মুক্তির পথ একটাই সমাজতন্ত্র

৬ মার্চ বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র ৭৩তম প্রতিষ্ঠা দিবস। কমিউনিস্ট পার্টি শ্রমিক মেহনতি মানুষের পার্টি। শোষিত-নিপীড়িত মানুষের এ পার্টি এদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোতে লাল পতাকাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে লড়াই করেছে। অবিভক্ত ভারতে ব্রিটিশ আমল থেকে কাজ শুরু করলেও কার্যত ১৯৪৮ সালের ৬ মার্চ এদেশে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা দিবস। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে কলকাতায় ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির ২য় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। কংগ্রেসে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে ১২৫ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। ৬ মার্চ আলাদা কংগ্রেসে মিলিত হয়ে গঠন করা হয় পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি। কংগ্রেসে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য গঠন করা হয় একটি প্রাদেশিক কমিটি। সে হিসেবে ৪৮-এর ৬ মার্চ বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা দিবস।

অবিভক্ত বাংলার এই অঞ্চল ছিলো শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্পের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত পশ্চাদপদ। পাকিস্তানি শাসকদের জাতিগত শোষণ, দমন-পীড়ন ও প্রতিক্রিয়াশীল নীতির বিরুদ্ধে দেশবাসী মাতৃভাষার অধিকার, গণতন্ত্র ও জাতীয় বিকাশের দাবিতে ও বিজাতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে কমিউনিস্টরা তেভাগা আন্দোলন, টংক, নানকার আন্দোলন, নাচোলে আদিবাসী বিদ্রোহের মত বহু দুঃসাহসিক আন্দোলন গড়ে তোলে। ‘৪৮ এ ভাষা সংগ্রাম ’৫২-র রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ’৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা আন্দোলন, ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-র ৬ দফা সংগ্রাম, পরবর্তীতে ১১ দফা আন্দোলন ও ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০ ও ’৭১-এর অসহযোগ আন্দোলন, কৃষক, শ্রমিক, নারী, ছাত্র জনতার বিভিন্ন গণসংগ্রাম গড়ে তোলার মূল সংগঠকের দায়িত্ব পালন করে কমিউনিস্ট পার্টি। আবার মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ, ছাত্র ইউনিয়নসহ ১৯ হাজার গেরিলা বাহিনী নিয়ে সশস্ত্র অংশগ্রহণ করে কমিউনিস্ট পার্টি।

এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সময় সমাজতান্ত্রিক বিশ্বসহ আন্তর্জাতিক বিশ্বের সমর্থন আদায়ে মূল ভূমিকা পালন করে কমিউনিস্ট পার্টি। ’৭৫ এ জাতীয় ট্র্যাজেডির পর বারবার সামরিক শাসন, হত্যা, ক্যু, গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ, মৌলবাদী তা-ব, সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রে জাতীয় স্বার্থ লুণ্ঠন ইত্যাদির বিরুদ্ধে কমিউনিস্টরা জীবন-মরণ লড়াই করেছে। এজন্য কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধও করা হয়। সামরিক শাসকদের বুটের তলায় রাজনীতি, গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার যখন পিষ্ট তখনও কমিউনিস্টরা হতাশ হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দলগুলি যখন চরমভাবে হতাশ ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় তখনও মার্কসবাদী দ্বান্দ্বিক তত্ত্বের বিশ্বাসী-কমিউনিস্টরা পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য পথ করে নিয়েছে, অন্যদের পথ চিনিয়েছে। অন্যদের অনুপ্রাণিত ও ঐক্যবদ্ধ করার ব্যাপারে সংগঠকের ভূমিকা পালন করেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাহসের সাথে লড়াই-সংগ্রাম গড়ে তুলেছে। জনগণের সংগ্রামের ভেতর পার্টির শেকড় প্রোথিত। কমিউনিস্ট পার্টির হাতে জনতার সংগ্রামের রক্ত পতাকা। জনগণের সংগ্রাম যত দিন থাকবে ততদিন এই পতাকার মিছিল চলবে।

মুক্তির পথ সমাজতন্ত্র। সমাজতান্ত্রিক সমাজে শ্রেণি, জাতির মধ্যে কোনো বৈষম্য থাকে না। ‘মুক্ত মানুষের মুক্ত সমাজ’ তথা সাম্যবাদের পথে, মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রার পথে সমাজতন্ত্র হলো এক আবশ্যিক অন্তর্র্বর্তীকালীন পর্ব। সমাজতন্ত্র এমন একটি সমাজব্যবস্থা- যার মূল বাণী হলো- ‘সবকিছু মানুষের জন্য, সবকিছু মানুষের মঙ্গলের জন্য।’ ‘প্রতিটি মানুষের মুক্ত বিকাশই হচ্ছে সকলের মুক্ত বিকাশের পূর্বশর্ত।’ সমাজতন্ত্রে রাষ্ট্রক্ষমতায় জনগণের সমর্থনপুষ্ট শ্রমিক শ্রেণি ও মেহনতি মানুষের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। জনগণের রায়, সমর্থন ও আস্থাই হচ্ছে এই নেতৃত্বের উৎস ও ভিত্তি। শ্রমিক শ্রেণি ও জনগণের সক্রিয় সমর্থন ও আস্থা ছাড়া সমাজতন্ত্র অগ্রসর হতে পারে না। সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য হচ্ছে উৎপাদনের প্রধান প্রধান উপায়গুলোর ওপর সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা, মানুষের ওপর মানুষের শোষণের অবসান এবং সামাজিক নির্যাতন, সুবিধাভোগী সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর শাসনের অবসান এবং ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, বেকারত্ব থেকে মুক্তি। সমাজতন্ত্র উৎপাদন শক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পরিকল্পিত সুষম মানবিক ও পরিবেশসম্মত বিকাশের প্রভূত সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। এই সমাজতন্ত্রের জন্য চাই- সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, অনগ্রসরতা, পশ্চাদপদতা দূর করে সমাজতন্ত্রের ভিত প্রস্তুত করা।

জনগণের জন্য সমাজতন্ত্র। আর সমাজতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন বিপ্লব। আবার বিপ্লবের জন্যও প্রয়োজন জনগণ। বুর্জোয়া রাজনীতির গতিধারার উপর হস্তক্ষেপ করতে হলে প্রয়োজন জনগণের শক্তি। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, স্বাধীনতা বিরোধী সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তির যথেষ্ট জনসমর্থন রয়েছে। তাদের পরাস্ত করে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হলেও প্রয়োজন জনশক্তি। রাজনৈতিক অরাজকতা, নৈরাজ্য বা বন্দুকের নল, প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে বেশিদিন ক্ষমতায় থাকা যায় না। আর তা যদি সম্ভব হত তাহলে পাকিস্তানিরা লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যেত না। শ্রেণি আন্দোলন, পেশাজীবী আন্দোলন, স্থানীয় আন্দোলন ইত্যাদির মাধ্যমেই কেবল জনগণকে জয় করা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.