মুক্তবুদ্ধির অগ্রদূত বিদ্যাসাগর

মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী

[আজ বিদ্যাসাগরের ১৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী। এ উপলক্ষে শহীদ বুদ্ধিজীবী মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর একটি রচনা একতা টিভির পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হল। লেখাটি মাসিক সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত, প্রকাশকাল: অগ্রহায়ণ, ১৩৬১। পরে এটি ‘সাহিত্যের নবরূপায়ণ’ নামের বইতে সংকলিত হয়। বইটির প্রকাশকাল আশ্বিন, ১৩৭৬ (১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দ); প্রকাশক: মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা।– নির্বাহী সম্পাদক]

“মাঝে মাঝে বিধাতার নিয়মের এরূপ আশ্চর্য ব্যতিক্রম হয় কেন, বিশ্বকর্মা যেখানে চারকোটি বাঙালি নির্মাণ করিতেছিলেন, সেখানে হঠাৎ দু একজন মানুষ গড়িয়া বসেন কেন, তাহা বলা কঠিন।”

‘চারিত্র্য পূজা’ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের এই মন্তব্য বিদ্যাসাগরের চরিত্রের প্রতি এক অবিস্মরণীয় প্রশস্তি। এই হীনতেজ, দুর্বল আত্মা ও পরশ্রীকাতরতার দেশে বিদ্যাসাগরের মতো বিশাল হৃদয় অগ্নিপুরুষের আবির্ভাব বিস্ময়কর, সন্দেহ নাই। যে জননী সাতকোটি সন্তানকে শুধু বাঙালি করেই রেখেছেন, মানুষ করতে পারেন নি, কবির মতে, তারই ছেলেদের মধ্যে একমাত্র মানুষের মতো মানুষ— বিদ্যাসাগর। বর্ণ-পরিচয় প্রথম ভাগে বিদ্যাসাগর গোপাল নামক এক সুবোধ ছেলে এবং রাখাল নামক এক দুর্দান্ত ছেলের কথা লিখেছেন এবং বাঙালী শিশুদের গোপালের ন্যায় সুবোধ হতে উপদেশ দিয়েছেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মত ভিন্নরূপ—

“নিরীহ বাংলাদেশে গোপালের মতো সুবোধ ছেলের অভাব নাই। এই ক্ষীণতেজ দেশে রাখাল এবং তাহার জীবনী লেখক ঈশ্বরচন্দ্রের মতো দুর্দান্ত ছেলের প্রাদুর্ভাব হইলে বাঙালি জাতির শীর্ণ চরিত্রের অপবাদ ঘুচিয়া যাইতে পারে। সুবোধ ছেলেগুলি পাশ করিয়া ভালো চাকরি-বাকরি এবং বিবাহকালে প্রচুর পণ লাভ করে, সন্দেহ নাই, কিন্তু দুষ্ট অবাধ্য অশান্ত ছেলেগুলোর কাছে স্বদেশের জন্য অনেক আশা করা যায়।”

বিদ্যাসাগর নাকি বাল্যকালে বর্ণ পরিচয়ের রাখালের মতোই দুরন্ত ছিলেন— তাই এই কথা।

ঊনবিংশ শতকের বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, পুরুষকারের জ্বলন্ত আদর্শ এই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে আজ আমরা ভুলে যেতে বসেছি। যে বাংলাদেশের জন্য, বিশেষ করে বাংলার হিন্দু সমাজের জন্য তিনি এত করে গেছেন, সেই দেশে, সেই সমাজে আজ বিদ্যাসাগরের অপেক্ষা বহু ক্ষুদ্রতর ব্যক্তি, তাঁর চাইতে মর্যাদার বহু উঁচু আসনে। আমাদের দুঃখ এই যারা বাংলা এবং বাঙালি হিন্দু সমাজকে রক্ষণশীলতা আর গোঁড়ামীর মন্ত্রে দীক্ষা দিয়ে পেছন দিকে টেনে নিয়ে গেছেন, তাঁরাই আজ বাংলাদেশে ঋষি এবং ‘পরম পুরুষ’ আখ্যা পেয়েছেন, কিন্তু যে বিদ্যাসাগর আধুনিক বাংলার ভিত্তি পত্তন করে দিয়ে গেছেন, যিনি তাঁর ত্রিকালজ্ঞ দৃষ্টিতে দেশের প্রগতির সঠিক পন্থা নির্ধারণ করে দিয়ে গেছেন, তিনিই বাঙালির কাছ থেকে ‘ঋষি’ খেতাব পেলেন না। তিনি শুধু পণ্ডিত, অনেকের ধারণা ‘টুলো পণ্ডিত’। তাই এই সার্বজনীন শোকসভার দেশে আর তাঁকে নিয়ে বাঙালি সভা করে না; তাঁর উপর কেউ বক্তৃতাও করে না, তাঁর কথা কেউ লেখেও না।

বিদ্যাসাগর মহাপ্রস্থান করেছেন আজ থেকে মাত্র ৬৪ বৎসর* আগে। আর ১৩৫ বৎসর* পূর্বে, ১২২৭ সালের ১২ আশ্বিন তারিখে (২৬ সেপ্টেম্বর, ১৮২০) ঈশ্বরচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেন। (*এই লেখাটি ১৯৫৫ সালে রচিত, সে হিসাবে— সম্পাদক)

ঈশ্বরচন্দ্রের বাৎসরিক জন্মদিন অন্য বারের মতোই এসে চলে গেল। দুঃখ এই, প্রতিবারেই বিদ্যাসাগরের জন্মের এই শুভদিন আমাদের সামনে দিয়ে সৃষ্ট লগ্নের মতোই ব্যর্থ হয়ে যায়। বিদ্যাসাগরের বিরাট জীবন, তাঁর অভাবনীয় কৃতিকর্ম, তাঁর বিরাট আদর্শের বিশেষ কোনো আলোচনাই আজ আর শোনা যায় না কোনো স্মৃতি সাগরে। অকীর্তিত, অগীত, অস্মৃত চলে যায় বিদ্যাসাগরের আবির্ভাবের পুণ্যতিথি, তার জন্মের শুভক্ষণ। মুসলমানদেরর তো কথাই নেই, হিন্দুরাও তাঁকে আজ স্মরণ করে না।

বিদ্যাসাগরকে যে আমরা বিস্মৃত হয়েছি বা হতে চলেছি এর বোধ হয় কিছু মনস্তাত্ত্বিক কারণ আছে। বিদ্যাসাগরকে বাঙালি, বিশেষ করে বাংলার হিন্দু সমাজ প্রসন্ন মনে গ্রহণ করতে পারেননি।

বিদ্যাসাগরকে যে তারা সইতে পারেন নি, তার কারণ, বিদ্যাসাগর ঊনবিংশ শতক তো দূরের কথা, এই বিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের দুই বাংলাদেশের তুলনায়ই অগ্রগামী এবং প্রগতিশীল ছিলেন। তিনি যেসব মতবাদ পোষণ করতেন, আজকের দিনের উচ্চ শিক্ষিত হিন্দু মুসলমানেরও তা হজম করতে বাধবে।

বিদ্যাসাগর হিন্দু সমাজের আচার ও বিশ্বাসের ভিত্তিমূলে প্রচণ্ড নাড়া দিয়েছিলেন। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পুনরুত্থানে বিশ্বাসী বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোক যাই মাত্রেরই মতে এ দেশের প্রাচীন কবিদের তুল্য জ্ঞানী কেউ কোনো দিন ছিল না, আর কেউ হবেও না। বেদ-বেদান্ত ও সংহিতায় সবযুগের শেষ কথা ও সার কথা বলা হয়েছে। ঊনবিংশ শতকের শেষের দিকে তাদের আত্মপ্রবঞ্চনা এতদূর পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল যে, ইউরোপে সমসাময়িক কালে কেউ বিজ্ঞানের কোনো নুতন তত্ত্ব বা তথ্য আবিষ্কার করলে অমনিই তারা বলতে শুরু করতেন, ‘এ আর নূতন কথা কী! আমাদের পূর্বপুরুষগণ হাজার হাজার বছর আগেই তা জানতেন। অমুক সংহিতায় অমুক শ্লোকে কি সে কথাই বলা হয়নি’— যেহেতু এদের মতে ভারতবর্ষ সনাতন সভ্যতার দেশ! এই আত্মপ্রবঞ্চনামূলক মূঢ় দৃষ্টির ওপর প্রথম জ্ঞানাঞ্জন শলাকা বুলোতে চেষ্টা করেন মনীষী রামমোহন।

এই মূঢ়তার ওপরেই বিদ্যাসাগরের বজ্রমুষ্টি এসে পড়ে; কিন্তু তিনি হিন্দু বিশ্বাসের সর্বাপেক্ষা স্পর্শকাতর তন্ত্রীতে, আত্ম-প্রশস্তির কোমলতম জায়গায় গিয়ে আঘাত করেছিলেন। তাই এক প্রচণ্ড বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল এবং সেই অনুযায়ী প্রতিঘাতও তাঁকে খেতে হয়েছিল। কিন্তু বিদ্যাসাগর কিনা ছিলেন পুরুষসিংহ, তাই একাই লড়েছিলেন দেশব্যাপী প্রতিকূলতার সঙ্গে। যা তিনি বিশ্বাস করেছেন, তা তিনি বলেছেন এবং এক আসুরিক (দৈব বললুম না, কারণ তাতে তিনি বিশ্বাস করতেন না) শক্তির বলে তা সম্পূর্ণ কার্যে পরিণত করেছেন।

ভারতীয়দের পূর্বপুরুষগণই চরম জ্ঞানের আধার ছিলেন, একথা বিদ্যাসাগর হাস্যকর মনে করতেন এবং বেদান্ত ইত্যাদি শাস্ত্র অভ্রান্ত সত্যের আকার— একথা তিনি বিশ্বাস করতেন না। যদিও সেসব কথা তিনি সর্বসাধারণ্যে প্রচার করেননি। কারণ তার বিপদ ছিল, এখনও আছে। ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে শিক্ষানীতি আলোচনা প্রসঙ্গে বিদ্যাসাগর তৎকালীন সরকারি শিক্ষা পরিষদকে লিখেছিলেন—

“বেদান্ত ও সাংখ্য যে ভ্রান্ত দর্শন এ সম্বন্ধে এখন আর মতদ্বৈধ নাই। মিথ্যা হইলেও হিন্দুদের কাছে এই দুই দর্শন অসাধারণ শ্রদ্ধার জিনিস। সংস্কৃতে যখন এগুলি শিখাইতেই হইবে, ইহাদের প্রভাব কাটাইয়া তুলিতে প্রতিষেধকরূপে ইংরেজিতে ছাত্রদের যথার্থ দর্শন পড়ান দরকার।” (সাহিত্য সাধক চরিতমালা— ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়; ১৮ সংখ্যক গ্রন্থ, পৃ. ৩৩-৪০, চতুর্থ সংস্করণ)

বিদ্যাসাগরের বুদ্ধি কতটা মুক্ত এবং প্রগতিশীল ছিল এর থেকেই বোঝা যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে তাঁর চিন্তার এই স্বচ্ছতা সত্যিই আমাদের বিস্ময়ের বস্তু। প্রাচীন ভারতীয় বিদ্যার সঙ্কীর্ণ ধাধা গণ্ডীর মধ্যে বিশেষ কোনো জ্ঞানই যে লাভ হবে না— একথা বোঝানোই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। উক্ত চিঠিরই অন্যস্থলে আছে—

“একথা অবশ্য স্বীকার করিতে হইবে, হিন্দু দর্শনে এমন অনেক অংশ আছে, যাহা ইংরেজিতে সহজবোধ্যভাবে প্রকাশ করা যায় না, তাহার কারণ সে সবের মধ্যে পদার্থ কিছু নাই।” (বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গ— ঐ (১৩৩৮); পৃ. ১৪-২০, ইংরেজি হইতে অনূদিত)

সমসাময়িক সংস্কৃত পণ্ডিতদের প্রতি বিদ্যাসাগরের অবজ্ঞাও ছিল অপরিসীম। তাও তিনি প্রকাশ করতে দ্বিধাবোধ করেন নি (যদিও তিনি একজন সংস্কৃত পণ্ডিত)। প্রসঙ্গক্রমে প্রাচীন ভারতীয় পণ্ডিত এবং দার্শনিকদের প্রতি অন্ধভক্তির বিরুদ্ধে তিনি সুস্পষ্ট প্রতিবাদ জানিয়েছেন। উক্ত চিঠিতেই আছে—

“আমার বলিতে লজ্জা হয় ভারতীয় পণ্ডিতগণের গোঁড়ামী কিছু কম নয়। তাঁহাদের বিশ্বাস সর্বজ্ঞ ঋষিদের মস্তিষ্ক হইতে শাস্ত্র নির্গত হইয়াছে, অতএব শাস্ত্রসমূহ অভ্রান্ত। আলাপ অথবা আলোচনার সময় পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের নূতন সত্যের কথা অবতারণা করিলে তাঁহার হাসি ঠাট্টা করিয়া উড়াইয়া দেয়। সম্প্রতি ভারতবর্যের এই প্রদেশে— বিশেষত কলিকাতা ও তাহার আশে পাশে— পণ্ডিতদের মধ্যে একটি মনোভাব পরিস্ফুট হইয়া উঠিতেছে; শাস্ত্রে যাহার অঙ্কুর আছে এমন কোনো বৈজ্ঞানিক সত্যের কথা শুনিলে সেই সত্য সম্বন্ধে শ্রদ্ধা দেখান দূরে থাক, শাস্ত্রের প্রতি তাহাদের কুসংস্কারপূর্ণ বিশ্বাস আরও দৃঢ়ীভূত হয়— এবং ‘আমাদেরই জয়’— এই ভাব ফুটিয়া উঠে। এইসব বিবেচনা করিয়া ভারতবর্ষীয় পণ্ডিতদের নূতন বৈজ্ঞানিক সত্য গ্রহণ করাইবার কোনো আশা আছে, এমন আমার বোধ হয় না।” (বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গ— ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়; পৃ. ১৮-১৯)

বিদ্যাসাগরের এই মন্তব্য শুধু বিজ্ঞতা এবং মুক্তবুদ্ধির নয়, এক অসাধারণ পরিচ্ছন্ন চিন্তার (Clarity of thought) পরিচায়ক। যাই হোক, সমসাময়িক এই পণ্ডিতদের শতহস্তেন দূরে রেখেই, তাঁদের সকল বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি তাঁর কাজে (ইংরেজি শিক্ষা ও পাশ্চাত্য দর্শন-বিজ্ঞানের প্রবর্তন) এগিয়ে যাবেনই— এই দৃঢ় সংকল্পই তিনি প্রকাশ করেছেন। এইখানেই তার অটল, যুগন্ধর প্রতিভার পরিচয় এবং তাঁর চারিত্রিক বিশিষ্টতা। ওই চিঠিতে তিনি আরও বলেছেন—

“আমি সযত্নে এখানকার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করিয়াছি। তাহাতে আমার মনে হইয়াছে, তাঁহাদের মনস্তুষ্টি সম্পাদনের প্রয়োজন নাই, কেননা আমরা তাঁহাদের কোনো সাহায্য চাহি না। আজ ইহাদের সম্মানও লুপ্ত প্রায়, কাজেই এই দলকে ভয় করিবার কারণ দেখি না। ইহাদের কণ্ঠ ক্ষীণ হইতে ক্ষীণতর হইয়া আসিতেছে। এ-দলের পূর্ব আধিপত্য ফিরিয়া পাইবার বড় সম্ভাবনা নাই। বাংলাদেশের যেখানে শিক্ষার বিস্তার হইতেছে, সেখানেই পণ্ডিতদের প্রভাব কমিয়া আসিতেছে। দেখা যাইতেছে, বাংলার অধিবাসীরা শিক্ষালাভের জন্য অত্যন্ত ব্যগ্র। দেশীয় পণ্ডিতদের মনস্তুষ্টি না করিয়াও আমরা কি করিতে পারি, তাহা দেশের বিভিন্ন অংশে স্কুল কলেজের প্রতিষ্ঠাই আমাদের শিখাইয়াছে।” (বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গ, পৃ. ১৯)

এ-হেন বিদ্যাসাগরকে পণ্ডিতগণ তথা হিন্দু সমাজ সইতে পারবে কেন! তবু হিন্দু সমাজ বলেই হয়তো বিদ্যাসাগর বড়ো বেঁচে গেছেন, মধ্যযুগের ইউরোপে জন্মালে তাঁকে ঠিক পুড়িয়ে মারতো, ‘গিলোটিন’ করতো ধর্মদ্রোহের (heresy) অজুহাতে। কিন্তু তবু তাঁকে আমরা পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বলেই জানি, বিপ্লবী বা দেশনায়ক বিদ্যাসাগর তো তাঁকে কেউ বলে না।

তার সম্ভাব্য কারণ— বিদ্যাসাগরের রচিত সাহিত্যে তাঁর বিদ্রোহের পরিচয় লেখা নেই। তাঁর সাহিত্য প্রায়ই প্রাচীন গ্রন্থের ভাবানুবাদ; সেগুলিতে তাঁর স্বাধীন চিন্তা প্রকাশের অবকাশ ছিলো না। সংস্কারক ও বিপ্লবী বিদ্যাসাগরের পরিচয় খুঁজতে হবে— তাঁর জীবনব্যাপী কর্মসাধনা, তাঁর আলাপ পরিচয় কথাবার্তা এবং তাঁর চিঠিপত্রগুলোর ভেতর থেকে। অবশ্য ‘বিধবা বিবাহ’ ও ‘বহুবিবাহ’ সম্পর্কে যে ‘প্রস্তাব’গুলো তিনি লিখেছিলেন এবং তাঁর অধিকাংশ বেনামী রচনাতে তাঁর সে পরিচয় কিছুটা মিলবে।

বিদ্যাসাগরের চিন্তাধারা যে কতখানি বৈজ্ঞানিক এবং স্বচ্ছ ছিল, তার সামান্য নিদর্শন, ‘বোধোদয়’ নামক শিশুপাঠ্য গ্রন্থের একটি বাক্য— “স্বপ্ন সকল অমূলক চিন্তা মাত্র”। যে-দেশে ‘হিং টিং ছট’ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে পণ্ডিতদের টিকিশুদ্ধ মাথাই ছিঁড়ে পড়বার যোগাড় হয়— সে-দেশে একশত বছর আগে এই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যাসাগর লাভ করলেন কী করে, তাই অবাক হয়ে ভাবি। সৃষ্টিকর্তা বা ঈশ্বর সম্বন্ধে বিদ্যাসাগরের মতামত ছিল আরও বিস্ময়কর। এতে একদিকে যেমন স্বাধীন চিন্তা ও মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে, তেমনি অপরদিকে দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় এবং মর্যাদাবান স্বাতন্ত্র্যবোধেরও প্রমাণ রয়েছে। এ বিষয়ে তিনি ছিলেন অনেকটা অজ্ঞেয়বাদী  (agnostic)।

বিদ্যাসাগর বলেছিলেন—

“এ দুনিয়ার একজন মালিক আছেন তা বেশ বুঝি, তবে ঐ পথে না চলিয়া এ পথে চলিলে নিশ্চয় তাঁহার প্রিয়পাত্র হইব, স্বর্গরাজ্য অধিকার করিব, এ সকল বুঝিও না, আর লোককে তাহা বুঝাইবার চেষ্টাও করি না। লোককে বুঝাইয়া শেষটা কি ফ্যাসাদে পড়িব? এতে তো নিজে শত শত অন্যায় কাজ করিয়া নিজের পাপের বোঝা ভারী করিয়া রাখিতেছি, আবার অন্যকে পথ দেখাইতে গিয়া তাহাকে বিপথে চালাইয়া শেষটা কি পরের জন্য বেত খাইয়া মরিব? নিজের জন্য যাই হোক পরের জন্য বেত খাইতে পারিব না বাপু। এ কার্য আমাকে দিয়া হইবে না। নিজে যেমন বুঝি সেই পথে চলিতে চেষ্টা করি, পীড়াপীড়ি দেখিলে বলিব, এর বেশী বুঝিতে পারি নাই।” (বিদ্যাসাগর চরিত– চণ্ডীচরণ বন্দোপাধ্যায়; উনিশ শতকের বাঙলা সাহিত্য– ত্রিপুরাশঙ্কর সেন)

এটা প্রত্যয়হীন নাস্তিকের উক্তি নয়, সৃষ্টিকর্তার ওপর দৃঢ় আস্থাবান এক নিষ্ঠ মানবাত্মার স্বাধীন সত্ত্বার স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ। যিনি আমাকে প্রজ্ঞা দিয়ে, বিচারবুদ্ধি দিয়ে স্বাধীন মানবরূপে সৃষ্টি করে পাঠিয়েছেন, আমি অন্যের দ্বারা পরিচালিত না হয়ে সেই স্বাধীন বিচার বুদ্ধি অনুসারে কাজ করলে তিনি আমাকে ত্রাণ করবেন না— এ হতেই পারে না। বিদ্যাসাগরের উক্তির ইহাই তাৎপর্য।

মানুষের কর্তব্য কী এর উত্তরে বিদ্যাসাগর বলেছেন—

“আমাদের নিজেদের এরূপ হওয়া উচিত যে, সকলে যদি সেরূপ হয়, তবে পৃথিবী স্বর্গ হয়ে পড়বে। প্রত্যেকের চেষ্টা করা উচিত যাতে সকলের মঙ্গল হয়।”

এইটি ছিল বিদ্যাসাগরের ধর্ম— তথা philosophy of life । তাঁর নীতি ছিল কল্যাণ বুদ্ধি দ্বারা প্রণোদিত হয়ে কাজ করে যাব, যা বুঝব না তার সম্বন্ধে নীরব নিঃসম্পর্কিত থাকব। জীবনের সব কাজেই তিনি তার পরিচয় দিয়েছেন। বলা বাহুল্য কপটতা এবং বিশ্বাস ও আচরণে বিরোধ কখনও বিদ্যাসাগরের নীতি ছিল না; এই হীনতা তাঁর চরিত্রকে স্পর্শ করতে পারেনি।

পুত্র নারাণচন্দ্রকে এক বিধবার সঙ্গে বিবাহিত করে দর্পভরে বিদ্যাসাগর সহোদরকে লিখেছিলেন—

“আমি দেশাচারের নিতান্ত দাস নহি, নিজের বা পর মঙ্গলের নিমিত্ত যাহা উচিত বা আবশ্যক বোধ হইবে তাহা করিব, লোকের বা কুটুম্বের ভয়ে কদাচ সঙ্কুচিত হইব না।”

তাঁরই মতো মুক্ত মনের সতেজ মানুষ বাংলাদেশে গড়ে তোলাই ছিল বিদ্যাসাগরের অন্যতম প্রধান সংকল্প। এই উদ্দেশ্যে প্রাণপাত করে শিক্ষা বিস্তারে তিনি ব্রতী হয়েছিলেন। তিনি অনুভব করেছিলেন সর্বপ্রথম আদর্শ শিক্ষকের প্রয়োজন, যাঁদের চিত্ত হবে সংস্কারবর্জিত, আত্মা হবে উদার এবং যাঁরা হবেন যথার্থ জ্ঞানী। সে রকম অনেক শিষ্য এবং শিক্ষক তিনি তৈরী করে দিয়ে যেতে পেরেছেন— এটি কম আনন্দের কথা নয়। এ বিষয়ে তাঁর পরিকল্পনা তিনি শিক্ষা পরিষদকে লিখে জানিয়েছিলেন—

“জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষা বিস্তার, ইহাই এখন আমাদের প্রয়োজন। আমাদের কতকগুলো বাংলা স্কুল স্থাপন করিতে হইবে, এই সব স্কুলের জন্য প্রয়োজনীয় ও শিক্ষাপ্রদ বিষয়ের কতকগুলি পাঠ্যপুস্তক রচনা করিতে হইবে। শিক্ষকদের দায়িত্বপূর্ণ কর্মভার গ্রহণ করিতে পারে এমন একদল লোক সৃষ্টি করিতে হইবে; তাহা হইলেই আমাদের উদ্দেশ্য সফল হইবে। মাতৃভাষায় সম্পূর্ণ দখল, প্রয়োজনীয় বহুবিধ তথ্যে যথেষ্ট জ্ঞান, দেশের কুসংস্কারের কবল হইতে মুক্তি, — শিক্ষকদের এই গুণগুলো থাকা চাই। এই ধরনের দরকারী লোক গড়িয়া তোলাই আমার উদ্দেশ্য— আমার সংকল্প।”

এর থেকেই বুঝতে পারি শিক্ষা বিস্তারের দ্বারা দেশবাসীর মনের মুক্তিসাধনের উপর বিদ্যাসাগর কতটা জোর দিয়েছিলেন। এর জন্য ইংরেজি শিক্ষাকেই তিনি দেশের জন্য একমাত্র প্রয়োজনীয় এবং পরম বাঞ্ছনীয় মনে করেছেন; বার বার তিনি এই ইংরেজি শিক্ষা তথা ইউরোপীয় জ্ঞান বিজ্ঞান দর্শন সাহিত্য অধ্যয়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তাঁর মনে হয়েছিল— একমাত্র এই পথেই দেশের মুক্তি।

ইউরোপীয় বিদ্যা এবং ইংরেজি সাহিত্যের চিন্তার প্রসার এবং বিচারশীলতা (rationalism) বিদ্যাসাগরকে বড়ই আকর্ষণ করেছিল। পূর্বের উদ্ধৃত উক্তি থেকেই আমরা দেখছি, তিনি সংস্কৃত কলেজেই ছাত্রদের সাংখ্য বেদান্ত প্রভৃতি ভ্রান্ত দর্শন না পডিয়ে, কিংবা পড়ালেও তাদের সম্ভাব্য কুফলের অর্থাৎ কুসংস্কারের প্রতিষেধকরপে ‘যথার্থ’ ইউরোপায় দর্শন পড়াবার প্রস্তাব করেছেন। ‘যথার্থ’ কথাট এখানে সকলকে লক্ষ করতে অনুরোধ করি। ইউরোপীয় দর্শন যুক্তি ও স্বাধীন বিচার দ্বারা সত্যে উপনীত হবার চেষ্টা করেছে। কাজেই বিদ্যাসাগর তাকেই উঁচুতে স্থান দিয়েছেন ও সত্য দর্শন মনে করেছেন এবং ছাত্রদের বুদ্ধিকে সংস্কারমুক্ত ও চিন্তাশীল করে তোলবার জন্য তারই সাহায্য নিয়েছেন। এ বিষয়ে তাঁর এতটুকু গোঁড়ামি ছিল না, কিংবা কোনোরকম সংস্কার দ্বারাই তাঁর অন্তঃকরণ আচ্ছন্ন হয়নি। ‘প্রয়োজনীয় বিষয়’ এবং ‘দরকারী লোক’ কথা দুটিও বিশেষভাবে লক্ষ করবার। বাজে বিষয় এবং অকোজো লোক নিয়ে বিদ্যাসাগর সময় নষ্ট করতে চাননি; কারণ তিনি কাজের লোক।

বিদ্যাসাগর এ সম্বন্ধে শিক্ষা পরিষদকে লেখা (৫ অক্টোবর ১৮৫৬) আরেকটি চিঠিতে বলেছিলেন—

“যদি ইংরেজির সাহায্যে ছাত্রদের মনে বিশুদ্ধ জ্ঞানের সঞ্চার করিতে পারি এবং আমার কার্যে শিক্ষা পরিষদের সাহায্য ও উৎসাহ পাই, তাহা হইলে এ বিষয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, কয়েক বৎসরের মধ্যে এমন একদল যুবক তৈরী করিয়া দিব, যাহারা নিজেদের রচনা ও পড়াইবার গুণে আপনাদের ইংরেজি অথবা দেশীয় যে কোনো কলেজের কতবিদ্য ছাত্রদের অপেক্ষা ভালোরূপে দেশের লোকের মধ্যে জ্ঞান বিস্তার করিতে পারিবে। আমার এই একান্ত অভিলাষ— এই মহৎ উদ্দেশ্য কার্যকরী করিবার জন্য আমাকে যথেষ্ট পরিমাণে— স্বাধীনতা দিতে হইবে।” (ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর— ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়; পৃ. ৪২)

বিদ্যাসাগর দেশে শিক্ষাবিস্তার কার্যে প্রত্যক্ষভাবে আত্মনিয়োগ করেছিলেন, স্বয়ং স্কুল কলেজের প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, এটা অনেকেই জানেন। কিন্তু এক্ষেত্রে একক প্রচেষ্টায় তিনি যে দানবীয় পরিমাণ কর্মকীতি রেখে গেছেন, সেটা হয়তো খুব কম লোকেরই জানা আছে।

১৮৫৫ সালের ১ মে তারিখ থেকে বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষতার সঙ্গে উপরি নতুন আর একটা কাজের ভার নিলেন। তাঁর এই পদের প্রথম নামকরণ হয় Special Inspector of Schools for South Bengal। এবার বিদ্যাসাগরের অভীষ্ট পরিকল্পনা মতো শিক্ষা বিস্তারের কাজে তাঁর সুযোগ মিলে গেল। প্রথমত, উপযুক্ত শিক্ষক নির্বাচন এবং তাঁদের ট্রেনিং দেবার জন্য বিদ্যাসাগর একটি নর্মাল স্কুল প্রতিষ্ঠা করলেন (১৭ জুলাই ১৮৫৫)। তারপর নেমে পড়লেন নিজের মনোনীত চারজন সাব-ইন্সপেক্টরের সহায়তায় বিভিন্ন জেলার পল্লী অঞ্চলে মডেল স্কুল প্রতিষ্ঠার কাজে।

একথা বললে কিছুমাত্র অতিশয়োক্তি হবে না যে মূলত বিদ্যাসাগরেরই চেষ্টায় এবং একমাত্র তাঁরই উৎসাহে, অতি অল্প সময়ের মধ্যেই (৮ মাস; ১৮৫৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে), দক্ষিণ বাংলার চারটি জেলায় কুড়িটি (২০) মডেল স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই জেলা চারটি— নদীয়া, হুগলী, বর্ধমান ও মেদিনীপুর। এ প্রত্যেকটি জেলায় বিদ্যাসাগর ৫টি করে মডেল স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও অনেকগুলো বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। অনেকগুলো বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তিনি সক্রিয়ভাবে সহায়তা করেন এবং বহুস্থলে নিজের তহবিল থেকে অর্থ সাহায্য করেছেন— তার প্রমাণ আছে। কিন্তু শুধু প্রতিষ্ঠা করেই বিদ্যাসাগর তাঁর কর্তব্য শেষ করেন নি, নিজের প্রতিষ্ঠিত অন্তত কোনো কোনো বিদ্যালয় সম্পর্কে বিদ্যাসাগর যে অসাধারণ যত্ন নিতেন তার বিস্ময়কর এক বিবরণ পাওয়া যায়— তৎকালীন ইনস্পেক্টর লজ সাহেবের রিপোর্টে—

“স্কুল গৃহের জন্য তিনি (বিদ্যাসাগর) বেশ উপযোগী স্থানে একখানি সুন্দর বাঙলো প্রস্তুত করিয়া দিয়াছেন। ছয়-সাতজন শিক্ষকের বেতন তিনি নিজেই দেন। ছাত্রদের নিকট মাহিনা লওয়া হয় না। বিনামূল্যে তাহাদের সকল রকম বই দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, পণ্ডিতের নিজের বাড়িতে প্রায় ৩০ জন দরিদ্র ছেলের আহারের ও থাকিবার ব্যবস্থা আছে। দরকার পড়িলে বস্ত্রাদি পর্যন্ত যোগানো হয়। অসুখে তাহাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। সকলের সম্পর্কেই এমন যত্ন লওয়া হয় যেন প্রত্যেকেই পরিবারের একজন।” (বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গ— ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়)

বিস্ময় আরো বাকি আছে। স্ত্রীশিক্ষা বিস্তারের জন্য বিদ্যাসাগরের কর্ম প্রচেষ্টার কথা এখনও উল্লেখ করা হয়নি। উপরিউক্ত মডেল স্কুল ছাড়া, বিদ্যাসাগর তাঁর এলাকার চারিটি জেলায়— শুধু মেয়েদের জন্য ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন— তাও মাত্র সাতমাস কাল সময়ের মধ্যে! (নভেম্বর ১৮৫৭—মে ১৮৫৮)। দামোদর নদী সাঁতরে পার হওয়া থেকে যুবক বাবুর কুলিগিরি করা পর্যন্ত বিদ্যাসাগর-চরিত্রের সর্বত্রই অলৌকিক মনে হয়, এ কর্মশক্তিও তেমনি অলৌকিক। একমাত্র আলাদীনের প্রদীপের দৈত্যের কর্ম-তৎপরতার সঙ্গেই তার তুলনা হয়।

এছাড়া সংস্কৃত কলেজের সংস্কার এবং মেট্রোপলিটান কলেজ (অধুনা বিদ্যাসাগর কলেজ) ও বিদ্যালয়, অ্যানুয়িটি ফান্ড (এক প্রকারের বীমা কোম্পানি) প্রতিষ্ঠার কথা তো প্রায় সবাই জানেন। উপরিউক্ত তালিকার সঙ্গে বিদ্যাসাগরের এই কীর্তিগুলো যোগ করলে বিদ্যাসাগরের কর্মশক্তি যে দানবীয় কিংবা অতি-মানবীয় ছিল, তা-ছাড়া আর কিছু মনে হয় না। দেশের শিক্ষা বিস্তারের জন্য কোথাও অন্য কোনো মহাপুরুষ এত কাজ করেছেন কিনা আমরা জানি না।

আমি তো ভেবে পাইনে, এত কাজ করে, বিদ্যাসাগর কখন বাংলা সাহিত্য সৃষ্টির জন্য এত সময় দিতে পারলেন! এ বিষয়ে অণুমাত্র সংশয় নেই যে বাংলা গদ্য-শৈলী বিদ্যাসাগরই উদ্ভাবন করেন, তিনিই আধুনিক গদ্য-সাহিত্যের জনক। স্বয়ং বই লিখেছিলেন তিনি প্রায় ৩২ খানি, সম্পাদনা করেছিলে আরও ১২ খানি। সাহিত্যক্ষেত্রে তাঁর কৃতিত্বের কথা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের মুখ থেকেই শোনা যাক—

“তাঁহর প্রধান কীর্তি বঙ্গভাষা। যদি এই ভাষা সাহিত্য সম্পদে ঐশ্বর্যশালিনী হইয়া উঠে, যদি এই ভাষা অক্ষয় ভাবজননীরূপে মানবসভ্যতার ধাত্রীগণের ও মাতৃগণের মধ্যে গণ্য হয়, … … তবেই তাঁহার এই কীর্তি তাহার উপযুক্ত গৌরব লাভ করিতে পারিবে।

“বিদ্যাসাগর বাংলাভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী ছিলেন। তৎপূর্বে বাংলায় গদ্য সাহিত্যের সূচনা হইয়াছিল, কিন্তু তিনিই সর্বপ্রথম বাংলা গদ্যে কলা নৈপুণ্যের অবতারণা করেন। ভাষা যে কেবল ভাবের একটা আধারমাত্র নহে, তাহার মধ্যে যেন তেন প্রকারেণ কতকগুলা বক্তব্য বিষয় পুরিয়া দিলেই যে কর্তব্যসমাপন হয় না, বিদ্যাসাগর দৃষ্টান্ত দ্বারা তাহাই সপ্রমাণ করিয়াছিলেন। … … তৎপূর্বে বাংলা পদ্যের যে অবস্থা ছিল তাহা আলোচনা করিয়া দেখিলে এই ভাষা গঠনে বিদ্যাসাগরের শিল্প প্রতিভা ও সৃষ্টিক্ষমতার প্রচুর পরিচয় পাওয়া যায়।” (চারিত্র্যপূজা)

এমনকি যে বঙ্কিমচন্দ্র আজীবন বিদ্যাসাগরের বিরুদ্ধবাদী ছিলেন— তিনিও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন—

“বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ভাষা অতি সুমধুর ও মনোহর। তাঁহার পূর্বে কেহই এরূপ সুমধুর বাঙলা গদ্য লিখিতে পারেন নাই। এবং তাঁহার পরেও কেহই পারে নাই।” (বাঙলা সাহিত্যে প্যারীচাঁদ মিত্রের স্থান)

কিন্তু এই বিদ্যাসাগরকেই বঙ্কিমচন্দ্র হেয় প্রতিপন্ন করবার কতই না চেষ্টা করেছেন। বড়ই পরিতাপের বিষয়, সাহিত্য-সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র, যিনি হিন্দু সমাজের জাগরণের পুরোধা এবং মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি বলে সম্মানিত তিনিই বিদ্যাসাগরের ন্যায় মহাপ্রাণকে অশোভনভাবে আক্রমণ করতে ছাড়েননি। বিষবৃক্ষে বঙ্কিমচন্দ্রের সূর্যমুখী এক চিঠিতে লিখছেন—

“আর একটা হাসির কথা। ঈশ্বর বিদ্যাসাগর নামে কলিকাতায় কে নাকি বড় পণ্ডিত আছেন, তিনি আবার একখানি বিধবা বিবাহের বহি বাহির করিয়াছেন। যে বিধবা বিবাহের ব্যবস্থা দেয়, সে যদি পণ্ডিত, তবে মূর্খ কে? এখন বৈঠকখানায় ভট্টাচার্য ব্রাহ্মণ আসিলে সেই গ্রন্থ লইয়া বড় তর্ক-বিতর্ক হয়। সেদিন ন্যায় কচকচি ঠাকুর, মা সরস্বতীর সাক্ষাৎ বরপুত্র— বিধবা বিবাহের পক্ষে তর্ক করিয়া বাবুর নিকট হইতে টোল মেরামতের জন্য দশটি টাকা লইয়া যায়।”

বিস্মিত হয়ে ভাবি, বাংলাদেশের প্রথম গ্রাজুয়েট ইংরেজি শিক্ষিত ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমচন্দ্র হলেন গোঁড়া প্রাচীনপন্থী আর সংস্কৃত কলেজে শিক্ষিত, তথাকথিত টুলো পণ্ডিত, দরিদ্রসন্তান ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর হলেন আপোষহীন সংস্কারপন্থী এবং অক্লান্ত বিপ্লবী কর্মী। এটা কেমন করে সম্ভব হলো? এ কি নিয়তির পরিহাস না ইতিহাসের রসিকতা!

বিদ্যাসাগরকে তখন কেন, এখনও দেশের লোক বুঝতে পারেনি। রবীন্দ্রনাথ দুঃখ করে বলেছেন—

“আমাদের কেবল আক্ষেপ এই যে, বিদ্যাসাগরের বসওয়েল কেহ ছিল না। তাঁহার মনের সবলতা, গভীরতা ও সহৃদয়তা তাঁহার বাক্যালাপের মধ্যে প্রতিদিন অজস্র বিকীর্ণ হইয়া গেছে, অদ্য সে আর উদ্ধার করিবার উপায় নাই। বসওয়েল না থাকিলে জনসনের মনুষ্যত্ব লোক-সমাজে স্থায়ী আদর্শ দান করিতে পারিত না। … …

বিদ্যাসাগরের জীবন বৃত্তান্ত আলোচনা করিয়া দেখিলে এই কথাটি বাবংবর মনে উদয় হয়, তিনি যে বাঙালি বড়োলোক ছিলেন তাহা নহে, তিনি যে রীতিমতো হিন্দু ছিলেন তাহাও নহে— তিনি তাহা অপেক্ষাও অনেক বড়ো ছিলেন, তিনি যথার্থ মানুষ ছিলেন।” (চারিত্র্যপূজা)

বিদ্যাসাগরের চরিত্রের আর একটি বড় দিক, নারী জাতির প্রতি সহানুভূতি। বিদ্যাসাগরকে দয়ার সাগর বলে সবাই জানেন— কলেরা রোগীকে যিনি পথ থেকে কাঁধে তুলে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন— ইনিই তিনি। কিন্তু আমি তাঁর কথা বলছি না। দয়া নয়, অনুগ্রহ নয়, — নারীজাতির প্রতি ছিল বিদ্যাসাগরের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা। তাদের তিনি পরিপূর্ণ মর্যাদাবান এবং পুরুষের সমানই মানুষ বলে মনে করতেন। যে দেশে নারীর আত্মা আছে কিনা— এ নিয়ে প্রবল বিতর্ক ছিল, সে দেশে এটা একটু অস্বাভাবিক বই কি।

এ দেশের লোক মেয়েদের যে চোখে দেখে, ঘরে ঘরে তারা যে ভাবে নির্যাতিত হয়— তা দেখে বিদ্যাসাগরের চিত্তে ক্ষোভের অবধি ছিল না। ‘প্রভাবতী সম্ভাষণে’ পরলোকগতা শিশু প্রভাবতীকে সম্বোধন করে বিদ্যাসাগর লিখেছেন—

“তুমি স্বল্পকালে নরলোক হইতে অপসৃত হইয়া আমার বিবেচনায় অতি সুবোধের কার্য করিয়াছ। অধিককাল থাকিলে কি আর অধিক সুখভোগ করিতে। … তুমি দীর্ঘজীবিনী হইলে কখনই সুখে ও স্বচ্ছন্দে জীবনযাত্রার সমাধান করিতে পারিতে না।”

বিদ্যাসাগর খেদ করে বলেছেন, এই হৃদয়হীন দেশে যেখানে নারীর কোনো মর্যাদা নেই, সেখানে মেয়েদের জন্মগ্রহণ করাই বিড়ম্বনা:

“হায়, কি পরিতাপের বিষয়! যে দেশে পুরুষ জাতির দয়া নাই, ধর্ম নাই, ন্যায় অন্যায় বিচার নাই, হিতাহিত বোধ নাই, সদ্বিবেচনা নাই, কেবল লৌকিক রক্ষাই প্রধান কর্ম ও পরম ধর্ম আর যেন সে দেশে হতভাগ্য অবলাজাতি জন্মগ্রহণ না করে— হায় অবলাগণ! তোমরা কি পাপে ভারতবর্ষে আসিয়া জন্মগ্রহণ কর, বলিতে পারি না।”

এই উক্তিতে একদিকে যেমন ফুটে উঠেছে বিদ্যাসাগরের দয়ার্দ্র হৃদয়ের সহানুভূতি, তেমনি অন্যদিকে পৌরুষোচিত মহত্ত্ব। শুধু দয়া করে নয়, বিদ্যাসাগরের মর্যাদাবান পৌরুষে আঘাত লেগেছিল বলেই বিদ্যাসাগর বিধবাদের দুঃখমোচনে ব্রতী হয়েছিলেন।

তখনকার দিনে একজন লোক বিদ্যাসাগরের চরিত্র মাহাত্ম্য কিছুটা বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি মাইকেল মধুসূদন দত্ত—

“The man … has the genius and wisdom of ancient Sage, the energy of an Englishman and the heart of a Bengali mother.”

এই মহাপ্রাণ, উন্নতমনা আদর্শ কর্মী বিদ্যাসাগরকে আজ আমরা আমাদের হৃদয়ের অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা নিবেদন করে আবার কবিগুরুর ভাষাতেই বলি—

“আজ আমরা বিদ্যাসাগরকে কেবল বিদ্যা ও দয়ার আধার বলিয়া জানি। এই বৃহৎ পৃথিবীর সংশ্রবে আসিয়া যতই আমরা মানুষ হইয়া উঠিব, যতোই আমরা পুরুষের মতো দুর্গম বিস্তীর্ণ কর্মক্ষেত্রে অগ্রসর হইতে থাকিব, বিচিত্র শৌর্য বীর্য মহত্ত্বের সহিত যতই আমাদের প্রত্যক্ষ সন্নিহিতভাবে পরিচয় হইবে, ততই আমরা নিজের অন্তরের মধ্যে অনুভব করিতে থাকিব যে, দয়া নহে, বিদ্যা নহে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রধান গৌরব তাঁহার অজেয় পৌরুষ, তাহার আক্ষয় মনুষ্যত্ব; এবং যতই তাহা অনুভব করিব, ততই আমাদের শিক্ষা সম্পূর্ণ ও বিধাতার উদ্দেশ্য সফল হইবে এবং  বিদ্যাসাগরের চরিত্র বাঙালির জাতীয় জীবনে চিরদিনের জন্য প্রতিষ্ঠিত হইয়া থাকিবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published.