মহাসংকটে পুঁজিবাদ, জাগছে মানুষ

রাজু আহমেদ

নব্বইয়ের দশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার পর বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদদের সদম্ভ উচ্চারণ ছিল, ‘পুঁজিবাদই ইতিহাসের শেষ কথা’। কিন্তু মাত্র তিন দশকের মধ্যেই একের পর এক বিপর্যয়ে পর্যুদস্ত পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। এক সঙ্কট সামাল দিতে দিতে চলে আসছে আরেক ধাক্কা। ধারাবাহিক এই অস্থিরতার মধ্য দিয়ে নয়া উদারবাদ আর মুক্তবাজার নীতির ব্যর্থতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

পুঁজিবাদের এই দৈন্যদশা হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটাই অনিবার্য পরিণতি। কার্ল মার্কস যাকে বলেছেন, পুঁজিবাদের সাধারণ সঙ্কট। মার্কসীয় বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পুঁজিবাদের সাধারণ সঙ্কট হলো এই ব্যবস্থা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মন্দার মধ্যে ঘুরপাক খায়। ফলে গত কয়েক দশকে বিশ্ব অর্থনীতির একের পর এক বিপর্যয় পুঁজিবাদের অনিবার্য পরিণতি ছাড়া আর কিছুই নয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পুঁজিবাদের মূল হাতিয়ারে পরিণত হয় বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। তুলনামূলক কম সুদে ঋণের বিনিময়ে এই অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে দেশে অর্থনৈতিক সংস্কার চাপিয়ে দেয়। বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের সংস্কার কর্মসূচির মূল লক্ষ্য রাষ্ট্রায়ত্ত্ব খাত সঙ্কোচন, সরকারি প্রতিষ্ঠান বিক্রি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যক্তি খাতে ছেড়ে দেওয়া, ভর্তুকি তুলে দিয়ে তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় সঙ্কোচন এবং বিদেশি পণ্য ও বিনিয়োগের জন্য দেশের বাজার উন্মুক্ত করে দেয়া। বলা হয়, তাদের প্রেসক্রিপশন মেনে সংস্কার করা হলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটবে, দারিদ্র্য দূর হবে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে।

কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন উৎপাদন ব্যবস্থা বা কারখানা বিক্রি করে, ভর্তুকি তুলে দিয়ে এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের ভূমিকা খর্ব করে বড় অঙ্কের ঋণ পাওয়া গেলেও তা স্থিতিশীল উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে না। সাময়িকভাবে অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি অর্জন হলেও তা অনেকটাই ফাঁপা। বিপুল পরিমাণ ঋণের দায়, সেই সাথে ব্যাপকমাত্রায় দুর্নীতি অচিরেই অর্থনীতিতে বড় রকমের সঙ্কট সৃষ্টি করে।

এই প্রক্রিয়ায় উন্নয়ন যতটুকুই বা হয় তার সুফল চলে যায় ধনিক গোষ্ঠীর দখলে। সমাজের বৃহৎ জনগোষ্ঠী এর তেমন কোনো সুফল পায় না। মোট কথা, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ নির্দেশিত পথে কিছু সময়ের জন্য অর্থনীতি ঊর্ধ্বমুখী হলেও তা সাধারণ মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে না। উল্টো খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সঙ্কুচিত হয়ে আর্থ-সামাজিক বৈষম্য তীব্র করে তুলে।

এখানেই আবার ফিরে আসে কার্ল মার্কসের তত্ত্ব, পুঁজিবাদের নীতি অনুযায়ী মুনাফার জন্য মালিক শ্রেণি কর্মীদের ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করে। এতে মধ্যবিত্ত ক্রমে গরিব হতে থাকে। আর অধিকাংশ সম্পদ কিছু মানুষের হাতে জমতে থাকে।

বর্তমানে পৃথিবীতে ৩৭০ কোটি দরিদ্র মানুষের যতোটা সম্পদ রয়েছে মাত্র ২৪ জন ধনীর দখলে আছে তারচেয়ে বেশি।

তথাকথিত মুক্তবাজার ব্যবস্থা ও পুঁজিবাদী বিশ্বায়ন যে কোনো দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীল সমাধান নয়– সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর মধ্য দিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে তা আরো পরিষ্কার হয়েছে। ‘রাষ্ট্রের ভূমিকা সঙ্কুচিত করে ব্যক্তি খাতকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর’ পুঁজিবাদী ফর্র্মুলা যে কতোটা ভঙ্গুর- তাও প্রমাণ হয়ে গেছে। ঋণের জালে আবদ্ধ হয়ে অনেক দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। দেউলিয়া হয়েছে কোনো কোনো দেশ। এই পরিস্থিতির সর্বশেষ উদাহরণ হলো- শ্রীলঙ্কা।

শুধু শ্রীলঙ্কা নয়, পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই অর্থনৈতিক মন্দা তীব্র হচ্ছে। বিশ্ব পুঁজিবাদের রক্ষক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে একের পর এক সঙ্কট সৃষ্টি হচ্ছে। ছোট-বড় অনেকগুলো সঙ্কট মিলিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অরাজক পরিস্থিতি। কর্পোরেট কেলেংকারি, বেকারত্ব, করোনা মহামারী এবং যুদ্ধের প্রভাবে দেখা দিচ্ছে অস্বাভাবিক মুল্যস্ফীতি। দেশে দেশে ব্যাপক হারে বাড়ছে দ্রব্যমূল্য। সাধারণ মানুষের সঙ্কট তো আছেই, সেইসঙ্গে গভীর সমস্যায় পড়ছে রাষ্ট্র। খাদ্যপণ্যের ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে করে তুলেছে দুর্বিষহ। বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে খাদ্য ও জ্বালানি আমদানি করে সঙ্কট সামাল দেয়ার সামর্থ্য হারাচ্ছে সরকার। জ্বালানির অভাবে বন্ধ হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। আর বিদ্যুৎ না থাকায় স্থবির হয়ে পড়ছে শিল্প কারখানা। এর বিপরীতে বেড়ে যাচ্ছে বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ। এমনটাই এখন বিশ্বের অনেক দেশের সাধারণ চিত্র। এই পরিস্থিতিতে শ্রীলঙ্কার মতো দেউলিয়া ঘোষণার পথে বেশ কয়েকটি দেশ।

বিভিন্ন দেশে মুখ থুবড়ে পড়া অর্থনীতিকে জাগিয়ে তুলতে পুঁজিবাদ আবারো সেই বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ’কেই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে উঠেপড়ে লেগেছে। অর্থনৈতিক সঙ্কটের মুখে গণবিক্ষোভে ক্ষমতা হারানোর ভয়ে ভীত শাসকশ্রেণি নতুন করে ঋণ নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। আর অর্থলগ্নিকারী এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া মানেই নতুন করে শর্তের জালে জড়িয়ে পড়া, দেশীয় বাস্তবতায় স্বাধীন নীতি গ্রহণের সক্ষমতা হারানো। ফলে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের ঋণ সহায়তায় হয়তো বা সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা আর্থিক ও নৈতিক সক্ষমতার দিক থেকে রাষ্ট্রকে দুর্বল ও নতজানু করে তুলবে।

এভাবে নানা ফন্দি-ফিকির করে, জোড়াতালি দিয়ে সময়ে সময়ে পুঁজিবাদের সঙ্কটের মাত্রা কমিয়ে আনা গেলেও- তা কখনো স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারবে না। কারণ এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্যই হলো মুনাফা। অনৈতিক মুনাফার এই প্রতিযোগিতার ফলে একদিকে ছোট ছোট পুঁজি ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে কর্পোরেট পুঁজি ও তার রক্ষক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তৈরি হচ্ছে তীব্র বৈরিতা। এই পর্যায়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে একচেটিয়া বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থের সংঘাত তীব্র হয়ে উঠেছে। পুঁজিবাদী বিশ্ব ব্যবস্থার অভ্যন্তরেই বিভিন্ন শক্তির জোটবদ্ধ অবস্থানে নানামুখী পরির্বতন ঘটছে। পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর পারস্পারিক বৈরিতা বাড়ছে। যার চূড়ান্ত পরিণতি যুদ্ধ। আর এটাই হলো সেই পথ, যার মধ্য দিয়ে ‘পুঁজিবাদ নিজেই নিজের ধ্বংস ডেকে আনবে’।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নয়া উদারবাদ ও মুক্তবাজার নীতি যে মানুষের জীবন-জীবিকার সমস্যার ন্যূনতম সমাধান দিতে পারে না, ইতোমধ্যেই তা স্পষ্ট হয়ে গেছে। আর সে কারণেই দেশে দেশে জেগে উঠছে মানুষ- যার মধ্যে নিহিত আছে বিপ্লবের বীজ।

লেখক: সাংবাদিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.