মানবাধিকার লঙ্ঘন বিতর্ক

বিপ্লব রঞ্জন সাহা

ছাত্র জীবনে সক্রিয় রাজনীতি করার সময়ে যেসব বন্ধুরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে সমাজ বিপ্লবের মাধ‍্যমে সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলার জন‍্য বিপ্লব ও সংগ্রামের কঠোর পথ বেছে নিয়েছিলো, তারাই আজ রাজনৈতিক জীবনকে জলাঞ্জলি দিয়ে প্রতিষ্ঠার চোরাগলিতে প্রবেশ করে বেছে নিয়েছে স্বচ্ছলতা ও প্রাচুর্য‍্যের সহজ পথ এবং শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত‍্যয় ভুলে সাম্রাজ‍্যবাদী দুনিয়ার দাস‍্যবৃত্তিতে লিপ্ত। তারা প্রতিনিয়ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে উচ্চকণ্ঠ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার দোসর ইংল‍্যান্ড, কানাডা, ফ্রান্স ও অস্ট্রেলিয়া যখন গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রাকে ম্লান করতে সে দেশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের মিথ‍্যা গল্প ফাঁদছে, তখন সাম্রাজ‍্যবাদী মদদপুষ্ট ও তাদের অর্থায়নে পরিচালিত সংবাদ মাধ‍্যম সেসব গল্প ফেরি করে বেড়াচ্ছে; আর তার সাথে যুক্ত হয়েছে আমাদের দেশের গণমানুষের কষ্টার্জিত অর্থে শিক্ষিত হয়ে ওঠা ময়ুরপুচ্ছধারী কাকেরা, যারা ততোধিক তারস্বরে চিৎকার করে সেসব মিথ‍্যাচারকে বিশ্বাসযোগ‍্য করে তোলার স্বেচ্ছাসেবা দিয়ে যাচ্ছে! যারা একসময় দমে দমে মার্কিন সাম্রাজ‍্যবাদসহ তার দোসরদের বিরুদ্ধে জীবনপণ লড়াইয়ের ঝাণ্ডা হাতে তুলে নিয়েছিলো, তারা আজ অতীত ভুলে ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ‍্যবাদী বিশ্বের উচ্ছিষ্ট ভোগ করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছে।

যতদিন পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্ত হয়নি তখনও রাজনৈতিক মতাদর্শগত অবস্থানের কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করতে গেলে, যেসব রাজনীতিবিমুখ ও প্রতিষ্ঠামুখী বন্ধুদের বিরোধিতার মুখোমুখি হয়েছি, তাদেরও অনেকেই হয়তো ভাগ‍্যান্বেষণের উদ্যেশে পশ্চিমা দুনিয়ায় পাড়ি জমিয়েছে। সেসব বন্ধুদের সাথে বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করা গেলেও, যারা একদা ‘বিপ্লব মন্ত্রে দীক্ষিত ছিলো, তাদের দশা একশ’ আশি ডিগ্রি বিপরীতমুখী। তারা মানতেই নারাজ যে, বর্তমান বিশ্বে প্রগতির বেগবান এক ধারা বহমান, যার অবিসংবাদিত নেতৃত্বের অবস্থানে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন আর তাই সাম্রাজ‍্যবাদী বিশ্বের সকল আঘাত তাকেই সহ‍্য করতে হচ্ছে। সেসব তথাকথিত ‘বিপ্লবী’ বন্ধুদের মুখেও শুনি চীনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বানোয়াট ও প্রমাণাতীত সব গল্প।

আজ এই বিষয়টি সকলের সামনে তুলে ধরার উদ্দেশ‍্যে এই প্রবন্ধটি লিখতে হচ্ছে এমন এক বাস্তবতায় যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক সহোদর কানাডা জাতিসংঘের ৪০ জাতি সম্বলিত মানবাধিকার সংস্থার উচ্চ ফোরামে মুসলিম ও অন‍্যান‍্য জাতিগোষ্ঠী অধ‍্যুষিত চীনের উইঘুর অঞ্চলে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর দিকে আলোকপাত করে চীনের প্রতি অভিযোগ উত্থাপন করেছে যে, পশ্চিম শিনজিয়াং অঞ্চলে স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত করে দিতে হবে। অথচ ‘দি ফেডারেশন অব সভরেইন ইনডিজেনাস নেশনস’ নামের কানাডার একটি ইনডিজেনাস গ্রুপ চলতি বছরের ২৩ জুন বুধবার, তাদের এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, স্ব স্ব পরিবার থেকে তুলে আনা ইনডিজেনাস শিশুদের জন‍্য আরেকটি আবাসিক বিদ‍্যালয়ে শত শত অসনাক্তকৃত কবরের সন্ধান তারা পেয়েছে।

এটা আমার মনগড়া কোন বক্ত‍ব‍্য নয়, বরং এই খবরটির তথ‍্যসূত্র খোদ রয়টার্স। গত মাসেও বৃটিশ কলাম্বিয়ার কামলুপসে মেরিয়েভাল ইন্ডিয়ান রেসিডেন্সিয়াল স্কুলে ২৩৫ জন শিশুর কবর পাওয়া গিয়েছে, যাদের গড় বয়স তিন বছর বা তার কাছাকাছি। ১৮৩৬ সাল থেকে ১৯৯৬ সালের ভেতরে এ ধরণের আবাসিক স্কুলগুলোতে ১,৫০,০০০ শিশুকে জোরপূর্বক তাদের পরিবার থেকে ছিনিয়ে নিয়ে অপুষ্ট অবস্থায় লালন-পালন, শারীরিক ও যৌন নির্যাতন করা হয়। যেটাকে ২০১৫ সালে সাংস্কৃতিক বিলোপসাধন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং এরও আগে ২০০৮ সালে কানাডার সরকার এ ধরণের কর্মকাণ্ডের কথা স্বীকার করে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমাও চেয়েছে। এছাড়াও বিগত পাঁচশ বছরের ধারাবাহিক দখলদারির মানসিকতাসম্পন্ন ইংল‍্যান্ড, ফ্রান্স, স্পেন যখন মানবাধিকার নিয়ে মায়াকান্না করে তখনও ইতিহাসের সেই রক্তাক্ত পৃষ্ঠাগুলো স্বাভাবিকভাবেই চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে।

জাতিসংঘে নিযুক্ত চীনা মিশনের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জিয়াং ডুয়ান শিনজিয়াং অঞ্চলে অবাধ প্রবেশাধিকারের ব‍্যাপারে কানাডার দাবীর প্রতি প্রতিক্রিয়া ব‍্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, তাদের (কানাডার) উচিত নিজ দেশের মানবাধিকার লঙ্ঘন পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টিপাত করা। কারণ ‘২০০৬ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত কানাডায় দশ সহস্রাধিক অভিবাসীকে ইচ্ছাস্বাধীনভাবে আটক করে রাখা হয়েছে’ বলে তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের সভায় উল্লেখ করেন। তিনি কানাডার বন্দীশালাগুলোতে অভিবাসীদের প্রতি বৈষম‍্যমূলক ও অমানবিক আচরণ এবং বেসামরিক ব‍্যাক্তিদেরকে বিদেশাতঙ্ক ও ইসলামাতঙ্করের নামে বেআইনিভাবে হত‍্যাকাণ্ডের কথাও উল্লেখ করেন।

তিনি একথাও উল্লেখ করেন যে, কানাডার ভূমিজ সন্তানদের হত‍্যা ও নিশ্চিহ্ন করার এক দুঃখজনক ইতিহাসও তাদের রয়েছে। এবং সারা বিশ্ব কানাডার একটি আবাসিক স্কুলে ২০০ ভূমিজ ছাত্রছাত্রীর শবদেহও আবিষ্কৃত হতে দেখেছে। তাই তিনি কানাডাকে তার নিজ দেশের মানবাধিকার লঙ্ঘন পরিস্থিতির দিকে মনোযোগ দিতে এবং মানবাধিকার বিষয়টিকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব‍্যবহার না করার আহ্বান জানিয়েছেন।

জেনেভায় জাতিসংঘ সদর দপ্তরে চীনা প্রতিনিধি দলের এক মুখপাত্র লিউ ইউইন ইউএনএইচআরসি’র শিনজিয়াং বিষয়ক যুক্ত বিবৃতিতে বলেন, কানাডা কর্তৃক আনীত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী কানাডাও যার অন্তর্ভূক্ত এর পক্ষ থেকে চীনকে হেয় প্রতিপন্ন করার এক রাজনৈতিক কূটকৌশল ছাড়া কিছুই নয়। কিন্তু এই অপচেষ্টা শেষ পযর্ন্ত ব‍্যর্থ হয়েছে। কারণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই অভিযোগ প্রত‍্যাখ‍্যান করেছে। তিনি আরো যুক্ত করেন যে, চীনা সরকার শিনজিয়াং-এর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীসহ তার সকল জনগণের কল‍্যাণ সাধনে বদ্ধপরিকর। অবিরাম প্রচেষ্টার মাধ‍্যমে শিনজিয়াং-এ ঘটেছে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবাধিকার ক্ষেত্রে লক্ষ‍্যণীয় অগ্রগতি। ২০২০ সালের মধ‍্যে এই অঞ্চলের তিন মিলিয়ন মানুষকে দারিদ্র্যমুক্ত করা হয়েছে। শিনজিয়াং-এর ব‍্যাপারে চীন সরকারের নীতিমালা উন্মুক্ত ও খোলামেলা এবং তা জনগণ ও ইতিহাসের কাছে দায়বদ্ধ। এসব নীতিমালা সব নৃগোষ্ঠীর মানুষের পরিপূর্ণ সমর্থন অর্জন করেছে। কিছু কিছু দেশ চীনে শিনজিয়াং-এর অগ্রগতি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নকে দেখে মোটেও খুশি নয় বলেই তারা তাদের ইচ্ছামতো সেখানকার মানবতাবাদী কর্মকাণ্ড নিয়ে মিথ‍্যাচার করে বেড়াচ্ছে যা চীনের অভ‍্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ ছাড়া কিছু নয়।

এবার আসা যাক আলোচ‍্য বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তব চিত্রের একটি উপস্থাপনায়। চীন ২০২০ সালের মার্চ মাসে ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মানবাধিকার লঙ্ঘন’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে যে, সাতটি সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মানবাধিকার পরিস্থিতি অত‍্যন্ত নাজুক এবং তা দিনে দিনে আরো অবনতির দিকে যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার পরিস্থিতির উপর প্রকাশিত সংবাদ ও তথ‍্য-উপাত্ত পর্যালোচনার ভিত্তিতে পরিচালিত এবং স্টেট কাউন্সিল ইনফরমেশন অফিস প্রকাশিত ‘২০১৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মানবাধিকার লঙ্ঘন বিষয়ক দলিল’ শিরোনামের এক প্রতিবেদনের শুরুতেই উল্লেখ করা হয় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সচিব পম্পেও ২০১৯ সালের ১৫ এপ্রিলে প্রদত্ত এক বক্তৃতায় বলেছেন, ‘আমরা মিথ‍্যা বলেছি, আমরা প্রতারিত করেছি, আমরা চুরি করেছি…, এটাই আপনাদেরকে আমেরিকার গবেষণাকর্মের গর্বের জায়গাটা স্মরণ করিয়ে দিবে।’সেই প্রতিবেদনটিতে আরো উল্লেখ করা হয় যে, ‘উপরোক্ত মন্তব‍্যটি মানবাধিকার প্রসঙ্গে নিজেদের অবস্থানকে অস্পষ্ট রাখার নিমিত্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিদদের দ্বৈত-মান তথা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করার কপটতাকে উন্মোচিত করে দিয়েছে।’

নাগরিক এবং রাজনৈতিক অধিকার

মার্কিন মুল্লুকে বন্দুকধারীদের গুলিতে নিরীহ মানুষের মৃত‍্যু নৈমিত্তিক ব‍্যাপার। জনে জনে অস্ত্র বহনের অবাধ অধিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক ধরণের বন্দুক সন্ত্রাসের প্রবণতা বাড়িয়ে দিয়েছে, যা সাধারণ নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের ও জানমালের জন‍্য বর্তমানে এক হুমকিতে পরিণত হয়েছে।

তবে এ প্রসঙ্গে যা সংযোজন করা একান্তভাবে জরুরি তা হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মারণাস্ত্র বহনের ইতিহাস খতিয়ে দেখা। আর তা আমাদেরকে ইতিহাসের চারশ বছর অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। যখন আমেরিকার ভূখণ্ডে সদ‍্য পা রাখা একেকজন শেতাঙ্গ একেকজন ভূমিজ সন্তানকে খুন করতে পারলে পুরস্কৃত হতো। তারই ধারাবাহিকতায় আজ সেখানকার একে অপরকে হত‍্যা করছে হরহামেশা। এমন হত‍্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান কেউ সত‍্যিকার অর্থেই জানতে চাইলে আমার মুখাপেক্ষী হওয়ার প্রয়োজন হবে না বলে আশা করি।

পরিস্থিতির ক্রমাবনতিতে বর্তমানে দলীয় রাজনীতি, নির্বাচনী রাজনীতি এবং আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক বাস্তবতা পরস্পর সম্পর্কিত হয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিচার ব‍্যবস্থাকে এক নাকাল পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হলো পৃথিবীতে একমাত্র উন্নত দেশ যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ এখনও অনাহারে দিন যাপন করে। গিনি সূচক অনুসারে সে দেশে ধনী ও গরীবের ব‍্যবধান বিগত পঞ্চাশ বছরের মধ‍্যে সবচেয়ে বেশি। ২০১৮ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের শতকরা ১০ ভাগ মানুষ মোট জাতীয় সম্পদের ৭০ শতাংশের মালিক। আর বিগত ৩০ বছরে নীচের দিকের শতকরা ৫০ শতাংশ মানুষের সম্পদ অর্জনের মাত্রা শূন‍্যের কোঠায়। যেখানে ৩০.৭ মিলিয়ন মানুষ চরম দারিদ্রের মধ‍্যে জীবন যাপন করে সেখানে দেশটির কংগ্রেস এক দশকে সর্বনিম্ন আয় ঘন্টাপ্রতি ৭.২৫ ডলার থেকে ১ সেন্টও না বাড়ানোর পক্ষে রায় দিয়েছে।

আর দিবেই বা কি করে? যারা প্রতিমুহূর্তে বেইল আউটের পথ খুঁজছে এবং সস্তা মজুরি শ্রমিক পাওয়ার আশায় লটারির মূলা ঝুলিয়ে তৃতীয় বিশ্বের হাজার হাজার মানুষকে নিয়ে গিয়ে কায়ক্লেশে জীবনযাপনে বাধ‍্য করেও সংকট মোকাবেলা করতে পারছে না, তারা মজুরি বাড়াবে কি করে? অবশ‍্য বাংলাদেশে বসে আমরা যারা ডলারের মূল‍্য অনুপাতে এই মজুরির হিসাব কষি, তাদের কাছে মনে হতে পারে এই মজুরিতো অনেক। কিন্তু এ কথা বিস্মৃতির কি কোন অবকাশ আছে যে, সেই শ্রমিকটিকে বাংলাদেশে নয় জীবনযাপন করতে হয় মার্কিন মুল্লুকে। আর সেই হিসাব-নিকাশ করে দেখলে এতো দূরে বসেও অনুমান করা যায়, যারা মোহাবিষ্ট হয়ে একবার সেখানে পাড়ি জমিয়েছিলো তারা কোন্ স্তরের জীবন যাপন করছে। তাদের চরম মানবেতর জীবনের বিনিময়ে আমরা বিরাট অংকের রেমিট্যান্স পাচ্ছি মানে এই নয় যে, সেসব মানুষজন খুব ভালো আছে।

জাতিগত সংখ‍্যালঘুদের প্রতি বৈষম‍্যমূলক আচরণ

অ্যাংলো-স‍্যাক্সন এক প্রোটেস্ট্যান্ট দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ও স্বীকৃত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজও অ্যাংলো-স‍্যাক্সন প্রোটেস্ট্যান্ট দেশ হিসেবেই রয়ে গেছে। আর অপর দিকে অন‍্য সকল জাতি-ধর্ম-বর্ণ ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী বিভিন্ন মাত্রার বৈষম‍্য ও নিপীড়নের শিকার বলে উক্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

দাসপ্রথা ও বর্ণবাদী বৈষম‍্যের নিদর্শন হিসেবে শেতাঙ্গ প্রাপ্ত বয়স্কদের তুলনায় ৫.৯ গুণ বেশি আফ্রিকান-আমেরিকান কারারুদ্ধ থাকে। এটা আমেরিকার আদিবাসীদের অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টিকেও স্পষ্ট করে তুলে যারা আজীবন বেকার অবস্থায় দারিদ্রের মধ‍্যে থেকে অধিকহারে অকালে মৃত‍্যুবরণ করে।

এখানে অবশ‍্যই ভেবে দেখতে হবে কতটা ‘মানবিক’ আচরণের মাধ‍্যমে আমেরিকার ভূমিজ সন্তানরা নিশ্চিহ্নপ্রায় হয়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মর্যাদা নিয়ে একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে তাদের দ্বারা, যারা মানবাধিকারের নামাবলী গায়ে চাপিয়ে দেশে দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সোচ্চার এবং গায়ে মানে না আপনি মোড়লের মতো বিচার সালিশের দায়িত্ব স্বীয় স্কন্ধে তুলে নিয়েছে।

অভিবাসীদের প্রতি অসদাচরণ

অভিবাসীদের প্রতি বর্তমানে চালু রয়েছে শূন‍্য সহনশীলতার নীতি, যা দিনে দিনে কঠোর থেকে কঠোরতর হচ্ছে। যার পরিণতিতে অসংখ‍্য অভিবাসী পরিবার বিচ্ছিন্নাবস্থা মেনে নিতে বাধ‍্য হচ্ছে বলে অসংখ্য প্রতিবেদন দেখতে চাইলে প্রতিদিন চোখে পড়বে।

বিশ্বব‍্যাপী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার লঙ্ঘন

সংরক্ষণ, যুদ্ধ এবং আরো অনেক কিছু

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেনে যুদ্ধে জড়িয়ে জানমালের ক্ষয়ক্ষতির মাধ‍্যমে ব‍্যাপক গণবিপর্যয় ঘটিয়েছে। দেশটি কিউবার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে একতরফা সংরক্ষণ আরোপ করেছে যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলসহ অনেকগুলো বহুজাতিক সংস্থা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে আন্তর্জাতিক ব‍্যবস্থাপনায় সংকটের জন্ম দিয়েছে।

চাইনিজ স্টেট কাউন্সিল ইনফরমেশন অফিস ২৪ জুন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে মানবাধিকারকে সম্মান প্রদর্শন ও তা রক্ষা করার ব‍্যাপারে এক শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছে।

২০২১ খ্রিস্টাব্দ চীনের কমিউনিস্ট পার্টির শততম বার্ষিক হওয়ায়, মানবাধিকার সংরক্ষণের ব‍্যাপারে তারা ব‍্যাপক তৎপরতা অব‍্যাহত রাখার পাশাপাশি বিশ্ব মানবাধিকার উন্নয়নের লক্ষ‍্যেও ভূমিকা রাখার অঙ্গীকার ব‍্যক্ত করেছে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মতাদর্শের অন‍্যতম বিষয় হলো জনগণের প্রতি অগ্রাধিকার। শুধু তাই নয়, বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা ও অব‍্যাহত রাখার যে কোন উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার পাশাপাশি চীন বৈশ্বিক মানবাধিকার উন্নয়নের নিমিত্তেও সর্বাত্মক ভূমিকা রাখবে বলেও শ্বেতপত্রে ঘোষণা করা হয়।

সবশেষে দৃষ্টি ফেরানো যাক চলমান কোভিড-১৯ পরিস্থিতির দিকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দায়িত্বজ্ঞানহীন ও উন্নাসিক আচরণের কারণে চলমান কোভিড-১৯ মহামারী মোকাবেলা ও নিয়ন্ত্রণ করতে ব‍্যর্থ হওয়ায় যে ছয় লক্ষাধিক মানুষের মৃত‍্যু হলো তা মানব জাতির জন‍্য এক ট্র্যাজেডি, তাকেও বিশেষজ্ঞমহল মানবাধিকারের লঙ্ঘন বলেই মনে করেন। অথচ এই মারণঘাতি ভাইরাসটির সংক্রমণ শুরুর সাথে সাথেই চীনের সমন্বিত ও সুশৃঙ্খল স্বাস্থ‍্যব‍্যবস্থার কল‍্যাণে একেবারে শুরুতেই একে নিয়ন্ত্রণে আনার সাফল‍্যকে কতভাবেই না হেয় করার অপচেষ্টা সারা বিশ্ব প্রত‍্যক্ষ করেছে। কোনভাবেই সফল হতে না পেরে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা দুনিয়ার দোষারোপের প্রোপাগান্ডার মুখপাত্র হতে যখন সেইসব বন্ধুদেরকে দেখি, তখন মনে হয়, কি বিচিত্র ও আত্মভোলা এই জীবন!

সূত্র: চায়না গ্লোবাল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজ।

ইমেইল: bipi1963@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published.