মানবিক সমাজ বিনির্মাণে শাণিত করতে হবে লেখনি

শামসুজ্জামান হীরা

‘যা কিছু আমাদের নিশ্চেষ্টতা, নিষ্ক্রিয়তা, যুক্তিহীনতার দিকে টানে, তাকে আমরা প্রতিক্রিয়াশীল বলে প্রত্যাখ্যান করি। যা কিছু আমাদের বিচারবুদ্ধিকে উদ্বুদ্ধ করে, যা যুক্তির আলোকে প্রতিষ্ঠান ও প্রথাকে পরীক্ষা করে, যা আমাদের কাজ করতে, নিজেদের সংগঠিত করতে, রূপান্তর করতে সহায়তা করে, তাকে আমরা প্রগতিশীল বলে গ্রহণ করি।’

শুরুতে আমি যে কথাগুলো উদ্ধৃত করেছি তা নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘের প্রতিষ্ঠাকালীন ইশতেহারের অংশবিশেষ।

উনিশশো তিরিশের দশকের শুরু থেকেই রুশ বিপ্লবের প্রভাবে বাংলায় কাজী নজরুল ইসলাম ও শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় প্রগতির চিন্তাধারাকে তাঁদের সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখাতেও রুশ বিপ্লবের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। আমরা জানি, রবীন্দ্রনাথের ‘রাশিয়ার চিঠি’ বহুলপঠিত একটি বই। এই সময়েই সমাজবাস্তবতার সুস্পষ্ট আভাস লক্ষ্য করা যায় আত্মশক্তি পত্রিকায় শিবরাম চক্রবর্তীর ‘আজ ও আগামীকাল’ সিরিজের প্রবন্ধগুলোতে। মনীন্দ্রলাল বসুর ‘কিরণের কথা’ গল্পে নায়কের সেই উক্তি এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, ‘শিল্প কি শুধু রং নিয়ে খেলা, সুন্দরীর মুখ আঁকা? কুলীদের বস্তির কদর্যতা, চাষি-মজুরের কর্মজীবন, পতিতার বেদনাকে আমি মূর্ত করতে চাই।’

এ কথা অনস্বীকার্য যে, শ্রমজীবী-সাহিত্য নির্মাণে কল্লোল পত্রিকার ছিল অনন্যসাধারণ ভূমিকা। ওই পত্রিকায় নিয়মিত লেখক অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত, মনীশ ঘটক প্রমুখের লেখা এবং পরবর্তীকালে হেমন্ত কুমার সরকার ও তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনায় ছিল মার্কসীয় সমাজচেতনার প্রভাব। মানিক বন্দোপাধ্যায়, মনোরঞ্জন হাজরা ও গোপাল হালদারের রচনাগুলো ছিল সেই আমলে কমিউনিস্ট চিন্তাধারার ফসল।

উনিশশ ঊনত্রিশ থেকে ১৯৩৩ পর্যন্ত চলমান অর্থনৈতিক সংকটের পর, আরও স্পষ্টভাবে বললে, ফ্যাসিস্ট একনায়কতন্ত্রের সবধরনের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের ওপর আগ্রাসনের পর বিশ্বসাহিত্যে এক নতুন ধরনের আন্দোলনের সূত্রপাত হয়, যাকে প্রগতিশীল সাহিত্য-আন্দোলন বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। ১৯৩৫ সালে প্যারিসে লেখকদের এক সম্মেলনে, রোমাঁ রলাঁ (Romain Rolland), অঁরি বাবুস (Henri Barbusse), আঁদ্রে জিদ (Andre Gide), আঁদ্রে মালরো (Andre Malraux), এলডাস হাক্সলি, মাইকেল গোল্ড, জন স্ট্র্যাচি, লুই আরাগঁ’র (Louis Aragon) মত বিশ্ববরেণ্য মনীষীরা উপস্থিত থেকে নতুন এই সাহিত্য আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করেন। তাঁরা ফ্যাসিস্ট বর্বরতার বিরুদ্ধে সকল মানবপ্রেমিক শিল্প-সাহিত্যকর্মীকে ঐক্যবদ্ধ হবার আহ্বান জানান। এই সম্মেলনে ভারতের পক্ষ থেকে অংশ নেন সৈয়দ সাজ্জাদ জহির ও মুলক্রাজ আনন্দ।

উনিশশ ছত্রিশ সালের ১০ এপ্রিল সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত হয় ‘নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘ’। বস্তুতপক্ষে প্রগতি লেখক সংঘ প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে ছিল মার্কসীয় বুদ্ধিজীবী ও কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগ। ‘নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘের প্রথম সভাপতি ছিলেন স্বনামধন্য হিন্দি লেখক মুন্সি প্রেমচাঁদ এবং সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন উর্দু ভাষার খ্যাতিমান লেখক সৈয়দ সাজ্জাদ জহির। দেশবিভাগের পর তিনি পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন।

নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘের অগ্রযাত্রার ধারাবাহিকতায়ই ১৯৩৯ সালে রণেশ দাশগুপ্ত, অচ্যুত গোস্বামী, সতীশ পাকড়াশী, কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত, সোমেন চন্দ প্রমুখের উদ্যোগে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় প্রগতি লেখক সংঘ। মুনীর চৌধুরী, অজিত গুহ এঁরাও সংঘের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং শোষণ ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা ও গণতন্ত্র কায়েমের লড়াইকে এগিয়ে নেওয়াই ছিল প্রগতি লেখক সংঘের লক্ষ্য। শুরু থেকেই সংঘের চরিত্র যেমন ছিল আন্তর্জাতিক, তেমনই সেকুলার ও গণতান্ত্রিক।

যে লক্ষ্য হাসিলের জন্য প্রগতি লেখক সংঘের জন্ম হয়েছিল, এখনও পর্যন্ত তা হাসিল হয়নি। আর এজন্যই প্রগতি লেখক সংঘ তার প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি।

মুসোলিনির ফ্যাসিবাদ বা হিটলারের নাৎসিবাদ দি¦তীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে দৃশ্যত সমাধিস্থ হলেও, ভিন্ন রূপে এখনও তা বিশ্বের অনেক দেশে বিরাজ করছে। বাংলাদেশ আজ বিদেশে অর্থপাচারকারী লুটেরা ধনিক শ্রেণির এক উপনিবেশে পরিণত হয়েছে। জনগণের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকারও আজ নেই। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করে বাকস্বাধীনতাকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। নতুন ধরনের এক ফ্যাসিবাদী, পরিবারতান্ত্রিক শাসনের যাঁতাকলে দেশের সাধারণ ও খেটে-খাওয়া মানুষ আজ পিষ্ট। দেশের শিল্প-সংস্কৃতি আজ হুমকির মুখে। গণবিরোধী শাসক শ্রেণি নিয়ন্ত্রণ করছে সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতি। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সংস্কৃতির মূল ধারা থেকে স্বাভাবিক কারণেই বিচ্ছিন্ন। ধর্মীয় মৌলবাদ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে দিচ্ছে মধ্যযুগীয় পশ্চাৎপদতা, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প। সারা বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদ আতঙ্কজনকভাবে আজ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন কোনও দ্বীপ নয়। এই অবস্থা থেকে দেশকে উদ্ধার করে জনগণতান্ত্রিক একটি সমাজ গড়ে তুলতে হলে আজ দেশের প্রগতিমনা লেখক-শিল্পীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন; যে ধরনের আন্দোলন আমাদের পূর্বসূরীরা গড়ে তুলেছিলেন। আর এ অভিযানে নেতৃত্বের ভূমিকায় থাকতে হবে প্রগতি লেখক সংঘকে।

আমরা জানি, ১৯৪২ সালের ৮ মার্চ, মাত্র ২২ বছর বয়সে প্রগতি লেখক সংঘের প্রতিষ্ঠাতা সহ-সম্পাদক ও রেল শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা কমরেড সোমেন চন্দ নিহত হয়েছিলেন ফ্যাসিবাদ সমর্থিত শক্তির হাতে।

বাংলাদেশে দীর্ঘকাল প্রগতি লেখক সংঘের কর্মতৎপরতা স্তিমিত হয়ে ছিল। দু-হাজার আট সালে একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে প্রগতি লেখক সংঘ পুনরুজ্জীবিত হয়। ২০১৪তে অনুষ্ঠিত হয় এর প্রথম জাতীয় সম্মেলন, ২০১৭-তে দ্বিতীয় এবং ২০১৯ সালে তৃতীয় জাতীয় সম্মেলন।

করোনা অতিমারি, ভয়াবহ বন্যা এসব দুর্যোগের কারণে নির্ধারিত সময়ের থেকে বেশ খানিকটা সময় পিছিয়ে প্রগতি লেখক সংঘের চতুর্থ জাতীয় সম্মেলন আজ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

আমরা আনন্দিত যে, চতুর্থ জাতীয় সম্মেলনের প্রাক্কালে দেশের চৌষট্টিটি জেলার মধ্যে প্রায় পঁয়ত্রিশটিতে বর্তমানে আমাদের সংগঠনের কার্যক্রম চালু রয়েছে। গর্বের বিষয় যে, কার্যক্রম এবং সাংগঠনিক বিস্তারের দিক থেকে বর্তমানে বাংলাদেশের সব থেকে বড় সাহিত্য সংগঠন বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ।

চতুর্থ জাতীয় সম্মেলন সফল করতে যাঁরা অক্লান্ত শ্রম দিয়েছেন, যাঁরা বিজ্ঞাপন ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে এই আয়োজনকে সাহায্য করেছেন, আমি সম্মেলন-প্রস্তুতি পরিষদের পক্ষ থেকে তাঁদের জানাচ্ছি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

প্রফেসর এমিরেটাস ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ ও অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হক এই সম্মেলনে উপস্থিত থেকে একে ঔজ্জ্বল্য দান করেছেন, এজন্য তাঁদের জানাচ্ছি আন্তরিক শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। জাতীয় সম্মেলনে নিমন্ত্রিত সম্মানিত অতিথিবৃন্দ, সংঘের কাউন্সিলরগণ ও পর্যবেক্ষকদের প্রতি আমাদের রক্তিম শুভেচ্ছা ও প্রাণঢালা অভিনন্দন।

শোষণহীন, প্রগতিমুখী ও মানবিক সমাজ নির্মাণের লড়াইয়ের কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে আসুন আমরা আমাদের কলমকে শাণিত করে তুলি।

শ্রমজীবী মানুষ ও জনগণের জয় হোক।

বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ দীর্ঘজীবী হোক।

(প্রগতি লেখক সংঘের চতুর্থ জাতীয় সম্মেলনে পঠিত বক্তব্য)

লেখক: আহ্বায়ক, চতুর্থ জাতীয় সম্মেলন প্রস্তুতি পরিষদ, বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ

Leave a Reply

Your email address will not be published.