মানবমুক্তির একমাত্র পথ সমাজতন্ত্র

রফিকুজ্জামান লায়েক

“রুশ জনস্রোত ভেঙেছে শ্রম দাসত্বের জোয়াল”

ব্যক্তিমালিকানা অর্থাৎ মানবসমাজে শ্রেণি বিভাজন সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে মেহনতি শ্রমজীবী মানুষ শ্রম দাসত্ব থেকে মুক্তির জন্য এক মহৎ স্বপ্নের কথা ভেবে আসছেন। সে স্বপ্ন হলো মানুষের ওপর মানুষের শোষণ-অত্যাচার, জুলুম ও নির্যাতন থেকে মুুক্তি। আর তা ভেবেই মানুষ বসে থাকেননি, নানাভাবে লড়াই করেছেন, মানুষের সে লড়াই আজও চলছে। লড়াই অগ্রসর হয়েছে অনেক। কিন্তু মেহনতি মানুষের সে স্বপ্ন সফল হয়নি। তবে আজ থেকে একশত চার বছর পূর্বে শ্রমিক শ্রেণি ও মেহনতি জনগণের সে স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল সোভিয়েত রাশিয়ায়। ১৯১৭ সালে মহামতি লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ার শ্রশিকশ্রেণি বিপ্লব সংঘটিত করার মাধ্যমে বুর্জোয়া সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে। এই বিপ্লবের ফলে রাশিয়ায় শুধু ক্ষমতার বদলই হয়নি, হয়েছিল নীতি ও আদর্শের বদল। এই বিপ্লব বিশ্বে প্রথম ঘোষণা করল গণমানুষের মুক্তির কথা। মানুষের উপর মানুষের শোষণ আর রইল না। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ আর থাকল না। শ্রেণিবৈষম্য, জুলুম এবং অত্যাচারেরও অবসান ঘটল। কৃষক পেল জমির অধিকার, শ্রমিকরা লাভ করল মানবিক, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন। মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহ নিশ্চিত করল বিপ্লবী সরকার। সরকার ঘোষণা করল এখন থেকে সকল সম্পদ ও ক্ষমতার মালিক হলো জনগণ। নারীমুক্তির লক্ষ্যে সরকার নারী পুরষের বৈষম্যের চির অবসানের ঘোষণা দিল।

অক্টোবর বিপ্লবের ফলে রাশিয়ার মেহনতি শ্রমজীবী মানুষ নিজেকে বিকশিত করার সমান সুযোগ ও অধিকার লাভ করলো। বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করলো রাশিয়ার জনগণের জীবনে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন। আর যে ব্যবস্থার মাধ্যমে এ কাজ সাধিত হলো, তার নাম ‘সমাজতন্ত্র’। সে জন্যই অক্টোবর বিপ্লবের নাম হলো– সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। আর রাশিয়া হলো বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক দেশ।

অক্টোবর বিপ্লবে রাশিয়ার শ্রমিকশ্রেণি গরিব কৃষককে সঙ্গে নিয়ে বিপ্লব করেছিল। বিপ্লবের পর শ্রমিক ও কৃষকের ‘সৌভিয়েট গভর্নমেন্ট’ প্রতিষ্ঠা করেছিল। অক্টোবর বিপ্লবী মানুষের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। যা পৃথিবীতে সাম্রাজ্যবাদের একাধিপত্যের অবসান করেছিল। দুয়ার খুলে দিয়েছিল পরাধীন দেশসমূহের জাতীয় স্বাধীনতা অর্জনের ও সারা দুনিয়ার মানুষের শোষণমুক্তির। ফলে এ কথা আমরা বলতে পারি অক্টোবর বিপ্লব শুধু রাশিয়ার শ্রমজীবী মেহনতি মানুষকেই মুক্ত করেনি, এই বিপ্লবের অভিঘাত সারা দুনিয়ার শ্রমিক, মেহনতি মানুষ ও নিপীড়িত জাতিসমূহের কাছে ও মুক্তির বারতা নিয়ে হাজির হয়। শ্রমিক, কৃষক শ্রমজীবী মানুষসহ অত্যাচারিত সকল বিশ্ববাসী জাতিগত, সম্প্রদায়গত ও শ্রেণি শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াই করবার সাহস ও শক্তি সঞ্চয় করে। অক্টোবর বিপ্লবের অনুপ্রেরণায় দেশে দেশে মেহনতি মানুষের মুক্তিসংগ্রাম জোরদার হয়ে উঠে। পরাধীন দেশগুলির স্বাধীনতা সংগ্রাম জোরদার হয়ে উঠে। ভারতীয় উপমহাদেশসহ পৃথিবীর প্রায় সকল পরাধীন দেশ স্বাধীনতা লাভ করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয় লাভের মধ্য দিয়ে সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে উঠার পথ সুগম হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত সেনাবাহিনীর বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে সভ্যতা বেঁচে ছিল, চূর্ণ হয়েছিল ফ্যাসিবাদের জয়রথ, নৃশংস বর্বরতার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল মানবতা। ধ্বংস হয়েছিল ইউরো রাশিয়ার প্রায় অর্ধেক ভূখণ্ড। ফ্যাসিবাদের ধ্বংসস্তূপের ওপর জন্ম হয়েছিল সমাজতান্ত্রিক পূর্ব ইউরোপের। তবে তার জন্য সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার দুই কোটিরও বেশি নর-নারীকে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছিল। দুনিয়াব্যাপী সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ে রাশিয়া হয়ে উঠেছিল বিশ্ব শ্রমজীবী মানুষের ভরসাস্থল।

ফলে ধীরে ধীরে বিশ্বের প্রায় সকল দেশের ও অঞ্চলের শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষের সংঘটিত লড়াই ও দুনিয়ার বাস্তবতা এবং ইতিহাসের শিক্ষায় সমাজতন্ত্রের প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে এবং মানুষের মধ্যে সমাজতন্ত্রের প্রয়োজনীতা অনুভূত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়েও দে্েযশর জনগণের একটা অংশের মধ্যে সমাজতন্ত্রের প্রতি আগ্রহ দেখা যায়। ফলে সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত বাংলাদেশ নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি সত্ত্বেও সমাজতন্ত্রের পথে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা শুরু করে। শিল্প-কারখানাসহ প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করা হয়। ১৯৭২ সালের সংবিধানের প্রধান চার স্তরের মধ্যে সমাজতন্ত্রকে রাখা হয়। যদি ওপরে প্রতিক্রিয়াশীল সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশকে পুরনো ধারায় ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে। সে ধারা এখনও অব্যাহত আছে। ফলে শোষণ, নির্যাতন, মানুষে মাননুষে অর্থের বৈষম্য, বেকারত্ব এবং সামাজিক জীবনে পশ্চাৎপদ বেড়েই চলছে। যদিও মানুষেণর লড়াই থেমে নেই। তবে সে লড়াই আরও জোরদার হওয়া খুবই প্রয়োজন।

রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-শিল্প-সাহিত্যসহ মানব জীবনের সকল ক্ষেত্রে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি সাধিত হয়। লেনিনের নেতৃত্বে রাশিয়ার শ্রমিক শ্রেণি ক্ষমতা দখলের মাত্র ২০ বছরের মধ্যে সকল মানুষকে শিক্ষিত করে তোলে, গড় আয়ু দ্বিগুণ হয়। বিশ্বে প্রথম মহাকাশে নভোচারী পাঠায় রাশিয়া। নতুন ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের নতুন অর্থ প্রত্যক্ষ করল বিশ্ববাসী। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অমানবিক দুঃশাসনের অবসানের ফলে রাশিয়ার সমাজজীবন ক্রমান্বয়ে মানবিক হয়ে উঠেছিল। নারীর অভিসপ্ত জীবনের অবসান ঘটে। নারীর ভোটাধিকার ও শিক্ষায় সমান সুযোগ এবং নারী-পুরুষের সমমজুরির ঘোষণা বিশ্বে প্রথম প্রদান করে সোভিয়েত রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা। বাংলা ভাষার বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৩০ সালে রাশিয়ায় ভ্রমণে যেয়ে লিখেছিলেন– ‘অবশেষে রাশিয়ায় আসা গেল। যা দেখছি আশ্চর্য ঠেকছে। অন্য কোনো দেশের মতোই নয়। একেবারে মূলে প্রভেদ। আগাগোড়া সকল মানুষকেই এরা সমান করে জাগিয়ে তুলছে। এখানে শিক্ষা যে কী আশ্চর্য উদ্যেমে সমাজের সর্বত্র ব্যাপ্ত হচ্ছে, তা দেখলে বিস্মিত হতে হয়। শিক্ষার পরিমাপ শুধু সংখ্যায় নয়–তার সম্পূর্ণতায় তার প্রবলতায়। কোনো মানুষই যাতে নিঃসহায় ও নিষ্কর্মা হয়ে না থাকে, এজন্য কী প্রচুর আয়োজন ও কী বিপুল উদ্যোগ।’

রুটি, জমি, শান্তির আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে রাশিয়ার শ্রমিকশ্রেণি বিপ্লবের মাধ্যমে বুর্জোয়া সরকারকে উৎখাত করেছিল। তারা মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে বিশ্বের সকল জাতির শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে তীব্র করে তুলতে সক্ষম হয়। সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থা পুঁজিবাদী শোষণ ও নিপীড়নমূলক ব্যস্থার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। পুঁজিবাদ কয়েক শতকে যা পারেনি, সমাজতন্ত্র মাত্র কয়েক দশকে মানুষের কাক্সিক্ষত মানবিক সমাজ নির্মাণে সফল হয়েছে। গোটা মানব জাতিকে নতুন মানবিক সভ্যতা গড়বার পথ দেখিয়েছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা যা পারেনি, মানব জীবনের বাস্তবতা বলে পারবেও না। সাম্প্রতিক সময়ে করোনা মোকাবিলায় কমিউনিস্ট পার্টি শাসিত দেশ ও অঞ্চলে যে সাফল্য দেখিয়েছে বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তার ধারে কাছে আসতে পারে নাই। বিশ্ব পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী মহলের শুরু থেকে অব্যাহত নানা ষড়যন্ত্র এবং নেতৃত্ব দ্বারা তত্ত্বের প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছু ভুলের কারণে রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে গেলেও মানব জীবনের বাস্তবতায় অক্টোবর বিপ্লবের মাহাত্মকে ক্ষুণ্ন করা সম্ভব হয়ে উঠেনি।

বরং পুঁজিবাদের দেউলিয়াপনা সমাজতন্ত্রের মর্মবাণীকে আরো উজ্জ্বল করে চলছে। সাম্রাজ্যবাদের নগ্ন থাবা দেশে দেশে মানবতা ও জীববৈচিত্রকে ধ্বংস করছে। উদারিকরণের মাধ্যমে শোষণের নানা উপায় বের করছে। এবং এর ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তরা শেষ হয়ে যাচ্ছে। ঋণের ফাঁদে ফেলে অনেক দেশের স্বাধীন জাতীয় অর্থনীতি ধ্বংস করা হয়েছে। ধনবৈষম্য যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি। পুঁজিবাদ ক্রমান্বয়ে আিরো অমানবিক হয়ে উঠছে। দুনিয়ার দেশে দেশে ধনীরা শিল্প-কৃষি-বিজ্ঞান-প্রযুক্তসহ মানুষের মেধাস্বত্বকেও শোষণের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে। অল্প মানুষের কাছে প্রচুর সম্পদ জমা হচ্ছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা বর্তমানে কতটা অমানবিক একটি উদাহরণ দ্বারা বুঝা যাবে। গত ২০২০ সালে করোনার কারণে বিশ্বের সকল দেশের মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দুনিয়ার দেশে দেশে উৎপাদন বন্ধের কারণে অনেক মানুষ নতুন করে বেকার হয়েছেন। ক্ষুধা-দারিদ্র্যতা বেড়েছে। অথচ ঐ বছর বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা বেড়েছে (২৭৮০-২১২০) ৬৬০ জন। আমাদের দেশের অবস্থা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি– মানুষের দৈন্যতা, হাহাকার, বেকারত্ব নতুন করে অতি দরিদ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি– কিন্তু তাতে কী বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়ে আমাদের দেশে ২০২০ সালে নতুন করে ১১৬০০ জন কোটিপতি হয়েছেন। সে যাই হোক মানুষ বসে নাই, মানুষের লড়াইও থেমে নাই। পুঁজিবাদের লুণ্ঠন, সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে মানুষ লড়াই করছে। শত সহস্র বছর ধরে মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা ও ইতিহাসের শিক্ষা হলো- পুঁজিবাদ বা অন্য কিছু নয়, সমাজতন্ত্রেই মানুষের মুক্তি। মানবিক সমাজ আর উন্নত জীবনের জন্য আসুন আমরা আমাদের দেশে সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তন সাধন করি। অফুরন্ত শক্তি আর বিপুল সম্ভাবনার নাম সমাজতন্ত্র।

লেখক: সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.