মহাশূন‍্যে যুদ্ধ জারির পায়তারা

বিপ্লব রঞ্জন সাহা

১৯৬৭ সালে স্বাক্ষরিত বহিঃমহাশূন‍্য চুক্তি অনুসারে ‘মহাকাশে অবস্থানরত নভোচারীগণ মানবজাতির দূত হিসেবে বিবেচিত হবে এবং সকল রাষ্ট্রই তাদেরকে সম্মান করবে ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। কখনো তাদের প্রাণসংসয় হলে সে বিষয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রসমূহকে সে বিষয়ে অবগত করা হবে বলে। সেই চুক্তিটি যদিও আজও জীবন্ত এবং বর্তমান বাস্তবতায় যখন বিভিন্ন দেশের নভোচারীরা আরো অহরহ মাহাকাশে বিভিন্ন প্রয়োজনে যাবে আসবে তখন মহাকাশের সামরিকীকরণ মানবজাতির মহাকাশ গবেষণার জন‍্য একটা হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

চীনের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা China National Space Administration-এর মুখপাত্র ঝাও এ কথা উল্লেখ করে আরও বলেন. “সেই চুক্তিতে একথাও বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রসমূহ জাতীয় মহাশূন‍্য কার্যক্রমের দায়িত্ব নিবে সেই কাজ সরকারের হোক বা ব‍্যক্তিপর্যায়েরই হোক’।”

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বহিঃমহাশূন‍্যে তথাকথিত দায়িত্বশীল আচরণের দাবী অব‍্যাহত রাখে কিন্তু তারা আন্তর্জাতিক চুক্তির বাধ‍্যবাধকতার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে এবং নভোচারীদের জীবনের প্রতি মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াতে দ্বিধা করে না। তাই ঝাও বলেন, ‘এটি তাদের জাতীয় দ্বৈতনীতির প্রকাশ।’এলন মাস্কের স‍্যাটেলাইটের সাথে প্রায় সংঘর্ষাবস্থার পরে চীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তীব্র ভর্ৎসনা ছুঁড়ে দেয়।

মহাশূন‍্যে চীনের স্পেস স্টেশনটির এলন মাস্কের স্পেসএক্স (SpaceX) স‍্যাটেলাইটের সংঘর্ষ এড়ানোর পর চীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে মহাশূন‍্যে দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানিয়েছে। মাত্র কয়েকদিন আগে চীনের মহাকাশচারীদের বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা উন্মোচিত হলে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মহাকাশ চুক্তির ব‍্যাপারে বাধ‍্যবাধকতা বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদাসীনতা নিয়ে অভিযোগ উত্থাপন করেন।

চীনের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা CNSA-এর মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান এ কথা নিশ্চিত করেছেন যে, গত এক বছরে চীনের মহাশূন‍্য স্টেশনের সাথে টেলসার প্রতিষ্ঠাতা এলন মাস্কের স্পেসএক্স অ্যারোস্পেস কোম্পানির স্টারলিংক ইন্টারনেট সার্ভিসের স‍্যাটেলাইট দু’বার সংঘর্ষের কাছাকাছি পর্যায়ে গেছে। চীনের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের মহাশূন‍্য বিষয়ক কর্মতৎপরতা দপ্তর বরাবর ডিসেম্বরের প্রথমভাগে উপস্থাপিত অভিযোগপত্র অনুসারে গত বছর ১ জুলাই ও ২১ অক্টোবর এই অনভিপ্রেত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

ঝাও একথাও উল্লেখ করেন যে, ‘স‍্যাটেলাইটটির সাথে সংঘর্ষ এড়াতে চীনের নির্মাণাধীন স্পেস স্টেশনকে যেটিতে তিনজন টাইকোনট (চীনা নভোচারী) রয়েছে, তাদের জরুরি ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক অবস্থান পরিবর্তন করতে হয়।’ডিসেম্বর মাসের প্রথমভাগে বহিঃস্থ মহাশূন‍্যের শান্তিপূর্ণ ব‍্যবহারবিষয়ক জাতিসংঘ কমিটির কাছে প্রেরিত এক অভিযোগে চীন উল্লেখ করে, জুলাই ও অক্টোবর মাসে চীনের নতুন স্পেস স্টেশন তিয়ানগংকে স্টারলিঙ্ক স‍্যাটেলাইটের পরপর দুটি সংঘর্ষ এড়াতে দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করতে হয়।

প্রামাণিক দলিলাদি অনুসারে স্টারলিঙ্ক স‍্যাটেলাইট তিয়ানগং-এর নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঢুকে পড়লে দু’দুবার প্রায় সংঘর্ষাবস্থা থেকে তিয়ানগংকে সংঘর্ষ এড়াতে তাৎক্ষণিকভাবে ‘নিয়ন্ত্রণমূলক প্রতিরক্ষা ব‍্যবস্থা’ গ্রহণ করতে বাধ‍্য করা হয়েছিল। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে বলা হয় অক্টোবরের ঘটনার আগ পর্যন্ত ‘প্রয়োজনীয় কৌশল অবলম্বনের পদ্ধতি ছিল একেবারেই অজানা এবং কক্ষপথ সংক্রান্ত ত্রুটিবিচ্যুতি অনুমান করা ছিল অত‍্যন্ত কঠিন।’উক্ত বিবৃতিতে এ কথাও বলা হয়, ‘কক্ষপথে অবস্থানরত নভোচারীদের জীবন বাঁচাতে ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।’

স্মারকলিপিতে উক্ত ঘটনা সম্পর্কে বলা হয়, ‘এটি চীনের স্পেস স্টেশনে অবস্থানরত নভোচারীদের জীবন ও স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলেছিল’এবং জাতিসংঘের মহাসচিব মহোদয় বরাবর এই প্রসঙ্গটি বহিঃস্থ মহাকাশে প্রেরিত স‍্যাটেলাইটের স্বত্বাধিকারী সকল দেশকে অবহিত করার উদ্দেশে প্রচারের দাবীও উত্থাপিত হয়।

এলন মাস্কের মেগা নক্ষত্রের ঝাঁক কি রাতের আকাশে বিভ্রম সৃষ্টিকারী পদার্থ?

মাস্কের স্পেসএক্স প্রাইভেট কোম্পানির একটি শাখা স্টারলিঙ্ক প্রায় ১,৬০০’রও বেশি সংখ্যক স‍্যাটেলাইট মহাকাশে উৎক্ষেপণ করেছে। সারা পৃথিবীতে ইন্টারনেট সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ‍্যে একটি প্রকল্পের অধীনে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ১২,০০০ পর্যন্ত স‍্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের অনুমতি পেয়েছে।

ভিয়েনায় অবস্থিত জাতিসংঘের মহাশূন‍্য বিষয়ক এজেন্সির দপ্তরে প্রেরিত চীনের স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, ‘যেসব দেশ মহাশূন‍্য চুক্তির অন্তর্ভুক্ত যা আন্তর্জাতিক মহাশূন‍্য আইনের ভিত্তি তা সরকারি হোক বা ব‍্যক্তিমালিকানারই হোক মহাকাশকে ঘিরে যেকোন কার্যক্রমের আন্তর্জাতিক দায়দায়িত্ব বহন করবে।’

হার্ভার্ড স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের জোনাথন ম‍্যাকডোয়েল বলেন, ‘মহাকাশে উৎক্ষিপ্ত স‍্যাটেলাইটের সংখ‍্যা ও সেসবের বিভিন্ন গতির কারণে মহাকাশের স‍্যাটেলাইটসমূহের মধ‍্যে সংঘর্ষের ঝুঁকি কমাতে এবং সংঘর্ষ এড়াতে তাৎক্ষণিক স্থান পরিবর্তন করতে হচ্ছে।’ম‍্যাকডোয়েল আরো বলেন ‘এর বিরাট অংশের প্রতিনিধিত্ব করে স্টারলিঙ্ক এবং এটা একেবারেই অস্বাভাবিক যে যেকোন দেশই তাদের ব‍্যাপারে তথ‍্যভিত্তিক বুলেটিন প্রকাশ করে একটি অভিযোগ উত্থাপন করতে পারে।’তবে তিনি একথাও যোগ করেন, ‘এ ধরণের যেকোন সংঘর্ষ মহাকাশে চীনের স্পেস স্টেশনকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়ার কারণ হতে পারে।’ম‍্যাকডোয়েল বলেন, ‘মহাকাশে চীনেরও রয়েছে বিপুল সংখ্যক স‍্যাটেলাইট। আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনকে গত দশ বছরে অনেকবার তাৎক্ষণিক স্থান পরিবর্তনের কৌশল অবলম্বন করতে হয়েছে’। তিনি বলেন, ‘এসব ঘটনা ইঙ্গিত বহন করে যে, পৃথিবী বর্তমানে মহাশূন‍্যের নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। বর্তমানে মহাকাশে বিচরণ করছে অসংখ‍্য কার্যকর স‍্যাটেলাইট ও স‍্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ। দিনে দিনে মহাকাশের ব‍্যস্ততার মাত্রা বাড়ছে, বাড়ছে স‍্যাটেলাইটের জট। বতর্মানে চলছে ব‍্যবসায়িকভাবে প্রাধান‍্যশীল মহাশূন‍্যের যুগ… যখন আমরা প্রথমবারের মতো মহাকাশকে নিয়ে ভাবনার চাপে পড়েছি।’

চীনা স্পেস স্টেশন তিয়ানগংয়ের কোর মডিউলটি যার মানে ‘স্বর্গীয় প্রাসাদ’এ বছরই কক্ষপথে প্রবেশ করেছে এবং ২০২২ খ্রীস্টাব্দেই এটি পুরোপুরি কার্যকর হয়ে উঠবে।

বেইজিংয়ের অভিযোগপত্র প্রদানের পর মাস্কের ব‍্যাপারে চীনের সোস‍্যাল মিডিয়ায় ব‍্যাপক সমালোচনা হয়। যদিও এর আগে সে চীনে যথেষ্ট প্রশংসিত ছিলো। যে টেলসা প্রতিদিন চীনের ক্রেতাদের কাছে হাজার হাজার গাড়ি বিক্রয় করে তেমনই একজন ক্রেতা মাত্র কয়েকদিন আগে করা এক জরীপে বলেছেন, ‘কতটা হাস‍্যকর ব‍্যাপার যে যখন চীনা জনগণ টেলসার গাড়ি ক্রয় করে মাস্ককে বিপুল অর্থ প্রদান করে তখন সেই টাকায় মাস্ক মহাকাশে স্টারলিঙ্ক স‍্যাটেলাইট উৎক্ষেপন করে যে স‍্যাটালাইট আবার মহাশূন‍্যে চীনা স্পেস স্টেশনে আঘাত করতে ছুটে যায়।’

বিদেশী ব্র্যান্ডের সকল পণ‍্য জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী কাজ করছে চীনা জনগণের মধ‍্যে প্রচলিত এমন ধারণার প্রতিনিধিত্বকারী আরেকজন ওয়েইবু ব‍্যবহারকারী বলেন, ‘টেলসাকে বর্জন করার প্রস্তুতি নেওয়া দরকার।’কেউ কেউ অনুমান করছে যে যদি বিপরীত ধরণের ঘটনা ঘটতো তাহলে ওয়াশিংটন হয়তো চীনের বিরুদ্ধে বিধিনিষেধ আরোপ করতো। তাই একজন বলেন, ‘আমরা কেন তেমনটাই করছি না যেমনটা ওরা সচরাচর করে?’ এ ব‍্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলে ক‍্যালিফোর্নিয়া ভিত্তিক স্পেসেক্সের কেউ কোন মন্তব‍্য করতে রাজী হয়নি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা বর্তমান রাশিয়া ও চীনের মহাকাশ কার্যক্রমের তুলনামূলক পর্যালোচনার স্বার্থে যেহেতু পশ্চিমা প্রচারমাধ‍্যমের কল‍্যানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নিষ্প্রয়োজন এবং এই প্রবন্ধে রাশিয়ার প্রসঙ্গটি অপ্রাসঙ্গিক, তাই চীনের মহাকাশ গবেষণার ইতিহাস সম্পর্কে পাঠককে কিঞ্চিত ধারণা দিতে চাই। চায়না ন‍্যাশানাল স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (সিএনএসএ) পরিচালিত গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের মহাকাশ গবেষণা প্রকল্প শুরু হয়েছিলো ১৯৫০-এর দশকে যখন চীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি মোকাবেলায় ব‍্যালাস্টিক মিসাইল প্রকল্প শুরু করেছিল। যাহোক চালক সম্বলিত কর্মসূচি চালু হয়েছিল আরো কয়েক দশক পরে। তবে চীন পৃথিবীতে তৃতীয় দেশ যারা স্বাধীনভাবে মহাশূন‍্যে মানুষ পাঠাতে সমর্থ হয়েছে। আর বর্তমানে তাদের পরিকল্পনার মধ‍্যে রয়েছে ২০২২- এর মধ্যেই মহাশূন‍্যে তাদের নিজস্ব স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ স্টেশন স্থাপন করা এবং সৌরজগত ও তার বাইরে যতদূর সম্ভব আন্তঃগ্রহ গবেষণা পরিচালনা করা।

১৯৫৭ খ্রীস্টাব্দের ৪ অক্টোবর সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুৎনিক-১ মহাকাশে উৎক্ষেপণের পর চীনের ত‍ৎকালীন চেয়ারম্যান মাও সে তুং ১৯৫৮-এর ১৭ মে সিপিসি’র জাতীয় কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ‘চীনকে পরাশক্তিদের সমকক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে, চীনের কৃত্রিম উপগ্রহ বানানোর সক্ষমতা অর্জন করতে হবে এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার দশম বার্ষিক উদযাপনের আগেই ১৯৫৯-এর মধ‍্যে মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করতে হবে।’এ জন‍্য তারা তিনধাপের লক্ষ‍্যমাত্রা নির্ধারণ করে অগ্রসর হয়। চন্দ্র বিজয়ের ভেতর দিয়ে যখন মহাকাশ অভিযানে দুই পরাশক্তির প্রতিযোগিতা তুঙ্গে তখন মাও সে তুং ও চৌ এন লাই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এই দৌড়ে চীনের পিছিয়ে পড়লে কিছুতেই চলবে না। আর সেই সাথে শুরু হয় চীনের নিজস্ব চালক পরিচালিত মহাকাশ প্রকল্প। এরপর থেকে বহুবিধ সফলতা-ব‍্যর্থতার পথপরিক্রমায় আজ চীন মহাকাশ অন্বেষণ ও গবেষণা ক্ষেত্রে এক অজেয় পর্যায়ে উন্নীত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘চীন যে গতিতে অগ্রসর হচ্ছে তাতে আগামী ২০৩০ সালের ভেতরে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাবে।’

এখানেই মার্কিন সাম্রাজ‍্যবাদী গোষ্ঠীর মাথাব‍্যাথার কারণ। তারা ভূপৃষ্ঠে আর্থ-সামাজিক সকল সূচকে চীনের চেয়ে পিছিয়ে পড়ায় বর্তমানে এলন মাস্কের কাঁধে বন্দুক রেখে মহাকাশে একটি যুদ্ধ জারি করতে চায় বলে বিশেষজ্ঞমহল মনে করেন।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজ; সদস্য, বাঙলাদেশ কমিউনিস্ট কর্মীসংঘ।

ইমেইল: bipi1963@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published.