মানুষের ওপর চাপ বাড়ছে, জনস্বার্থের রাজনীতি কোথায়?

রুহিন হোসেন প্রিন্স

উন্নয়নের ঘোড়া দৌড়ানোর খবর থেমে নেই। বড় বড় প্রকল্প অব্যাহত রাখা, সময় ও ব্যয় বাড়ানো এবং নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণের খবরে ‘উন্নয়নের দৌড়’র খবর শুনতে হচ্ছে অহরহ। অথচ প্রতিদিনই রাস্তা-ঘাটে চলার পথে সাধারণ মানুষের কণ্ঠে শুনতে হয় ভিন্ন ধরনের কথা।

বিশ্বে নাকি বাংলাদেশের উন্নয়নের গুণগানে ব্যস্ত সবাই। অথচ বিশ্ব পাসপোর্ট ইনডেক্সেও আমাদের অবস্থান নিম্নমুখী। ২০২১ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১১৬টি দেশের মধ্যে আমাদের অবস্থান ১০৮ নম্বরে।

করোনার ওমিক্রন ধরনে বিশ্বব্যাপী আক্রান্তের ঝুঁকিতে বাংলাদেশেও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে নানা ধরনের ঝুঁকিও। গত দুই বছরের করোনাসহ নানা ঝুঁকি কাটিয়ে মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে বলে ভেবেছিল। সেটির রেখা এখন আর দেখা মিলছে না।

আমাদের দেশের মানুষ বন্যা, খরা, ঝড়, নানা ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলা করে টিকে থেকে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার কাজ করে চলেছে। এসব সংকটে মানুষ বসে থাকে না। অথচ সব মানুষকে ক্ষমতাসীনরা, চলতি ধারার রাজনীতি স্বস্তি দিতে পারছে না। বরং হতাশ ও ক্ষুব্ধ করে তুলছে।

এইতো চলার পথে একটি গ্রাম, শহরে পরিচিত, অপরিচিতজনদের কাছে জানতে চাইলাম, কেমন আছেন? উত্তর এলো, ‘স্বস্তিতে নেই’। কেন? উত্তর এলো, ‘চাদাবাজী, লুটপাট, মাদক, হয়রানি, দখলদারিত্ব সর্বত্র। কৃষিজমি উজাড় হচ্ছে। নানামাত্রায় সাম্প্রদায়িক অপশক্তির দাপট বাড়ছে।’

ক্ষমতাসীনদের বড় থেকে শুরু করে চেলা-চামুণ্ডাদের দাপট বেড়েই চলেছে। একাংশ মানুষের অর্থলিপ্সার শেষ নেই। অসুস্থ হলে ওষুধ আর চিকিৎসায় টাকা শেষ, কম দামে জমি বিক্রি করতে হয়। দুর্যোগে কষ্টে ফলানো ফসলের ক্ষতি হলে ক্ষতিপূরণ নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেড়েই চলছে, দেখার কেউ নেই। গরিবের জন্য রেশন নেই, নেই ন্যায্যমূল্যের দোকান। স্থানীয়ভাবে বৈষম্য চরমে। হচ্ছে চোখের সামনে অন্যায় অনৈতিকভাবে। আইনের শাসন, সুশাসন নেই। ক্ষমতা আর টাকার গরমে সাধারণ মানুষ, ভালো মানুষের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। লেখাপড়া নেই। নীতি-নৈতিকতা কমে যাচ্ছে। মানুষ চার পাঁচ বছর পর পর যে ভোটের অপেক্ষায় থাকতো, শান্তিমত সেই ভোট নেই। উন্নয়নের বরাদ্দের নামে লুটপাট সর্বত্র। ‘ভয়’ গ্রাস করছে সর্বত্র। শহর উপজেলা গড়ে উঠছে অপরিকল্পিতভাবে। নতুন নতুন ট্যাক্স খাজনা ধরা হচ্ছে এবং বাড়ছে, অথচ নাগরিক সুবিধা নেই- সবই যেন চাঁদাবাজি। মানুষ এসবের পরিবর্তন চায়, তবে কথা বলতে চায় না। এক অজানা ভয়ের মধ্যে থাকে। কথা যে বলবে, সংগঠিত হবেÑএর জন্য ভরসা করার রাজনৈতিক শক্তি পাচ্ছে না।”

এটাতো সামগ্রিক চিত্রের খণ্ডাংশ মাত্র। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিতদের ওপর শাসনভার দেওয়ার কথা থাকলেও জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের হাল সবাই প্রত্যক্ষ করছে। এখন নিবার্চন যেন নির্বাসিত। চলছে অন্ততঃ একটা ‘ভাল, ভোট দেওয়ার অধিকারের নির্বাচনের জন্য নানা কথা’।

এই অবস্থার মধ্যে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে নাটকীয়তা চলছে। বটিকা গেলানোর চেষ্টা হলো, ‘সংলাপে সব হবে।’ থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়ায় এর জন্য আইন করার কথা প্রচার করা হচ্ছে। অথচ রাজনৈতিক দলসমূহকে এবং এসব বিষয়ে চিন্তাশীল মানুষের অংশগ্রহণ করানো হলো না এই আইন প্রণয়নে। দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতা হলো দলীয় সরকারের অধীনে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয় না। তাই একটা ভাল নির্বাচন কমিশন হলেও যে সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে না, যদি নির্বাচনকালীন দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকে, এটা প্রমাণিত। তাই নির্বাচনকালীন সরকারের দায়িত্ব-কর্তব্য সুনির্দিষ্ট করার দাবি দীর্ঘ দিনের। অথচ এটি এখনও আমলে নেওয়া হচ্ছে না। আমলে নেওয়া হচ্ছে না, নির্বাচনে নানা মতের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা, ভোটে দাঁড়ানো ও ভোট দেওয়ার সমঅধিকার নিশ্চিত করতে নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার কাজের। সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনসহ নির্বাচনকে টাকার খেলা, পেশীশক্তি, সাম্প্রদায়িক-আঞ্চলিক প্রচার-প্রচারণা ও প্রশাসনিক কারসাজি থেকে মুক্ত করতে সিপিবি ও বামপন্থিরা দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করলেও এসব কথা থেকে যাচ্ছে এজেন্ডার বাইরে। নির্বাচন কমিশন নিয়োগ আইন তৈরি নামে নতুন বটিকা তৈরি করে ক্ষমতার আসন পাকাপোক্ত করতে নানা ‘দূরভিসন্ধি’ গেলানোর প্রচার-প্রপাগান্ডা এখন তুঙ্গে। আর এক ইস্যুকে ধামাচাপা দিতে অন্য ইস্যু সামনে আনার কাজতো চলছেই।

সব মিলিয়ে মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার মত কোনো খবর চোখে পড়ে না। বরং অন্যায়, অযৌক্তিক, বেআইনিভাবে জনগণের পকেট কাটার নতুন নতুন ফন্দির খবর আসছে। সিলিন্ডার গ্যাসের দামের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে। যুক্তি, তর্ক, দেশের মানুষের বাস্তবতা বিবেচনা না করে বেশি দাম নির্ধারণ ও আরো বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। এক্ষেত্রেও একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবসায়ীদের। যে যুক্তিতে ডিজেল কোরেসিনের দাম বাড়ানো হলো, সেই যুক্তি কেউ সঠিক মনে করলো না। তারপরও দাম বাড়ানো হলো। এর ফলে সর্বত্র মূল্য বৃদ্ধি, পরিবহনসহ ভাড়া বৃদ্ধিসহ নৈরাজ্য চলছে সর্বত্র। ভোজ্য তেলসহ নিত্যপণ্যের বাজার সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের দখলে। দাম নির্ধারণ    হয় ওদের ইচ্ছেমতো। সব রেকর্ড ছাড়িয়ে এখন বাসাবাড়ির গ্যাসের দাম ১১৭ শতাংশ বৃদ্ধির পাঁয়তারা হচ্ছে। এটা হলে সিলিন্ডার গ্যাসের দাম আরো বাড়ানোর পথ পরিষ্কার হবে। অথচ কয়েকদিন আগে সরকারের প্রতিমন্ত্রী তিতাসের দুর্নীতি নিয়ে কথা বললেন। এর বিরুদ্ধে কোনো ভূমিকা নেই। তার পরও তথ্য বলছে কোম্পানিগুলো লাভে আছে। বড় বড় প্রজেক্টের খরচ মেটাতে জনগণের পকেট কাটার এ আরেক চেষ্টা চলছে।

সাধারণ মানুষের অবস্থা নতুন করে বলার দরকার হয় না। তবুও একটু তথ্য দেখি। বাংলাদেশ ব্যাংকই বলছে, করোনার দেড় বছরে দেশে কোটিপতি হয়েছেন ১৭ হাজারেরও বেশি মানুষ। আর এই করোনাকালে দেশে ৩ কোটি ২৪ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন। ‘ওয়াল্ড ইনইক্যুয়ালিটি রির্পোট-২০২২’-এ দেখানো হয়েছে দেশের মোট জাতীয় আয়ের ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ মাত্র ১ শতাংশ ধনী মানুষের হাতে আছে। অপরদিকে নিম্নবিত্ত ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে আছে মোট আয়ের ১৭ দশমিক ১ শতাংশ। দেশের দারিদ্র্য ও অসাম্যের এর থেকে আর কি খারাপ চেহারা হতে পারে? এটি সম্পূর্ণ মুক্তিযুদ্ধের ধারার বিপরীতমুখী অবস্থান। এই ভাবেই তো চলছে। প্রচলিত অর্থনীতির ধারা এই অবস্থা তৈরি করেছে।

শুধু দেশে, নয় পুজিবাদী নব্য উদারনীতি অর্থনীতিতে সারা বিশ্বেও করোনার সময় বৈষম্য বেড়েছে। করোনা মহামারির সুযোগে ধনী আরো ধনী হয়েছে। বিশ্বের প্রথম ১০জন ধনীর সম্পদ বেড়েছে ব্যাপক ভাবে। এই ১০ জন ধনীর সম্পদের পরিমাণ ৭০০ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে দেড় ট্রিলিয়ন ডলার হয়েছে। দৈনিক বেড়েছে ১১৩ কোটি ডলার। অন্যদিকে প্রতিদিন প্রায় ১৬ কোটি মানুষ দরিদ্রের তালিকায় পড়েছেন। এসব সংকটের মধ্যে বিভিন্ন দেশে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। যা সারা বিশ্বকে সংকটে ফেলছে। ধনী দেশগুলো এসব সংকটে সমারিক তৎপরতাসহ নানা অধিপত্যবাদী তৎপরতা বৃদ্ধি করছে, করবে যা অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, করবে। এই অবস্থায় দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে জনগণের ঐক্য গড়ে তুলে অগ্রসর হওয়াই দেশপ্রেমিকের দায়িত্ব। কে করবে এই কাজ?

এই সামগ্রিক সংকটে দেশের মানুষের স্বার্থে দেশকে অগ্রসর করে নিতে ‘ব্যবস্থা বদলের’ বিকল্প নেই। এই লক্ষে সংগ্রামের নানা ধারাবাহিকতায় এগুতে না পারলে সাধারণ মানুষের সংকট বাড়বে। ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতা আরো কুক্ষিগত করতে জেল, জুলুম, নির্যাতন, স্বৈরাচারী, ফ্যাসিবাদী প্রবণতা বাড়াবে। বড় সংকটে পড়লে ক্ষমতার ভাগ বাটোয়ারা দিয়ে পরিস্থিতি সামলাতে চাইবে। এতে সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষিত হবে না। তাই জনস্বার্থের সংগ্রাম জোরদার করতে হবে সাধারণ মানুষকে সচেতন ও সংগঠিত করে। এর মধ্য দিয়ে অর্জিত সাফল্যে জনস্বার্থের প্রতিফলন দেখা যাবে। এটি না হলে দেশি বিদেশি একই স্বার্থরক্ষাকারী গোষ্ঠীর চাপে নেওয়া পদক্ষেপে কিছু চমক থাকতে পারে। তবে এটা শাসক গোষ্ঠীর নিজেদের স্বার্থরক্ষার ভাগ বটোয়ারার কার্যক্রম ছাড়া বেশি কিছু আশা করার থাকবে না।

সম্প্রতি কতক দেশের চাপে গণতন্ত্র, ‘নির্বাচন’, ‘মানবাধিকার’, প্রশ্নে সরকার লোক দেখানো কিছু পদক্ষেপ নেওয়া চেষ্টা করে নিজেদের যতই ‘নির্বাচিত’ ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষাকারী হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করুক না কেন, সেখানে সাধারণ মানুষের স্বার্থের প্রতিফলন নেই। ভোটের বিবেচনায় বিরোধী দলগুলোর কার্যক্রমে মানুষের স্বার্থের প্রতিফলন নেই।

তাই নানা ডামাডোলেও গণতন্ত্রহীনতা, লুটপাটতন্ত্র, সাম্প্রদায়িকতা, সাম্প্রজ্যবাদ-আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে নীতিনিষ্ঠ অবস্থান বজায় রেখে সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হবে। এসব সংগ্রামে মানুষকে যুক্ত করতে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষকে যার যার শ্রেনিস্বার্থে ঐক্যবদ্ধ করার কাজটি ধৈর্য্যরে সাথে করতে হবে। এসব কাজ সচেতন, সংগঠিত ও নীতিনিষ্ঠ অবস্থানের মধ্য দিয়ে অগ্রসর করার মাধ্যমে নিজেদের জনগণের আস্থাভাজন শক্তি হয়ে উঠতে হবে। চলতি ধারার রাজনীতির বিপরীতে এই আস্থাভাজন বিকল্প শক্তিই পারবে ‘ব্যবস্থা বদলের’ সংগ্রাম অগসর করে দেশকে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় সমাজতন্ত্রের পথে এগিয়ে নিতে। আমাদের যতটুকু শক্তি আছে ততটুকু শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত করে, এই দায়িত্ব আমাদেরই পালন করতে হবে। নিষ্ঠাবান অপরাপর শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজকেও অগ্রসর করতে হবে।

লেখক: সম্পাদক, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.