মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে শর্টকাট কোনো রাস্তা নাই

একটি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এদেশ স্বাধীন হয়েছে ৫০ বছর হতে চলেছে। মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতি- গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের পথে অগ্রসর হওয়ার জন্য এটা খুব কম সময় নয়। কিন্তু সেই পথে কতটুকু অগ্রসর হয়েছে প্রিয় বাংলাদেশ? এটা এই বিজয় অর্জনের মুখে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলে উত্তরটা বোধ হয় খুব সুখকর হবে না। একদিকে শাসকশ্রেণি মনে করছে, শুধু বড় বড় অর্থনৈতিক প্রকল্পের পরিসংখ্যানই হচ্ছে দেশের উন্নয়ন-সমৃদ্ধির একমাত্র পথ। সেই পথকে পাথেয় করেই এই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে এক নজিরবিহীন বৈষম্যের দিকে এগিয়ে চলেছে। পদে পদে দুর্নীতি তো আছেই। পৃথিবীতে সবচেয়ে কম সময়ে অতিধনী হওয়ার প্রবণতা রয়েছে এই দেশেই। টাকা পাচারে শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।

বিশেষজ্ঞরা বরছেন, প্রতিদিন বৈষম্যের হার বাড়ছে। ২০১৬ সালে যেখানে আয়ের জিনি সহগ ছিল ০.৪৮। ২০২০ সালে তা ০.৫২-এ পৌঁছেছে। কোনো দেশের আয়-বৈষম্য কতটা তা পরিমাপ করা হয় জিনি সহগ দিয়ে। জিনি সহগের মান যত কম হয়, আয়-বৈষম্য তত কমে; আর এর মান যত বেশি হয় আয়-বৈষম্য তত বাড়ে। এটা শূন্য হলে বোঝায় যে, দেশের সকলের মধ্যে চরম সমতা বিরাজ করছে; আর এর মান বাড়তে বাড়তে শূন্য দশমিক পাঁচ (০.৫) বা বেশি হলে বোঝায় যে, দেশে আয়-বৈষম্য চরমতম অবস্থায় পৌঁছেছে। এ থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশের আয়-বৈষম্য চরমতম অবস্থায় পৌঁছেছে। আয়-বৈষম্যের এ চিত্র শহরের চেয়ে গ্রামে আরও বেশি তীব্র। এই প্রকট আয়-বৈষম্য রেখেই কি আমরা স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তীতে পদার্পণ করতে যাচ্ছি? তাহলে সেই স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ আসলে কার? গবিরের নাকি বিপুল আয় যে গোষ্ঠীর কাছে গিয়ে পুঞ্জীভূত হয়েছে তার?

এই দেশের মানুষ স্বাধীনতার পর থেকেই দেশকে গড়ে তুলতে উদয়াস্ত পরিশ্রম করেছে। কিন্তু সেই পরিশ্রমের ফল সে কখনোই ভোগ করতে পারেনি। অপরদিকে আরেকটি গোষ্ঠী প্রতিদিন দেশের টাকা পাচার করেছে। কানাডা, আমেরিকা, মালয়েশিয়ায় স্বপ্নের দ্বিতীয় আবাস গড়ে তুলেছে। এক হিসাবে বলা হচ্ছে, শুধূমাত্র ২০১৫ সালেই বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৫০ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশে পদ্মা নদীর উপর সেতু হচ্ছে। এরই মধ্যে সেতুর সবগুলো স্প্যান বসে গেছে। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প। এর অনুমিত ব্যয় ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর পরে দ্বিতীয় বৃহৎ প্রকল্প হচ্ছে ঢাকা শহরের মেট্রো রেল প্রকল্প। এর ব্যয় প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা।

তার মানে, শুধু এক বছরে বাংলাদেশ থেকে যে টাকা পাচার হয়েছে সেই টাকা দিয়ে আরেকটি পদ্মাসেতু আর মেট্রো রেল তৈরি করা সম্ভব হতো। প্রশ্ন হচ্ছে, এই যে লুটেরা পুঁজির মালিক, যারা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে- তাদের স্ব স্ব অবস্থানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ গড়ে তোলা কতোটা সম্ভব?

এই বিজয় দিবস এমন একটি সময়ে আমাদের কাছে এসেছে যখন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে মৌলবাদী শক্তি আরো উগ্র হয়ে পড়েছে। আদর্শহীন, বুর্জোয়া দলগুলো কীভাবে তাদের মাথায় হাত রেখে বড় করে তুলেছে সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। যে ধর্মনিরপেক্ষতার মর্মবাণী নিয়ে এই দেশ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, ৫০ বছর পর সেইদেশে কী আজ তারাই ব্রাত্য হতে বসেছে! তারপরও বিজয় দিবস আসবে। কিন্তু মানুষের মুক্তি সে তো অন্য লড়াই-সংগ্রামের অধ্যায়। সেখানে পৌঁছানোর শর্টকাট কোনো পথ নেই। মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল সশস্ত্র সংগ্রামের আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়েছে আরো দীর্ঘতর কোনো শ্রেণি-সংগ্রামের।