব্যাংক-হিসাব অনুসারে দেশে এক বছরে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১৪ হাজার। প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হবে।

টিকে থাকার জন্য সাধারণ মানুষকে চড়া সুদে এনজিও-ঋণ নিতে হচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত সুদের কারণে এক এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে অন্য এনজিওর ঋণ শোধ করতে হচ্ছে। গরিব মানুষ নতুন করে ঋণের জালে আটকা পড়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের আয় ক্রমাগতভাবে হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে বর্তমান সরকারের আমলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা-সুবিধা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে।

সরকার যে উন্নয়নের কথা বলছে, তা সার্বজনীন নয়। বেশির ভাগ মানুষের জীবনে ‘চুইয়ে পড়া’ এই উন্নয়ন সীমাহীন লুটপাটের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন জেঁকে বসায় দুর্নীতি-লুটপাট অবিশ্বাস্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। কর্তৃত্ববাদী শাসনে দেশে চলছে দুর্নীতি-লুটপাটের মহোৎসব। লাভবান হচ্ছে মুষ্টিমেয় মানুষ, আর খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

মানুষের জীবনমানের দিকে নজর না দিয়ে, পুঁজিবাদী উন্নয়ন-ধারায় নানা প্রকল্প করা হচ্ছে। যত বড় প্রকল্প, তত বেশি দুর্নীতি হচ্ছে। সরকারি প্রকল্প মানেই অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর আর অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা। এর মূলে কাজ করছে লাগামহীন দুর্নীতি আর লুটপাটের প্রণোদনা। সরকারি কর্মকর্তাদের লাগামহীন বিদেশ সফরের উপাখ্যান শুনলে রীতিমতো চমকে উঠতে হয়। তা যেন কল্পনাকেও হার মানায়।

খিচুড়ি রান্না শিখতে ৫ কোটি টাকা খরচ করে ৫০০ কর্মকর্তার বিদেশ সফর, পুকুর খনন শেখার জন্য ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা খরচ করে ১৬ কর্মকর্তার বিদেশ সফর, নলকূপ খনন শিখতে একাধিক কর্মকর্তার বিদেশে সফর, একটি বিমান ডেলিভারি নিতে দুই দফায় ৪৫ জনের যুক্তরাষ্ট্র সফর, ১০তলা ভবন নির্মাণের জন্য ১৯ কোটি ৮২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা খরচ করে ৯৭৩ পরামর্শক নিয়োগ দেয়া এবং ভবন নির্মাণের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য ৬ লাখ ৬৬ হাজার টাকা খরচ করে ভবন দেখতে ৩০ কর্মকর্তার বিদেশ সফর, আলুর চাষ দেখতে ৩ কোটি টাকা খরচ করে বিএডিসির ৪০ কর্মকর্তার ইউরোপ সফর, একটি ক্যামেরা কিনতে তিনজনের বিদেশ সফর, লিফট দেখতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আট শিক্ষক ও কর্মকর্তার সুইজারল্যান্ড ও স্পেন এবং ফ্ল্যাট দেখতে থাইল্যান্ড-সিঙ্গাপুর সফর, কারাগারে স্বজন-লিংক স্থাপনে অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা ও আর্জেন্টিনা সফর, মাত্র আড়াই কিলোমিটার সড়কের জন্য ‘প্রশিক্ষণ’ নিতে জনপ্রতি ১৫ লাখ টাকা খরচ করে ১৩ জন কর্মকর্তার আমেরিকা, কানাডা ও ইউরোপ সফর, নিরাপদ পানির ‘প্রশিক্ষণে’ চট্টগ্রাম ওয়াসার ২৭ জন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের আরও ১৪ জন কর্মকর্তার উগান্ডার মতো অনুন্নত দেশে এবং ১৫ জন কর্মকর্তার নেদারল্যান্ডস সফর, শিক্ষা সফরের নামে কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের কথা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি সফরের সব খরচ বহন করার পর ‘পকেট মানি’ দেয়ার কথাও জানা যায়।

বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে বিশ্বব্যাংকের ঋণের অর্থে ‘নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ’ প্রকল্পের (কেইস) মাধ্যমে গত ১০ বছরে পরিবেশ অধিদপ্তর দেশে ২২১ কোটি টাকা খরচ করেছে। প্রকল্পের অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ১২৩ কোটি টাকা ব্যয় হয় কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর, পরামর্শক ফি, গাড়ি কেনা ও ভবন নির্মাণে। প্রকল্পের অধীনে ১০ বছরে ২৯৬ জন কর্মকর্তা বিদেশ সফর করেছেন। একজন কর্মকর্তা ১০ বারও বিদেশে গেছেন। এসবের পর পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিবেদন বলছে, বায়ুদূষণ বেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও মহাকাশ বিষয়ক সংস্থা ‘নাসা’র এক প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পুরস্কার গ্রহণ করতে ফ্লোরিডায় যেতে পারেননি। কিন্তু তাতে কী? সরকারি খরচে তথ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট আরেকটি প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তা ঠিকই ফ্লোরিডায় বেড়িয়ে এসেছেন। ‘সত্যিই সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ!’

বিদেশ সফরে বিশ্বরেকর্ড করেছেন বর্তমান সরকারের মন্ত্রী ডা. দীপু মনি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে ৫৪ মাস মেয়াদে তিনি সফর করেছেন ১৮৭টি দেশ এবং দেশের বাইরে থেকেছেন ৬০০ দিন। পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, একজন সচিব স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে রাষ্ট্রীয় খরচে ১৯ মাসে ১৩ বার বিদেশ সফর করেছেন। সরকারি কর্মকর্তা, সচিব, এমপি, মন্ত্রীদের লাগামহীন বিদেশ সফরের সব ঘটনা আমরা জানতে পারি না।

দুর্নীতি-লুটপাটের অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে গেছে। সরকারি কেনাকাটায় ‘সাগর চুরি’ এখন ‘মহাসাগর চুরি’তে গড়িয়েছে। একটা টিনের দাম এক লাখ টাকা! খাগড়াছড়ির ৬-আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) ঘর মেরামতের কাজে দুই বান টিনের দাম পড়েছে ১৪ লাখ টাকা। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, একটি তালা ৫ হাজার ৫৫০ টাকা দিয়ে কিনেছে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে। নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের সন্দ্বীপ চ্যানেলে ভাঙনরোধে তীর সংরক্ষণ প্রকল্পে ৫টি সাইনবোর্ড বানাতে ২৭ লাখ টাকা, স্ট্যাম্প ও সিল বানাতে ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) একটি প্রকল্পে সড়কের প্রতিটি এলইডি বাতির ব্যয় ধরা হয় ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা।

ডাক বিভাগের ৫৪০.৯৪ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের ১৬০ কোটি টাকার কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি প্রকল্পে ক্লিনারের মাসিক বেতন ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা, অফিস সহায়কের মাসিক বেতন ৮৩ হাজার ৯৫০ টাকা এবং ক্যাড অপারেটরের মাসিক বেতন ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। বিদেশি পরামর্শকের মাসিক বেতন ধরা হয়েছে ২৫ লাখ টাকা। এসব কিন্তু কল্পনা নয়, এসব নির্মম সত্য!

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ‘বালিশকাণ্ড’, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের ‘পর্দাকাণ্ড’ নিয়ে সারাদেশে ব্যাপক শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। রূপপুর প্রকল্পে বালিশের দাম পড়েছিল ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা, বালিশ খাটে রাখাতে খরচ দেখানো হয়েছিল ৭৬০ টাকা। বালিশ আনার জন্য ট্রাক ভাড়া, কাজটা তদারকির জন্যও লাগামহীন খরচ দেখানো হয়েছিল। এমনি করে কভারসহ কমফোর্টার, ফ্রিজ, ইলেকট্রিক কেটলি, ওয়াশিং মেশিন, ডাইনিং টেবিলসহ বিভিন্ন আসবাব ও পণ্য ক্রয়ে অস্বাভাবিক খরচ দেখানো হয়। ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রতি সেট পর্দার দাম পড়েছিল ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা!

দুর্নীতি আর লুটপাটের গল্পের যেন শেষ নেই! এমন কোনো সেক্টর, মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, সরকারি অফিস পাওয়া যাবে না, যেখানে লাগামহীন দুর্নীতি নেই। যেন দুর্নীতি আর লুটপাটের প্রতিযোগিতা চলছে। করোনাকালে মানুষের বিপন্নতার মধ্যে স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক দুর্নীতির কথা জানা যায়। নিয়ন্ত্রণহীন দুর্নীতি-লুটপাটের অনেক কাহিনি আমরা জানতেও পারি না।

বিদেশে অর্থ পাচার বাড়ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) তথ্য বলছে, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে গড়ে পাচার হয়ে যাচ্ছে প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকা। প্রকৃত পরিমাণ আরও বেশি হবে। সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) প্রতিবেদন বলছে, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের জমা করা অর্থের পরিমাণ ৫ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা। ফরিদপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নিশান মাহামুদ শামীম একাই ২ হাজার কোটি টাকা পাচার করে ফেলেছেন। যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট পাচার করেছেন ১৯৫ কোটি টাকা। ডাক বিভাগের ডিজির বিরুদ্ধে বিদেশে শত কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। রাঘব-বোয়ালদের অর্থ পাচারের পরিমাণ কল্পনারও বাইরে!

মানবপাচার আর মুদ্রাপাচারের অভিযোগে কুয়েতে বাংলাদেশের একজন এমপিকে গ্রেপ্তার হতে হয়েছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় কয়েকজন লুটেরা বিদেশে পালিয়েও গেছেন। ক্যাসিনো, সম্রাট থেকে পাপিয়া, ট্রাংক আর সিন্দুকে থরে থরে সাজানো টাকা-এসব বিষয় মানুষ ভোলেনি।

দুর্নীতি-লুটপাট কর্তৃত্ববাদী শাসনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। অনেক আগেই বাংলাদেশ কার্যত একদলীয় শাসনব্যবস্থা তথা কর্তৃত্ববাদে প্রবেশ করেছে। কর্তৃত্ববাদ কথাটা ইংরেজি ‘Authoritarianism’ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ। স্বৈরাচারের ভিন্ন রূপ হচ্ছে কর্তৃত্ববাদ। ‘স্বৈরাচার’ কথাটা সেকেলে হলে, কর্তৃত্ববাদ তার নবতর সংস্করণ। একদলীয় বা এক ব্যক্তির শাসন, যেখানে নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বা মতামতের কোনো মূল্য নেই, সেই শাসনকে কর্তৃত্ববাদী শাসন বলা হয়ে থাকে।

কর্তৃত্ববাদী শাসনে গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা হারিয়ে যায়। সরকারের ঘোষিত ও অঘোষিত নিয়ন্ত্রণের ফলে নাগরিকদের স্বাধীনতা ও অধিকার বিপন্ন হয়। ভীতি সঞ্চার ও বলপ্রয়োগ করে বিরোধী মতকে স্তব্ধ করে দিয়ে এবং গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্রের অন্তর্গত সব বিষয়ের ওপর শাসকের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রশাসন ও পুলিশের ওপর সরকারের অতিমাত্রায় নির্ভরতা এবং বিচারহীনতা দেখা দেয়। রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে তোলা হয়। শাসককে পরিণত করা হয় প্রভুতে। জনগণ পরিণত হয় শাসকের নিয়ন্ত্রণাধীন ভৃত্যে। এক দল কিংবা এক ব্যক্তি বা কতিপয় ব্যক্তির নির্দেশই এখানে শিরোধার্য। নানা পন্থায় কর্তৃত্ববাদী শাসক সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি হয়ে ওঠেন সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক, সবকিছুর নিয়ন্ত্রক। ব্যক্তি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের সমার্থক। প্রসঙ্গত বলা যায়, ফরাসি সম্রাট ষোড়শ লুই সদম্ভে ঘোষণা করেছিলেন-‘আমিই রাষ্ট্র’।

কর্তৃত্ববাদী শাসনে জনগণের প্রতি সরকারের কোনো দায় থাকে না। কর্তৃত্ববাদী সরকার জনমতকে তোয়াক্কা করে না। কর্তৃত্ববাদ নয়, জনগণের স্বার্থই শেষ কথা। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইকে অগ্রসর করতে হবে। দ্রব্যমূল্যের ‘পাগলা ঘোড়া’, লুটপাট-দুর্নীতি ঠেকাতে হবে, কর্তৃত্ববাদী সরকার হঠাতে হবে।

লেখক: প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.