মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে লিবিডোতত্ত্ব ও মার্কসবাদ

লুৎফর রহমান   

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিকদের একজন। তাঁর লেখা উপন্যাসের সংখ্যা ৩৯ টি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাস্তববাদী লেখক। তাঁর লেখায় ফ্রয়েডের লিবিডো তত্ত্ব ও মার্কসবাদের প্রভাব লক্ষ্য করার মতো বিষয়। লিবিডো তত্ত্ব হচ্ছে যৌনতার ক্রমবিবর্তন সম্পর্কিত সিগমুন্ড ফ্রয়েডের এক তত্ত্ব। এই তত্ত্বের মূল কথাটি হচ্ছে সর্বরতিবাদ। এই তত্ত্বানুসারে শৈশবের সব ইচ্ছে ও আচরণই যৌনতাভিত্তিক। ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রবৃত্তিমূলক মনস্তত্ত্ব। এ তত্ত্ব মানব শরীরের অভ্যন্তরীণ ক্রিয়াকলাপের সাথে মানবমনের বিশ্লেষণ সম্পর্কিত। ফ্রয়েড ধারণা করতেন এ তত্ত্ব দিয়ে সমাজ ও মানুষের জীবনের সবকিছু ব্যাখ্যা করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে এ তত্ত্ব মানবমনের মুক্তিকামী ইচ্ছাকে সার্থকতায় পৌঁছে দিতে সক্ষম নয়। তা বিবেচনায় সে সময় বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের এ তত্ত্ব খুব পছন্দ হয় এবং দেশে দেশে প্রচারের ব্যবস্থা করে, এমন কি ভারতবর্ষেও।

বাংলা সাহিত্যের নতুন ধারার ঔপন্যাসিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সাহিত্য সাধনার শুরুর সময়ে এই তত্ত্বের দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত হন। কিন্তু তিনি বেশি সময় এখানে আটকে থাকেননি। তিনি মার্কসীয় তত্ত্বকে ঊর্ধ্বে স্থান দিয়ে ফেলেন। কারণ মানব মনের ভেতরের স্তর ও বাইরের স্তরের মাঝে বিরোধকে ফ্রয়েড বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় উপস্থাপন করলেও মানুষের ভেতরের মনকে পরিবর্তন করতে হলে যে দুনিয়াটাকেই পরিবর্তন করতে হবে এই সত্য তাঁর তত্ত্বে নেই। সমসাময়িক সমাজের বিরুদ্ধে প্রবৃত্তির বিদ্রোহই ফ্রয়েডের কাছে সবকিছু। তাই মনস্তত্ত্ব, শিল্পকলা, ধর্ম, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও ইতিহাস সবই তিনি এই ছাঁচে ঢেলে বিচার করেন।

কিন্তু মার্কসের মতে, জীবন্ত আবেগের জন্ম হয় যুগ যুগান্তরের ক্রিয়া থেকে। সব শিল্পকলা, শিক্ষা, দৈনন্দিন সামাজিকতা এই আবেগকে মানুষের জৈব সত্তার অভ্যন্তর থেকে বের করে আনে, এর লক্ষকোটি প্রকাশকে পরিচালিত করে, আকৃতি দেয়। ব্যক্তির ভেতরকার এই শক্তিকে সামগ্রিক সমাজ পরিচালিত করে। কোনো একজন ব্যক্তি, বিশেষজ্ঞ, রসায়নবিদ অথবা কোনো দৈবশক্তি এ কাজ করতে পারে না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এই বক্তব্যকে মেনেছিলেন বলেই নিজেকে ১৯৪৪ সালে মার্কসবাদী হিসেবে ঘোষণা দিতে পেরেছিলেন।

আমরা যদি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দর্পন’ উপন্যাসটি নিয়ে আলোচনা করি দেখতে পাবো এতে ফ্রয়েডীয় ভাবধারার উপস্থিতি রয়েছে। মানিকের লেখা যখন ফ্রয়েডীয় ভাবধারা থেকে মার্কসবাদের দিকে যাচ্ছে ‘দর্পন’ সে সময়ের উপন্যাস। এই উপন্যাসে ফুটে ওঠেছে কলকাতা মহানগরীর উচ্চবিত্তের পাশাপাশি বস্তির মানুষের অবরুদ্ধ ভেতরকার মনের ও বাইরের মনের সম্পর্কের গতিধারা। এছাড়া শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে গ্রামের চাষি ও অন্যান্য নিম্ন শ্রেণির মানুষের তখনকার ব্যর্থ অভ্যুত্থান। এ যেনো ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব ও মার্কসবাদের পাশাপাশি গমন। তবে ‘দর্পন’ বুঝিয়ে দেয় যে এখানে মানিক মানুষের অদম্য মুক্তিসংগ্রামে মার্কসীয় দর্শনকেই বেছে নিয়েছেন আর ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব পেছনে পড়ে গিয়েছে। তবে ফ্রয়েডীয় ভাবধারা পরিত্যাক্ত হয়নি। এতে উপন্যাসটি সার্থকতা পেয়েছে সামগ্রিক দিক থেকে। দর্পনের রম্ভা যেমন যৌন আবেদনময়ী তেমনি চিন্তাশীলা একজন সাধারণ মেয়ে। তার যৌবনদীপ্ত দেহটি পুরষকে টানে আবার সেটি যেনো বিপ্লবী অভ্যুদয়ের জন্যই প্রস্তুত। এ দেহের মনটি বিশ্লেষণধর্মী ও তাত্ত্বিক। এখানে দুই দর্শনের মিলন উপন্যাসটিকে সমৃদ্ধ করেছে।

এবার যদি ‘দর্পন’, ‘সহরতলী’ ও ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করা যায় দেখা যাবে, ‘দর্পন’-এ ফ্রয়েডীয় মনোবিজ্ঞানের উপাদান ও মার্কসীয় উপাদানের দ্বন্দ্বাত্মক প্রক্রিয়ায় জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম সহায়তা পেয়েছে। এই উপন্যাসটি মানিকের ‘সহরতলী’ ও ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাস থেকে অগ্রসর। এখানে লাঞ্চিত মানুষজন জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের বৃহৎ ধারায় নিজেদের স্থাপন করতে পেরেছে। ‘সহরতলী’ উপন্যাসটির সংগ্রাম অর্থনৈতিক বিধায় আংশিক এবং ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসে কোনো রাজনৈতিক পটভূমি নেই বলে এর সংগ্রাম প্রাকৃতিক। আর জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের গভীরে যে শ্রেণিসংগ্রামের বিষয়টি কাজ করে এসেছে তা দর্পনে প্রচুর বিদ্যমান। এখানে মানিক ধর্মের বিষয়টিকে সমস্যা হিসেবে আনেননি, ফুটে ওঠেছে ধর্মনিরপেক্ষতা। নায়ক হিরেণের স্ত্রী উপন্যাসে আরিফকে গ্রহণ করে। এটা ব্যর্থ প্রেমের দিক থেকে হিরেণের সমস্যা, ধর্মের দিক থেকে নয়। ধর্মরিপেক্ষতার বিষয়টি পদ্মানদীর মাঝিতেও বিধৃত হয়েছে, “রাজবাড়ির আজিজ ছাহাব কন, …মুসলমানে মসজিদ দিলি হিঁদু দিব ঠাহুর ঘর- না মিয়া আমার দ্বীপির মধ্যি ও কাম চলবো না। ” সাম্প্রদায়িকতা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা বিবেচিত হয়েছিলো। এখানে মার্কসবাদের মানবিক দর্শনের প্রাধান্য পরিলক্ষীত হয়েছে।

‘ইতিকথার পরের কথা’ উপন্যাসে শ্রেণিসংগ্রামের প্রশ্নটি জোরালোভাবে এসেছে। এখানে নরনারীর লুকোনো মনের চাওয়া শুধু যে গুরুত্ব পেয়েছে তা নয়, উপন্যাসের সৌন্দর্যকে শিল্পরূপকে সমৃদ্ধ করেছে। এই উপন্যাসের ‘শুভ’ চরিত্রটি যদি আমরা উল্লেখ করি দেখবো, বিলাত ফেরত শুভ দেশের মৌল কাঠামো বদলাতে চায়। সে শিল্পায়ন চায় যার প্রচণ্ড বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদ। আসলে জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির উপায় এটি। সে শহরের মোহ কাটিয়ে গ্রাম এলাকায় কারখানা স্থাপন করেছে এবং কৃষক ও শ্রমিকের ঐক্য স্থাপনের আয়োজন করেছে। এই উপন্যাসটি দর্পনের সময় থেকে এগিয়ে আছে। তবে এ দুটিতে একটি মিলের দিকও আছে। সেটি যৌনতা ও উচ্চতর আদর্শের দিক থেকে। দর্পনে হিরেণ যেমন চাষী মেয়ে রম্ভার প্রতি আকৃষ্ট বৈপ্লবিক মানসিকতার কারণে শুভও তেমনি আকৃষ্ট চাষী কন্যা লক্ষ্মীর বৈপ্লবিকতায়। উচ্চবিত্তের মেয়েরা এখানে চাষী মেয়েদের কাছে ম্লান হয়ে গেছে। তাই বলে উপন্যাসের শিল্পরূপের কোনো খামতি হয়নি। আমরা দেখতে পেয়েছি ফ্রয়েডবাদ ও মার্কসবাদের অপূর্ব সমন্বয়।

‘পদ্মানদীর মাঝি’, ‘সহরতলী’, ‘দর্পন’ ও ‘ইতিকথার পরের কথা’ উপন্যাসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যে নীরিক্ষা চালিয়েছিলেন তার পরিণতি এসেছিলো ‘চিন্তামনি’, ‘আরোগ্য’ও ‘প্রতিবিম্বে’। ওগুলোতে তাঁর বিপ্লবাত্মক কাজ ফুটে ওঠেছিলো শিল্পীতভাবে। এগুলোয় বহির্বাস্তব ও মনস্তাত্ত্বিক উপাদান প্রয়োগে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সময়ের দাবি পূরণ করেছিলেন। তিনি বাংলা উপন্যাসে শিল্প সাধনার প্রথমদিকে ফ্রয়েডীয় তত্ত্বকে সরাসরি প্রয়োগ করেছিলেন এবং মধ্য ও শেষ জীবনে মিলিয়েছিলেন মার্কসীয় ধ্যান ধারণার সাথে। তিনি বাংলা সাহিত্যের আকাশে একজন সার্থক তারকা শিল্পী।

Leave a Reply

Your email address will not be published.